Home » পপুলার ডেস্টিনেশন » শালবনে সারাদিন

শালবনে সারাদিন

মাসুম সায়ীদ
দেশের মধ্যভাগের বৃহত্তম বন মধুপুরের শালবন। শাল এখানকার প্রধান বৃক্ষ হওয়ায় এর নাম এমন। আমাদের- মানে নেচার স্টাডি অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের এগারজনের দলটার পরিকল্পনা হচ্ছে মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব প্রান্ত- দোখোলা থেকে রাজাবাড়ী- পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া। তারপর বানার নদী পার হয়ে যাব পাহাড় পাবুইজান গ্রামে তারেকদের বাড়ি। তারেক সাভার মডেল কলেজের অফিস পিয়ন। অভিযান শেষে তাদের বাড়িতেই আজ আমাদের খাবারের ব্যবস্থা।

Shalbanসকাল পৌনে ৮টায় একটা হাইএস মাইক্রোবাসে করে আমরা রওনা হলাম সাভার থেকে। পথে জামুর্কিতে কালিদাস মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে সন্দেশ বিরতি আর এলেঙ্গায় সিএনজি বিরতি। দোখোলা বাজারে পৌঁছলাম দুপুর ১২টায়। গাড়ি থেকে নেমে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমাদের পরিকল্পিত যে পথ সেই পথে নাকি সমস্যা আছে। আমাদের পথপ্রদর্শক মঞ্জুর আর পারভেজ। ওরা জানাল গত সপ্তাহে বনের ভেতর দুটো মাইক্রোবাসে ডাকাতি হয়েছে। মনটা দমে গেল তবে হাল ছাড়লাম না। ওরা প্রথমে একটু দ্বিধা করলেও পরে রাজি হয়ে গেল। তারেক মাইক্রোবাস নিয়ে চলে গেল খাবারের আয়োজন দেখতে।

এরই মধ্যে একটা সুযোগ হাত ফসকে গেল। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে দ্বিধান্দ্বদ্বর হিসাব কষ ছিলাম সেখানেই বড় একটা গান্ধি গজারির ডালে লেজ ঝুলিয়ে বসে ছিল একটা শ্যামা। আমাদের ক্যামেরা তখনও ব্যাগ বন্দি। ক্যামেরা বের করার আগেই সোনাবন্ধু দিলেন ছুট। শিট! প্রথম দেখা পাখিটাই ধরা গেল না। সে তো গেলই কিন্তু মনে দিয়ে গেল দাগা। এর আগে কখনই এত কাছে থেকে পাখিটি দেখিনি। প্রথম দেখার ভালোলাগা যাকে বলে; প্রথম প্রেমের বিরহ নিয়ে সারাদিন যে জ্বলতে থাকবে মন সন্দেহ নেই। যাকগে, দ্বিধা ঝেরে আমরা ততক্ষণে উঠে এসেছি মাঠে।

মাঠ পেরিয়ে একটু উত্তরে এগিয়ে গেলে শালবনের সবচেয়ে মনোরম বাংলো ‘চুনিয়া’। ওদিকে যাওয়ার সময় হবে না আজ তাই সোজা পথ ধরলাম। মাঠের কোনায় একটা বড় দাতই গাছ। মগ ডালে বসে আছে মুখপোড়া হনুমান। গায়ের রং সোনালি। দাতই গাছে এখন ফুল ফোটার সময়। নাকফুলের মতো ছোট ছোট ফুল। হলুদ রঙ।

Shalban2এটা পাতাঝরা বন। শীতে ঝরে যায় পাতা। বসন্ত আসে নতুন পাতার গান নিয়ে। গ্রীষ্মে এ বন কিশোরী আর বর্ষায় ভরা যৌবনের যুবতী। এ বছর বৃষ্টিবাদলা শুরু হয়ে গেছে আগে, তাই শালবনে এখনই নেমেছে যৌবনের ঢল। শাল গাছগুলো ছোট। এই বনে মাথা উঁচু করে রাজত্ব করছে গান্ধি গজারি, গর্জন আর চাপালিশ- স্থানীয়রা ডাকে চাম্বল। গান্ধি গজারি গাছে গোটা ধরেছে। দেখতে অদ্ভুত যেন লেজ লাগানো তীরের ফলা! দেখতে দেখতে ঢুকে গেলাম বনের মধ্যে। নানা ধরনের পাখির গান আর ঝিঝি পোকার ডাকে পুরো বন মুখর। প্রথম থেকেই ঝিঁঝিঁ পোকা খুঁজছিলাম নিসর্গীদের দেখানোর জন্য। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একটা গর্জন গাছের গায়ে পাওয়া গেল দু তিনটা। আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়ে তারা চুপ করে গেল। মন্দের ভালো- পালায়নি। নবীন নিসর্গীরা এই প্রথম দেখল এদের।

আমরা ইট বিছানো পথ ছেড়ে দিয়ে হাঁটছি বনের ভেতরের পায়ে চলার পথ ধরে। ঝরা পাতার মাদুর বিছানো সে পথ। পায়ের নিচে শুকনো পাতার আর্তনাদ শুনে ছুট দেয় কোন কোন পাখি। কোনটাকে আবার আগে থেকে দেখে আমরাই সাবধান হয়ে যাই। তারপর সর্ন্তপণে এগিয়ে যাই ক্যামেরা তাক করে। কোনটা ধরা দেয় কোনটা দেয় না। কতবার চলে গেল নীলকান্তমণি চোখের সামনে দিয়ে! সানবার্ড আর শ্যামার মাঝামাঝি আকারের দশ-বারোটা আচেনা পাখির দল আমাদের নিয়ে খেলল কতক্ষণ, তারপর উড়ে গেল। একটা কমলা দামা পথের ওপর পড়ে থাকা পাতার নিচ থেকে পোকামাকর কুড়িয়ে খাচ্ছিল তার সাথে এসে যোগ দিল একটা তিলা ঘুঘু। আমাদের পায়ের শব্দে উড়ে গেল। ওয়িট ওয়িট… শব্দ আসছিল খুব কাছ থেকেই। এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল। একজোড়া Woodshrike বা পাতি বনলাটোরা। ধূসর রঙের পাখি দেখতে বিষণ্ন কিন্তু ডাকটা মধুর। অনেকদূর থেকে ভেসে আসছিল বনমোরগের ডাক। পারভেজ বারবার উৎকর্ণ হয়ে ডাক শুনছিল। পরে বুঝলাম ব্যাপারটা। ও রাতের বেলায় প্রায়ই ফাঁদ পেতে বনমোরগ ধরে। এবারের ডাকটা আসছিল খুব কাছে থেকেই। আমি একটু এগিয়ে যেতেই ও হেসে ফেলল। বলল, ‘লাভ নেই, আপনাকে দেখামাত্র দিবে একছুট’। কথা সে মন্দ বলেনি। সীতাকুণ্ডুতে প্রমাণ পেয়েছি। তাই আর এগোলাম না।

তবে একটা লাভ হলো, নতুন ধরনের একটা পাখি চোখে পড়ল। নতুন মানে আমি এর আগে দেখিনি কখনও। সূর্য ছিল পাখিটার পিছনে তাই রং বোঝা যাচ্ছিল না। ভেবেছিলাম নীলকান্ত। কিন্তু একটু সরে গিয়ে ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম পাখিটার গায়ের রং একদম কালো। ফিঙ্গে আর কোকিলের মাঝামাঝি গড়ন। বুক-মাথা-পেট দেখে মনে হয় ফিঙ্গে কিন্তু লেজ মিলে না। নোমান ভাইও চিনতে পারলেন না।

এদিকে এত উঁচুতে যে ক্যামেরায় ধরা যায় না। এরপর আরো কয়েক জোড়া চোখে পড়ল। একটাকে একটুখানি পেলাম খুব যে ভালো ছবি তা না তবে চেনা পরিচয় করানো যাবে। আমার বারবার মনে হচ্ছিল এটা ফিঙেরই কোনো জাত। বাসায় এসে দেখলাম যা ভেবেছিলাম তাই- কেশরাজ ফিঙ্গে। নীলকান্তকে আরও কয়েকবার দেখা গেল কিন্তু ধরা গেল না; আফসোস! আরো নানা ধরনের পাখির ডাক কানে আসছিল কিন্তু পাখির ছবি তোলার জন্য যে অপেক্ষা আর স্থবিরতার দরকার সে সময় ছিল না। যেতে হবে প্রায় দশ-বারো কিলোমিটার পথ। আমরা তাই চল ছিলাম ক্রমাগত।

দুপুর আড়াইটায় এসে পৌঁছলাম বনের পশ্চিম অংশের ঠিক মাঝখানে। জায়গাটার নাম লহোরিয়া। স্থানীয়রা বলে নহুরা। এখানে বন বিভাগের একটা অফিস আছে। অফিস সংলগ্ন কাঁটাতারে ঘেরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র। দর্শনার্থী আকর্ষণ করার জন্য রাখা হয়েছে কয়েকটা হরিণ। পারভেজ আর মঞ্জু আনন্দের সাথে জানাল সে কথা। হরিণ সুন্দরবনের শোভা। এখানকার বন্দি হরিণ দেখার ইচ্ছা আমাদের নেই।

খাবার পাওয়া যায় বলে এখানে বেশ কিছু বানরের দেখা পেলাম। ছোট-বড়-মাঝারি- সব ধরনের। বেশ নাদুসনুদুস। অফিসের কেয়ারটেকার জানাল বিস্কুট খেতে দিলে আরো বানর আসবে। বিস্কুট সেই বিক্রি করে। দুই টাকার বিস্কুট পাঁচ টাকায়।

এখানে একটা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। মাশুল দিয়ে উঠতে হয়। দোখোলাতেই নিসর্গীরা টাওয়ারে উঠতে চেয়েছিল, এবার সে সুযোগটা দিলাম। আমি নিজেও উঠলাম। বন সবুজ নির্মল। ঝিরঝির বাতাস। আকাশে মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি, চারদিকে পাখি আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক! এ ডাক যেন নবম সিম্ফনিকেও হার মানায়। এমন মধুর সুর এখানে বাজে বলেই কি এ জায়গার নাম লহোরিয়া?

নুমান ভাই উঠেই বললেন- ‘মাসুম ভাই, থেকে যাই এখানে।’ আমি হাসলাম। দশতলা দালানের সমান উঁচু এটা। বাতাসে দোল খায়। সিঁড়িও বেশ খাড়া। আশ্চর্য! শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। এখানে বাঁশ বাগান করা হয়েছে। তাই ছায়াটা বেশ ঘন। ভরদুপুরেও গা ছমছমে অনুভূতি। আমরা আবার পথে নামলাম।

এবার পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন হলো। ঠিক হলো রসুলপুর দিয়ে বের না হয়ে আমরা টেলকি দিয়ে বের হব। তাহলে পূর্বপাশে বেশি বনপথ পাওয়া যাবে। টেলকিতে একটি লোকালয় আছে। মান্দি বা গারোদের পাশাপাশি সাধারণ অধিবাসীরাও আছে। এখানে জমজমাট আবাদ হয়। শালবন হচ্ছে কলা, লেবু আর আনারসের বাগান। দুইশ বছর আগে এ বন থেকে হাতি-গণ্ডার বিলুপ্ত হয়েছে। একশ বছর আগে বাঘ, ত্রিশ বছর হলো মযূর। আর পঞ্চাশ বছর পরে হয়তো বনই থাকবে না(?)।

Shalban3পথের পাশেই কলার কাঁদি কাটা হচ্ছিল। আমরা ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত। কলা খেলে মন্দ হয় না। মঞ্জু ভাইকে বললাম কলা কিনতে। মঞ্জুভাই এগিয়ে গেলেন। মালিক দাঁড়িয়ে ছিলেন। সে আগে থেকেই আমাদের লক্ষ করছিলেন। কলা কেনার কথা শুনে আমাদের সবাইকে ডাকলেন তিনি। হাসি মুখে আমাদের হাতে কলা তুলে দিলেন বেছে বেছে। খেতে খেতে শুনলাম উনি একজন মানবাধিকার কর্মী।

খানিক এগিয়ে গিয়ে পেলাম চায়ের দোকান। হাতপা ছড়িয়ে বসলাম সবাই। ঠাণ্ডা পানির পর গরম চা যেন অমৃত।

পড়ন্ত বিকালে আমরা উঠে এলাম টাঙ্গাইল- ময়মনসিংহ সড়কে। সড়ক পেরিয়ে আবারও ঢুকে গেলাম বনে; একটা পায়ে চলার পথ ধরে। এটা যে একটা পথ আমরা জানতামই না যদি মঞ্জু আর পারভেজ না থাকত। বন আর পাহাড়ের শোভা যে লতাগুল্ম তার অভাব নেই এখানে। সূর্য ঢলে পড়েছে বলে বিকালেই নেমে এসেছে আবছা আঁধার। অন্য এক শিহরণ খেলে গেল গায়। তরুণ নিসর্গীদের এটা প্রথম অভিযান। মুক্তি, স্বাধীনতা, দুরন্তপনার সাথে ক্লান্তি, পরিশ্রম আর গা ছমছম করা শিহরণ তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্য এক জগতে। তাদের এই উদ্বেলতা দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।

বন পেরিয়ে বিশাল মাঠ এখন আনারসের বাগান। ফাঁকা অংশে ছোট-ছোট ছন। সাদা ফুল যেন কাশফুলের ছোট সংস্করণ। বিকালের মিঠেল রোদ আর মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে। দেখে মনে হয় হাত নেড়ে ডাকছে- ‘আয়রে তোরা আয়, ডাকব তোদের কত?’

মাঠের পর একচিলতে বন আর লেবুবাগান পার হয়ে রাজাবাড়ি গ্রাম। বানার নদীর তীর। নদীতে ব্রিজ। ব্রিজের ওপারে তারেকদের গ্রাম। আমরা ব্রিজে উঠলাম। নদীতে এখনো বান ডাকেনি। বৃষ্টির পানি বুকে ধরে নদী তার আব্রæ ঠিক রেখেছে। এ যেন বাসন্তীর জাল পরে ইজ্জত ঢাকবার চেষ্টা। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ উপন্যাসের অনেকখানি জুড়ে রয়েছে এই নদী আর শালবনের দাপটের কথা। নদী, বন, পাহাড়- সব চুরি হয়ে যায় বাংলাদেশে।

খেতে-খেতে সন্ধ্যা নামল। মাগরিবের নামাজ শেষে গাড়িতে উঠলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এলাম রসুলপুর। চাঁদের কৃষ্ণ পক্ষ শুরু হয়ে গেছ। অন্ধকারে ঢেকে আছে বন। অন্ধকার চিরে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল বন। পেছনে পড়ে রইল মধুপুরের ছোট্ট শহর, বাসস্ট্যান্ড, বংশাই নদীর ব্রিজ। ক্লান্তিতে চোখে নেমে আসছে তন্দ্রা। সেই তন্দ্রাকে ছাপিয়ে মনের আয়নায় ভেসে উঠছে বারবার ফেলে আসা সারাটা দিন।
ছবি : ফরিদী নুমান