Home » বাছাইকৃত » নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে বাংলাদেশ-ভারত

নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে বাংলাদেশ-ভারত

এ ইতিহাস সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব আর মানবতার ইতিহাস। ৬৮ বছর ধরে যাঁদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না, ছিল না পরিচয়, সবাই যাঁদের চিনতো ছটিবাসী হিসেবে – তাঁরা তাঁদের জাতীয়তার পরিচয় পাবেন। নাগরিকত্বের পরিচয় দেবেন গর্বে বুক ফুলিয়ে।

Sitmohol

শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’ আর সেখানকার নাগরিকদের পরিচয় হবে বাংলাদেশি। ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলও লীন হবে ভারতে, সেখানকার নাগরিকরা হবেন ভারতীয়। এই শুভক্ষণের অপেক্ষায় থাকা ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মাইনুল হক বলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের মূহূর্ত। আমি, আমরা, সব ছিটমহলবাসীরা এক মুক্ত জীবনের স্বাদ নিতে যাচ্ছি। এ যে কত আনন্দের তা শুধু অনুভূতিতেই ধারণ করা যায়, প্রকাশ করা যায় না।’

বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে দুই দেশের হাই-কমিশনাররা বৃহস্পতিবারই তেজগাঁওয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে ৩০টি গুচ্ছ মানচিত্রে সই করেন। এর মাধ্যমে কেবল মুহুরির চরের দুই কিলোমিটার এলাকা ছাড়া দুই দেশের মধ্যে এক হাজার ১৪৪টি মানচিত্রে সই হয়। ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নতুন করে চিহ্নিত এ সব সীমান্তে সীমানা পিলার বসানোর কথা।

ঢাকায় পাওয়া খবরে জানা গেছে, দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই-কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী গুচ্ছ মানচিত্র হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এর মধ্যে দিয়ে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।’ অন্যদিকে ভারতীয় হাই-কমিশনার পঙ্কজ শরণ একে উল্লেখ করেছেন ‘এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে।

Sitmohol2বাংলাদেশের মানচিত্রের পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভূখণ্ডের পরিমাণ বাড়বে এবং বাড়বে নাগরিকের সংখ্যাও। বাংলাদেশের পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নিলফামারী – এই চার জেলায় ভারতের ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। এ ছিটমহলগুলোতে ২০১১ সালে একটি যৌথজরিপ চালানো হয় এবং ১৬২টি ছিটমহলে ৫১ হাজার ৫৪৯ অধিবাসীকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থিত ছিটমহলগুলোতে বাস করে এবং ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি ভারতের ছিটমহলগুলোতে বাস করে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ছিটমহলবাসীদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৯৭৯ জন ভারতে চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী আগামী নভেম্বরের মধ্যে তাঁরা ভারতে চলে যাবেন। তবে ভারতে যেতে চাওয়া কিছু ছিটমহলবাসীকে বাংলাদেশে জবরদস্তি করে রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এখানে নানা রকম অপপ্রচার হচ্ছে। আমি এ ধরনের কোনো অভিযোগ শুনিনি।’

মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামে পরিচিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি হয় ১৯৭৪ সালে। এর ৪১ বছর পর সেই চুক্তি বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। তবে ছিটমহলের এই বন্দিত্ব আরো আগে থেকে, প্রায় ৬৮ বছর ধরে৷ ছিটমহল বিনিময় কমিটির সভাপতি মাইনুল হক জানান, ‘এরই মধ্যে ছিটমহলে উৎসব শুরু হয়ে গেছে। শুক্রবার জুমার নামাজ বাদে মিলাদ মাহফিল-এর পর আনন্দ-উৎসব শুরু হয়ে গেছে। রাত ১২টা এক মিনিটে জ্বালানো হবে ৬৮টি মোমবাতি। হবে আলোকসজ্জা, জ্বলবে ফানুস। এছাড়াও থাকবে লাঠি খেলা, নৌকাবাইচসহ ঐতিহ্যবাহী সব আয়োজন।’ তিনি জানান, ‘ছিটমহলের চার জেলাতে একই আয়োজন করা হয়েছে। মধ্যরাতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্য, ডিসি, এসপিসহ ঊর্ধতন কর্মকর্তারা।’

Sitmohol3শনিবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনে চার জেলায় ছিটমহলে স্থাপিত বিজয়মঞ্চে চলবে দিনব্যাপী আনন্দ আয়োজন। ওড়ানো হবে জাতীয় পতাকা। এরপর দুপুরে কাটা হবে ৬৮ পাউন্ড ওজনের কেক, বের করা হবে আনন্দ র‌্যালি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অধিবাসীর সকলেই ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে থেকে যেতে চেয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির ভারতীয় অংশের সভাপতি দীপ্তিমান সেনগুপ্ত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘দীর্ঘ ৬৮ বছরের কষ্ট আর নাগরিকত্বহীন জীবনের যন্ত্রণার ইতি ঘটতে যাচ্ছে। এ দিনটি হবে ছিটমহলবাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিন ও উৎসবের রাত। আর এরপর থেকে প্রতিবছর এ দিনটিকে স্মরণ করে ছিলমহলবাসী নানা কর্মসূচি পালন করবে।’

প্রসঙ্গত, এ বছর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের পর গতি আসে স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের কাজে। ৬ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই – এই ১১ দিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলে ভারত ও বাংলাদেশের ৫০টি যৌথ দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে হালানাগাদ সমীক্ষা করে। এবার পালা চূড়ান্ত ছিটমহল বিনিময়ের, সময় নতুন এক ইতিহাসের। সূত্র : ডয়চে ভেলে