Home » ফিচার » গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি
ভাওয়াল রাজবাড়ির একাংশ

গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি

হাসমত আলী
গাজীপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ি। আয়তন এবং কক্ষের হিসেবে এটি একটি বিশাল আকারের রাজবাড়ি। প্রায় ৫ একর জায়গার ওপর রাজবাড়িটি নির্মিত। এ রাজবাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি এবং সামনে রয়েছে বিশাল সমতল একটি মাঠ। রাজবাড়িটির পুরো এলাকাই সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাওয়াল রাজা সন্ন্যাসী মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরির মৃত্যুর ১২ বছর পর পুনঃআবির্ভাবের শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস।

কীভাবে যাবেন : দেশের যে কোরো স্থান থেকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে শিববাড়ি মোড়। সেখান থেকে জয়দেবপুর-রাজবাড়ি সড়ক হয়ে পূর্ব দিকে কিছু দূর অগ্রসর হলে এ রাজবাড়িটির অবস্থান। আর ট্রেনে নামতে হবে জয়দেবপুর জংশনে। একইভাবে যেতে হবে রাজবাড়িতে। এটুকু পথের জন্য রিকশাই সবচেয় ভাল বাহন। কারণ রাজবাড়ির প্রধান ফটকের সামনেই অহরোহ রিকশা থামে। ভাড়া ও খুব বেশি নয়।

ভাওয়াল রাজবাড়ির একাংশ

ভাওয়াল রাজবাড়ির একাংশ

গাজীপুরের জয়দেবপুর মৌজায় অবস্থিত রাজবাড়ি। জয়দেবপুর- রাজবাড়ি সড়কের রাস্তার উত্তর পাশে রাজবাড়ি আর দক্ষিণ পাশে রাজবাড়ি মাঠ। রাজবাড়ির সীমানা প্রাচীর দেখে মুগ্ধ হবেন অনেকেই। সীমানা প্রাচীরেও কারুকার্য খচিত, বেশ উঁচু। প্রধান ফটক থেকে প্রায় অর্ধবৃত্তাকারের দুটো পথের যে কোনো একটা ধরে অগ্রসর হলেই মূল রাজপ্রাসাদ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ৩৬৫টি কক্ষ বিশিষ্ট ভাওয়াল রাজবাড়িটি মূলত উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত, দৈর্ঘ্য ৪০০ফুট এবং দ্বিতল। বিশালাকৃতির রাজবাড়িটির বিভিন্ন অংশের রয়েছে পৃথক পৃথক নাম। যেমন- বড় দালান, রাজ বিলাস, পুরানবাড়ী, নাটমন্দির, হাওয়া মহল, পদ্মনাভ ইত্যাদি।

রাজবাড়ির সামনের অংশের নাম বড় দালান। এর নিচ তলায় প্রশস্ত বারান্দা, তিনটি কক্ষ রয়েছে। নিচতলা থেকে ওপরের তলায় যাওয়ার জন্য রয়েছে ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল কাঠের সিড়ি। ওপর তলায় রয়েছে একটি বড় হল ঘর এবং দুপাশে দুটি কক্ষ। বড় দালান বর্তমানে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বড় দালানের পিছনে (উত্তর পাশে) রয়েছে একটি খোলা প্রাঙ্গণ, এটি নাটমন্দির হিসেবে পরিচিত। এর পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ছিল আবাসনের জন্য নির্মিত বারান্দাযুক্ত কক্ষ। নাট মন্দিরের উত্তর পাশের প্রাসাদগুলি পুরানবাড়ি নামে পরিচিত। ভাওয়াল রাজবাড়ির দরজা-জানালা এবং অধিকাংশ সিড়ি এবং বারান্দার বেস্টনিগুলো শাল কাঠের তৈরি। বড়দালান সংলগ্ন (পূর্বপাশে) রাজা কালী নারায়ণ রায়ের নিঃসন্তান ভগ্নি কৃপাময়ী দেবীর বাড়ি (ট্রেজারি)। এ ছাড়া রাজবাড়ির পূর্বপাশে ম্যানেজারের অফিস (বর্তমানে জয়দেবপুর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়), পশ্চিমপাশে দেওয়ানখানা (রানী বিলাসমণি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়), রাজদীঘির পশ্চিমপাড়ে খাসমহল ছিল (ডা. আশু বাবুর বাড়ি)।

এর মূল প্রবেশ দ্বার দিয়ে ঢুকে একেবারে পিছনে যেতে হলে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ, পেরুতে হবে অনেক অলিন্দ আর বারান্দা। ক্ষণে ক্ষণে চোখ আটকে যাবে বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শনে। বিশাল এ রাজপ্রাসাদটির বিশালত্ব দেখে যে কেউ অভিভূত হবেন। আবার অনেকেই রাজবাড়িতে ঢুকে গোলক ধাঁধায় পড়ে যেতে পারেন। কারণ এর অলিন্দ গলি উপগলি দিয়ে একবার হেঁটে গিয়ে নতুন যে কারোর পক্ষে পুনরায় সেগুলো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। এ রাজবাড়ির প্রতিটি স্থানে প্রতিটি কক্ষে ঘুরে দেখতে সারা দিন লেগে যেতে পারে।

পেছন দিকে থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ি

পেছন দিকে থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ি

জানা গেছে, ভাওয়াল পরগনা এক সময় শাসন করতেন গাজী বংশের শাসকরা। ১৭৩৬ সালে গাজী বংশের শাসক দৌলত গাজী পদব্রজে হজব্রত পালন করতে গিয়ে মারা যান। এরপর তার দেওয়ান বলরাম রায় শঠতার আশ্রয় নিয়ে জমিদারী নিলামে তোলেন। ১৭৩৮ সালে নিজ নামে জমিদারী বন্দোবস্ত নেন। অবসান ঘটে গাজীবংশের জমিদারীর এবং শুরু হয় হিন্দু রাজাদের শাসনামল। তখন থেকে বলরাম রায়ের পরিবারের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এই জমিদারির অধিকারী ছিলেন। ওই বংশের জমিদার লোক নারায়ণ রায় ভাওয়ালের রাজবাড়িটি নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

এদিকে ভাওয়ালের জমিদারীর সাত আনার মালিক পাশ্ববর্তী গাছার জমিদার কালী প্রসন্ন রায় চৌধুরীর পুত্র কালী কিশোর রায় চৌধুরী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে নীলকর জে পি ওয়াইজের কাছে বিক্রি করে দেন। লোক নারায়ণের দৌহিত্র কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী জমিদারীর ওই সাত আনা ক্রয় করেন। ১৮৭৮ সালে তিনি রাজা উপাধি লাভ করেন। তার আমলে ভাওয়াল রাজবাড়ি, রাজদীঘি খনন সমাপ্ত করেন। কালীনারায়ণের পুত্র রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী এই জমিদারির আরো বিস্তৃতি ঘটান। এই সময় ভাওয়ালের জমিদারি ঢাকা, ময়নসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এস্টেটের মৌজা সংখ্যা ছিল ২২৭৪টি। জমির পরিমান ছিল ৪৫৯১৬.৩০ একর। এর মধ্যে দুইতৃতীয়াংশ বনভূমি ছিল।

ভাওয়ালের রাজবাড়ি ছিল ভাওয়াল এস্টেটের মূল পরিচালনা কেন্দ্র। পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে পূর্ববাংলার নওয়াব এস্টেটের পরেই ছিল ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারির অবস্থান।

রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর ছিল তিন পুত্রসন্তান। তারা হলেন রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী, রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। ১৯০১ সালে রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর মৃত্যু হয়। এই সময় তার তিনপুত্রই ছিলেন নাবালক। সে কারণে জমিদারী বেঙ্গল গর্ভমেন্ট ভাওয়াল এস্টেট অধীনে চলে যায়। পরে রাণী বিলাসমনি এর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে রিট করেন। কোর্ট রাণীর পক্ষে রায় দেন আদালত।

ভাওয়াল রাজবাড়ির নাটমন্দির

ভাওয়াল রাজবাড়ির নাটমন্দির

১৯০৭ সালে রাণী বিলাস মনি মারা যান। এর আগে তিনি তার মধ্যম পুত্র রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর নিকট জমিদারী অর্পন করেন। যিনি ভাওয়ালের সন্ন্যাসী রাজা হিসেবে অধিক পরিচিত। ১৯০৯ সালে দার্জিলিংয়ে রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর কথিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর বড় ছেলে রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ১৯১০ সালে মারা যান। রণেন্দ্র নারায়ণ মারা যাওয়ার কিছু দিন পরই ছোট কুমার রবীন্দ্র নারায়ণও ইহলোক ত্যাগ করে। তাদের সবাই ছিলেন নিঃসন্তান। ফলে ১৯১২ সালে সরকার আবারো ভাওয়াল জমিদারী কোর্ড অব ওয়ার্ডসের আওতায় নিয়ে আসে। ১৯১২ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছর কোর্ড অব ওয়ার্ডস কতৃর্ক ভাওয়াল পরগণা বৃটিশ সরকারের অধীনে থাকে।

এদিকে ১৯২১ সালে কথিত মৃত মধ্যম কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী সন্ন্যাসীর বেশে জয়দেবপুরে ফিরে আসেন। এর পর ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার অতিরিক্ত জজ আদালতে নিজের স্বীকৃতি ও জমিদারির অংশ দাবি করে সন্ন্যাসী মামলা করেন। আদালতের রায়ে প্রমাণ হয় আলোচিত সন্ন্যাসীই ভাওয়ালের মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। বিবাদীপক্ষ কোলকাতা হাইকোর্টে রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করেন।

১৯৪০ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি লিওনার্ড ক্যাস্টেলো আগের রায়ই বহাল রেখে আদেশ দেন। আপিলে হেরে বিবাদিপক্ষ লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে পুনরায় আপিল করেন। যদিও লাভ হয়নি। ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই প্রিভি কাউন্সিল তাদের রায় দেন। ভারতবর্ষের বিখ্যাত মামলার মধ্যে ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা দিল্লীতে গত শতাব্দীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী অন্যতম শ্রেষ্ঠ মামলা হিসেবে স্থান পায়।

মামলাটি শুরু হয় ১৯৩০ সালে আর শেষ হয় ১৯৪৬ সালে। প্রিভি কাউন্সিলের রায়ের পর আর মাত্র তিনদিন বেঁচে ছিলেন মেজকুমার। অবশ্য মেজকুমারের মৃত্যুর খবরটি ৫ আগস্ট ১৯৪৬ জয়দেবপুরে পৌঁছায়। সূত্র : রাইজিংবিডি