Home » ভ্রমণ » ভারত » তৃতীয় কেদার
চায়ের দোকানের বাইরে বসে অমল সিংহ রানা।

তৃতীয় কেদার

বিতান সিকদার
সান্দাকফু। প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। বেশ কয়েক বছর আগে সেখানে দাঁড়িয়ে চন্দ্রালোকিত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে এক বাঙালি পর্যটককে বলতে শুনেছিলাম, ‘আজ মাংস-ভাত খাব!’ সেই মুহূর্ত থেকেই আমার বাঙালি ট্যুরিস্টের প্রতি অ্যালার্জি।

আমার সহযাত্রী বন্ধু অভিজিৎ বলেছিল, ‘‘সবার দেখার ধরন এক নয়। তার উপর ছোকরা চাঁদের আলোয় পাহাড় দেখে ঘেঁটে গেছে— যাকে বলে চন্দ্রাহত! ক্ষমাঘেন্না করে দে!” পারিনি। তার পর থেকে যেখানেই গিয়েছি, মনে হয়েছে, বাঙালির অগম্য স্থান থাকলে ভাল হত।

চায়ের দোকানের বাইরে বসে অমল সিংহ রানা।

চায়ের দোকানের বাইরে বসে অমল সিংহ রানা।

আজ এই মুহূর্তে কেদার থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে চোপতায় দাঁড়িয়ে মনে হল, অগম্য কি না জানি না, তবে বাঙালি সমাগম এখানে নেই। এটা অন্য পাহাড়, অন্য দিক।

হরিদ্বার থেকে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার দূরে রুদ্রপ্রয়াগ জেলার এক পাহাড়ে কয়েকটা রেস্তোরাঁ আর গোটা তিন-চার হোটেলের মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা বদ্রীনাথের দিকে চলে গিয়েছে। সেই রাস্তারই এক পাশে একটা সব্জির দোকান থেকে লাঠি ভাড়া করছিলাম। আমি, আমার স্ত্রী সুচন্দা, বন্ধু অভিজিৎ আর তার সহধর্মিনী মৌসুমি— চার জন একটু আগেই চোপতায় এসে পৌঁছেছি। প্রায় ৮,৮০০ ফুট উচ্চতার চোপতাকে উত্তরাখণ্ডের মিনি সুইত্জারল্যান্ড বলে। কারণ, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া বিস্তীর্ণ এক সবুজ তৃণভূমি।

আমাদের গন্তব্য তুঙ্গনাথ— পঞ্চকেদারের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত শিবের মন্দির, যাকে তৃতীয় কেদারও বলা হয়। চোপতা থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটারের হাঁটা পথ তুঙ্গনাথ। উচ্চতা ১২,০৭৩ ফুট। সেই জন্যই লাঠি ভাড়া। আমরা ঘোড়া নেব না। নীলকণ্ঠ হোটেলের বাইশ বছরের রুম-বয় লক্ষ্মণ সিংহ নেগি ঘোড়া ভাড়া দেয়। হেসে বলল, “সব পয়দল যাইয়েগা তো হাম ক্যায়া খায়েঙ্গে?”

কেদারে ওঠার পথের সাথে তুঙ্গনাথের রাস্তার তুলনা হয় না। এ পথ কেদারের মতো অতটা খাড়াই নয়, চওড়ায় বেশি আর পাশে গভীর খাদ নিয়ে চলে না।

প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ হাঁটার পর সেই পাথুরে রাস্তার এক বাঁকে অমল সিংহ রানার দোকানে বসে স্টিলের গ্লাসে কফি খেতে খেতে ভাবছিলাম, ভাগ্যিস ঘোড়ায় আসিনি! ঘোড়া নিশ্চয়ই মুহূর্তের মধ্যে এই জায়গা পার করে নিয়ে চলে যেত। তাতে আখেরে ঘোড়া হত, কিন্তু ঘোরা হত না।

যেখানটায় বসে আছি, সামনে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গিয়েছে সবুজ মাঠ। দূরে ও পাশে দেখা যাচ্ছে বরফে মোড়া চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, ত্রিশূল আর কেদারডোম। আরও কিছুটা দূরে অন্য পাহাড়ের গায়ে পাইন আর রডডেনড্রনের জঙ্গল। এখানে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়…

বাহাত্তুরে অমল সিংহকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই জায়গার নাম কী?”

—হামলোগ ভুজগালি বোলতে হ্যায়।

কথাটা আসলে ‘বুগ্যাল’ অর্থাৎ মাঠ। এই চরাচর বিস্তৃত মাঠই চোপতা-তুঙ্গনাথ প্রসঙ্গে বার বার ‘আল্পাইন মিডস’-এর কথা তুলে আনে। অতএব, আল্পসে না গিয়েও আল্পাইন সৌন্দর্য দেখতে এখানে আসাই যায়।

‘বুগ্যাল’ অর্থাৎ মাঠ। স্থানীয়েরা যাকে ভুজগালি বলেই ডাকে।

‘বুগ্যাল’ অর্থাৎ মাঠ। স্থানীয়েরা যাকে ভুজগালি বলেই ডাকে।

আর সবচেয়ে বড় স্বস্তি ভিড়ভাট্টা একেবারে নেই। টুরিস্ট হাতে গুনে বলা যায়। যারা উঠছে বা নামছে, তাদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা। এক জনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, চোপতা, উখিমঠ, সারিগ্রাম, গোপেশ্বর— আশপাশের বেশ কয়েক জায়গার বাসিন্দাদের কাছে তুঙ্গনাথ অনেকটা আমাদের দক্ষিণেশ্বরের মতো। পঞ্চবটীতে বসাও হল, আবার পুণ্যিও হল। সারিগ্রাম থেকে আসা এক ছোকরা যেমন উঠতে উঠতে বলছিল, “কালেজ মে এগ্জাম হ্যায়। ইসিলিয়ে মাথা টেক্‌নে আয়ে হ্যায়!”

মাথার উপর অনেক বড় একটা নীল রঙের আকাশ আর পায়ের নীচে তার চেয়ে একটু ছোট একটা মাঠ। সেই মাঠের এক ধারে একটু আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে ধোয়া কাঁচা রোদ্দুর গায়ে মেখে সবে কফিটা শেষ করে সিগারেট ধরিয়েছি, আওয়াজটা এল দোকানের ভেতর থেকে, “দাদা কি কলকাতা থেকে আসব?”

সেরেছে! উঁকি মেরে দেখি দোকানের ভেতর বেঞ্চির এক কোণায় বসে আছে এক রঙ-ওঠা হাফহাতা সোয়েটার, তার উপর পুরনো একটা জ্যাকেট, ঢোলা পাতলুন, কাঁচাপাকা চুল, গালে কয়েক দিনের দাড়ি আর পান খাওয়া দাঁতে চেপে ধরে থাকা বিড়ি।
এই বাঙালি দেখলেই স্থানীয় মানুষদের কষ্ট করে ভুল বাংলায় কথা বলে অবাঞ্ছিত মনোরঞ্জনের চেষ্টা— এই ব্যাপারটাও আমায় যারপরনাই বিরক্ত করে। লোকটা কী ভাবছে? আমি হিন্দি বলতে পারব না?

ভদ্রতার খাতিরে উত্তর দিতে হল একটা। তাতে দেখলাম উনি ভদ্রতাটাকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন। দোকান থেকে বেরিয়ে আড়মোড়া ভেঙে আমার পাশে খাটিয়ায় বসে নামধাম, বাসস্থান ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। উনি যে শ্যামবাজারে বেশ কয়েক বার এসেছেন, সেটা জানালেন। শুনে অভিজিতের পুলক চাগাড় দিল। বলল, “ও তা হলে তো আপনি শ্যামবাজার গেছেন অনেক বছর হল। এখন গেলে দেখবেন নেতাজির মুখ ঘুরে গেছে। আগে আলিমুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এখন আর একটু ডান দিকে অনেকটা মুখ তুলে হরিশ মুখার্জি রোডের দিকে চেয়ে থাকেন।”

বাষট্টি বছরের প্রৌঢ়ের নাম মুরলী সিংহ রানা এবং তাকে নাকি ‘প্যায়ার সে মুরলী মনোহর’ বলেও ডাকা যায়। ওঁর বঙ্গপ্রীতির কারণ উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

এই প্রথম একটা খটকা লাগল। উমাপ্রসাদ তো আর রবীন্দ্রনাথ নন, যে জনে জনে চিনে ফেলবে। গাড়োয়ালের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা উমাপ্রসাদকে নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন! জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী!

জানালেন, অন্য লোকে কি আর ট্রেক করবে। ট্রেকিং তো বাঙালিদের একচেটিয়া। আর সবচেয়ে বড় ট্রেকার তো স্বয়ং উমাপ্রসাদ। তিনিই নাকি মুরলীকে ট্রেকিং শিখিয়েছিলেন।

তুঙ্গনাথ

তুঙ্গনাথ

হিমালয় নিয়ে উমাপ্রসাদের ভ্রমণবৃত্তান্তগুলো যে এক একটা রত্ন, তা কে না জানে। কিন্তু, সেই রত্নাবলী আহরণে এই ক্ষয়াটে চেহারার মুরলী সাহায্য করেছিলেন! পাহাড়ঘেরা উপত্যকার মাঝে বসে এ বিবরণ শুনতে খারাপ লাগছিল না।

উমাপ্রসাদের দেখানো রাস্তাতেই মুরলী এখনও ট্রেকিং করান। পাহাড়ের উপর উপর দিয়ে তিন দিনের সে পথ চলা। দেওড়িয়াতাল থেকে শুরু করে তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশিলা করিয়ে তবে সারিগ্রামে নামিয়ে আনেন। ট্যুরে কেদারনাথ ফরেস্টে ক্যাম্পিং করে রাত্রিযাপন,
“সোচিয়ে জারা, আপ তাম্বুকে অন্দর, অউর বাহার শের!”

‘‘তা এখন এখানে কী করছেন?’’

—তুঙ্গনাথ মহারাজ কী দর্শন করনে আয়ে থে।

বোঝালাম আমাদের ট্যুর প্ল্যান আলাদা। তাই এ বারকার মতো তাঁবুর ভেতরে থেকে বাঘের ডাক শোনা আর হল না, তবে মাথায় রাখব। শুনে বললেন, “রাখবেন তো বটেই। আরে বাঙালিই তো মনে রাখবে। বাকি সব ফালতু। দেখনে কী নজরিয়া অউর কিসমে হ্যায়!”

ওঁকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা লাগালাম। কিছু দূর এগিয়ে সুচন্দা বলল, “ওহ, এঁর বাঙালিপ্রীতি দেখে তো আর বাঁচি না।”

মৌসুমি বলল, “এগুলো ব্যাবসার এক ধরনের ট্রিক। ওই আবার দ্যাখ মরাঠি ট্যুরিস্ট পেলে হয়তো তাদের কারওর নাম বলে সেই জাতকে তোল্লাই দেয়।”

উঠতে উঠতে সেটাই ভাবছিলাম। তুঙ্গনাথ কিন্তু চারধামের অন্তর্গত নয়! উত্তরাখণ্ডে আসা ট্যুরিস্টদের অধিকাংশই কিন্তু রিলিজিয়ন ট্যুরিজম বোঝেন— কেদার-বদ্রী আর গঙ্গোত্রী-যমুনোত্রী। লাখে লাখে লোক— সে বাঙালিই হোক বা অবাঙালি— প্রতি বছর এই চারধামে এসে ‘পুণ্যি’ করে যাচ্ছে। সেখানে ‘আল্পাইন মিডস’-এর মধ্যে দিয়ে হেঁটে সবচেয়ে উচ্চ কেদারে উঠে ‘অর্জুন মহারাজের’ বানানো মন্দির দেখার লোক তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। তার উপর ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় এই পাহাড়ের চুড়োয় উঠে চন্দ্রশিলা থেকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে চার পাশের তুষারধবল শৃঙ্গ দেখবে— নাহ্‌, পুণ্যি করতে আসা ট্যুরিস্টদের তাতে কোনও লাভ নেই। যদিও চন্দ্রশিলার চুড়োয় একটা ছোট্ট মন্দির রয়েছে, গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত।

এখানে লক্ষ্মণের খচ্চরের পিঠে চড়ে মাঝবয়সী ভক্ত উপরে ওঠেন। চটজলদি ‘পেন্নাম ঠুকে’ নীচে নেমেই দোকান খোলেন। ‘মুনাফা জরুরি হ্যায়।’— তাই ‘শিব-শম্ভো শিব-শম্ভো’।

যাই হোক, আমি যাত্রী বিচারক নই। তার উপর এ হেন প্রাকৃতিক বৈভবের মাঝে দাঁড়িয়েও যে আমার মানবচরিত্র নিয়ে সমালোচনা কমছে না, তাতে করে কিন্তু আমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে কলমচির সাধ্য কী যে কলমে তুঙ্গনাথকে ধরে! কাকে নিয়ে কী বলব! ওই যে মেঘের চাদর সরিয়ে উঁকি মারছে চৌখাম্বা, তার বর্ণনা করব? পারব? নাকি রোদ্দুর পড়ে কেদারডোমের বরফ কেমন স্বর্ণাভ হয়েছে, তা লিখব? যে হাওয়াতে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তাতে অক্সিজেনের ভাগ ঠিক কতটা? কার্বন ডাই-অক্সাইড আদৌ আছে কি? ওই দূরে নীচে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ঢালু গায়ে লেগে থাকা মাঠ। চম্পা ভট্ট, সঞ্জয় রাওত, সুনীল সিংহ ওই মাঠ জুড়ে গরু চরাচ্ছে। ওদের স্কুলে এখন সামার ভ্যাকেশন। তাই, ‘পরিবার কী কাম পে হাত বাটা রহি হ্যায়!’

চন্দ্রশিলা থেকে চোখে পড়ে বরফে ঢাকা শৃঙ্গ

চন্দ্রশিলা থেকে চোখে পড়ে বরফে ঢাকা শৃঙ্গ

এ দিকের আকাশ দিয়ে কালো মেঘ আসছে। জানি, দু-পাঁচ মিনিট বৃষ্টি হবে। এই পাহাড়ে এই সময়টায় এটাই নিয়ম। এই মেঘ-রোদ-বৃষ্টির মধ্যেই ওঠা, এতেই আনন্দ।

চন্দ্রশিলা যদি সামিট হয়, তবে তুঙ্গনাথ সামিট ক্যাম্প— যেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার আগে অমর সিংহ রানার চায়ের দোকানে আমরা একটু আগেই এসে পৌঁছেছি। এ পথে চায়ের দোকানের মজা আলাদা। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে দৃশ্যত একটাই মাত্র দোকান। আর পাহাড় ঘেরা মাঠের ধারে সে দোকানের যা লোকেশন, তাতে করে বেশ খারাপ করে বানানো চা খেতেও খুব একটা খারাপ লাগে না। পথ শুরু হওয়ার এক কিলোমিটার পরে অমলের চায়ের দোকান আর পৌঁছবার এক কিলোমিটার আগে অমরের চায়ের দোকান। মাঝখানে রাস্তা এক বার উঠতে উঠতে প্রায় আকাশে উঠে যাচ্ছিল।

প্রথম খটকা ছিল সারিগ্রামের এক অখ্যাত দোকানির মুখে উমাপ্রসাদের নাম শোনা। আর দ্বিতীয় খটকা লাগল তুঙ্গনাথ পৌঁছে। মিনিট ১৫ হল পৌঁছেছি। মন্দির ট্রাস্টের গেস্ট হাউসে রুম আগে থেকেই বুক করা ছিল। হলুদ রঙের সে গেস্ট হাউসের দোতলায় দু’টি ঘর আমাদের। সামনে বারান্দা। সেখানে এসে দাঁড়ালে সামনে চরাচর জুড়ে সবুজ একটা মাঠ, যার একটা দিক নামতে নামতে ওই দূরে পাইনের জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে। আর একটা দিক বেয়ে খাড়াই খাদ কয়েক হাজার ফুট নীচে চলে গিয়েছে। ও পাশটা জুড়ে মাথা তুলে শৃঙ্গরাজি দাঁড়িয়ে।

এই বারান্দায় দাঁড়িয়েই জিনিসটা চোখে পড়ল। অনতিদূরে মন্দিরে ওঠার রাস্তার এক ধারে একটা প্ল্যাকার্ড বসানো। তাতে বাংলায় লেখা ‘গণেশ হোটেল’!

তুঙ্গনাথ গুটিকয়েক ঝুপড়ি দোকানের সমাহার। দৈর্ঘে একশো মিটারের বেশি হবে কিনা সন্দেহ! সেই দৈর্ঘে আমি আর কোনও হোটেলের প্ল্যাকার্ড কিন্তু দেখতে পাইনি। যে হেতু চোপতা থেকে এ মন্দিরের দূরত্ব মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার, তাই এখানে এসে অধিকাংশ লোকই থাকা পছন্দ করেন না। পুজো দিয়ে নেমে যান। আর যাঁরা থাকতে চান, তাদের জন্য এই সব দোকানগুলোরই লাগোয়া খাট-বালিশ-বিছানা-কম্বল-সহ গোটা কয়েক ঘর রয়েছে। এ ছাড়া আছে মন্দির ট্রাস্টের গেস্ট হাউস। আমরা সেখানেই উঠেছি।

গেস্ট হাউস থেকে একটু নেমে রাজিন্দরের ধাবা। সেখানেই আমাদের খাওয়াদাওয়া ও স্নানের জন্য গরম জলের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। এখানে ‘কারেন্ট’ নেই। গ্যাসে জল গরম করে রাজিন্দর আমাদের গেস্ট হাউসে দিয়ে আসবে।

ঘরে মালপত্তর রেখে এসে সেই ধাবায় বসে ঘি দিয়ে খিচুড়ি খাচ্ছি। হঠাৎ পাশের দেওয়ালে চোখ পড়ল। দেখি ফের বাংলায় লেখা ‘এখানে থাকার সু-বান্দোবোস্ত আছে’।

অভিজিৎ বলল, “একটা ব্যাপার লক্ষ করলি? আসে তো অনেকেই। কিন্তু, আর কোনও ভাষায় লেখা অন্য কোনও বিজ্ঞাপন কি তোর চোখে পড়ল?”

তবে কী ওঠার সময় থেকে যা কিছু শুনে এলাম, সে সব ঠিক? এখানকার লোকেদের মধ্যে এই বঙ্গপ্রীতি কি শুধুমাত্র বাঙালিদের মাথায় হাত বোলানোর ‘ট্রিক’?

ভাবতে ভাবতে খাচ্ছি, হঠাৎ শুনি, ‘ভাত খেব দাদা, ভাত খেব।’ যিনি বললেন, তিনি ধাবার পাশে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমাদের দেখে হাসি মুখেই কথাটা পাড়লেন। মিনিট দুয়েক পর জানলাম, ইনি রবিন্দরজি, মন্দিরের পূজারী। এখানে পালা পড়ে। এখন ওঁর পালা চলছে। বললাম, ‘‘আজ আর মন্দিরে যেতে পারব না (যদিও চার পা হাঁটলেই মন্দির)। ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’’
সে সন্ধেটা ভারী ভাল কেটেছিল। রাত আটটায় সন্ধে নামলে কেমন দেখায় সেটা সেই আমার প্রথম দেখা।

গোল বাধল সন্ধ্যারতির সময়। সবই ঠিক ছিল, হঠাৎ করে মন্দিরের বাইরে অনুরাধা পাডোয়ালের ভক্তিগীতি শুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল। ভেতরে আরতি হচ্ছে, বাইরে অনুরাধার গান মাইকে বাজছে। সৌজন্যে সোলার পাওয়ার! ১২,০৭৩ ফুট উঁচু এক পাহাড়ের মাথায় ঘণ্টাধ্বনির আলাদা একটা নেশা আছে। সেটাকে যদি অনুরাধা পাডোয়াল দিয়ে এই ভাবে ছোট করা হয়…
রাত্রে রাজিন্দরের ধাবা থেকে ‘রোটি অউর আলু জিরা’ খেয়ে ফিরছি, দেখি পূজারী নেমে আসছেন। যথারীতি এক গাল হাসি, “খাবা হল দাদা?”

ওঁকে একটা সিগারেট অফার করে বললাম, “লোকে দূর দূর থেকে এখানে আসে আপনার আরতি দেখতে, ঠিক কি না?”

—ঠিক!

‘‘সেখানে আপনি মন্ত্রপাঠের সময় বাইরে মাইক বাজাচ্ছেন! ও ক্যাসেট তো আমি যে কোনও জায়গায় কিনে নিয়ে শুনতে পারব। কিন্তু, আপনার মন্ত্র কি যেখানে সেখানে শুনতে পাব?’’

কথাটা শুনে পূজারী কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। রাতের অন্ধকারের আলোয় আন্দাজ করতে পারলাম উনি কিছু একটা ভাবছেন। বেশ কয়েক বার সিগারেটে টান দিলেন। শেষে বললেন, “সোচ শায়দ অ্যায়সা হি হোনা চাহিয়ে।” আর কিছু বললেন না। আস্তে করে আমার পাশ কাটিয়ে অন্ধকার রাস্তা ধরে নেমে গেলেন।

রাজিন্দর ধাবা থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে এটাই নিয়ম। আপনি কেদারে যান। সেখানেও মাইক বাজিয়েই পূজো হয়।”
গেস্ট হাউসে ফেরার পথটা এটা ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল যে, ব্যাপারটা বলা ঠিক হল কি না।

রাত্রে শোওয়ার আগে কেয়ারটেকার গোপাল যাদব এসে জেনে গেল, কাল সকালে চন্দ্রশিলা উঠতে গাইড লাগবে কি না। ‘না’ বলায় আবার বাঙালিকীর্তন, “অকেলে হি যায়েঙ্গে? কেয়া বাত! ইসে কহতে হ্যায় ট্যুরিস্ট! নীচের ঘরে গুরগাঁও থেকে দুই কলেজের ছোকরা-ছুকরি এসেছিল। বলব কি বাবু, ভয়ে চন্দ্রশিলা গেলই না। ইয়ে লোগ ক্যায়া খাক ঘুমেঙ্গে?”

পরদিন ভোর পাঁচটায় আমার ঘুম ভেঙেছিল। জীবনে এমন ভোর পাঁচটা আর এসেছে কিনা মনে পড়ে না। বারান্দায় বেরিয়ে দেখি চৌখাম্বা, কেদারনাথ, ত্রিশূল— আলোয় স্নান করে সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাঠ জুড়ে গতরাত্রের বৃষ্টিতে ভেজা ঘাস আর মাঠের পাশ দিয়ে খাদ বেয়ে উঠে আসা কুয়াশা। শান্ত, নিস্তব্ধ চরাচর।

না, চরাচর একেবারে শান্ত নয়। পাশেই মন্দিরে আরতি হচ্ছে। এ নিস্তব্ধ পাহাড়ে আমি শুধু ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে মন্দিরের ভেতরে কেউ যেন মন্ত্রোচ্চারণও করছিলেন—

‘ওম সর্বায় ক্ষিতিমূর্তয়ে নমহ্
ওম ভবায় জলমূর্তয়ে নমহ্…’ সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা