Home » বাছাইকৃত » অরণ্য দ্বীপের হাতছানি

অরণ্য দ্বীপের হাতছানি

মাসুম সায়ীদ
‘এইখানে নিরঞ্জনা নদী ছিলো
এই ঘাটে হাজার গৌতম
স্লান করে শুদ্ধ হয়েছেন।
নদী আছে ঘাট আছে
সেই শুদ্ধ জলের অভাব।’
-আহসান হাবীব

Manpura

পড়ন্ত বিকেল। ক্লান্ত সূর্য হারিয়ে যেতে বসেছে দালান-কোঠার আড়ালে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ‘ফারহান-৩’-এর ডেকে। বুড়িগঙ্গা এখন সত্যি বুড়ি। পানিকে আর পানি বলে চেনা যায় না, নদীকে নদী। তিনতলা লঞ্চ। পানি থেকে ছাদ অনেকটাই উপরে, তার পরও টেকা দায় দুর্গন্ধে। নদী নয়, যেন পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেন। তারপরও নদী। সদরঘাট- ঢাকার প্রাণ। রাজধানীর দক্ষিণ প্রবেশদ্বার। অসংখ্য ডিঙ্গি ভাসছে নদীতে। শক্ত হাতে বৈঠা ধরে মাঝিরা খেয়া পারাপার করছে। কালো পানিতে সাদা ফেনা তুলে সমুদ্রমুখী লঞ্চ-ট্রলার আসা যাওয়া করছে। সূর্যের রক্তিম আভা পিছলে পড়ছে পানিতে। যাত্রীদের ব্যস্ততা, কুলিদের চিৎকার-চেঁচামেচি, মাঝিমাল্লাদের হাঁকাহাঁকির মাঝেই সূর্যের অস্তরাগ কালোপানির মলিনতা আর দুর্গন্ধকে আড়াল করে দিল মন থেকে। ক্যামেরা হাতে আমরা মগ্ন হয়ে রইলাম; আর এই ফাঁকে হুইসেল বাজিয়ে লঞ্চ নোঙর তুলল। আমাদের গন্তব্য নিঝুম দ্বীপ।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। বারো ব্রাজকের দশজন যাচ্ছি ঢাকা থেকে। বাকি দুজনের দেখা মিলবে হাতিয়ায়। চিটাগাং থেকে আসছে তারা। আমাদের কেবিনগুলো পাশাপাশি। সামনে এক চিলতে বারান্দা। সেখানেই জমায়েত হলাম সবাই। কেক কাটা হবে। সাইদ ভাইয়ের জন্মদিন। তবে তিনি কিছু জানেন না। আমাদের ষড়যন্ত্রে টাসকি মেরে থাকলেন কিছুক্ষণ। কেকের পর চা পর্ব। জমে উঠল আড্ডা। রাত ৯টায় পাত পড়ল রাতের খাবারের। দলনেতা ফরিদী নুমান ভাই, কোয়ার্টার মাস্টার- মানে ম্যানেজার মোস্তাফিজ ভাই। দুজনের যুক্ত বিবৃতি- ‘কাল সারাদিন ছুটতে হবে একটানা; সুতরাং রাতজাগা বন্ধ।’

নুমান ভাই আর আমি এক কেবিনে। দুজনেরই রাতজাগা স্বভাব। কেবিনে এসে জুটলেন আর এক নিশাচর শামীম ভাই। রাত সোয়া একটা বাজলে আমাদের ঘুমের কথা মনে পড়ল।

ভোর হলো মনপুরায়। সিনামার আগেই ‘মনপুরা’ নামটাকে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন বাংলার পিকাসো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার চিত্র ‘মনপুরা-৭০’ এঁকে। লঞ্চ এখানে আধঘণ্টার মতো দেরি করবে। আমরা নেমে পড়লাম ভাঙনমুখর দ্বীপটায়। জয়নুলের ছবিটাই ঘুরেফিরে আসছিল মনে। কিন্তু এখানকার মানুষজন দিব্যি ভুলে গেছে সেই দুঃসহ স্মৃতি। সকালের নাস্তাটা এই ঘাটেই সেরে নিলাম আমরা। সাথে মহিষের ঘন দুধের চা। লঞ্চ ছাড়ল। সকালের হিমেল বাতাস, নরম আলো, মনপুরার নারিকেল গাছে সবুজ পাতার ঝিলিক- ভালোই লাগছিল রোদচশমা ছাড়া মাস্টার ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে।

Manpura2

তমরুদ্দি ঘাটে নামলাম আটটার পর। ঘাটে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন ওছখালির রাজু ভাই। এখন থেকে তার কাঁধেই আমাদের ভর। তার নেতৃত্বে স্কুটারে ওছখালি, তারপর খোলা নছিমনে মাইজ চর, সোনাদিয়া, জাহাজমারা পার হয়ে এলাম চর মোক্তারিয়া। মোক্তারিয়া চ্যানেল পার হলেই নিঝুম দ্বীপ।

চ্যানেলে তখন জোয়ারের দাপাদাপি। টালমাটাল একটা নৌকায় বৈতরণী পার হলাম। নিঝুম দ্বীপের একমাত্র সড়ক এখন পাকা। পিচ ঢালা। এর কৃতিত্ব অনেকটাই মোস্তাফিজ ভাইয়ের। দিগন্ত টিভির দুরন্ত সংবাদের প্রযোজক থাকাকালে নিঝুম দ্বীপের খুটিনাটি সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরেছিলেন কয়েকটা পর্বে। সেই সুবাদে বেশ কিছু উন্নয়ন ঘটেছে। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তার পশ্চিম প্রান্তে নামার বাজার আর মাঝে বন্দরটিলা। জনশূন্য বিশাল এই দ্বীপ এক সময় শুধু মৌসুমি বাতাইন্যাদের আস্তানা ছিল। এখন ৬৫ হাজার মানুষের মুখর এক জনপদ। ম্যানগ্রোভ জঙ্গল হরিণ আর শিয়ালের আস্তানা। সদ্য জেগে ওঠা চরে বিচিত্র পাখি। একমাত্র পথটার যানবাহন হলো মোটরসাইকেল আর রিকশা। আমরা রিকশায় করে বন্দরটিলায় এলাম। মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টার- যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবেই নির্মাণ করা- কিছু দোকানপাট আর চেয়ারম্যান সাহেবের একটা গেস্টহাউস নিয়ে বন্দরটিলা বাজার। আমরা এই গেস্টহাউসেই উঠলাম দুপুর ১টায়।

বিকাল ৩টার মধ্যেই আবার বেরিয়ে পড়লাম সবাই। গন্তব্য হরিণের স্বর্গরাজ্য চৌধুরীর খাল। সূর্যের আলো উজান ঠেলে আমরা চললাম পায়ে হেঁটে। দুই কিলোমিটারের মতো গিয়ে রাস্তা ছেড়ে ধরলাম বনের পথ। বনের প্রধান গাছ কেওড়া আর গেওয়া। গোলপাতা আর টাইগার ফার্ন থাকলে একে দিব্যি সুন্দরবন বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। মাটিতে ঝরাপাতার পুড়ো কার্পেট। যত চেষ্টাই করি না কেন, পা ফেললেই বেজে উঠছে নূপুর। সুরটা শুনতে মন্দ না কিন্তু ওই শব্দে হরিণেরা পালাবে। হলোও তাই। একটা ফাঁকা জায়গায় একদল হরিণ দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে দিল ছুট।

চৌধুরীর খাল যাচ্ছি শুনে একটি কিশোর- নাম ইরাক- এগিয়ে এলো স্বেচ্ছায়। নৌকা ছাড়া যাওয়া সম্ভব নয় শুনে নৌকা আনতে বললাম ওকে। ভাটার সময় এখন। নৌকায় উঠতে হলো কাদার পাহাড় ঠেলে। বেলা থাকতে চৌধুরীর খালে পৌঁছানো সম্ভব না। তাই নামলাম কাছের মাঠটাতে। মাঠের ঘাস শীতঘুমে বিবর্ণ। হাওয়ার মিঠাইয়ের মতো ফুরিয়ে গেল বিকাল। হরিণের পাল এল না।

আমরা গোল হয়ে বসলাম মাঠের মাঝখানে। নিস্তরঙ্গ খাড়ি। ওপারে আর একটি চর। তার গাছগাছড়ার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সূর্য। এদিকে পুব আকাশে চন্দনের ফোঁটার মতো উঁকি দিচ্ছে চাঁদ। ধীরে ধীরে চাঁদ উঠে এলো গাছগাছালির ওপর। নুমান ভাই মনোপডে ক্যামেরা বসিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন চাঁদসুন্দরীর রূপ ধরতে। সাথে আমিও। শামীম ভাই গান ধরলেন। তাকে ঘিরে অন্যরা। রাত ৮টার পর ভাঙল আসর। কাঁদার পাহাড় ভেঙে উষ্ণ বালুচর দলে ফিরে এলাম নামর বাজার। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে বন্দরটিলায়।

পরদিন ফজরের নামাজ পড়েই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। শুনেছি দমার চরে বিলুপ্তপ্রায় গাঙচষা পাখি পাওয়া যায়। ঘাট থেকে নৌকায় আধঘণ্টা লাগল দমার চরে আসতে। দুধে ভেজানো উল্টানো চিতই পিঠার মতো জেগে উঠেছে এই চর। ছন জাতীয় এক ধরনের ঘাস সবে মাথা তুলেছে মাটির ওপর। আমরা চরে নামলাম। সুচালো ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে অনেকের পা ছড়ে গেল। দুটো গাঙচষা এফ-১৬ বিমানের মতো ড্রাইভ দিয়ে পানির সমান্তরালে নেমে ঠোঁট দিয়ে পানি চিরে চলে গেল অনেকদূর। তারপর ফিরে এসে শুরু করল আবার আগের জায়গা থেকেই। দেখে ব্যথা ভুলে গেল সবাই। অনেকক্ষণ ধরে চলল এই খেলা। একসময় ওদের আহারপর্ব সাঙ্গ হলো। উড়ে চলে গেল উত্তরে।

আমরাও চললাম ওই উত্তরেই; গাঙচষা জুটিকে অনুসরণ করে। চরের উত্তর প্রান্তে নদীর বাঁকে অসংখ্য পাখি বসে আছে। প্রথমে ভেবেছিলাম গুলিন্দা। কাছে আসতেই চোখ ছানাবড়া! গুলিন্দাও আছে, তবে সবচেয়ে বেশি গাঙচষা। কয়েকশ তো হবেই। নৌকার শব্দে পাখি উড়ল। অভূতপূর্ব এক দৃশ্য!

দমার চরের পাঠ চুকিয়ে এসে নোঙর করলাম কালাম চরে। বসতিহীন এক নির্জন চর, কেওড়া গাছে ভরা। থেকে যেতে লোভ হয়।
এখান থেকে মোক্তারিয়া চ্যানেল ধরে আমরা রওনা হলাম সোজা উত্তরে। গন্তব্য পশ্চিমের নামার বাজার। পথে দেখলাম- শরালি, পানকৌড়ি, বক, চেগা, গুলিন্দা, কাদাখোঁচা, জলকইতর- আর নাম না জানা অসংখ্য জলচর পাখি- নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কোনো কোনো চরে মহিষের পাল। অনেক দিন পর দেখলাম পালের নাও। লাল-সবুজ আর হলুদ রঙের পাল তুলে একলা মাঝি ভাসিয়েছে ডিঙ্গি।

Manpura3

রোদ খানিকটা পড়ে এলে নামার বাজার ঘাট থেকে আমরা আবার নৌকা ভাসালাম। যাব চর-কবিরা। আধঘণ্টা পর চরে নৌকা ভিড়ল। নরম বালিতে পা দিতেই শিহরণ খেলে গেল সারা গায়। নির্জন দ্বীপ বলে পাখিদের স্বর্গরাজ্য এটা। প্রচুর হুদহুদ পাখি এই চরে। দ্বীপের দক্ষিণ তীরটি সাগর সংলগ্ন। জোয়ার জল, ঢেউয়ের ধাক্কা আর ঝড়-তুফানকে বুক পেতে নিতে হয় এখানকার গাছগুলোকে।

হরিণ না দেখে ফেরত যাওয়া মেনে নিতে পারছিলেন না দলনেতা। তাই শেষ চেষ্টা করে দেখবেন বলে জানালেন। নামবেন আবার চৌধুরীর খালে। ততক্ষণে ভাটা শুরু হয়ে গেছে। তাই খালের ভেতর নৌকা নিয়ে যেতে রাজি হলো না মাঝি। আমাদের সে নামিয়ে দিল খাড়ি সংলগ্ন চরে। চরের তিন দিকে খাল। খালে পানির চেয়ে কাদা বেশি। আর এক দিকে খাড়ি। খাল পার না হয়ে ফেরার উপায় নেই। যা হবার হবে- একে একে খালে নেমে গেলাম সবাই। তারপর পায়ে পায়ে বিশাল মাঠটা পার হয়ে চলে এলাম বনের ধারে। বসে থাকলাম সন্ধ্যা-অবধি। কোথায় হরিণ?

আমাদের সাথে ফেরার নৌকা নেই। এখন ভাটার সময়। জোয়ার কখন আসবে কে জানে? জোয়ার এলেও এই রাতের বেলা অন্য কোনো নৌকা আসার সম্ভাবনা কম। এইখানে আবার ত্রাণকর্তা হলো ইরাক। চর-কবিরা যাওয়ার পথে সঙ্গী হয়েছিল স্বেচ্ছায়। সে পানি আর কাদাজল ভেঙে গেল নৌকার খোঁজে। দুজন জেলেকে বলে কয়ে নিয়ে এল রাত ৮টার পর। নিঝুম দ্বীপের শেষ খেয়া রাত ৯টায়। আজ রাতেই যদি আমরা নিঝুম দ্বীপ না ছাড়ি তাহলে তমরদ্দী ঘাট থেকে কাল লঞ্চ ধরা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। পরবর্তী ঘটনা ঘটল খুব দ্রুত। আমরা খেয়া পার হতে পারলাম।

মোক্তারিয়া চরের চেয়ারম্যানের ঘাটে খেয়া নৌকা থেকে নেমে পেছন ফিরে তাকালাম। নিঝুম দ্বীপ এখন সত্যি সত্যি নিঝুম। নিঝুম এই দ্বীপটাকে চাঁদবুড়ি ঢেকে রেখেছে তার রূপালি আঁচলে পরম মমতায়।