Home » পপুলার ডেস্টিনেশন » ঢেউ খেলানো পাহাড়ের পথে

ঢেউ খেলানো পাহাড়ের পথে

মো. জাভেদ বিন এ হাকিম
রাত ১১টা ১০ মিনিটে কমলাপুর থেকে গাড়ি ছাড়ল। আমাদের সবার আসন সামনের দিকে হলেও কপাল দোষে মণি আর ডেন্টিস্ট ইমন ভাইয়ের সিট পড়ল একদম পেছনে। এরপরও যেন দুজনের আনন্দের কোনো কমতি নেই। গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে, অবরোধের কবলে রাস্তা পুরোই ফাঁকা। মধ্যরাতে কুমিল্লায় এক বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে ব্রেক পড়ল। তেল ছাড়া পরোটা আর গরুর গোস্ত ভুনা। আহা খেতে কী দারুণ হবে! মুখে দিতেই কর্ম সারা, সজোরে চিবিয়েও যেন গলা দিয়ে নামে না।

পেটে ক্ষুধা মুখে হাসি, আবারও যে যার মতো গাড়ির সিটে বসি!

সকাল ৮টা ২০ মিনিটে দিঘিনালা বন বিহারের সামনে নামি! শ্রমিক নেতা সুনীল দা চান্দের গাড়ি নিয়ে আগে থেকেই রেডি। খানিকটা কুশল বিনিময় হলো। এরপর কিছুটা সময় ব্যয় হলো বন বিহারের সৌন্দর্য দর্শনে। সেলফোনে মফিজ ভাইয়ের তাড়া, ‘একটু তাড়াতাড়ি আসেন না ভাই, বাজার সদাই করে যেতে হবে সাজেক ভ্যালি।’

Sajekচান্দের গাড়িতে দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই বাজারের কাছের গেস্ট হাউসে। নাশতা আর বাজার সদাই সেরে নিই। চাল, তেল, মুরগি গাড়িতে তুলি। সবকিছু পিছনে ফেলে গাড়ি ছুটছে সাজেক ভ্যালি।

খাগড়াছড়ি জেলাকে টা টা দিয়ে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছেই ব্রেক। একজন গিয়ে করে এল নাম-ঠিকানা এন্ট্রি। অথচ ২০০৪ সালে যখন গিয়েছিলাম, তখন জবাবদিহিতা করতে হয়েছিল প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে।

গঙ্গারাম মুখ, নন্দরাম পাড়া পেরিয়ে নিরিবিলি পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি ছুটছে। যতই এগিয়ে যাই ততই সামনের পাহাড়গুলো যেন দূরে সরে যায়। যাচ্ছি আর থামছি। কখনো কখনো চারপাশের মায়াময় প্রকৃতির ঘোরে আছন্ন হয়ে পড়ছি। উচ্ছ্বাসে কয়েকজন গাড়ির ছাদে চড়ে বসেছে।

কাচালং নদী পেরিয়ে মাচালং বাজারে খানিকটা সময়ের বিরতি। কচি ডাবের পানি আর পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে অম্ল-মধুর খুনসুটিতে সময়টা কেটে যায় বেশ। এরপর বাজারে অপেক্ষায় থাকা কংলাক পাড়ার হেডম্যানকে সঙ্গে নিয়ে আবারও ছুটলাম। সাজেক পৌঁছার ঠিক পাঁচ কিলোমিটার আগে পথের এমন সৌন্দর্যময় বাঁক পড়ে, যেখানে গাড়ি ব্রেক না করে আর পারিনি।

আমরা যখন ফটোসেশনে ব্যস্ত তখন আবু নাসের কচি খুঁজে বের করে ঝিরি। এবার আমাদের আর পায় কে? সবার আগে রাজু টুপ করে ডুব দেয়। এরপর টঙ দোকান থেকে দু-চারটা বাংলা কলা পেটে পুরে চলছি উপরের দিকে। একটা সময় মনে হলো ধরতে যাচ্ছি যেন আকাশটাকে। তবে আকাশ ধরার আগেই পৌঁছে যাই সাজেকের প্রথম পাড়া রুইলুইতে। ওয়াও! প্রথম দেখাতেই যেন চোখ কপালে। জনপ্রতি বিশ টাকা টিকেট কেটে ঢুকে পড়ি ভেতরে। কৃত্রিম আর প্রাকৃতিক এই দুয়ের মিশ্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাজেকের রূপে এনে দিয়েছে এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি। দেখলে মনে হবে যেন সাজেক ভ্যালি উন্নত বিশ্বের কোনো পাহাড়ি জনপথের প্রতিচ্ছবি।

আমাদের রাতে থাকার জন্য ঠাঁই হয় সাজেক ক্লাব হাউসে। কাঁধের-পিঠের ঝোলা রেখে বের হয়ে যাই সাজেক দর্শনে। কয়টার সময় খেতে আসব জানতে চাইলে, রসুই ঘর থেকে খবর আসে ঘুরতে থাকেন মনের সুখে! দুপুরের খাবার সন্ধ্যার আগে হবে না কোনোভাবেই।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭০০ ফিট উচ্চতার সাজেক ভ্যালি এখন দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। খোলা চোখে হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত সাজেকের চারপাশের ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে যে কেউ তার রূপে আচ্ছন্ন হবেই। বসন্তের ছোঁয়ায় পাতাঝরা গাছগুলো যেন একেকটি ভিন্ন রকম শিহরণ জাগানো ছবি।

সাজেকের আইকন বিজিবি পরিচালিত রুন্ময় কটেজটি সাজেকের রূপের পসরায় যোগ করেছে আশ্চর্য সৌন্দর্যের দ্যুতি। কংলাক সাজেকের সবচেয়ে উঁচু সিপ্পু পাহাড়ে অবস্থিত। শুধু সাজেক ভ্যালি নয়, পুরো রাঙামাটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৮০০ ফিট উপরে। কংলাকের প্রকৃতি যেন আরও একটু বেশিই উদার। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের বুকে সারি সারি কমলার বাগান যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে।

রুইলুই ও কংলাক পাড়ায় আদিবাসী লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরাদের বসতি। মোট ৯৬টি পরিবারের আবাস। প্রতিটি বাড়িই সাজানো গোছানো। বাড়ির আঙ্গিনায় ফুটে আছে নানা রঙের ফুল। হেডম্যান লাল থ্যাঙ্গগা লুসাইর সঙ্গে কথা বলে সাজেকবাসীর যাবিত জীবন সম্পর্কে জানা হলো। রুইলুই ও কংলাক এই দুই পাড়ার আদিবাসীরা অধিকাংশই ইংরেজি শিক্ষিত। পাশেই ভারতের মিজোরাম প্রদেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বেশি।

অধিকাংশ বাসিন্দা পড়ালেখাসহ হাট-বাজার পর্যন্ত মিজোরাম থেকেই করে থাকেন। তাদের পোশাক ও আচার-আচরণ পুরোটাই আধুনিক। অত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এক কথায় বন্ধুবত্সল।

সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের চারপাশ বড় বড় পুরোনো সেগুন, হরেক প্রকারের বিশাল বাঁশের বন আর প্রাচীন বটবৃক্ষের মায়াবী পরশে ঘেরা। পুরো বিকেলটা কংলাক পাড়ার সিপ্পু পাহাড়ের চূড়ায় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরি ক্লাব হাউসে। শুরু হয় খানাপিনা। খাওয়া শেষে সবাই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলি, ‘আহ্ কী স্বাদ!’

কিভাবে যাবেন

সাজেক রাঙামাটি জেলাতে হলেও খাগড়াছড়ি দিয়ে যোগাযোগের সুবিধা বেশি। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি খাগড়াছড়ির দিঘিনালা বাজার। সেখান থেকে চাদের গাড়িতে সাজেক ভ্যালি।

কোথায় থাকবেন

সাজেক ক্লাব হাউস, ভাড়া মাথা পিছু ২০০ টাকা। এছাড়া আরও রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত সাজেক রিসোর্ট ও বিজিবি পরিচালিত সাজেকের আইকন রুন্ময় কটেজ। সূত্র : ইত্তেফাক