Home » বাছাইকৃত » কুয়াকাটার পথে পথে

কুয়াকাটার পথে পথে

Kuakata রাকিবুল ইসলম জীবন
অপার সৌন্দর্যের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এর রূপ মাধুর্য এতই অপূর্ব যে, কঠিন মনেও তা সারা ফেলতে বাধ্য। প্রকৃতির এই অপার প্রেমে পড়ে আমিও এক শুভক্ষণে পেয়েছিলাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্র সৈকত ‘কুয়াকাটা’ যাওয়ার সুযোগ।

আমরা দুই বন্ধু মিলে ঠিক করলাম কুয়াকাটা যাব এ বছর জানুয়ারি মাসের ২ তারিখ। কুয়াকাটায় এটি ছিল আমার প্রথম ভ্রমণ। তাই আমার মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। ভ্রমণের দিন যতই ঘনিয়ে এলো ততই আমার মধ্যে এই উত্তেজনা বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে বন্ধুদের নিয়ে একটা পার্টি পর্যন্ত দিলাম(!)।

যাই হোক নতুন স্থান, নতুন পরিবেশ, আর নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া; এই ভেবে নতুন জামাকাপড় কিনে প্রস্তুতি নিলাম। আমরা রাতে রওয়ানা দিতে চেয়েছিলাম। যাতে ভোর রাতে গিয়ে সুর্যদয়ের দৃশ্যটা দেখে চোখ জুড়াতে পারি।

অবশেষে অনেক প্রতীক্ষার পর এলো জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় দিন। সবকিছু ঠিক করে সন্ধ্যা নাগাদ বাসা থেকে বের হলাম। আমাদের যাত্রা শুরু হলো বরিশালের গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড থেকে। বাসা থেকে ২০ মিনিটের দূরত্বে এই বাসস্ট্যান্ড। রিজার্ভ করা একটি সুন্দর বাস সন্ধ্যা থেকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

গৌরনদী পৌঁছে আমার অনেক পুরনো বন্ধুদের সাথে দীর্ঘ সময় পর দেখা হলো। ওদের কাছে পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম।

যাই হোক রাত ৯টায় আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। সামনের দিকের জানালার পাশের একটি সিটে বসলাম আমি। একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, আমি যেখানেই যাই বাসের জানালার পাশের সিট লাগবেই। তাই দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিয়ে একই সিটে বসে শুরু হলো আমার জীবনের প্রথম কুয়াকাটা ভ্রমণ।

যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই টেলিভিশনে আমার স্বপ্নের নায়ক শাহরুখ খানের ‘ওম শান্তি ওম’ ছবিটি দেখানো শুরু হলো। ব্যস্ততার কারণে অনেক দিন প্রিয় এই ছবিটি দেখা হয়নি। তাই টিভিতে ছবিটি দেখামাত্রই আমার হৃদয় উল্লসিত হলো। মাঝে একবার যাত্রা বিরতি দেয়া হলো। ওই সময়টায় আমরা প্রয়োজনীয় নাস্তা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। আমার এক বন্ধু ছিলো; ও চমৎকার কৌতুক করতে পারতো। সারাটা পথ ও আমাদের কৌতুক করে হাসি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখলো। এত উত্তেজনার মাঝেও আমি খানিক সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নিলাম।

গৌরনদী থেকে কুয়াকাটা পৌঁছতে চারটি ফেরি পাড় হতে হয়। একে একে সবগুলো ফেড়ি পাড় হয়ে আমরা আমাদের স্বপ্নের কাছাকাছি অর্থ্যাৎ কুয়াকাটায় পৌঁছে গেলাম। একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম ১০ মিনিট পরেই বহুল প্রতিক্ষিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। আমার উত্তেজনা চরমে পৌঁছে গেলো। রাত সাড়ে চারটায় আমরা স্বপ্নের গন্তব্য কুয়াকাটায় পৌঁছালাম। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আমার কানে এলো।

বাস থেকে নেমে আমরা কিছুটা সময় কুয়াকাটা জিরো পয়েন্টে কাটিয়ে মোটর সাইকেলে রওয়ানা দিলাম সূর্যদয়ের দৃশ্য দেখতে। এখানে মোটর সাইকেল ভাড়ায় পাওয়া যায়। আমি যার মোটর সাইকেলে উঠলাম তিনি ছিলেন বেশ রসিক। আর রসালোভাবেই তাঁর কাছ থেকে জেনে নিলাম কুয়াকাটা সম্পর্কিত নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

বালির মধ্যে দিয়ে চলা আকাবাকা রাস্তা পেরিয়ে যেতে আমার শৈশবের সেই হারানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো। দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার চলার পর আমরা এলাম সূর্যোদয় দেখার যায়গায়। আমাদের মত আরো অনেক দর্শনার্থী সেখানে একই উদ্দেশে এসেছেন।

সাগরের অশেষ জলরাশির মধ্যে একটু একটু করে সূর্যি মামার লাল আভা দেখা যাচ্ছিল। আমার আর তর সইছিলো না। মাত্র ১০ মিনিট অপেক্ষাকে অনেক লম্বা মনে হচ্ছেল। শেষ পর্যন্ত এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। এতো কাছ থেকে সূর্য দেখে মনে হলো আল্লাহ পৃথিবীকে এত বৈচিত্র্যময় করে গড়ে তুলেছেন! যেকোন মানব চোখ এতে বিস্মিত হতে বাধ্য।

ধীরে ধীরে পুরো প্রান্তর সোনালী আলোয় আলোকিত হতে শুরু করলো। হঠাৎ পায়ের কাছে কি যেন অনুভব করলাম। হালকা আলোয় সাদা সাদা ক্ষুদ্র কি যেন মনে হলো। বিস্ময়ের সীমা অনেক উঁচুতে উঠে গেলো যখন দেখলাম এগুলো সামুদ্রিক ঝিনুক। রাতের সমুদ্রে এগুলো ভেসে এসে পুরো সৈকতকে যেন সাদা রঙের অপূর্ব পর্দায় ঢেকে দিয়েছে। যে ঝিনুক আমি এর আগে বই-পুস্তক বা টিভিতে দেখেছি, সেই ঝিনুক চোখের সামনে দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। শুরু হল বন্ধুদের সাথে ঝিনুক কুড়ানোর প্রতিযোগিতা।

একসাথে অনেক ঝিনুক কুড়িয়ে দেখলাম সূর্যি মামা পুরোপুরি উঠে গেছে। সাদা রঙের ঝিনুকের পরশে আমার মন পুরোপুরি সাদা হয়ে গেল। আর মনে হচ্ছিলো আল্লাহ এই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর ও আপন করে বানিয়েছেন।

যাই হোক এভাবে ঝিনুক কুড়ানোর পাশাপাশি আশেপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সকাল নয়টা বেজে গেল। এরপর সবার সাথে ডাক পড়ল সকালের খাবার খাওয়ার। খানিকটা ফ্রেশ হয়ে খাবারের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ভুনা খিচুরিই হবে সকালের খাবার। এতে আমার আনন্দের সীমা রইল না। কারণ আমার প্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে ভুনা খিচুরির অবস্থান হিমালয়ের সারিতে। বাড়িতে যখন থাকি তখন অন্তত সপ্তাহে একদিন আমার ভুনাখিচুরি খাওয়া লাগতই। তাই পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য দেখতে এসে সাথে যে আমার প্রিয় খাবার পাবো তা আমার ধারনাতেই ছিলো না। বন্ধুদের নিয়ে একসাথে মজা করে খাবার খেয়ে আমার কুয়াকাটা জীবনের প্রথম মিষ্টি সকালটা অতিবাহিত হলো।

আমাদের বিশাল টিমের সিদ্ধান্ত ছিলো একদিনের মধ্যেই যে যার পছন্দমত জায়গা ঘুরে দেখার। কিন্তু আমার ইন্টারমিডিয়েট লাইফের একজন প্রিয় বন্ধু ছিলো সালাম। আগে থেকেই ও জানতো যে আমি ওর এলাকা অর্থাৎ কুয়াকাটা আসছি। সকালের খাবার খেয়ে আমি ওকে ফোন দিলাম। ও কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলো আমাকে নিতে। কিন্তু আমি ওকে বললাম যে, ওই দিনটা আমি সবার সাথে থেকে পরে ওর বাসায় যাবো। ও দ্বিমত করার ছেলে ছিলো না। সালাম ওর বাসায় জানিয়ে দিলো যে আজ বাসায় ফিরবে না। একেতো প্রথমবারের মত কুয়াকাটা ভ্রমণ তার ওপর দীর্ঘ তিন বছর পর দেখা। আমার মনে হলো আমি যেন সব পেয়েছির দেশে আছি। ওকে নিয়ে সকালের বাকিটা সময় দীর্ঘ সৈকতের কিছুটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ঠিক করলাম দুপুরের খাবার খেয়ে যাব ‘ফাতরার বন’-এ। যা কি-না কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্রস্থল।

দুপুরের খাবার খেয়েই রওয়ানা দিলাম ফাতরার বন ভ্রমণে। শুরুতে কিছুটা পথ নৌকায় পাড় হতে হলো। ছোট একটা নৌকায় প্রায় ২০ জন লোক। নৌকাটি একবার এদিকে দোল খায় তো আরেকবার ওদিকে। যাই হোক কিছুটা স্নায়ুচাপের পর ফাতরার বনে পৌঁছলাম। সে কি সুন্দর জায়গা! সারি সারি গাছ বালির মধ্যে দেখে মনে হলো বুঝি সত্যিকার কোনো ছবি। কিন্তু বাস্তবতায় ফিরে দেখলাম আমি সত্যিই সৌন্দর্য অবলোকন করছি। একদিকে ফাতরার বনের সৌন্দর্য অন্যদিকে ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা। মুহূর্তগুলোকে কেমন যেন মনে হলো আমি স্বপ্নে দেখছি। সালাম আমাকে ধীরে ধীরে পুরো বিকেল ফাতরার বন ঘুরে দেখালো। ফাতরার বনের এরূপ দৃশ্য দেখে আমার ইচ্ছা হলো আমি যদি সারা জীবন এখানে থাকতে পারতাম। সত্যিই এত সুন্দর ও উপভোগ্য যে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না।

Kuakata3ফাতরার বন ভ্রমণের একটা পর্যায়ে শুনতে পেলাম চিৎকারের শব্দ। প্রথমত ঠিক করতে পারছিলাম না শব্দটা কোন দিক থেকে আসছে। মনোযোগ স্থির করা মাত্র দৌঁড় দিলাম চিৎকার আসা প্রান্তরের দিকে। গিয়ে দেখলাম ছোটখাটো একটা ভিড়। ভিড় ঠেলে এগিয়ে ভিতরে গিয়ে দেখলাম একটা মরা হরিণ। জীবনে প্রথমবারের মত হরিণ দেখলাম চোখের সামনে। কিন্ত ভাবিনি যে মৃত অবস্থায় দেখবো। যাইহোক বালির উপর হরিণটিকে পরে থাকতে দেখে আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। হরিণটির শরীর দেখে মনে হলো সম্ভবত কয়েকদিন আগে কোনো এক নিষ্ঠুর শিকারীর হাতে আহত হয়ে মারা গেছে। কিছুটা সময় অহেতুক এই বর্বরতা দেখে আমার সারা দিনের আনন্দ মাটি হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমাদের টিমের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই সন্ধ্যার আগেই বাসে ফিরে এলো। আমি ম্যানেজাকে জানিয়ে দিলাম আমি তাদের সাথে ফিরবো না। তিনি প্রথমত দ্বিমত করলেও পরে আমার বাবার সাথে কথা বলে সব মেনে নিলেন। আমার কয়েকজন বন্ধুও আমাকে রেখে আসতে চাইছিলো না। তবে আমি তাদের বুঝিয়ে বললাম যে আমি সালামের বাড়ি থাকবো। তখন সবাই স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিলো।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসটি গৌরনদীর উদ্দেশে যাত্রা করলো। তবে এই যাত্রায় আমি তাদের সাথে আর নেই। আমি কুয়াকাটাকে আরো স্মৃতিময় করে রাখতে চাই। যাই হোক আমার বন্ধুরা আমাকে উৎসাহ দিয়ে ফিরে চলল নীড়ের দিকে।

বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে আমি চললাম সালামের সাথে ওদের ‘খান ম্যানসন’-এ। মোটর সাইকেলে পাঁচ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ওদের বাড়িতে। কাকা-কাকি আমাকে দেখে অনেক খুশি হলেন। এর আগে তাদের সাথে ফোনে অনেক কথা বলেছি। কিন্তু এবারই প্রথম সাক্ষাত। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ কথা বললাম। এরপর খানিকটা খাবার খেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম স্থানীয় রাখাইন আদিবাসীদের প্রসিদ্ধ ‘রাখাইন মার্কেট’ দেখতে যাবো। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি আর সালাম হেঁটে হেঁটে গেলাম রাখাইন মার্কেটের দিকে। হেঁটে যাওয়ার কারণ একটাই, আশেপাশের জায়গাটা ভালোভাবে পরখ করে নেয়া। ১০ মিনিটের মধ্যেই আমরা মার্কেটে এসে পরলাম।

আমরা জানি আদিবাসীদের চেহারা সাধারণ বাঙালীদের থেকে একটু আলাদা। এই তথ্য প্রথমত আমি বইতে পেলেও চোখের সামনে এরকম রাখাইনদের দেখতে পাচ্ছিলাম। মার্কেটের মধ্যে নানান বৈচিত্র্য। সমুদ্রের ছোট ছোট ঝিনুকের তৈরি নানা রকম জিনিসপত্র থেকে শুরু করে পোশাক সামগ্রীই বেশি চোখে পরছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো হাতের তৈরি এসব পোষাকের দাম এতই কম যে মনে হয় এগুলো তৈরি করতেই দাম অপেক্ষা অনেক বেশি খরচ হয়েছে। কাপড়তো বাদ।

ছোটবেলা থেকেই শর্ট পাঞ্জাবীর প্রতি একটা আলাদা ভালোলাগা কাজ করত। হাতের তৈরি এসব সুন্দর পাঞ্জাবী দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। একসাথে পছন্দমত পাঁচ-পাঁচটা পাঞ্জাবী কিনে নিলাম। সাথে কিছু ঝিনুকের তৈরি জিনিসপত্র আর আমার পরিবারের পছন্দের হরেক রকমের আচার কিনে নিলাম। এরপর ঢুকলাম একটা তিন তারকা হোটেলে। খানিকটা খাবার খেয়ে আমরা গেলাম পোষাক তৈরি করা আস্তানায়। গিয়ে দেখলাম রাখাইন মহিলারা সাড়ি বেঁধে ধৈর্য ধরে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলছে পোষাকে।

এক আদিবাসী মহিলার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পারলাম যে, এই পেশা তাদের পূর্বপূরুষদের অনুসরণ করে আসা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে রাত ১০টা বেজে গেলো। এত সৌন্দর্যের মাঝে খেয়ালই ছিলো না যে কখন এতটা রাত হয়ে গেলো। তারপর খুব তাড়াতাড়ি বাসার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। বাসায় ফিরে খুব দ্রুতই রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেলাম এবং বহু আকাঙ্খিত কুয়াকাটার মাটিতে প্রথমবারের মত ঘুম দিলাম।

পরের দিন অনেকটা অচেনা পরিবেশে আমার ঘুম ভাঙলো। ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা খেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ‘লাল কাকড়ার চর’ দেখতে যাবো।

জায়গাটি এক প্রকার কাকড়ায় পরিপূর্ণ যাদের গায়ের রং লাল। দেখতে এতই মিষ্টি যে ইচ্ছে করবে কাকড়াগুলো ধরে ধরে হাতে তুলতে। কিন্তু বলা সহজ হলেও কাজটা কিন্তু অনেক কঠিন। কারণ কাকড়াগুলো এতো জোড়ে দৌঁড়ায় যে, বুঝি বিশ্বসেরা দৌড়বিদ উসাইন বোল্টকেও হার মানাবে।

Kuakata2যাই হোক কুয়াকাটার অদূরে অবস্থিত এই চড়ে পৌঁছে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো লাল রংয়ের সেই অদ্ভুত প্রাণীটি যার নামের সাথে মিল রেখেই চড়টির নাম লাল কাকড়ার চর। দেখে ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে একটাকে ধরতে। কিন্তু কাকড়া ব্যাটা যেই বুঝতে পরলো অমনি দিলো এক ভো-দৌঁড়। ওর সাথে সাথে আমরাও দৌঁড় দিলাম। মনে হলো আগে কখনও এত জোড়ে দৌঁড়াইনি। স্কুলের দৌঁড় প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কোনো রকমে একটাকে পরাস্ত করতে পারলাম। এর বিচিত্র রকমের পা আর দুটি শুর ছিলো তা দিয়ে ইচ্ছে করলেই ও আমার আঙ্গুল ওর নিজের সম্পত্তি বানাতে পারতো। ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে তুললাম ওর অনেকগুলো ছবি।

কাছেই প্রত্যক্ষ করলাম একটা হোটেল। শুনলাম কাকড়া রান্না করে খাওয়ানো হয় ওখানে। আমি আগে কখনও কাকড়া খাইনি। তার পর ধর্মীয় বিধিনিষেধের একটা ব্যাপার তো ছিলোই। কিন্তু আমার বিবেক শক্তি কোথায় যেন হারিয়ে এসে আমি আর সালাম রান্না করা কাকড়া (!) খেলাম। খেতে অবশ্য খারাপ মনে হয়নি। অভিজ্ঞতা অর্জনের এই জীবনে কাকড়া খাবার অভিজ্ঞতা হলো এই লাল কাকড়ার চরে এসে। হোটেল থেকে বেরিয়ে পুরো চড়টা আস্তে আস্তে ঘুরে ঘুরে দেখলাম । দুপুর ১২টার দিকে আমরা বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে খানিক সময়ের জন্য ঘুম দিলাম। কারণটা অবশ্যই পরখ করে নেয়া যে কুয়াকাটায় দুপুরের ঘুমটা কত মজার হয়।

দুপুরের স্বপ্নময় ঘুম যখন ভাঙলো তখন বিকেল ৩টা পেরিয়ে গেছে। সালামকে জিজ্ঞেস করলাম বিকেলটা কোথায় কাটানো যায়। ও বলল মৎস্য পল্লী নামক একটা জায়গায় যাওয়া যায়। ওর কথামতো গেলাম কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী মৎস্য পল্লীতে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ অসংখ্য মাছে পরিপূর্ণ। ওই এলাকায় ঢুকতেই মাছের একটা বোঁটকা গন্ধ পেতে শুরু করলাম। দেখলাম ওখানে বাণিজ্যিকভাবে মাছের শুটকি বানানো হচ্ছে। জেলেরা সারা রাত মাছ ধরে সকালে পল্লীতে নিয়ে আসে। বাসিন্দাদের একাংশ তখন সারিবদ্ধভাবে মাছগুলো রাখে এবং বড় মাছ অভিনব পদ্ধতিতে ঝুলিয়ে শুকাতে দেয়।

মৎস্য পল্লীর বাসিন্দাদের মাতে, এখানকার শুটকি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়।

বইতে পড়েছি যে, মৎস্য শক্তিতে বাংলাদেশ অনেক সমৃদ্ধ। আজ চোখের সামনে এতো মাছ দেখে বুঝতে পারলাম কেন আমাদের বলা হয় “মাছে ভাতে বাঙালী”।

ঠিক এমন সময় বাড়ি থেকে মায়ের ফোন পেলাম। তাঁর একটাই কথা রাতের মধ্যেই যেন বাড়ি ফিরি। মায়ের অবাধ্য আমি কোনো দিনও হইনি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম রাতেই গৌরনদী ফিরবো। তাই মৎস্য পল্লী থেকে দ্রুত সালামদের বাসায় গিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। কিছুটা খারাপ লাগলো কারণ দেখার মত অনেক জায়গা যে তখনও বাকি ছিলো। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত কুয়া, ঐতিহাসিক মন্দির ও মুর্তিও ছিলো বাকি। যাই হোক মায়ের ডাকে সাড়া দিতে পারছি এই ভেবে খারাপ লাগা মুহূর্তেই হিল্লোলে রূপান্তরিত হলো। তাই রাতের খাবার খেয়ে কাকা-কাকিসহ বাসার সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবং ভবিষ্যতে আমাদের এলাকা ভ্রমণেরর আহ্বান জানিয়ে স্বপ্নের কুয়াকাটা ভ্রমণের মধুর সমাপ্তি ঘটালাম।

ভ্রমণ মানুষের মনকে উজ্জীবিত করে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট এই অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টিতে যতই বিচরণ করা যায় বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মানব জীবন ততটাই সমৃদ্ধশালী হয়। জীবনে বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক স্থানে ভ্রমণের সুযোগ আসবে। কিন্তু জীবনের প্রথম কুয়াকাটা ভ্রমণের স্মৃতি আমি কোনোদিনও ভুলতে পারবো না। বাস্তব স্মৃতিতে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে কুয়াকাটা ভ্রমণ।