Skip to content

লাল লতিকা হট্টিটি

হবিগঞ্জে খোয়াই নদের চরে বিচরণ করছে লাল লতিকা হট্টিটি। ছবি : আশিষ দাশ

হবিগঞ্জে খোয়াই নদের চরে বিচরণ করছে লাল লতিকা হট্টিটি। ছবি : আশিষ দাশ

শাহ ফখরুজ্জামান
শীত মৌসুমে খরস্রোতা খোয়াই নদের চারদিকে জেগে ওঠে ধু ধু বালুচর। আর চরজুড়ে সারাক্ষণ চলে বালুখেকোদের আগ্রাসন। অথচ এই সময়টা চর ‘দখলে’ থাকার কথা লাল লতিকা হট্টিটির। ফলে বালুতে নেমে একটু রোদ পোহানো এবং পোকামাকড় শিকারের কোনো সুযোগ মেলে না ওদের।

নদীর চরে লাল লতিকা হট্টিটির অবাধ বিচরণ আর খাবার খুঁজে বেড়ানোর দৃশ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একসময় ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। বিভিন্ন প্রতিকূলতায় সেই দৃশ্য এখন আর সহজে নজরে পড়ে না। তবে পাখিটি একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। হারিয়ে যায়নি মুগ্ধতা ছড়ানো সেই বিচরণ-দৃশ্যও।

শীত মৌসুম চলছে। কয়েক দিন আগে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আসামপাড়া এলাকায় খোয়াই নদীতে জেগে ওঠা চরে দেখা মিলল লাল লতিকা হট্টিটির। খঞ্জনা আর পরিচিত কয়েকটি পাখির সঙ্গে ওরা হলুদ লম্বা পায়ে সন্তর্পণে হেঁটে চলা আর পোকামাকড় শিকারে ব্যস্ত। এই অপরূপ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ পেয়ে যান শখের ছবিয়ালের অ্যাডমিন আশিষ দাশ।

ছবি ধারণ সেই সময়ের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে আশিষ দাশ বলেন, ‘হট্টিটি অত্যন্ত চালাক এবং আদুরে পাখি। লাল লতিকা, ধূসর আর সাদা রঙের পালক এবং হলুদ রঙের লম্বা পায়ের পাখিগুলো এমনিতেই দেখতে খুব সুন্দর। খোয়াই নদীর চরে ওদের বিচরণের দৃশ্যটি ছিল মুগ্ধতা ছড়ানো। প্রথম নজরেই চোখে পড়ে পাখিগুলোর ঠোঁট আর চোখের সামনের লাল অংশ। চরে ওদের বিচরণ আর স্বচ্ছ পানিতে প্রতিবিম্ব মিলে সে এক মনকাড়া দৃশ্য!’

জলাশয়ের আশপাশে বিচরণ করা ছোট আকারের হট্টিটি (Lapwing) Perciformes বর্গের পাখি। মাথায় ঝুঁটি ও প্রশস্ত ডানা আছে। পাখিটির অধিকাংশ প্রজাতি পূর্ব গোলার্ধ ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিস্তৃত। উন্মুক্ত প্রান্তর, মাঠ ও খামারের ওপর দিয়ে ঘন ঘন উড়ে যায়। শীতকালে কর্দমাক্ত মাটিতেও দেখা যায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে কীটপতঙ্গ, কৃমিকীট ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী ক্ষুদ্র প্রাণী। বীজ ও ছত্রাক, ব্যাঙ ও ব্যাঙাচিও খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সারা পৃথিবীতে ২০ প্রজাতির হট্টিটি রয়েছে। বাংলাদেশে সাত প্রজাতির হট্টিটির বিচরণ দেখা যায়। এর মধ্যে তিনটি স্থায়ী। বাকি চারটি প্রজাতি পরিযায়ী। লাল লতিকা হট্টিটি স্থায়ী প্রজাতি।

লাল লতিকা হট্টিটি একসময় প্রচুর দেখা গেলেও নানা প্রতিকূলতায় এখন সংখ্যায় কমে যাচ্ছে। পায়ের আঙুলের বিশেষ গড়নের কারণে ওরা গাছের ডালে বসতে পারে না। ডাকে ‘হট-টি-টি হট-টি-টি’ স্বরে। ওরা বাসা বাঁধা ও ডিম দেওয়ার সময় এক রকম, আনন্দে এক রকম, বাচ্চাদের দিকনির্দেশনা দিতে এক রকম এবং সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে ভিন্ন রকম শব্দে ডাকে। অন্য কোনো পাখির ক্ষেত্রে এমনটা একেবারেই বিরল।

পাখিটি বাসা বাঁধে খোলা মাঠ, চষা ক্ষেত, ছোট ঘাস বা বিভিন্ন রকম ছোট উদ্ভিদ-গুল্মের ওপর। খুব বেশি গোছালোও নয় ওদের বাসা। বড়জোর এক সপ্তাহ সময় নেয় বাসা তৈরিতে। ছোট মাটির ঢেলা, শামুকের খোল, ইটের টুকরো, পুরনো দালানের পলেস্তারার টুকরো, শুকনো সুপারি, মাটির হাঁড়ি-কলসির চাড়া ইত্যাদি ওদের বাসা তৈরির উপকরণ।

হট্টিটি নিয়ে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একাধিক গল্প আছে, যা থেকে নানা উপকথা বা মিথের জন্ম হয়েছে। হট্টিটির লম্বা পা নিয়ে একটি জনপ্রিয় মিথ এ রকম—‘সৃষ্টির শুরুতে হট্টিটি পাখির গর্ব ছিল যে সে স্বর্গ, আকাশ আর পৃথিবীর ভার বহন করতে পারে। আর তা অন্য পাখিদের কাছে সে সব সময় বলে বেড়াত। এতে পাখিরা বিরক্ত হয়ে একদিন সবাই মিলে বিধাতার কাছে নালিশ করল। নালিশ শুনে বিধাতা হট্টিটি পাখিকে অভিশাপ দিলেন, হট্টিটিকে পায়ের ওপর আকাশের ভার বহন করতে হবে। এ জন্যই হট্টিটির দেহের তুলনায় পা বেশি লম্বা। আর মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার ভয়ে পাখিটি পা দুটি আকাশপানে তুলে শয়ন করে।’

বাস্তবে কখনো হট্টিটি পাখিকে আকাশের দিকে পা উঁচু করে থাকতে দেখা যায়নি। আঙুলের গঠনবৈশিষ্ট্যের কারণে এরা গাছের ডালে বসতে পারে না। সে জন্য চলাফেরা, আহার, বিশ্রাম, বংশবৃদ্ধি সব কিছুই করে থাকে মাটিতে। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

Hajj-Omrah-FB-Boost

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *