Skip to content

হাতিটির দিনরাত্রি

Elephant

ভাসতে ভাসতে ভারত থেকে এসেছে হাতিটি। ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন চর ঘুরে গেছে যমুনার চরে। ২০ জুলাই পর্যন্ত তার ২২ দিনের খবর জানাচ্ছেন কুদ্দুস বিশ্বাস

Elephant2সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চর বাগুয়ারচর, ২৮ জুন
কুড়িগ্রামের রৌমারীর সাহেবের আলগা সীমান্তের আন্তর্জাতিক মেইন পিলার নম্বর ১০৫২-এর কাছ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের বানের পানিতে ভেসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে চরবাগুয়ার আটকা পড়ে একটি বুনো হাতি। ভারতের আসাম রাজ্যের শিশুমারা পাহাড়ি এলাকার ওই বুনো হাতিটি দলছুট হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের স্রোতের কবলে পড়ে। শেষে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশে ঢোকে—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে বলে জানান আবুল কাশেম নামের একজন সীমান্তবাসী।

২৮ জুন বাংলাদেশে প্রবেশের পর রৌমারী, রাজীবপুর, দেওয়ানগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটার ৮টি চর ঘুরে প্রায় ৭০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিয়ে ১৫ জুলাই ঠাই নেয় বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চালিতাবাড়ি ইউনিয়নের হরিরামপুরের কাশিয়াবাড়ি চরে। তিনদিন পর সরে যায় আরো ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মুনসুরনগর ইউনিয়নের চরছোইন্না চর এলাকায় গিয়ে ওঠে। ২০ জুলাই পর্যন্ত সেখানেই ছিল হাতিটি। দীর্ঘ সময় সঙ্গীহীন হাতিটি খাবারের অভাবে এখন খুবই ক্লান্ত।

২৮ জুন
২৮ জুন সকাল ৭টার দিকে নদের বুকে কিছু একটা ভাসতে দেখে এলাকাবাসী। একসময় রটে যায়—ভারত থেকে মহিষ ভেসে এসেছে। একটা নৌকা নিয়ে ওই মহিষ ধরতে যায় সাহেবের আলগা চরের আনোয়ার হোসেন, বিনত মোল্লা, সিরাজুল ইসলাম আর সোনাউল্লাহ। কাছে যেতেই হাতিটি তাদের দিকে তেড়ে আসে। তাড়া খেয়ে ডাঙায় ঠাঁই নেয় তারা। ওই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতিটি চরবাগুয়ার চরেই অবস্থান করে। কিন্তু চরে খাবার না থাকায় চর ছাড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে। ভাসতে ভাসতে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে খেড়ুয়ার চরে আটকা পড়ে।

২৯ জুন
খেড়ুয়ার চরেও খাবার ছিল না। তবে সারা দিন ওই চরে অবস্থান করে রাতে স্রোতে ভেসে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজীবপুরের নয়াচর বাজারের পশ্চিমে মধ্যপাড়া নামক চরের কাদায় আটকা পড়ে। এ সময় নয়াচর বাজার এলাকার হাজারও উত্সুক মানুষ ভিড় করে হাতিটি দেখার জন্য। নয়াচরের সুরুজ মিয়া বলেন, ‘সামনাসামনি হাতি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। এই হাতিটি দেখে বুঝতে পেরেছি বাস্তবে হাতি দেখতে কেমন।’

Elephant3৩০ জুন
মধ্যপাড়ার কাদাপানিতে আটকে গিয়ে সারা দিন এক জায়গায়ই দাঁড়িয়ে ছিল হাতিটি। রাতে প্রায় এক কিলোমিটার উজানে চড়াইহাটি চরে ঢোকে। ‘এ সময় হাতিটিকে খুবই দুর্বল ও ক্ষুধার্ত মনে হয়েছিল। এ কারণে আমি বসতভিটা থেকে কলাগাছ কেটে নৌকায় করে হাতির কাছে ফেলে দিই। কলাগাছ পেয়ে হাতিটি দ্রুত খেতে থাকে,’ বলছিলেন কীর্তনতারী চরাঞ্চলের ইউপি মেম্বার নুরুল হক।

১-৭ জুলাই
চড়াইহাটি চরে প্রচুর কাশবন। খাবার থাকায় এখানে টানা আট দিন অবস্থান করে। এ চরে কোনো জনবসতি ছিল না। পরে আবার যায় নয়াচর মধ্যপাড়া চরে।

৮-৯ জুলাই
খুব ভোরে নয়াচর মধ্যপাড়া চরে হাতিটিকে দেখা যায়। এখানে দুদিন অবস্থান করে। খাবার না পেয়ে রাতে দক্ষিণ বড়বেড় চরের জনবসতিতে হামলা করে। একটি পরিবারের ঘর ভেঙে ফেলে। কয়েকটি গাছও উপড়ে ফেলে। একপর্যায়ে মানুষ তাড়া করলে আবার স্রোতে ভেসে যায়।

১০-১১ জুলাই
ওই রাতেই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি নামক চরে অবস্থান নেয় হাতিটি। এখানেও খাবারের খোঁজে জনবসতিতে ঢোকে। চরের মানুষ ভয় পেয়ে হাতিটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। ক্ষিপ্ত হয়ে হাতিটি মানুষের বাড়িঘরে আক্রমণ করে ১২টি পরিবারের ঘরবাড়ির ক্ষতি করে। একপর্যায়ে রাতের অন্ধকারে আগুন জ্বালিয়ে ও ঢোলের শব্দ করে হাতিটিকে তাড়িয়ে দেয় চরের মানুষ।

১২-১৩ জুলাই
এরেন্ডাবাড়ি চরের মানুষের তাড়া খেয়ে চরহাগড়ায় গিয়ে ওঠে। এ চরে জনবসতি ছিল না। কাশবন থাকায় এ চরে দুদিন অবস্থান করে হাতিটি। চরটি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাবাড়ি ইউনিয়নের অধীনে।

১৪ জুলাই
গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের পাতিলতলা চরে আটকে পড়ে। এখানে কোনো খাবার ছিল না। সারা দিন অনাহারে থাকার পর রাতে ছুটে চলে অন্য চরের দিকে।

১৫-১৮ জুলাই
বগুড়ার সারিয়াকান্দির হরিরামপুর কাশিয়াবাড়ি চরে গিয়ে ওঠে হাতিটি। রাতে জেলেরা হাতিটিকে প্রথমে দেখে ভয় পেয়েছিল। সকালে হাতি দেখার জন্য অসংখ্য নৌকায় উত্সুক জনতা ভিড় করে। চরের বাবুল ইসলাম নামের এক লোক কলাগাছ কেটে হাতিটিকে খাবার দিয়েছে বলে জানা গেছে। চরে কাশবন আর খাবার হিসেবে কলাগাছ পাচ্ছিল হাতিটি।

১৯-২০ জুলাই
কাশিয়াবাড়ি থেকে হাতিটি ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সরে গিয়ে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মুনসুরনগর ইউনিয়নের চরছোইন্না চর এলাকায় গিয়ে ওঠে ১৯ জুলাই। ২০ জুলাই সকালে স্থানীয় গিয়াস উদ্দিন মণ্ডল হাতিটিকে তাঁর চাচা ওয়াছিম মণ্ডলের বাড়ির ধারে দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে যান। পরে অবশ্য হাতিটি পাটক্ষেতে গিয়ে অবস্থান নেয়।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য
রংপুর চিড়িয়াখানার কিউরেটর (তত্ত্বাবধায়ক) ডা. নাসির হোসেন খান জানান, মানুষের কাছে দেশ বা সীমানা থাকলেও প্রাণীর কোনো দেশ বা সীমানা নেই। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে কোনো প্রাণী বিপদগ্রস্ত হলে তাকে উদ্ধার বা সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে। হাতি উদ্ধারে বন বিভাগের গঠন করা ১০ সদস্যের প্রধান ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গোবিন্দ রায় বলেন, ‘এটি একটি বুনো হাতি। উদ্ধারের অনেক চেষ্টাই করেছি। আর পানির মধ্যে থাকার কারণে অচেতনও করা যাচ্ছে না।’ জানা গেছে, হাতিটির উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতা দিতে ভারত থেকে তিন সদস্যের একটি দল শিগগিরই বাংলাদেশে আসছে। ছবি: লেখক। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *