Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » অনন্য সৃষ্টি রাইক্ষ্যং লেক

অনন্য সৃষ্টি রাইক্ষ্যং লেক

সমির মল্লিক
পাহাড়ের দেশের এই জলাধার দেখতে চাইলে থাকতে হবে ভয়কে জয় করার সাহস।

বৃষ্টির পাহাড়টা একটু অন্যরকম। নিঃশব্দের পাহাড় ঢেকে যায় সাদা মেঘের আবরণে। বৃষ্টি শেষে নীল পাহাড়। বারিধারায় ঝরনা ছুটে চলে চঞ্চল বেগে। কচি পাতায় জমে থাকে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা। মেঘে ঢাকা সবুজ পথ।

Rakkhang
এমনই এক ঘোর লাগা বর্ষায় এবার রওনা হয়েছিলাম, মায়াবীভূমির অন্যদেশ রাইক্ষ্যং লেকের পথে। খুব সকালে বৃষ্টি মাথায় যাত্রা শুরু— রুমার পথে, বান্দরবান সদর থেকে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ। পুরো পথ জুড়েই বৃষ্টি ছিল। পথের একপাশে নয়নাভিরাম অরণ্যভূমি এবং অন্যদিকে উঁচু পবর্তের শ্রেণি।

দুপুরেই আগেই পৌঁছাই রুমা বাজারে। সেখানেই দুপুরের খাওয়া শেষ করে রওনা। ট্র্যাকিং রুটগুলোতে আমরা নিজেরা রান্না করি বলে তিনদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যও কিনে নেওয়া হল।

Rakkhang3

রুমা থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল – গাইড শাহজাহান। সেখানকার থানায় সবার নাম-ঠিকানা লিখে রিজার্ভ চাঁদের গাড়িতে রওনা হলাম বগালেকের পথে। উঁচুনিচু ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পথ ধরে চলেছি বগা লেকের দিকে। কিছুটা বৃষ্টিও ছিল। যেখানে পথ কিছুটা উঁচু আর ভাঙা ঝঁকিপূর্ণ সেখানে যাত্রী নামিয়ে গাড়ি একলা চলে, আর আমরা হেঁটে।

বৃষ্টির দিনে পথ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ থাকে বলে ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে পৌঁছতে হবে বগালেক।

কাঁধে ব্যাগ, পায়ে বুট আর হাতে লাঠি (ট্র্যাকিং স্টিক) হাঁটার পথ শুরু। হাঁটতে হাঁটতেই ঝুপ করে রাত নেমে আসে নিঝুম পাহাড়ের দেশে। রাতে থাকার ব্যবস্থা হল– সিয়াম দি’র কটেজে।

রাতের খাওয়া শেষ করে লেকের পাড়ে বিশ্রামের আয়োজন। বিশাল আকাশের সহস্রাধিক নক্ষত্রের নিচে জেগে থাকি আমরা অভিযাত্রীর দল।

Rakkhang4

খুব সকালে আবার যাত্রা শুরু। গন্তব্য রাইক্ষ্যং লেক। বর্ষায় পাহাড়ের পথ পুরোটা বৃষ্টি মুখর এবং জোঁকে ঠাঁসা। পথের ঝুঁকি কিছুটা বাড়িয়ে দেয় ঝুম বুষ্টি। বড় বড় ফোটার বৃষ্টিতে হাঁটার পথ শ্লথ হয়ে যায়। এরমধ্যেই দল বেঁধে হেঁটে চলেছে অভিযাত্রীরা।

হারমন পাড়ায় প্রথম বিরতি। পাহাড়ের চূড়ার এই পাড়ায় ছুটে আসে কাছে–দূরের মেঘ। এ যেন মেঘের দেশ, ছবির দেশ। বৃষ্টির মধ্যে আবার রওনা হলাম। পাহাড় বেয়ে উঠতে হল সাইকত পাড়ায় । অঝোর বৃষ্টিতে পাড়ার ঘরগুলোও স্পষ্ট দেখা যায় না। এখানকার একটি মাঠ পেরিয়ে চায়ের ছোট্ট দোকান। বৃষ্টিতে ভেজা ঠাণ্ডা হয়ে আসা পথিকের জন্য এক কাপ চা যেন খুবই কাঙ্ক্ষিত। গরম চায়ে নিজেদের উষ্ণ করলাম। চায়ের কাপে যেন মেঘ মিশে যায়! এবার নামতে হবে।

উঁচু পাহাড় থেকে নিচের পৃথিবী দেখলাম এক পলক। পাহাড়ের বুকে চিরে বয়ে চলা পথকে মনে হয়, সবুজের মখমলে একটা সর্পিল রেখা। নামার পথটা কাদায় ভরপুর, যেন হাঁটাও দায়।

Rakkhang5

জুমের পথ শেষ করে পৌঁছাই প্রধান রাস্তায়, যেটা শেষ হয় আনন্দ পাড়ায়। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয় পাহাড়-মেঘের এই দেশে। জুমের ভুট্টা, ব্যাগে বহন করা শুকনা খাবার, আর চা- এই ছিল দুপুরের আহার।

এবার নামতে হল দীর্ঘ পথ। এই পথ মিশেছে রুমা খালে। পাশের এনাউ পাড়ায় যখন পৌঁছাই তখন প্রায় দিনের শেষ বেলা। মুরংদের বসবাস এখানে। রাতে থাকার ব্যবস্থা হল এনাউ পাড়ার কারবারির বাসায়।

বেশ বড় ঘর, পরিষ্কার মাচা, চারপাশে খোলা জানালায় খুব সহজে দেখা যায় কাছের পাহাড়ে জমাট বাধা মেঘ। গোধূলি বেলায় রুমা নদীতে গোসলের প্রশান্তি ভুলিয়ে দেয় সারাদিনের ক্লান্তি!

সন্ধ্যার পরই পরই শুরু হয় রান্নার আয়োজন। রাতের পাহাড় জুড়ে নামে অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টির পরে মেঘহীন আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ, মনে হচ্ছিল চাঁদটা পাহাড়ের চূড়াতেই ঝুলে আছে। জোছনার আলোয় আলোকিত সবুজ পাহাড় ঘেরা এই পাড়া।

Rakkhang6

পরদিন সকালের ঘুম ভাঙে বৃষ্টি আর স্রোতস্বিনী নদীর কলকল শব্দে। বৃষ্টি আর মেঘের অরণ্যের পথে পথিক এবার। কখনও কোমর আবার কখনও বা বুক সমান পানিতে পাড়ি দিলাম রুমা খাল। এরপর অনেকটুকু পথ হেঁটে উঠতে হয় জুমের রাস্তা ধরে।

ঝিরি আর পাহাড়ের পথ মাড়িয়ে আমরা এখন চূড়ায়, যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়- উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে দেশের অন্যতম বড় জলাধার রাইক্ষ্যং লেক, যার ডাক নাম পুকুর পাড়া।

এত উঁচু থেকে দেখছিলাম বলে মনে হচ্ছিল- আকাশে উড়ে যাওয়া কোনো পাখির চোখে নীচের পৃথিবী দেখছি। নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি স্বচ্ছ লেকের পানিতে যেন জলের বুকে জেগে উঠেছে অন্য এক পৃথিবী।

ঘুরে ঘুরে পুরোটা লেক দেখলাম, স্থানীয়দের বানানো ভেলায় ভাসলাম লেকের মাঝখান পযর্ন্ত, লোভ সামলাতে না পেরে রাতে চাঁদের আলোয় লেকের শীতল জলে সাঁতার কাটলাম অনেকক্ষণ।

Rakkhang7

লেকের দু’পাশে দুটো পাড়া, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। রাতে থাকা এবং খাওয়ার আয়োজন হল পুকুর পাড়ায় সুজন দা’র কটেজে। জোছনায় ঢেকে আছে রাইক্ষ্যং লেক। অদূরের পাহাড়গুলো সাদা কুয়াশার আবরণে ঢাকা। নৈঃশব্দের রাজ্য নেমে এসেছে দুইপাড়ের পাড়াগুলোতে।

পরদিন ফেরার পালা- বৃষ্টিহীন সকালের উজ্জ্বল আকাশ। রওনা পুকুর পাড়া থেকে, পাহাড়ের পথ ধরে ওঠা আর বারবার পেছন ফিরে দেখা দূরের অরণ্যভূমির জলাধারের দিকে প্রকৃতির অনবদ্য সৃষ্টি রাইক্ষ্যং লেক।

Rakkhang8

যেভাবে যাবেন

প্রথমে যেতে হবে বান্দরবান। ওখান থেকে বাস করে রওনা হয়ে রুমা বাজার। রুমা বাজার থেকে রিজার্ভ চাঁদের গাড়ি করে অথবা হেঁটে বগালেক পযর্ন্ত। সেখান থেকে হেঁটে হারমন পাড়া, সাইকত পাড়া, আনন্দ পাড়া হয়ে পুকুর পাড়া বা রাইক্ষ্যং লেক পৌঁছানো যাবে।
যেখানে থাকবেন

বান্দরবানের পাড়াগুলোতে আদিবাসীদের কটেজেগুলোতে থাকা যায়। ওখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। তবে কিছু শুকনা খাবার নিজেরাই নিয়ে নিন।

Rakkhang9

প্রয়োজনীয় তথ্য

রাইক্ষ্যং লেকের পথটা মূলত ট্রেকিং নির্ভর। প্ল্যাস্টিকের নরম জুতা, ওরালস্যালইন, প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ পত্র, ওডামস বা মশা-পতঙ্গ নিরোধক ক্রিম, হালকা খাবার, পর্যাপ্ত খাবার পানি সঙ্গে রাখুন।

রাইক্ষ্যং লেক ভ্রমণে তথ্য ও সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন ০১৫৫৬-৭১০০৪৩,০১৮১৫-৮৫৬৪৯৭।

Rakkhang10

খেয়াল রাখবেন

মানুষ প্রকৃতির কাছে যাবে তবে প্রকৃতি যাতে তার মতো করে সুন্দর থাকে সেই দায়িত্বটাও মানুষের হাতে। ব্যবহার করা কোনো প্রকার পলিথিন, পানির বোতল, প্যাকেট, ময়লা ইত্যাদি বনের ভিতরে ফেলবেন না। সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন অথবা পুড়িয়ে ফেলবেন।

ভালো থাকুক অরণ্য, সুন্দর থাকুক প্রকৃতি।
ছবি: লেখক। সূত্র : বিডিনিউজ