Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » বাংলাদেশের বিস্ময়!

বাংলাদেশের বিস্ময়!

মুনির হাসান
কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি কীর্তিমান বিজ্ঞানী তপন চক্রবর্তীর বয়স প্রায় ৬৫ বছর। বিশ্বের সাতটি মহাদেশে ম্যারাথন দৌড় শেষ করেছেন তিনি। দৌড়েছেন অ্যান্টার্কটিকার বরফ-রাজ্য, দুর্গম এভারেস্ট কিংবা আফ্রিকার গহিন জঙ্গলেও।

Tapon

১০ মার্চ, ২০১৪: অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে তপন চক্রবর্তী। ছবি: ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে

একজন দূরপাল্লার দৌড়বিদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি দৌড়ের ওপরেই আছেন। সাত মহাদেশেই অন্তত একটি করে ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন। ২৯টি ম্যারাথনের প্রতিটি সফলভাবে শেষ করেছেন। ভাবছিলাম, হয়তো একজন দশাসই চেহারার কাউকে দেখব। গাড়ি যখন ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে ঢুকেছে, তখনো জানতাম না আমার জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে। লবি থেকে ফোন করতেই পাশের ঘর থেকে একহারা গড়নের ছোটখাটো একজন বের হয়ে এলেন! মোটেই কোনো বিশাল অ্যাথলেট মনে হলো না। তারও চেয়ে বড় কথা, ওনার বয়স যে প্রায় ৬৫ তা মনেই হচ্ছে না! কিন্তু হঁ্যা। তপনতোষ চক্রবর্তী, (সবার কাছে যিনি পরিচিত তপন চক্রবর্তী নামে) বয়স সত্যিই ৬৫ বছর!

মানুষ বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে

এই বয়সে এত দৃঢ়তা ও শক্তি কোথা থেকে পান?

‘যখন ছোট ছিলাম। চাঁদপুরের মতলবে আমাদের বাড়ির চৌকাঠে চক দিয়ে লিখেছিলাম, মানুষ বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে (ম্যান ক্যান ওয়ার্ক ওয়ান্ডার)। লেখাটা শুধু লেখার জন্য লিখিনি, বিশ্বাস থেকেই লিখেছি।’ তপন বললেন, আস্তে আস্তে। কিন্তু দৃঢ়চিত্তে। ১১ বছর বয়সে আক্রান্ত হয়েছিলেন কলেরায়। তবে সেবারও হার মানেননি।
সংস্কৃতির শিক্ষক অশ্বিনী কুমার চক্রবর্তী ও হাস্য বালা চক্রবর্তীর তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার ছোট তপনের জন্ম ১৯৫০ সালে। বাপের বাড়িতে লেখাপড়া না করলেও বিয়ের পর হাস্যবালা পড়াশোনা শেখেন। শেখেন সেলাই এবং দাইয়ের কাজও। কারণ, লক্ষ করেছেন গ্রামের মেয়েদের কেউ লেখাপড়া শেখায় না কিংবা সন্তান প্রসবের সময় ধাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেই মায়ের কাছ থেকে সেলাই ও ছবি আঁকা শিখেছেন তপন। আর বাবা নিজে গান লিখে সুর করে তপনকে শোনাতেন।

Tapon2

২০১১: বস্টন ম্যারাথনে

হঠাৎ করে বাবার মৃত্যুতে বিপদে পড়ে যায় পুরো পরিবার। কিন্তু হার মানেনি। ১৯৬৫ সালে মতলব হাইস্কুল থেকে এসএসসিতে তৃতীয় ও ১৯৬৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসিতে দ্বিতীয় হন। তারপর পড়তে আসেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে। ১৯৭১ সালে মাসহ ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। ফিরে এসে ১৯৭২ সালে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন সেখানে। ১৯৭৪ সালে ফরাসি বৃত্তি নিয়ে প্যারিস যান পড়তে। পরের বছর, প্যারিস থেকে কানাডার ওয়াটার লু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান মাস্টার্স ও পিএইচডি করতে। ১৯৮০ সালে যোগ দেন কানাডার সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি ইম্পেরিয়াল ওয়েলের গবেষণা বিভাগে। এই কোম্পানিটি উত্তর আমেরিকায় এক্সন মোবিল নামে পরিচিত।

যেভাবে শুরু
১৯৯৬-৯৭ সালে দুই বছরের জন্য হিউস্টনের ল্যাবে কাজ করেন। সেখানে দুজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা হয়, যাঁরা ম্যারাথন দৌড়ান। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তপন ফুটবল ও ভলিবল খেলতেন। কিন্তু ম্যারাথন দৌড়ানোর কথা ভাবেননি কখনো। হিউস্টন থেকে ফেরার পর ক্যালগারিতে একটা নতুন বাড়িতে ওঠেন। খেয়াল করে দেখলেন, তাঁর সহকর্মীদের কেউ কেউ সকালে দৌড়ে অফিসে আসেন। ভাবলেন, তিনিও সেটি করবেন।

পাঁচ কিলোমিটার দূরের বাসা থেকে একদিন দৌড়ে অফিসে এলেন। তেমন একটা সমস্যা বোধ হলো না। ভাবলেন, নতুন একটা লক্ষ্য ঠিক করা দরকার। ঠিক করলেন, ম্যারাথন দৌড়াবেন। যে ব্যায়ামাগারে তিনি মাঝেমধ্যে যেতেন, সেখানকার প্রশিক্ষক তাঁর লক্ষ্যের কথা শুনে হেসে বললেন, ‘তুমি ম্যারাথন দৌড়াবে? তাহলে ম্যাগাজিন পড়বে কে?’ কিন্তু তপন গায়ে মাখেননি সেসব।
২০০০ সালের ৭ মে ভ্যানকুবার ম্যারাথনে দৌড়ানোর জন্য ৭০ ডলার খরচ করে নিবন্ধন করে ফেললেন, আর প্রতিদিন একটু একটু করে প্র্যাকটিসের চৌহদ্দি বাড়ানো শুরু করলেন। তারপর ঠিক ঠিক সফলতার সঙ্গে শেষ করলেন জীবনের প্রথম ম্যারাথন। সেই শুরু। তারপর দুর্গম এভারেস্ট থেকে অ্যান্টার্কটিকা কিংবা আফ্রিকার জঙ্গল, তপন ম্যারাথন দৌড়ে জয় করেছেন বিশ্বের সব কটি মহাদেশ।

এভারেস্ট থেকে অ্যান্টার্কটিকা
তপন চক্রবর্তী এখন ম্যারাথন ম্যানিয়া ক্লাবের সদস্য। তিনি এথেন্স, প্যারিস, বার্লিন, আমস্টারডাম, বার্সেলোনা, লন্ডন, বোস্টন, নিউইয়র্ক ও শিকাগো ম্যারাথন শেষ করেছেন। ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকার প্রায় সব কটা উল্লেখযোগ্য দৌড়ে অংশগ্রহণের রেকর্ড। তাঁর অন্যতম কঠিন লড়াই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার এভারেেস্ট।

ঢাকায় তপন চক্রবর্তী। ছবি: প্রথম আলো

ঢাকায় তপন চক্রবর্তী। ছবি: প্রথম আলো

লুকলা থেকে মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে পৌঁছান নয় দিন হাইকিং করে। তারপর বেস ক্যাম্প থেকে নামসে বাজারে আসেন দৌড়ে! দক্ষিণ আফ্রিকায় দৌড়েছেন হাতি, গন্ডার, জলহস্তী, সিংহ ও চিতাদের অভয়ারণ্যের মাঝ দিয়ে!

বিশ্বের সব বড় ম্যারাথন দৌড়েই শেষ করার একটা সর্বশেষ সময় থাকে। সে সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারলে একটা মেডেল পাওয়া যায়। সব বারই তিনি সেটা পেরেছেন।
রাশিয়ার একটি অভিযাত্রী জাহাজে করে পৌঁছান অ্যান্টার্কটিকায়। বরফ-রাজ্যে এমন দীর্ঘ দৌড় কীভাবে সম্ভব? তপন মানলেন কাজটা সহজ ছিল না।

‘ওটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, কানাডায় বরফ আর তুষারের ওপর অনুশীলন করেছি, কিন্তু এখানে এসে জানলাম, অর্ধেক পথই দৌড়াতে হবে পিচ্ছিল কাদার মতো বরফের ওপর দিয়ে।’ বললেন তপন। ২০১৪ সালের ১০ মার্চ ভোর তিনটার সময় দৌড়বিদদের চেয়ে বেশি নার্ভাস ছিলেন তাঁদের কোচ। ছয় কিলোমিটার দৌড়ের পরেই তপনের মাংসপেশিতে সামান্য টান লাগে। ‘কিন্তু আমার জন্য থামা সম্ভব ছিল না। কারণ, আমি থামতে শিখিনি।’ তারপর শেষে মজা করে বললেন, ‘অ্যান্টার্কটিকায় আমার দৌড়ের প্রধান দর্শক ছিল পেঙ্গুইন আর সিল মাছের দল।’

অ্যান্টার্কটিকায় দূরপাল্লার দৌড়ের শেষ প্রান্ত ছোঁয়ার আনন্দ ভাগাভাগি

অ্যান্টার্কটিকায় দূরপাল্লার দৌড়ের শেষ প্রান্ত ছোঁয়ার আনন্দ ভাগাভাগি

গ্রিসের বিপদ
এথেন্স ম্যারাথনে গিয়ে দৌড়ানো ছিল সারা জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেখানে গিয়েই বিপদের মুখে পড়লেন তপন। বেঁকে বসল শরীর। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে গ্রিসে গিয়ে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হলেন তপন। চার দিন জ্বরের পর ম্যারাথনের দিন ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে শুনলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে এক তরুণ ম্যারাথনবিদ মারা গেছেন বাছাইয়ের সময়। শঙ্কা তো খানিক লাগেই।

২০১৩: তেনজিং এভারেস্ট ম্যারাথনে দৌড়ের ফাঁকে একটু বিশ্রাম

২০১৩: তেনজিং এভারেস্ট ম্যারাথনে দৌড়ের ফাঁকে একটু বিশ্রাম

‘সকালে বাসে করে ম্যারাথনের পথে রওনা দেওয়ার সময় দেখলাম, আমার স্ত্রী মাধুরী আমাকে ভিডিও করছে। আমার একবার মনে হলো, আজকেই মনে হয় শেষ দিন। যাই হোক, শুধু মনোবল সম্বল করে ১৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় দৌড়ালাম। চার ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে দৌড় শেষ করলাম।’

তেল তরলীকরণে একজীবন
মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ তেলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার তেলের একটা বড় পার্থক্য আছে। মাটির এক হাজার ৫০০ ফুট গভীরে কালো বালুর মধ্যে তেল থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সান্দ্রতা খুবই কম। বলা যায় সেটি থাকে তরল। পাইপ বসিয়ে দিলেই মোটামুটি উঠে আসে। কিন্তু কানাডার তেলকূপগুলোতে যে তেল, সেটির সান্দ্রতা কখনো কখনো প্রায় এক লাখ সেস্টিমিপস পর্যন্ত হয়। কাজেই সেখান থেকে তেল তুলে আনার খরচটা যেমন বেশি, তেমনি সেটি কঠিনও।

———————————————————-

জামিলুর রেজা চৌধুরী

জামিলুর রেজা চৌধুরী

তপন চক্রবর্তী অত্যন্ত সফল
জামিলুর রেজা চৌধুরী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

বিষ্ণুপুর গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন তিনি। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তপন চক্রবর্তী অত্যন্ত সফল। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় তেলকে খনি থেকে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ এবং দূরবর্তী অঞ্চলের গ্যাসকে স্থানান্তরের জন্য তরল হাইড্রোকার্বনে পরিণত করার কৌশলসংক্রান্ত ৩৮টি পেটেন্ট আছে তাঁর। এমনকি ছেলের সঙ্গে যৌথভাবে ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারেও তাঁর একটি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে। বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের অসচ্ছল শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তিও প্রচলন করেছেন তপন চক্রবর্তী।
———————————————————-

তপন চক্রবর্তী বিশ্বাস করেন, সমস্যার আশপাশেই প্রকৃতি তার সমাধানটা রেখেছে। তিনি উদ্ভাবন করেন একটা নতুন দ্রাবক। এটি তেল–মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে তেলের সান্দ্রতা এত কমে যায় যে তখন সেটিকে অনায়াসে তোলা যায়।

‘আমার একটা বিশেষ গুণ বলতে পারো। আমি কোথাও নতুন কিছু দেখলে সেটি অন্য কোথায় কাজে লাগানো যেতে পারে, তা সহজে বের করতে পারি।’ হাসতে হাসতে বললেন এখন পর্যন্ত মোট ৩৯টি পেটেন্টের অধিকারী এই বিজ্ঞানী। যার মানে, ৩৯টি বিশেষ সেবা ও পন্যের স্বত্ব আছে এই কীর্তিমান বিজ্ঞানীর ঝুলিতে।

তবুও গবেষণা
প্রকৌশলী পুত্র ও চিকিত্সক কন্যার জনক-জননী তপন ও মাধুরী চক্রবর্তী থাকেন ক্যালগারিতে। ইচ্ছা আছে বাংলাদেশের আর্সেনিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার। এখন তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তপন চক্রবর্তী তাঁর প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ থেকেই এ শিক্ষা পেয়েছেন। ‘আমি আমার সব উদ্ভাবনকেই মনে করি একটি সুন্দর গান বা কবিতার মতো।’ নিজেকে একজন ‘বিশেষজ্ঞ’ মনে করেন না।

‘কোনো কিছু আবিষ্কার করতে হলে কখনো বিশেষজ্ঞ হওয়া যাবে না। বরং ভুল করতে হয়, খোলা মনের অধিকারী হতে হয়।’

তপনকে যতই জানি, ততই বিস্ময়কর লাগে। ফেরার সময় তাঁকে একটা প্রশ্ন না করে পারি না।

‘দেশে দৌড়াবেন না?’ মাতৃভূমিই বাকি থেকে যাবে, সেটা কেমন করে হয়?

প্রায় তিন ঘণ্টার আলাপচারিতা শেষে বিদায়বেলার সময় তিনি জবাবটা দিলেন, ‘দেশে তো সে রকম ম্যারাথন হয় বলে শুনিনি। সময় আর সুযোগ হলে ঠিকই দৌড়াব।’ সূত্র : প্রথম আলো