Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » নাফাখুমের প্রান্তরে

নাফাখুমের প্রান্তরে

Nafakhumমো. জাভেদ-বিন-এ হাকিম
বান্দরবান এমন একটি জেলা, যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ম্লান হওয়ার নয়। বাংলাদেশের জন্য বান্দরবান প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।

‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের পাঁচ বন্ধু মিলে এবার গিয়েছিলাম বান্দরবানে, বাংলার নায়াগ্রা নামে খ্যাত নাফাখুম আর আমিয়খুম দেখতে। ‘নাফা’ অর্থ মাছ, আর ‘খুম’ অর্থ জলপ্রপাত। এটি মারমা শব্দ। অমিয় শব্দের অর্থ জানতে পারিনি। তাতে কি, অমিয়খুমের নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য হূদয়ে ধারণ করে এনেছি। তবে আজ শুধু নাফাখুমের গল্প হবে। থানচি থেকে গাইড নিয়ে ইঞ্জিন নৌকা রিজার্ভ করে প্রথমে ছুটেছিলাম রেমাক্রির উদ্দেশে। নাফাখুম যেতে হলে সময় স্বল্পতার কারণে একরাত সেখানে কাটাতেই হয়। ছবির মতো সুন্দর সাঙ্গু নদী। একমাত্র এই নদীটিরই উত্পত্তিস্থল বাংলাদেশের ভেতরে রয়েছে। স্রোতের উল্টো দিকে আমাদের নৌকা সাঁতরে চলেছে। সাঙ্গুর দু-কূলে পাথরের ছড়াছড়ি। সরু নৌকায় ভালোলাগা আর ভালোবাসার মেজাজে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা বেশ আয়েশ করে বসে আছে। ঝিরঝির বাতাসে নৌকা সাঙ্গুর জলের হরেক রূপ আর ডুবে থাকা পাথরের সাথে আপস করে ভেসে চলেছে তিন্দুর দিকে। এ এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। কয়েক ঘণ্টা চলার পর তিন্দুর দেখা পেলাম। কিছুক্ষণের জন্য বিরতি। চা-নাস্তার পাশাপাশি আদিবাসী পাড়া ঘুরেফিরে ফটোসেশন হলো।

যাত্রা আবার শুরু হলো। এবার সাঙ্গুর জল কেটে উপর দিকে যাচ্ছি। পানির তীব্র গতি, স্বচ্ছ জলে নদীর তলদেশে পাথরের লুটোপুটি, দু পাশে দিগন্ত ছোঁয়া পাহাড় যেন প্রাচীর হয়ে আছে।

দূর থেকে দেখা যায় রাজাপাথর। সত্যিই রাজা হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে অনেক পাথরের ভিড়ে। রাজাপাথর আসতেই ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ। ছোট-বড় অসংখ্য পাথর দেখে মনেই হয় না আমরা দেশের মাটিতে আছি! অথচ কতটা অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে প্রকৃতির এ রূপ। রাজাপাথর এলাকা অতিক্রম করে আমরা আরও গভীরে যেন ভূ-স্বর্গের ভেতরে প্রবেশ করছি। সাঙ্গু নদীর দু তীরের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা অক্ষরে বুঝানো সম্ভব নয়। রোদেলা বিকেলে রেমাক্রি পৌঁছলাম। পাহাড়ে সন্ধ্যা আগে নামে, তাই চটজলদি পেটে দুটো দানা-পানি দিয়ে রেমাক্রি খালে জলকেলিতে মেতে উঠলাম। রাতে রেমাক্রি থাকব। তাই ইচ্ছেমতো নীলাভ শীতল জলে ডুবিয়ে নিলাম নিজেদের। তারা ভরা রাতে পাহাড়ি মোরগের বার-বি-কিউ হলো। বেশ সুস্বাদু হলো বলতে হয়। এশার নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব সকালেই বের হয়ে যেতে হবে নাফাখুমের পথে। ফজরের নামাজ পড়েই শুরু হলো পায়ে হাঁটা। সঙ্গে আছে চিড়া-মুড়ি-গুড় ভাবনা নেই পেট চো-চো-র। কখনো নদী-খাল, কখনো ঝিরি, কখনোবা আবার পাহাড়-টিলা ডিঙ্গিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা হেঁটে নাফাখুম জলপ্রপাতের দেখা পেলাম। অকল্পনীয় সুন্দর! নিজের চোখকে বিশ্বাসই করাতে পারছিলাম না। এমনিতে বর্ষা মৌসুমে নাফাখুম অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ধারণ করে! যা শুধু স্বচক্ষে দেখলেই অনুভব করা সম্ভব। আনুমানিক প্রায় পঁচিশ ফিট প্রশস্ত জল প্রপাতটি দেখলে মনে হবে এ যেন সেই কানাডার নায়াগ্রা। সত্যিই জাতি হিসেবে আমরা বড় ভাগ্যবান। দুঃখ একটাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। শুভ্র ফেনা তোলা জলে কোমড়ে রশি আর লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কাটতে নেমে পড়লাম। সবাই আনন্দে আত্মহারা, আজ যেন নেই কোনো বাধা। সব কষ্ট, ক্লান্তি ভুলে একাকার সবাই নাফাখুমের জলে। চার হাত-পা ছড়িয়ে পানিতে দাপালাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক জলকেলিতে মাতোয়ারা থাকার পর অমিয়খুমের দিকে অগ্রসর হলাম। বিদায় নাফাখুম! আবার আসব ফিরে তোমার কাছে।

যো গা যো গ
ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে দিনে রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া ৬২০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে লোকাল বাস বা চাঁদের গাড়িতে থানচি বাজার যেতে হবে। থানচি নৌঘাট থেকে ট্রলারে রেমাক্রি যেতে হবে। ভাড়া রিজার্ভ ২৫০০ টাকা থেকে ৩২০০ টাকা। ভ্রমণের গাইড নেবে প্রতিদিনের জন্য ৭০০ টাকা। সব মিলিয়ে তিন দিনের জন্য মাথা পিছু ৫৫০০ টাকা খরচ হবে।
সূত্র : ইত্তেফাক