Home » বাছাইকৃত » ম্যালা পাখি হলুদ গাঁয়

ম্যালা পাখি হলুদ গাঁয়

মাসুম সায়ীদ
১৫ পৌষ, ২২ ডিসেম্বর। বছরের সবচেয়ে ছোট দিন। সকাল পৌনে ৯টা। কর্মব্যস্ত মানুষেরা জেগে উঠলেও জাগেনি প্রকৃতি। কুহেলিকার কিংখাব তখনো পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছে তাকে। সাভারের বংশী নদীর তীরে বালুময় ঘাটে দাঁড়িয়ে আমরা (জাবির শামীম, রনি, ভিক্টোরিয়ার লিঙ্কন আর আমি) অপেক্ষা করছি খেয়া নৌকার। নৌকা এলো। আমরা উঠে পড়লাম। নদীর দুর্দশার কাল শুরু হয়ে গেছে। তবু এখনো জেলেরা জাল ফেলে, হাঁসেরা জলকেলি করে সারা দিন। নৌকা থেকেই দেখলাম, তীরে কয়েকটি রাজহাঁস পানি ঘেঁষে বসে তাকিয়ে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। এদিক-ওদিক আরো কিছু পাতিহাঁস। রাজার পাশে ওরা যেন প্রজা। নৌকা ঘাটে ভিড়ল।

123654এপারের গ্রামটার নাম রূপনগর। সে অর্থে পুরনো কোনো গ্রাম নয়। পূর্বপারের জমজমাট বাজার আর পৌর এলাকায় ঠাঁই না-পাওয়া আশ্রয়সন্ধানী নানা জায়গার নানা মানুষের কলোনি মাত্র। গ্রামটা পেরোলেই উঁচু সড়ক। ফোর্ডনগর খেয়াঘাট থেকে এর শুরু, শেষ হয়েছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢুলিভিটা বাসস্ট্যান্ড গিয়ে। অদূর ভবিষ্যতে বাইপাস সড়ক হিসেবে এটা সাভার আর ধামরাইকে সংযুক্ত করবে। ওই পথ ধরেই আমাদের আজকের পদযাত্রা।

রাস্তায় ওঠার আগেই চোখে পড়ল একদল তিতির। ছাই রঙের ওপর ধবধবে সাদা রঙের বাহারি ফোঁটা সারা শরীরে। ক্যামেরা বের করতেই মাথা তুলে দেখল একবার। তারপর আবার খুঁটে খাওয়া শুরু করল। শুধু একটা বাদে। প্রায় সারাক্ষণ মাথা তুলে নিথর হয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল। বুঝলাম, এটাই দলনেতা। দলনেতার সতর্কতা সত্যি ছুঁয়ে গেল আমাকে। ছবি তুলে ঘুরে দাঁড়াতেই একটি সরিষা ক্ষেতের খুঁটির ওপর চোখে পড়ল আরেকটি পাখি। হালকা বাদামি রঙের পাখিটি দেখে প্রথমে চাতক মনে হলেও আসলে এটা চাতক নয়; শিকরা, লোকে বলে তুর্কিবাজ।

আমরা উঁচু সড়কে এসে উঠলাম। রাস্তাটা মহাসড়কের মতো উঁচু, তবে পরিত্যক্ত রেল সড়কের মতো নীরব আর নিঃসঙ্গ। দুপাশে ফসলের মাঠ। মাঠের বিস্তৃতি পূর্ব পাশে নদীর তীর ঘেঁষা বাড়িঘর আর পশ্চিম পাশে দিগন্তব্যাপী। পুরো মাঠ হলুদ সরিষা ফুলে ভরা। যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ। তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বিশাল এই মাঠ বর্ষাকালে সরোবরে পরিণত হয়। রাস্তাটা থাকে ডুবু ডুবু। মাঝে দু-তিনটা খাল বর্ষায় পূর্ব-পশ্চিমের সংযোগ রক্ষা করে। এখনো ব্রিজ বা কালভার্ট হয়নি। ফলে যান চলাচল নেই। তেমন কেউ আসেও না। মাঠের পরের গ্রাম কাইজারকুণ্ডু। রূপনগর থেকে প্রায় দেড় কি দুই কিলোমিটার উত্তরে। সেখানেও একটা খেয়াঘাট আছে। রাস্তাও ভালো। গাঁয়ের লোকেরা ওই পথেই চলে। পথ কভু পথিকহীন থাকে না। একটু আগেই ঝাঁকা মাথায় এক ফেরিওয়ালা চলে গেল আমাদের ছাড়িয়ে। আবার এক মহিলা তাঁর দুটো ছেলেমেয়ে আর একটা ছাগল সঙ্গে করে এগিয়ে আসছেন। রাস্তাটা এখানে বেশির ভাগই শণ, ঘাস আর লতাগুল্মের দখলে। সীমান্তের মতো একটা রেখা ধরে আমরা এগিয়ে যাই। সামনেই কাশফুলের ঝোপে লুটোপুটি খাচ্ছে কয়েকটা দাগি টুনি। ছোট্ট পাখিগুলো এত চঞ্চল যে ফোকাসে পাওয়া মুশকিল। রাস্তার ডানে-বাঁয়ে চোখে পড়ল অসংখ্য বাঘা টিকি বা অঞ্জনা। কসাই নামেই বেশি চেনা। খানিক বাদে কাদা-ডোবায় পাওয়া গেল একটা ছোট মাছরাঙা। পায়ে পায়ে বেশ কাছে পৌঁছে গেলাম। এত কাছে এর আগে এদের পাইনি। কয়েকটা বড় মাছরাঙাও চোখে পড়ল। এখানে একটা ভুল ভাঙল- মাছরাঙারা শুধু মাছ নয়, পোকাও খায়। কালো ফিঙে এত বেশি যে এটাকে ফিঙের রাজত্ব বললেও ভুল হবে না। ফিঙের ছবি আগেও তুলেছি। কিন্তু হলুদ সরিষা ফুলের ক্যানভাসে এই প্রথম।

মাথার ওপর মধ্যদুপুরের কুয়াশাচ্ছন্ন রোদ উড়ে যাচ্ছিল উত্তুরে হাওয়ায়। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছিই। একটা ডোবা শুকিয়ে চৌচির। পাশেই একখণ্ড বীজতলা। গাঢ় সবুজ কচি চারার বীজতলাটি যেন মখমলের সবুজ গালিচা।

শুকিয়ে যাওয়া ডোবা থেকে এঁটেল মাটির কাদা নিতে এসেছে গাঁয়ের মহিলা ও শিশুরা। এই কাদায় তাদের চুলা, ঘরের মেঝে আর উঠোন নিকানো হবে।

কয়েকটি দুরন্ত রাখাল ছেলে বসে ছিল রাস্তায়। ক্যামেরা দেখে সবাই প্রস্তুত। ওরা ধরেই নিয়েছে, আমরা ওদের ছবি তুলতে চাইব। নিষ্পাপ ছেলেগুলোকে হতাশ করতে ইচ্ছে করল না।

মাঠ পেরিয়ে গ্রামে ঢুকলাম। একই রাস্তা; কিন্তু এখানটা বেশ উপযোগী। বোঝা যায়, নিয়মিত রিকশাভ্যান চলে। গ্রামের মুখে পেলাম লাউ আর সিমের মাচা। পাতাকপি, মুলা আর গম ক্ষেত। সিমের মাচায় দুটো তিল মুনিয়া। লিঙ্কন বলল, ওরা তো দলবেঁধে থাকে, এখানে দুটো কেন? ‘দেখো আছে কোথাও’, ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখেই বললাম। অনুমান মিথ্যে হলো না- পাশেই কফি ক্ষেতের পাশে ছোট্ট একটা খড়ের গাদার কাছে পাওয়া গেল পুরো দলটাকে। একটা হলদে পাখি ডেকে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে। তাকেও পাওয়া গেল আমগাছে; কিন্তু বড়ই লাজুক। যেন ভিনপুরুষকে দেখা দিতে নেই। আম-কাঁঠাল আর নানা গাছের ছায়ায় ঢাকা পথ। পায়ের নিচে শুকনো পাতার নূপুর। বাঁশঝাড়ে দোয়েল আর টুনটুনির গান, এখানে-ওখানে গ্রামীণ মহিলাদের কৌতূহলী চোখ আর শিশুদের বিস্ময়ভরা চাহনি পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। মাঝেমধ্যে থামি কাঠশালিক, বুলবুল, কাঠঠোকরা, হাঁড়িচাঁচা কিংবা পাতার আড়ালে চুপটি করে বসে থাকা লাজুক কোকিল বধূটিকে দেখে। কাউকে ডিজিটাল ক্যানভাসে পাই, কাউকে পাই না। একটা বাড়ির পশে এসে থেমে যাই। একটা মাত্র ঘর। এক ফালি উঠোন, রান্নার জন্য একটা চালা। কলাপাতায় ঘেরা কলপাড় রাস্তা থেকেই দেখা যায়। গৃহকর্ত্রী উঠোনে কাঁথা মেলে বসেছেন শেলাই করতে। সুইয়ের ফোঁড়ের দিকে নিবিষ্ট চোখ। মনে হয়তো তাঁর সংসারের সুখ-দুঃখের খতিয়ান। উঠোনের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এটা-সেটা। পাঁচ-ছয় বছরের দুরন্ত ছেলেটা আমাদের দেখছে ভাঙা বেড়াটায় মুখ বাড়িয়ে।

মামুরা পার হয়ে চলে এলাম বাড়িগ্রাম। বাড়িগ্রামের শেষ মাথায় নৌকাঘাট। ঘাটের ওপর রাস্তার ধারে একটা মাথা ভাঙা শ্যাওড়া গাছে স্বর্ণলতায় ফুল ধরেছে। সবুজ পাতারা যেন নোলক পরেছে, অসাধারণ! ছোটবেলায় বেশ ভয় করতাম এই গাছকে। সব কটা শ্যাওড়া গাছকে মনে করতাম ভূত-পেতনি আর শাঁখচুনি্নদের বাড়ি। বাড়িগ্রামের পর চন্দ্রাইল, বড় চন্দ্রাইল- স্থানীয় উচ্চারণে চন্ডাইল- পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ঢুলিভিটার নাগরিক পরিবেশে। অবশ্য বড় চন্দ্রাইল থেকেই টের পাওয়া যায় যান্ত্রিক জীবনের উত্তাপ।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যখন পা দিলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা ১টা পেরিয়ে। একটা অটোরিকশায় করে আমরা চলে এলাম নয়ারহাট। রনি চলে গেল নবীনগর। আর আমরা পায়ে পায়ে নেমে এলাম নৌকাঘাটে। দরদাম করে একটা নৌকা ভাড়া করলাম।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড (ওভারব্রিজের নিচে নামতে হবে)। ভাড়া ৪০-৩০ টাকা। অটোরিকশায় নামাবাজার রূপনগর খেয়াঘাট (বাঁশ পট্টির কাছে)। ভাড়া জনপ্রতি পাঁচ টাকা। খেয়া পার হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে গিয়ে রাস্তায় উঠতে হবে। (বর্ষাকালে গেলে ইঞ্জিন নৌকায় করে নামতে হবে কাইজারকুণ্ডু ঘাটে।) তারপর এক রাস্তা ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে হবে। দূরত্ব ৯-১০ কিলোমিটার। ঢুলিভিটা থেকে শুভযাত্রা ও ডি লিংক বাসে গুলিস্তান পর্যন্ত যাওয়া যায়। নয়ারহাট থেকে সাভার রূপগর ঘাটে নৌকা রিজার্ভ করেও ফেরা যায়। নৌকা ভাড়া ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে। কিছু শুকনো খাবার আর পানি সঙ্গে রাখা ভালো।

বি : লেখক। সূত্র : কালের কণ্ঠ