Home » বাছাইকৃত » স্মৃতিসৌধ দেখতে বাঁশতলায়
চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট

স্মৃতিসৌধ দেখতে বাঁশতলায়

সবুজ ছায়ায় সারি সারি সমাধি।

সবুজ ছায়ায় সারি সারি সমাধি।

ফারুখ আহমেদ
টিলার ওপর মাঠ, এমন দৃশ্য হয়। কিন্তু টিলার ওপর চোখ জুড়ানো স্মৃতিসৌধ? ঘুরে আসতে পারেন সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলা গ্রামে। শুধু স্মৃতিসৌধ নয়, এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সমাধি। তিন দিকে মেঘালয় পর্বতমালা ঘিরে থাকা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এক কথায় অসাধারণ। এখানে আরও পাবেন চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট ও টিলার ওপর জুমগাঁও।

বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ ইতিবৃত্ত
ডাউক সড়ক থেকে সুনামগঞ্জ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ নম্বর সেক্টর। পাঁচ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। পাঁচ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর ছিল সুনামগঞ্জ জেলার বাঁশতলা। এখানকার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিন। পাহাড়বেষ্টিত বাঁশতলা এলাকায় এবং তার আশপাশে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হন, তাঁদের সমাহিত করা হয় বাঁশতলার এই নির্জনে। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ।

স্মৃতিসৌধ

স্মৃতিসৌধ

আমাদের বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ দেখা
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক প্রয়াত মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গীর ইতিহাস জানতে গেলে তিনি বাঁশতলা স্মৃতিসৌধের গল্প বলেছিলেন। সে গল্প ভুলতে বসেছিলাম। তরতাজা করল সিলেটের কয়েকজন বন্ধু। তাদের নিয়ে বেশ কয়েকবার পরিকল্পনা হলো, কিন্তু সময় হলো না। একদিন আচমকা বাঁশতলা যাওয়ার প্রস্তাব পেলাম। তারপর বাসে চেপে বসা। রাত সাড়ে ১২টার বাসে চেপে ভোরে সিলেট পৌঁছেই আম্বরখানা চলে আসি। তখনো ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সেই অটোরিকশায় আবার পথে নামি ছাতকের উদ্দেশে। যানজটবিহীন সে রাস্তায় যাত্রাসঙ্গী শরীফ চোখ বুজে ঘুমের ভান করলেও সামিউল্লাহ বলে চলে বাঁশতলার গল্প। সে এর আগেও বাঁশতলা ঘুরে এসেছে।

দিন শুরুর সঙ্গে কোলাহলও বাড়ছে। এখানে পথের দুপাশের সৌন্দর্য অসাধারণ, সঙ্গে আছে নানা পাখির ডাক। এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই ছাতক বাজার। এখানে পাবলিক খেয়াঘাট থেকে নৌকায় ১০ মিনিটে সুরমা নদী পার হয়ে চলে আসি নোয়ারাই বাজার। সেখান থেকে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রায় দেড় ঘণ্টায় বাংলাবাজার হয়ে বাঁশতলা। স্মৃতিসৌধে পৌঁছানোর আগেই মুগ্ধ হতে হয়। সে মুগ্ধতা এনে দেয় এখানকার স্লুইসগেট। চেলাই খালের ওপর নির্মিত সে স্লুইসগেট দেখার পর পা আর আগে বাড়তে চায় না। তবু শরিফ আর সম্রাটের তাড়া খেয়ে আগে বাড়তে হয়। তবে কথা হয় ফেরার পথে স্লুইসগেটে আমরা অনেক সময় থাকব, আর যাব জুমগাঁও। টিলার ওপর পাহাড়ি গ্রাম। এখানে প্রায় ৩৬ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী পরিবারের বসবাস। শুনে তো আমার পা আবার থমকে যায়। কিন্তু এগিয়ে চলি স্মৃতিসৌধে।

মেঘ আর পাহাড়ের হাতছানি

মেঘ আর পাহাড়ের হাতছানি

ভারত সীমান্তঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এখন আমাদের একেবারে চোখের সামনে। সূর্য উঠেছে, ঝকঝকে নীলাকাশ যাকে বলে, ঠিক তা-ই। আর যেন হাত বাড়ানো দূরত্বে পাহাড়। আকাশতলে পাহাড় আর স্মৃতিসৌধ ভাবতে ভাবতে বলে ফেলি, আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় আর পাহাড়ে হেলান দিয়ে স্মৃতিসৌধ। গানের একটা লাইন জুড়ে দিলাম ঠিকই কিন্তু সুর দিতে পারলাম না।
সমাধি এলাকায় পা রাখতেই দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এখানে শুয়ে আছেন আমাদের ১৪ ভাই, ১৪ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এখানে শীত-গ্রীষ্ম যাবে-আসবে, দিন-রাত যাবে-আসবে কিন্তু তাঁরা আর ফিরে আসবেন না।

চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট

চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট

জেনে নিন
বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারা বাজার উপজেলার বাঁশতলা। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে বাঁশতলা যাওয়া যাবে। আবার ছাতক উপজেলা থেকেও বাঁশতলা যাওয়া যাবে। দিনরাত ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জ বাস চলাচল করে। সুবিধামতো সময়ে হানিফ, ইউনিক কিংবা শ্যামলী পরিবহনের বাসে চেপে বসলেই হবে। আমরা সিলেট-ছাতক-দোয়ারা বাজার হয়ে বাঁশতলা গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার বাসে সিলেট যাত্রা করলে রাত ১২টার মধ্যে সিলেট পৌঁছে রাতটুকু বিশ্রাম নিয়ে পরদিন বাঁশতলা। সকালে আম্বরখানা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আপনাকে ছাতক আসতে হবে। ভাড়া মাথাপিছু ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এবার ছাতক বাজার থেকে সুরমা নদী পার হয়ে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে সরাসরি বাঁশতলা।
সূত্র : প্রথম আলো, ছবি : লেখক