Home » ফিচার » পাকা আমের মধুর রসে

পাকা আমের মধুর রসে

নিজামুল হক
এখন আমের মওসুম। দেশজুড়ে চলছে আমের মেলা, যেন আমের দেশ বাংলাদেশ। উত্তরাঞ্চলের আম ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের পথে-প্রান্তরে। পাকা আমের হলুদ রঙে বাংলার প্রতিটি সড়ক, বাজার এখন রঙিন। কয়েকশ’ ট্রাক প্রতিদিন ব্যস্ত রয়েছে আম পরিবহনে। বাসের ছাদেও এখন পাকা আম। ব্যবসায়িক ছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই আমের জন্য ছুটছেন উত্তরাঞ্চলে। আমকে কেন্দ্র করে রাজশাহী অঞ্চলে চলছে ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম।

রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের আমে যাতে ফরমালিন, কার্বাইডসহ কোন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে বিএসটিআই বিনা খরচে আম পরীক্ষার পর সনদ দেবে। সেই সনদ নিয়েই রাজশাহীর বাইরে যাবে আমের চালান। শুধু দেশে নয়, যুক্তরাজ্যের বাজারেও এখন বাংলাদেশের আম। চলতি মাসে প্রথমবারের মতো বিলেতে আম রপ্তানি করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে আমের প্রথম চালান রওনা হয়।

Mango

বিজ্ঞানীরা প্রায় আড়াই হাজার আমের জাত পেয়েছেন। তবে এসব আম হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলাদেশের তিনশ’ জাতের আম আবাদ হয়ে থাকে। সবুজ কাঁচা আম পাকলে সবুজাভ হলুদ, হলুদ, কমলা, মিশ্র রঙের লাল আভাযুক্ত, এমনকি সবুজও থেকে যেতে পারে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মদন গোপাল শাহা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১০টি উন্নত আমের জাত উদ্ভাবন করেছে। তবে স্থানীয় জাত রক্ষার জন্য কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরাদ্দ নেই। গবেষণার জন্য নিয়মিত যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা দিয়ে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন জাত ধরে রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আগে বীজ থেকে আম গাছ হতো। এখন অন্য প্রক্রিয়ায় গাছ রোপণ করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার বিভাগের পরিচালক সুনীল চন্দ্র ধর দেশের ২৫টি উপজেলার চাষিদের আম চাষে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেকের মতো এলাকাতেও আম চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে শক্ত স্থান করে নেবে ।

ইতিহাস
বৈজ্ঞানিক নাম ম্যানজিফেরা ইন্ডিকা, বাংলায় আম, সংস্কৃতে আম্র, ইংরেজিতে ম্যাংগো, মালয় ও জাভা ভাষায় ম্যাঙ্গা, তামিল ভাষায় ম্যাংকে এবং চীনা ভাষায় ম্যাংকাও। রসাল বা মধু ফলও বলা হয় আমকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেন। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আফ্রিকায় আম চাষ শুরু হয়। এরপর ১৬ শতাব্দীতে পারস্য উপসাগরে, ১৬৯০ সালে ইংল্যান্ডের কাঁচের ঘরে, ১৭ শতাব্দীতে ইয়েমেনে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আম চাষ হয়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আমের আঁটি থেকে গাছ হয়। এভাবেই আম ফলটি বিশ্ববাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। মোগল সম্রাট আকবর ভারতের শাহবাগের দাঁড়ভাঙায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করে উপমহাদেশে প্রথম একটি উন্নতজাতের আম বাগান সৃষ্টি করেন।

জাত
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩০০ জাতের আম মিলে। তবে সময়ের সাথে এসব জাত হারিয়ে যেতে বসেছে। ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত, গোপালভোগ, মোহনভোগ, জিলাপিভোগ, লক্ষণভোগ, মিছরিভোগ, বোম্বাই ক্ষীরভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, সিঁদুরা, গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশাভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালীভোগ, সুন্দরী, গোলাপবাস, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালপাহাড় আম এখন মিলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাজশাহী ও নবাবগঞ্জে আবাদ হয় ক্ষীরসাপাত, বোম্বাই ক্ষীরসাপাত, সর ক্ষীরসাপাত, ছোট ক্ষীরসাপাত, কোহেতুর, জাফরান, মোহনভোগ। এছাড়া হিমসাগর, ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, আষাঢ়ী, শ্রাবণী, ভাদুরিয়া, আশ্বিনী, বিসমনী, ভরত, ভোজ, বৃন্দাবনী, বাবুই ঝাঁকি, বাতাস, চম্পা, চকচকি, চাপাতি, দুধকুমার, দুধভোগ,আক্কেল গরম, ডায়মন্ড, নীলম, দোকশলা, বারোমাসি, কাঁচামিঠে, মিছরীভোগ, মিঠুরা, তোতাপুরী, কপটভাঙ্গা, হাতিঝুল, অরুনা, সুবর্ণরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, কারাবাউ, কেঊই সাউই, কেন্ট, পাহুতান, ত্রিফলা, কোলোপাহাড়. লতা, তোতা ফজলি, চিনি ফজলি, মালদহ, গৌরজিত্, কিষাণভোগ, কালিভোগ, শিকাভোগ, সীতাভোগ, মিছরিভোগ, চিনিভোগও মিলছে কোথাও কোথাও। আবার ল্যাংড়ার মধ্যেও আছে নানা নাম। এই যেমন হাজি ল্যাংড়া, কাশীর ল্যাংড়া। বিলুপ্তপ্রায় জাতের মধ্যে রয়েছে বাদশাহী, আলমশাহী, বৃন্দাবনী, দিলশাদ, কোহিনূর, কোহেতুর, ওয়াবজান, শাহী, ছোট শাহী। দিলখোশ, ফেরদৌসপসন্দ, সুলতানপসন্দ, বোম্বাই ও গোলাবখাস।

সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় আমের নাম আলফানসো। ভারতে উত্পাদিত এ জাতের এক কেজি আমের দাম ৪০০ রুপি। মিয়ানমারের জনপ্রিয় আম রাঙ্গু দেখতে আকর্ষণীয়, খেতে সুস্বাদু। ভারতের গবেষকরা ১৯৭৮ সালে দশহরি ও নিলাম এ দুটি আমের মধ্যে সংকরায়ণের মাধ্যমে প্রথিবীর বিস্ময়কর জাতের আম উদ্ভাবন করেন; যার নাম আম্রপালি।

কোহিতুর নামের একটি আম নবাবদের খুব পছন্দের ছিল। আম গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও শীতকালে খাওয়া হত সেই আম। এই আম সংরক্ষণ করা হত ঘি আর মধুভান্ডে। আমের বোঁটা কেটে ফেলে সেই জায়গায় মোমের প্রলেপ দিয়ে সেই বোঁটা কাটার জায়গাটি ঢেকে দিয়ে মধু এবং ঘি ভান্ডে সংরক্ষণ করা হত। কোন প্রকার লোহার ছুরিচাকু ব্যবহার না করে বাঁশের ছুরি দিয়ে কেটে খাওয়া হত। অনেকেই মনে করেন, মোগল সম্রাট শাহজাহানের কোহিনূর সিংহাসনের নামের উচ্চারণগত কারণেই এই আমের নামকরণ হয়েছে কোহিতুর। বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মোগল ও নবাবী আমলের নাম অনুযায়ী আমের নামকরণ আজও চালু আছে। কিন্তু অন্যান্য আমের জাত বৃদ্ধি হলেও কোহিতুর আমের জাত বৃদ্ধি তেমন হয়নি। তবে কোহিতুর এখনও জনপ্রিয়। ঐতিহ্যবাহী এই আম সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হত মধু এবং ঘি।

দেশে আমের উত্পাদন
বিশ্বের সিংহভাগ আম উত্পাদন হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। পাশের দেশ ভারত রয়েছে শীর্ষে। ২০১২-১৩ মৌসুমে দেশটিতে আম উত্পাদনের পরিমাণ ১ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টন। পরের অবস্থানগুলোয় রয়েছে যথাক্রমে চীন ৪৪ লাখ, কেনিয়া ২৭ লাখ ৮১ হাজার, থাইল্যান্ড ২৬ লাখ ৫০ হাজার, ইন্দোনেশিয়া ২৩ লাখ ৭৬ হাজার, পাকিস্তান ১৯ লাখ ৫০ হাজার, মেক্সিকো ১৭ লাখ ৬০ হাজার টন উত্পাদন নিয়ে। নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের পর রয়েছে নাইজেরিয়ার উত্পাদন ১৬ লাখ ৬০ হাজার টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক কৃষিবিদ সুনীল চন্দ্র ধর ইত্তেফাককে জানান, দেশের ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জেই আবাদ হয় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে ৮ হাজার হেক্টর, দিনাজপুরের ৪ হাজার হেক্টর, সাতক্ষীরায় ৩ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়।

ভালো জাতের অভাব
বাংলাদেশে অনেক জাতের আমের চাষ হয়। তবে ভালো জাতের আমের চাষ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। অনেকের মতে, উপযুক্ত যত্ন নিলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ভালো জাতের আমের চাষ করা সম্ভব। দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে যেসব আমের চাষ করা হয় তার মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খীরসাপাতি, আশ্বিনা, সূর্যপুরী, হিমসাগর, কিষাণভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, মোহনভোগ, কোহিতুর, লক্ষণভোগ, বোম্বাই, লতা বোম্বাই, বারিআম-১ (মহানন্দা), বারিআম-২, বারিআম-৩ (আম্রপালি), বারিআম-৪, বারিআম-৫, বারিআম-৬, বারিআম-৭, বারিআম-৮ ও বারিআম-৯ (কাঁচামিঠা) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমের বিভিন্ন জাত অবমুক্ত করা, সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোয় আবাদ বাড়ানো ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণ করা গেলে উত্পাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি মুকুল থেকে শুরু করে ফল পাড়ার আগ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার জনপ্রিয় করতে হবে। আমের চারা উত্পাদন, বালাই ব্যবস্থাপনা এবং বিপণন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে বর্তমানে আবাদকৃত জমিতেই আরো বেশি উত্পাদন সম্ভব।

প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আম
দুই দশক ধরেই দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ ঘটছে। এ শিল্প বিকাশে যেসব ফসল বা ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তার মধ্যে আম রয়েছে বিশেষ অবস্থানে। এ ফলের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে জুস শিল্প। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমের জুস এখন রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে দেশ ও রফতানি মিলে জুসের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার।

বাংলাদেশের জুস রফতানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। তবে দেশে ম্যাংগো জুস নামে বাজারে যে জুস মিলে তাতে আমের পরিমাণ খুবই কম। এ কারণে ‘ম্যাংগো জুস’ না বলতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।

কানসাট আম বাজার
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমের বাজার, কানসাট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে আমের বিকিকিনি। দেশের নানান প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পাইকারি ক্রেতা এ বাজারে আসেন আম কিনতে। সাইকেল বা রিক্সাভ্যানে বোঝাই করে আম নিয়ে গভীর রাত থেকেই এ বাজারে জড়ো হতে থাকেন আম চাষিরা। আমের সময়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই এখানে হাট বসে। এই এলাকায় আমের বাগানে একশ বছরেরও বেশি পুরনো আমের গাছ রয়েছে। সূত্র : ইত্তেফাক
=====
ঢাকা ট্যুরিস্ট ক্লাবের উদ্যোগে শিগগিরই শুরু হচ্ছে আম উৎসব। বিস্তারিত জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।