Skip to content

৪৮ বাঁকের মৃত্যুফাঁদ

Alps

নাবীল অনুসূর্য
ইউরোপের সর্বোচ্চ ও সর্ববৃহৎ পর্বতমালা আল্পস। কেবল বিশালত্ব আর উচ্চতার জন্যই নয়, সৌন্দর্যের জন্যও আল্পসের খ্যাতি কম নয়। এই আল্পস পর্বতমালার পূর্ব দিকের একটি অংশের নাম ওর্টলার আল্পস। এটি পড়েছে ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে। ইতালিতে যে অংশটুকু পড়েছে, তার লাগোয়া দুটি শহর—স্তেলভিও ও বোর্মিও। ওর্টলার আল্পসের মধ্য দিয়ে এই শহর দুটির একটি থেকে আরেকটিতে যে রাস্তাটা চলে গেছে, সে রাস্তার খ্যাতিও কম নয়। তবে রাস্তাটার দুই পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এর খ্যাতি যতটা, দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে কুখ্যাতি তার চেয়ে বেশি।

রাস্তাটার নাম পাসো দেল্লো স্তেলভিও। সংক্ষেপে পরিচিত পাসো স্তেলভিও বা স্তেলভিও পাস নামেও। এর জার্মান নামটিও বেশ চালু—স্টিল্ফসার ইয়োখ। ওই স্তেলভিওরই জার্মান নাম স্টিল্ফ। আর এটাকে স্থানীয়রা, বিশেষ করে গাড়িচালকরা আরেক নামেও ডাকেন—‘মৃত্যুফাঁদ’। সত্যি এটা ভয়ানক বিপজ্জনক। এখানে দুর্ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর। অবশ্য দুর্ঘটনাগুলোর একটা বড় অংশেরই কারণ রাস্তাটার ভয়াবহতাকে পাত্তা না দেওয়া।

স্তেলভিও থেকে বোর্মিও যেতে স্তেলভিও পাস ওর্টলার আল্পসের বিভিন্ন পর্বতের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে। আর রাস্তাটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুও অনেক। সর্বোচ্চ উচ্চতা ৯ হাজার ৪৫ ফুট। তবে শুধু এই উচ্চতার কারণে অবশ্য পথটাকে বিপজ্জনক বলা হয় না। পৃথিবীতে এর চেয়েও উঁচু রাস্তা আছে। আল্পসেই আছে স্তেলভিও পাসের চেয়ে উঁচু আরেকটা সড়ক। তবে রাস্তার বিপদগুলোর অন্তত একটির সঙ্গে এই উচ্চতার যোগ আছে—বরফ। ইউরোপের এ ধরনের উঁচু রাস্তাগুলো এমনিতেই শীতকালে বরফের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়। বন্ধ থাকার দিক দিয়ে এই রাস্তাটা সবার চেয়ে এগিয়ে। স্তেলভিও পাস সবার আগে বন্ধ হয়, সবার শেষে চালু হয়। চালু থাকেই মোটে চার মাস; জুন থেকে সেপ্টেম্বর। এর মধ্যেও আবার মাঝেমধ্যেই তুষারঝড়ে বা বরফ জমে বন্ধ হয়ে যায়।

তার ওপর রাস্তাটা তেমন প্রশস্তও নয়। অনেক জায়গায় এতটাই সরু, দুটি গাড়ি দুই দিক থেকে এলে, পার হওয়াটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। আবার রাস্তার ধারের বেড়া খুব একটা শক্ত তো নয়ই, একদমই উঁচু নয়। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর রাস্তার বাঁকগুলো। এমনকি কনুইয়ের সঙ্গেও তুলনা করা যায় না। ওগুলো আরো সংকীর্ণ। আর স্তেলভিও থেকে বোর্মিও যেতে এমন বাঁক আছে মোট ৪৮টি। সব মিলিয়ে খুব দক্ষ চালক ছাড়া এই রাস্তায় গাড়ি চালানোর কথা চিন্তাও করা উচিত নয়।

স্তেলভিও পাস অবশ্য অনেক পুরনো। বানানো হয় ১৮২০ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে। তখন ওই অঞ্চলটা ছিল অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। অস্ট্রিয়ানরাই বানিয়েছিল। বানানো হয়েছিল মূলত অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের লোম্বারদিয়া প্রদেশের সঙ্গে মূল সাম্রাজ্যের যোগাযোগের জন্য। কাজেই লোম্বারদিয়া দখলে রাখতে কৌশলগত কারণেই রাস্তাটি ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তখন রাস্তাটি যে পরিকল্পনায় বানানো হয়, এখনো প্রায় তেমনটাই আছে। পরে ১৯১৯ সালে ইতালি এই অঞ্চলগুলো দখল করে নিলে, এর গুরুত্বও কমে যায়।

সেই গুরুত্ব না থাকলেও ইদানীং অন্য একটা গুরুত্ব যুক্ত হয়েছে। এমনিতেই রাস্তাটির চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য ভীষণ সুন্দর। বিশেষ করে এর ট্রাফোই অংশের পর্বতের দৃশ্য তো রীতিমতো বিখ্যাত। কাজেই পর্যটকরা, বিশেষ করে ফটোগ্রাফারদের কাছে এটি ভীষণ আকর্ষণীয়। পাশাপাশি এখন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে সাইক্লিস্টদের কাছেও। এই রাস্তায় বেশ কয়েকবার প্রোফেশনাল বা পেশাদার সাইক্লিং প্রতিযোগিতা হয়। অবশ্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এত ওপরে সাইকেল চালানোটা ভীষণ কষ্টের। তারপর বিপদ-আপদের ব্যাপারগুলো তো আছেই। সব মিলিয়ে সম্ভবত এই রাস্তায় হওয়া সাইক্লিং প্রতিযোগিতাগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন আর রোমাঞ্চকর। তাই সুযোগ পেলেই সাইক্লিস্টরা এখনো রাস্তাটিতে হানা দেয়। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *