Home » বাছাইকৃত » সোমেশ্বরী নদীর কোলে
সোমেশ্বরী নদীর নীল আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার

সোমেশ্বরী নদীর কোলে

সোমেশ্বরী নদীর নীল আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার

সোমেশ্বরী নদীর নীল আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার

রকিবুল হক রকি
ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে নামতে নামতেই বিকাল চারটা বেজে গেল। রওনা দিয়েছিলাম দেরিতে, দুপুর ১টার পর, ঈদ-পরবর্তী ছুটির কারণে ভাগ্যিস রাস্তা ফাঁকা ছিল, তাই খুব একটা সময় লাগেনি পৌঁছতে।

কিন্তু ময়মনসিংহ আমাদের গন্তব্য নয়। তাই মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে গেলাম ব্রিজ মোড় ব্যাসস্ট্যান্ডে। সেখানে গিয়ে খুঁজতে লাগলাম নেত্রকোনা বিরিশিরির বাস, আমাদের আসল গন্তব্য। একটু খুঁজতেই বাস পেয়ে গেলাম। বাসের চেহারা বেশ নাজুক। কিছু করার নেই। সব বাসের চেহারাই এক। সন্ধ্যা ছয়টার বাসের চারটি টিকিট কেটে আমরা চারজন গেলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, একটু ঘুরে দেখব, ব্রক্ষপুত্রের হাওয়া খাব।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম পরিবেশে হাঁটাহাঁটি করে বেশ ভালোই লাগছিল। ঈদের ছুটি, ক্যাম্পাস তাই বন্ধ। চারদিক ফাঁকা, সবুজে ভরা ক্যাম্পাসে ঘুরতে বেশ ভালোই লাগছিল।

ছয়টার আগেই চলে গেলাম বাসস্ট্যান্ডে। এরই মধ্যে আমার এক বন্ধু ফোন করে জানিয়ে দিল, যে বাসে যাব সেটায় হেডলাইট আছে নাকি দেখে নিতে। সে নাকি বছর খানেক আগে গিয়েছিল, সেই বাসের কোনো হেডলাইট ছিল না। রাতের বেলা নোকিয়া ফোনের টর্চ জালিয়ে নাকি বাস চালাতে হয়েছিল। সর্বনাশ! বাসের সামনে গিয়ে তাই আমরা খোঁজাখুঁজি করতে লাগলাম। আমাদের খুঁজতে দেখে হেল্পার এগিয়ে এসে জানতে চাইল আমরা কী খুঁজছি। বললাম, হেডলাইট। শুনে সে বেশ অপমানিত বোধ করল। বলল, হেডলাইট ছাড়া গাড়ি চলে নাকি?

চীনামাটির পাহাড় ঘেষেই সবুজ পানির পুকুর

চীনামাটির পাহাড় ঘেষেই সবুজ পানির পুকুর

যাই হোক, ছয়টার বাস ছাড়ল সাড়ে ছয়টায়। চারদিক অন্ধকার, তাই আশপাশের কিছুই দেখতে পারছিলাম না, তবে ঢাকায় অতটা শীত না লাগলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম বাইরে প্রচণ্ড কুয়াশা। তাই শীতে জবুথবু হয়ে বসে ছিলাম। কিন্তু একভাবে বেশিক্ষণ বসে থাকা যায় না, কারণ বাসের প্রচণ্ড ঝাঁকি। আগেই শুনেছিলাম এখানকার রাস্তা নাকি প্রচণ্ড রকমের খারাপ। কিন্তু এতটা যে খারাপ, তা কল্পনাও করতে পারিনি। কোনো কোনো জায়গায় বাস পুরো কাত হয়ে যাচ্ছিল, এই বুঝি উল্টিয়ে পড়ে গেল! তবে ড্রাইভারের কোনো টেনশন দেখলাম না। সে মোবাইলে কার সঙ্গে যেন রসের আলাপ করছিল, আর গাড়ি চালাচ্ছিল।

ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরির দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু রাস্তার কারণে এইটুকু পথ যেতে আড়াই-তিন ঘণ্টা লেগে গেল। রাত নয়টায় বিরিশিরিতে নেমেই আমরা চলে গেলাম ণডঈঅ রেস্ট হাউসে, আজকে রাতটা আমরা এখানেই কাটাব। বিরিশিরি বাজারের পাশেই এই ছোট্ট ট্রেনিং সেন্টার কাম রেস্ট হাউসটা। বেশ ছিমছাম এবং নিরাপদ বলে যারা ঘুরতে আসে, তাদের কাছে এটার রুমগুলোর ভীষণ চাহিদা। আগে থেকে ফোনে বুকিং দিয়ে না এলে রুম পাওয়াই যায় না। আমরাও ফোনেই বুকিং দিয়ে এসেছিলাম। বাজার থেকে রাতের খাবার খেয়েই রুমে গিয়ে এক ঘুম, রাস্তার ঝাঁকিতে শরীরের ২০৬টা হাড়গোড়ের মনে হচ্ছিল আর জায়গামত একটাও নেই।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি লুঙ্গি পরা কয়েকটা লোক, সবক’টা দাঁত বের করা। এরা হচ্ছে এখানকার রিকশাওয়ালা। বিজয়পুরের নীল পানি-সবুজ পানির দীঘি, চীনামাটির পাহাড়, কোহিনূর পাহাড়, চার্চ, মন্দির, শহীদ মিনার—এই ছয়টা জায়গা তারা ঘুরিয়ে দেখাবে। বিনিময়ে নাকি আমাদের যা খুশি, তাই দিলে চলবে। অতীতে এরকম কিছু একটা দিলেই খুশি টাইপ চুক্তি কখনোই সুখকর হয়নি। তাই আমরা আগেই টাকা-পয়সার ব্যাপারটা সুরাহা করে নিলাম। দুই রিকশা, ৮০০ টাকা। সব মিলিয়ে চার ঘণ্টা লাগবে।

এটা হচ্ছে নীল পানির পুকুর, শীতকালে পুরো নীল হয়ে থাকে

এটা হচ্ছে নীল পানির পুকুর, শীতকালে পুরো নীল হয়ে থাকে

রিকশায় চড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমরা সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে চলে এসেছি। সীমান্তের পাহাড় ঘেঁষা এই নদীর পানির রং যেন আকাশের নীলের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাচ্ছে। এখন শীতকাল আসন্ন বলে পানি নেই, স্রোতও কম। এমন শান্ত, সুন্দর নদী দেখে মন চাচ্ছিল নেমে পড়ি পানিতে। কিন্তু সাঁতার তো জানি না। দূরের পাহাড়গুলোর ব্যাপারে জানতে চাইলে রিকশাওয়ালা বলল, ওটা গারো পাহাড়, আরও দূরেরটা মেঘালয়ের পাহাড়।

একটু পরেই একটা যাত্রীবাহী ট্রলার এলো, সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে যেন গোটা বিশেক মানুষ এসে ট্রলারে চড়ে বসল। এরা এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিল আল্লা মালুম। ট্রলার তো ভরে গেল। আমরা কোথায় দাঁড়াব চিন্তা করছি, তখন দেখি আমাদের দুই রিকশাওয়ালা তাদের রিকশাটাকে চ্যাংদোলা করে ট্রলারে কীভাবে যেন উঠিয়ে দিল। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, আপনেরা রিকশায় উঠুইন। ট্রলারের ওপর রিকশা, তার উপর আমরা!

দশ মিনিটেই নদী পার হয়ে আবার রিকশা জার্নি শুরু হলো। সোমেশ্বরী নদীর বাঁধ ঘেঁষে রাস্তা, রাস্তা না বলে একগাদা বালি আর ভাঙা মাটির সমন্বয়ে তৈরি কিছু একটা বললেই বোধহয় ভালো হবে। এই রাস্তায় রিকশায় বসে থাকা সম্ভব নয়, তাই আমরা নেমে হাঁটা দিলাম। অবশ্য এই হাঁটাটা পুষিয়ে নিলাম একের পর এক ছবি তুলে। সোমেশ্বরীর নীলাভ সৌন্দর্য রাস্তার বিরক্তি মুছে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট।

কতক্ষণ এভাবে গেলাম খেয়াল নেই। রাস্তা এক সময় নদীর পাশ থেকে গ্রামে ঢুকল, তারপর ধান ক্ষেতে। একটা সময় দূরে সাদা কি জানি দেখা গেল, ভাবলাম মেঘালয়ের পাহাড় থেকে পালিয়ে আসা কোনো মেঘ হয়তো। রিকশাওয়ালা বলল, ওটাই চীনা মাটির পাহাড়। সেটার নিচেই আছে প্রকৃতির আজব সৃষ্টি নীল পানি আর সবুজ পানির লেক। চীনা মাটির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে লেকের পানির এই রং হয়।

নীল পানি

নীল পানি

প্রথমেই পেলাম সবুজ পানির লেক। উপরে নীল আকাশ, মাঝে সাদা পাহাড়, নিচে সবুজ রঙের পানি—চোখ জুড়ানোর জন্য আদর্শ। সঙ্গে জুটে গেল এক স্থানীয় পিচ্চি গাইড। সে আমাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগল।

এবার নীল পানি দেখার পালা। গিয়ে দেখি পানি নীল নয়, নীলের বদলে কেমন যেন ঘোলা ঘোলা। একেবারে শীতকালে নাকি পানি পুরোপুরি নীল হয়ে যায়। তবে আমরা যে হালকা নীলাভ রংটা দেখতে পাচ্ছি, সেটাও নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। সবার কপালে জোটে না। পানি একদম টকটকা নীল হোক আর না হোক, সাদা পাহাড়ের মাঝখানে একটু টলটলে নীল (!) পানি দেখে আমাদের সে কী উল্লাস! সঙ্গের সাঁতারু দু’জন পারলে পানিতে লাফিয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের পিচ্চি গাইড মানা করল। নামলে কী সমস্যা জানতে চাইলে সে বলল অনেক গর্ত, ঠাঁই পাওয়া যায় না। এই পানিতে মাছ হয় না, হয়তো বিষাক্ত, তাই সাঁতারু দু’জন তাদের দুঃখ দূর করল ছবি তুলে আর পাহাড়ে উঠে নাচানাচি করে।

চীনা মাটির পাহাড়ে ঘুরতে গেলে একটাই সাবধানতা, সেটা হচ্ছে পাহাড়ের একেবারে খাদের কোণায় দাঁড়াবেন না। মাটি একদম ঝুরঝুরে। যে কোনো চাপ পেলেই ধসে পড়তে পারে। সব জায়গায় তাই বাহাদুরি দেখানোর দরকার নেই।

নীল-সবুজ পানি দেখার সময়ই আমাকে দূরে চাঁদের মতো বাঁকা কোহিনূর পাহাড় টানছিল। পিচ্চি গাইডকে নিয়ে গেলাম সেই পাহাড়ে। এর মধ্যে তার নাম জেনেছি, মোঃ সোলাইমান। পাহাড়টাকে দেখে ভেবেছিলাম উঠতে কষ্ট কম হবে, কিন্তু আমার জিভ বেরিয়ে গেল চূড়ায় উঠতে। আমার বেগতিক অবস্থা দেখে সোলাইমান খুব হিঃহিঃ করল।

পাহাড় থেকে নেমে দেখি রিকশাওয়ালারা রেগে কাই হয়ে আছে। তারা আমাদের বলেছিল ২০ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসতে, নয়তো অন্য জায়গাগুলোতে যাওয়া যাবে না। সেখানে আমরা পাক্কা ২ ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। চারটা বেজে গেছে। আজকেই ঢাকায় ফিরতে হবে। তাই আর অন্যান্য জায়গায় না গিয়ে বিরিশিরি রওনা দিলাম। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। তারপর আবার সেই ভাঙা রাস্তার ঝাঁকি খেতে খেতে ময়মনসিংহ। এবার ঢাকার বাসে উঠতে হবে। এখানে আসার সময় ঈদের কারণে রাস্তা এবং গাড়ি দুটোই ফাঁকা পেয়েছিলাম। এখন তার উল্টো চিত্র। সবাই ঈদ শেষ করে ঢাকা ফিরছে। টিকিট কাউন্টারে বিশাল লাইন। কতক্ষণ লাগতে পারে, কেউ জানে না। কী আর করা, ডিজিটাল ক্যামেরাটা বের করে বিরিশিরির ছবিগুলো দেখতে লাগলাম।

নদীর তীরে শান্ত বিকেল

নদীর তীরে শান্ত বিকেল

কীভাবে যাবেন : ঢাকার মহাখালী থেকে বাস যায় সরাসরি বিরিশিরি পর্যন্ত। তবে সেই বাসগুলোর অবস্থা নাজুক এবং অনেক সময় নেয়। তাই যদি আগে ময়মনসিংহ যান, সেখান থেকে বিরিশিরি যান, তাহলে তাড়াতাড়ি হবে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ভাড়া ১২০-১৮০ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরির ভাড়া ৭০-১০০ টাকা। সেখান থেকে বিজয়পুর যেতে চাইলে রিকশা অথবা মোটর সাইকেল। ভাড়া একেক মৌসুমে একেক রকম থাকে, তাই আলোচনা করে ঠিক করে নেবেন।

কোথায় থাকবেন : বিরিশিরি বাজারে থাকার মতো হোটেল আছে, তবে বেশি ভালো নয়। তাই ণডঈঅ কিংবা ণগঈঅ-র রেস্ট হাউসগুলোই ভালো। আগে থেকে বুকিং দিতে হবে। যোগাযোগ করতে হবে ণডঈঅ-র প্রজেক্ট ইনচার্জ অমিতা সাংমার সঙ্গে। মোবাইল নং- ০১৭১২-০৪২৯১৬। ভাড়া নন-এসি প্রতি বেড ৩০০ টাকা, এসিসহ হলে ৪০০ টাকা। এখানেই আপনি তিনবেলার খাবার পাবেন, তবে সেটা আগে থেকে বলে রাখতে হবে।