Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » মেঘ পাহাড়ের দার্জিলিংয়ে (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
হোটেল রুম থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ, সাথে পিলার দেখা ফ্রি।

মেঘ পাহাড়ের দার্জিলিংয়ে (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

রকিবুল হক রকি
কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাঞ্চন মন
ঢাকায় গরমে, লোডশেডিংয়ে ঘুমিয়ে অভ্যাস, সেখানে হঠাৎ করে শীতের মধ্যে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমটা হলো জম্পেশ। কখন যে রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙল খালেদ সাইফুল­াহর ঠেলায়। চোখ মেলে দেখি সবাই হোটেল রুমের জানালা দিয়ে মাথা বের করে আছে। আমিও লাফ দিয়ে চলে গেলাম জানালায়। কি আশ্চর্য! এক অভাবনীয় দৃশ্য! হোটেল য়ুমার পরেই পুরো দার্জিলিং শহরটা দেখা যায় তা রাতেই বুঝেছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি এখান থেকে দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম সেই চ‚ড়োর দিকে। অনেক দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তার থেকেও আরও বহুদূরে, অনেক দূরে উঁকি দিয়ে আছে বিশাল কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশালত্ব, সৌন্দর্য কোনো লৌকিক ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব না। পরিষ্কার নীল আকাশে বরফে ঢাকা সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়া, তার নিচে মেঘের ঢেউয়ের কারণে আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন চূড়াটা তার সব সৌন্দর্য নিয়ে আকাশে ভেসে আছে।

হোটেল রুম থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ, সাথে পিলার দেখা ফ্রি।

হোটেল রুম থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ, সাথে পিলার দেখা ফ্রি।

যাই হোক, আস্তে আস্তে আকাশ আরও পরিষ্কার হলো। কাঞ্চনজঙ্ঘার আশপাশের আরও কয়েকটা চ‚ড়া তার সঙ্গী হয়ে রূপ যেন কয়েক হাজার গূণ বাড়িয়ে দিল। চোখ দিয়ে যত পারি দেখে মন ভরিয়ে ফেললাম। এবার ক্যামেরায় ছবি তোলার পালা। কিন্তু ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম ফ্রেমের মাঝখানে এক বিল্ডিংয়ের পিলার বেশ ঝামেলা করছে। তো কি আর করা, পিলারসহই ছবি তুলতে হলো।

ছবি তুলে মন না ভরায় আমরা আবার শুধু চোখেই দেখা শুরু করলাম। এবার আর বেশিণ পারলাম না। কারণ, একটা মারাÍক বদমাশ টাইপের কালো মেঘ এসে সব ঢেকে দিল। সেটার আবার একটা ছানা টাইপের মেঘ আমাদের রুমেও ঢুকে গেল। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্ব শেষ করে সবাই ফ্রেশ হওয়া শুরু করলাম, এতণ মনেই ছিল না আমরা দাঁত না মেজে, প্রাকৃতিক কর্মাদি সম্পন্ন না করেই প্রাকৃতিক দৃশ্যে আমরা মজে ছিলাম।

টো টো কোম্পানি
ফ্রেশ হয়ে দেখি হোটেল বয় রুমে বেড টি দিয়ে গেছে। চা মানে এক্কেবারে দার্জিলিংয়ের খাঁটি চা। খেলে মনে হয় শুধু খেতেই থাকি। মোটামুটি পাঁচ কাপ খাওয়ার পরে মনে হলো, নাহ, সকালের নাস্তার জন্য কিছু জায়গা রাখা দরকার। বিশ্বাস করুন, খালি পেটে ওই চা এতই মজা লেগেছিল যে চাইলে তখনই পুরো কেটলির চা খেয়ে ফেলতে পারতাম।

সাইফুল ভাইর প্রস্তাবে সবাই গেলাম ম্যাল চত্বরে। হোটেল থেকে বেরিয়ে মিনিট দশেক হাঁটলেই ম্যাল। সেখানে তখন স্থানীয় একটি ফেস্টিভ্যাল চলছিল। কিন্তু অত সকালে তো আর কোনো উৎসব হবে না, ছিলেন স্বাস্থ্যসচেতন স্থানীয়রা, ট্যুরিস্টরা আর স্কুলগামী বাচ্চারা। আমরা ম্যালে হাঁটাহাঁটি করলাম আর চারপাশের মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি দেখতে লাগলাম। অনেকণ এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটির পরে একটু ক্লান্ত হয়ে আমরা পাহাড়ের কিনারায় কয়েকটা চেয়ারে বসলাম। আল মারুফ আর হাজ্জাজ ভাই গেলেন মহাকাল মন্দির দেখতে। মন্দিরটা পাহাড়ের বেশ উপরে দেখে আমি আর গেলাম না। মারুফরা মিনিট বিশেকের মধ্যেই নামবে বলে উপরে গেল।

ম্যাল থেকে ফেরার সময়ে দেখলাম কয়েকটা দোকান মাত্র খুলতে শুরু করেছে। কিছু পরেই দেখি সাইফুল ভাই আমাদের সঙ্গে নেই। শুরু হলো তাকে খোঁজা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম, একটা ব্যাগের দোকানের সামনে। তাকে সেই দোকানেই রেখে আমরা আবার ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। ক্ষিদে লেগে গেল প্রচন্ড। সাইফুল ভাইকে নিয়ে হোটেলে ফিরব বলে আবার শুরু হলো তাকে খোঁজা। বেশি খুঁজতে হলো না, তিনি এখনও আগের দোকানটাতেই আছেন। সেই দোকানটার চামড়ার ব্যাগ এতটাই মানসম্মত আর সুন্দর যে, তিনি আর দোকান থেকে নড়তেই পারছেন না। শুধু কিনছেন আর কিনছেন। অগত্যা তাকে রেখেই হোটেল য়ুমাতে ফিরে এলাম। গিয়ে দেখি সবাই অপেক্ষা করছে। ততণে প্রায় বেলা এগারোটা বেজে গেছে। অতএব আগে থেকে ঠিক করা ট্যুর প্ল্যান বাদ। সাইফুল ভাই ফিরলে পরবর্তী পরিকল্পনা ঠিক করা হবে। আগেই বলেছি তিনি এই এলাকায় কয়েকবার এসেছেন, তাই আমাদের মধ্যে তিনিই ভালো বলতে পারবেন কোন কোন জায়গায় ঘুরতে গেলে ভালো হবে।

বেশকিছু পরে সাইফুল ভাই বিজয়ীর বেশে হোটেলে ফিরলেন। চোখ বুজেই বুঝলাম, দোকানদারও মহাখুশি, তার মোটামুটি এক মাসের বেচাবিক্রি হয়ে গেছে। সাইফুল ভাই-ই বা কি করবেন, ওখানকার জিনিসের মান যেমন ভালো, তেমনি দামেও সস্তা।
এবার কোথায় যাব সেটা ঠিক করতে না করতেই শুরু হলো সেই রকম বৃষ্টি। মনটাই খারাপ হয়ে গেল, ধ্যাৎ! সারাদিনে তেমন কোথাও ঘুরতে পারলাম না। বিকেলের দিকে বৃষ্টি থামলে সবাই আবার চাঙ্গা হয়ে গেলাম কাছাকাছি কয়েকটা ট্যুরিস্ট স্পটে। দুটো জিপ ভাড়া করা হলো। প্রথমেই গেলাম এইচএমআই (হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট)-এর চিড়িয়াখানা আর মিউজিয়ামে। জায়গাটা পাহাড়ের অনেক উপরে; আর গাড়ি যেতে পারে না, তাই আল মারুফ গেল খোঁজ আনতে। আমরা আস্তে আস্তে এগুতে লাগলাম।

কিছুদূর এগুনোর পরে সায়েম ভাই আর পৃথিবী ভাই সিদ্ধান্ত— নিলেন, পাহাড় বেয়ে উঠতে যখন হবেই, তাহলে আর আস্তে আস্তে ওঠা কেন, তার থেকে দৌড় দিলেই হয়। কষ্ট যা হবার তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। দিলেন দু’জনে দৌড়। অনেকণ দৌড়ে একেবারে উপরে উঠে দু’জনেই যখন হাঁফাতে লাগলেন, তখন দেখলাম মারুফ নামতে শুরু করেছে। কারণ, মিউজিয়াম চারটার পরে বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়তি বিনোদন হিসেবে আমরা সায়েম ভাই আর পৃথিবী ভাইয়ের দৌড় কম্পিটিশনটা দেখতে পেলাম আরকি।

এরপরের জায়গা হলো তেনজিঙ রক। এই বিশাল পাথর খণ্ডের একটা ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিঙ নোরগে এভারেস্ট সামিটের আগে এই সুবিশাল পাথর খণ্ডে ট্র্যাকিং প্র্যাকটিস করতেন। ট্যুরিস্টদের জন্য এই পাথরের উপরিভাগ উন্মুক্ত, যে কেউ চাইলেই দড়ি বেয়ে উঠতে পারেন, মাত্র ৩০ রুপির বিনিময়ে। সবার আগে বেশি উত্সাহ দেখিয়ে আমি দড়ি বেয়ে ওঠা শুরু করলাম। অনেকখানি উঠে এক জায়গায় আটকে গেলাম। বুঝলাম আমাকে দিয়ে এভারেস্ট জয় করা সম্ভব নয়। এরপর গেলেন হাজ্জাজ ভাই, তিনিও আটকে গেলেন। এরপর উঠলেন সায়েম ভাই, তিনি বেশ দ্রুত উঠে গেলেন। তবে নামলেন আরও দ্রুত, মানে পিছলে পড়ে গেলেন আর কী! যদিও তিনি সেটা স্বীকার করতে চান না। পরে বলেছিলেন, আমাদের এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, তাই তিনি শুধু শুধু সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি নেমেছেন।

আবার সবাই জিপে উঠলাম, এবারের গন্তব্য তিব্বতি রিফিউজি হেল্প সেন্টার। ১৯৫৯ সালে শরণার্থী তিব্বতিদের পুনর্বাসনের জন্য লেবঙ পাহাড়ে এই সেন্টারটি তৈরি করা হয়। তিব্বতিদের হাতে তৈরি কার্পেট, চাদর, শাল, বিভিন্ন স্যুভেনির এখানকার মূল আকর্ষণ। তুলনামূলকভাবে দামেও বেশ সস্তা। চারশ’ রুপি দিয়ে আমি দুটো শাল কিনলাম। সবাই যে যার পকেট হালকা করে ফেলল।

ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। এবার ফিরতে হবে। ফেরার পথে একটা চা-বাগান দেখে ভাবলাম দার্জিলিংয়ের চা-পাতা কিনে নিই। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে রাস্তার ধারের ছোট ছোট দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা ইচ্ছামত ছবি তুলে সেদিনকার মতো ট্যুর শেষ করলাম।

স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় আমরা হোটেলে ফিরলাম। একটু রেস্ট না নিয়েই দৌড় দিলাম ম্যাল চত্বরে, কেনাকাটা করতে হবে। দেশ থেকে বিশাল লিস্ট নিয়ে এসেছি, সবার পছন্দের জিনিস কিনে নিয়ে যেতে হবে। সময়ও বেশি নেই। কারণ সব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে রাত ৮টায়। আর আগামীকাল আমরা সময় পাব না, কারণ আমি, আল মারুফ আর হাজ্জাজ ভাই—এই তিনজন মিলে অলরেডি আরেকটা প্ল্যান করে ফেলেছি। সে কথায় পরে আসছি। অতএব কেনাকাটায় পুরো মনোযোগ দিয়ে ফেললাম। সেখানকার জিনিসের দাম বেশ কম বলেই মনে হলো, তবুও দামাদামি করলাম। আমি নিজে দামাদামিতে খুব বেশি এক্সপার্ট নই, তাই জিতলাম নাকি ঠকলাম সেটা পষ্ট করে বুঝলাম না।

মেঘ পাহাড়ের দার্জিলিংয়ে (প্রথম পর্ব)

(ঢাকা ট্যুরিস্ট ক্লাবের মেম্বাররা দার্জিলিং ভ্রমণে যাচ্ছে আগামী ঈদুল ফিতরের পর। আগ্রহীদের অফিসে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। বিস্তারিত এই লিঙ্কে : http://dhakatouristclub.com/?p=109)