Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » মেঘ পাহাড়ের দার্জিলিংয়ে (প্রথম পর্ব)
সকালের দার্জিলিং- ওরে কত পাহাড় আর মেঘ

মেঘ পাহাড়ের দার্জিলিংয়ে (প্রথম পর্ব)

রকিবুল হক রকি
যাত্রা হলো শুরু
ইফতারের আগে বের হলাম অফিস থেকে। একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম গুলশানে। প্রশ্ন করতে পারেন দার্জিলিংয়ের সঙ্গে গুলশানের কী সম্পর্ক? দার্জিলিং যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই গুলশান যেতে হবে, কারণ সেখানেই ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার। সেখানে ভিসা আনতে গিয়ে দেখলাম অফিসের সবার সে কি ভাব! একেকজন পুরো মনমোহন সিং, সোনিয়া গান্ধীর মতো মুড নিয়ে থাকে। দিন কয়েকের হ্যাপা ও টেনশন পেরিয়ে অবশেষে পেলাম ভিসা। বাসের টিকিট আগে থেকেই কাটা ছিল, শ্যামলী বাস। কল্যাণপুর থেকে ছাড়বে সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ, রাত ৮টায়।

আমার অভ্যাস বজায় রেখেই বাস ধরার আগে বেশ তাড়াহুড়ো লেগে গেল। কোনো রকম দৌড়াদৌড়ি করে বাস কাউন্টারে পৌঁছলাম ঠিক ৮টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে। গিয়ে দেখি বাস দুই ঘণ্টা লেট। এসি নাকি নষ্ট হয়ে গেছে, সারাতে সময় লাগবে। বাসস্ট্যান্ডে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন অন্য চার ভ্রমণসঙ্গী সাইফুল ভাই, পৃথিবী ভাই, হাজ্জাজ ভাই আর আল মারুফ।

সকালের দার্জিলিং- ওরে কত পাহাড় আর মেঘ

সকালের দার্জিলিং- ওরে কত পাহাড় আর মেঘ

সীমানা পেরিয়ে

পরদিন সকাল ৮টায় পৌঁছে গেলাম বাংলাদেশের সীমানায়, জায়গার নাম বুড়িমারী। বর্ডার পেরিয়ে ভারতে ঢুকলেই ওপারের জায়গাটার নাম চ্যাংড়াবান্ধা। ইমিগ্রেশন অফিস খুলবে সকাল নয়টায়। তাই আমরা একঘণ্টা বসে বসে জলযোগ-বিয়োগ করলাম আর আলোচনা করলাম কেন একপাশে বুড়িকে মারা হচ্ছে, আরেকপাশে চ্যাংড়াকে বেঁধে রাখা হচ্ছে।
বাসের সুপারভাইজারের সহযোগিতায় মোটামুটি ১০টার সময় গেলাম ইমিগ্রেশনের লাইনে। আমাদের সাইফুল ভাই জুয়েল আইচের মতো কী জানি কী ম্যাজিক করলেন, সবার আগে আমাদের পাসপোর্টে সিল, ইমিগ্রেশন, লাগেজ চেক হয়ে গেল। একেবারে ভোজবাজির মতো, কোনোরকম ঝামেলাই হলো না। আশ্চর্য! বর্ডার পেরুনোর সময় বেশ ভয় ভয় লাগছিল, যদি আমাকে এখান থেকে ফিরিয়ে দেয়, যদি ভারতে ঢুকতে না দেয়! সাইফুল ভাইয়ের ক্যারিশমায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম তিনি ক্যামনে কী করলেন। মুচকি হেসে বললেন, এটা হচ্ছে এর আগে তিনবার দার্জিলিং আসার অভিজ্ঞতার সফল।
ভারতে ঢুকেই সঙ্গের ডলারগুলোকে রুপি করে ফেললাম। তারপর শ্যামলীর আরেকটা বাসে আমাদের উঠিয়ে দেয়া হলো। বাসে উঠেই দিলাম এক ঘুম।

ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু

ঘুম থেকে উঠে দেখি, শিলিগুড়ি শহরে চলে এসেছি। শহরটা অনেকটা আমাদের পুরান ঢাকার মতোই। মূল পার্থক্যটা চোখে পড়ে রাস্তার রিকশা, গাড়ি আর সাইনবোর্ডের মডেল শাহরুখ খান, আমির খানদের দেখলে।
আমাদের আসতে আসতে বেলা একটা বেজে গেছে। শিলিগুড়ি জংশন পয়েন্টে তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আমাদের অপর ছয় ভ্রমণসঙ্গী অনিক খান, খালেদ সাইফুল্লাহ, সায়েম, ফিজা, মিতু আর তন্ময়। সদস্য হলো এগারোজন সব মিলিয়ে। এগারোজনের কথা শুনে নিশ্চয়ই আপনার মনে পড়ছে ফুটবল টিমের কথা কিংবা ওরা এগারোজন সিনেমার কথা। আমারও মনে পড়েছিল।
টুকটাক খানাপিনা করে দুটো জিপ নিয়ে আমরা এবার বেরিয়ে পড়লাম সৌন্দর্যের রানী দার্জিলিংয়ের উদ্দেশে। সেই গতকাল থেকে রাস্তা চলা শুরু করেছি, সবার শরীরই খুব ক্লান্ত। সবাই জিপে চড়ে কেমন যেন ঝিমিয়ে গেল। শুধু আল মারুফ তার নাইকন ক্যামেরা বের করে ক্লিক ক্লিক করতে লাগল।

ওই দেখা যায়

একটু মনে হয় চোখ বুজে এসেছিল, হঠাত্ টের পেলাম জিপের ভেতরে হালকা গুঞ্জন। দেখি, মারুফের ক্যামেরার সঙ্গে আরও সবার ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক বেড়ে গেছে। ঘটনা কী? বাইরে তাকিয়ে দেখি চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। শিলিগুড়ির সমতলভূমি থেকে হঠাত্ করে যেন গজিয়ে উঠেছে সারি সারি পাহাড়। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। ক্লান্তি উবে গেল। বাটে পড়ে বসেছিলাম দু’জনের মাঝখানে, তাই তেমন ছবি তুলতে পারলাম না। খালি চোখেই মন ভরে দেখলাম।
পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে জিপ ছুটে চলছে তো চলছেই। আমরাও মজা করে পাহাড় দেখছি। একটু পরে পাহাড়ের সঙ্গে জুটে গেল মেঘ। মেঘের কি বাহার!!! ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ, কুয়াশার মতো মেঘ, ঘন কালো মেঘ, গলেপড়া মেঘ, তুলোর মতো মেঘ। জিপের ঝাঁকি খাচ্ছি আর মেঘ দেখছি।
প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পরে এক পাহাড়ের চূড়োয় গাড়ি থামাল। এখানে মিনিট বিশেকের একটা ব্রেক। নেমেই আমি মনের সাধ মিটিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। গেল কই সব? দেখি সবাই রাস্তার পাশের এক ছোট্ট দোকানে ঢুকে মোমো, আলুর দম খাচ্ছে। মোমো হচ্ছে সেখানকার একেবারেই স্থানীয় একটা খাবার। অনেকটা আমাদের গ্রাম দেশের পুলি পিঠার মতোই। ভেতরে থাকে সবজি, নয়তো গোশত। সঙ্গে ঝাল মরিচের সস। এমনিতে নাকি প্রতি প্লেটের দাম ১৫-২০ রুপি, কিন্তু ওইখানে দাম রাখল ৪০ রুপি করে। দাম নিয়ে চিন্তা করলাম না, কারণ, জন্মদিনের সুবাদে পুরোটাই সাইফুল ভাইয়ের পকেট থেকে যাবে। তাই পেট পুরে খেয়ে নিলাম।
এরপর জিপের সামনের সিটে বসা অনিককে পটিয়ে আমি সেখানে বসলাম। বেশ ফুর্তি লাগল। এবার সব দেখতে দেখতে যাব। একেবারে সামনে থেকে।
জিপ ছাড়ার পরেই বুঝলাম ভুলটা করে ফেলেছি। রাস্তায় নানান রকম প্যাঁচ, আর একেবারে খাড়া। ভয়ে আমি পুরো রাস্তা শক্ত হয়ে বসে ছিলাম। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তা এতটাই খারাপ আর ভাঙা, দেখলে মনে হয় এই দেশের যোগাযোগমন্ত্রীও বুঝি আমাদের আবুল সাহেবের মতোই।
যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে গেল। ঝপ করে নামল শীত। ইন্টারনেট ঘেঁটে আগেই জেনেছিলাম, তাপমাত্রা এ সময়ে সর্বনিম্ন ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামে। তাই তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে জ্যাকেটটা বের করে পরে ফেললাম। আর ভাবলাম আহারে, গতকালও এই সময়ে ঢাকায় বসে ঘেমেছি, আর এখন জ্যাকেট-মাফলার পরে ফুলবাবু সেজে বসে আছি।

হোটেল য়ুমা

পেটের মোমো হজম হয়ে গেছে অনেক আগেই। থাকার জায়গার থেকে এখন বেশি দরকার খাওয়ার জায়গার। স্থানীয় সময় রাত ৮টায় দার্জিলিংয়ের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি আমরা একটা ভালো হোটেল খুঁজতে শুরু করলাম। বেশি খুঁজতে হলো না, পেয়ে গেলাম হোটেল য়ুমা, লাদেনলা রোডে। ডাবল বেডরুমের ভাড়া নাকি প্রতি রাতে দুই হাজার রুপি। কি কি ডিসকাউন্ট মিলিয়ে সেটা নেমে এলো বারোশ’ রুপিতে। আমরা তিনটা রুম নিয়ে নিলাম। একটু গাদাগাদি করে থাকব আর কী! একদম শান্ত একটা এলাকা, যদিও পরের দিনের বেলা বুঝতে পেরেছিলাম শুধু এই জায়গা নয়, দার্জিলিংয়ের কোনো জায়গাই দিনের বেলা চুপচাপ থাকে না, একেবারে গমগম করে। এটা নাকি অফসিজন, তাই ভিড় একটু কম। সিজন শুরু হলে নাকি গাবতলীর গরুর হাট হয়ে যায়। যদিও স্থানীয় কেউ গাবতলীর হাট চেনে না, তাই তারা বলেওনি, বলেছে আমাদের আল মারুফ।
হোটেল য়ুমাতেই রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা বের হলাম রাতের শহর দেখার জন্য। একটু এদিক-সেদিক ঘুরব বলে ঠিক করেছিলাম, কিসের কি! দেখি পুরো শহরটাই পাহাড় কেটে কেটে বানানো। যেখানেই যাই, খাড়া রাস্তা ধরে হাঁটতে হবে, নয়তো সিঁড়ি ভাঙতে হবে। এটা তো আর ঢাকা নয়, যে চাইলেই রিকশা পাব। অগত্যা আদমগাড়ি স্টাইলেই ঘুরলাম আধঘণ্টা। এরপর হোটেলে ফিরলাম পেটে রাক্ষুসে ক্ষিদে নিয়ে।
ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখি নাম না জানা সব স্থানীয় খাবারে টেবিল ভর্তি, আর আমাদের বলছে— খা, আমাদের খা। সেগুলোর ডাকে সাড়া দিয়ে আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আগে পেট ঠাণ্ডা হোক, তারপর নাম জানা যাবে।
রাতের খাবার শেষ হওয়ার পরে শুরু হলো আমাদের আরেক দফা ফটোসেশন। আমি হিন্দি ভাষার কিছু না বুঝলেও বেশ ভাব নিয়ে পেপার পড়া শুরু করলাম।
আস্তে আস্তে রাত বাড়ে, ঠাণ্ডাটাও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগে। তাই সবাই রুমে গিয়ে লেপের নিচে পা ঢুকিয়ে বসে রইলাম। সেই সঙ্গে সাইফুল ভাই করে ফেললেন আগামীকালের প্ল্যান। খুব ভোরে আমরা আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে বের হব। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে হলে নাকি টাইগার হিলে যেতে হবে, এখান থেকে জিপে করে দেড় ঘণ্টার পথ। এটা শুনেই আমরা দমে গেলাম। থাক, টাইগার হিলে নয়, দার্জিলিং শহর থেকেই যা দেখার দেখব। এখানেও আল মারুফ যোগ করল, টাইগার হিল নাকি এক্কেবারেই গাবতলীর গরুর হাট, প্রচণ্ড ভিড়।
ট্যুর প্ল্যানের পরে থাকবে সকালবেলা দার্জিলিংয়ের প্রাণকেন্দ্র ম্যালচত্বরে হাঁটাহাঁটি, চা-কফি পান। ওই জায়গায় একটু বসে চারপাশের পাহাড়ের শোভা দেখলে নাকি অসুস্থ মানুষও সুস্থ হয়ে যায়। তারপর আমরা যাব ‘ঘুম’ রেল স্টেশনে, টয় ট্রেনে চড়তে। ‘ঘুম’ রেল স্টেশনের নাম শুনেই সবার বেশ ঘুম পেয়ে গেল। তাই সব পরিকল্পনা আপাতত বাদ দিয়ে আমরা ঘুমাতে গেলাম।

চলবে…..