Home » বাছাইকৃত » এক গ্রাম এক বাড়ি
একটি গ্রাম একটি বাড়ি, ইনসেটে বাড়ির সদস্যরা

এক গ্রাম এক বাড়ি

সোহেল অটল
গ্রামের নাম কাশীপুর। এ গ্রামে একটাই বাড়ি। বাড়ির সদস্য ১১ জন। কাশীপুর গ্রামের অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায়। বর্ষা মওসুমে বাড়ির চারপাশে যত দূর চোখ যায় শুধু থই থই পানি। মাঝে মধ্যে দু-একটা গ্রাম ও বাজার মাথা উঁচু করে জনবসতির উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

নিকলী উপজেলার শিংপুর ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একসময়ের খরস্রোতা ধনু নদী। নদীর এক পাশে শিংপুর বাজার আর উল্টো পাশে কাশীপুর গ্রাম। শিংপুর ইউনিয়নেরই গ্রাম কাশীপুর।

বর্ষায় হাওরের রূপ মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। মাঝ হাওরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক গ্রাম দেখে মনে হয় সমুদ্রের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সব দ্বীপ। নয়ন জুড়ানো সে দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় বিচ্ছিন্ন একটা বাড়ির দিকে। নয়া দিগন্তের কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা জানালেন, এই গ্রামে একটাই বাড়ি। একথা শুনে আমরা কৌতূহল নিয়ে নৌকা থামালাম গ্রামটির ঘাটে।

একটি গ্রাম একটি বাড়ি, ইনসেটে বাড়ির সদস্যরা

একটি গ্রাম একটি বাড়ি, ইনসেটে বাড়ির সদস্যরা

কাশীপুর গ্রামের এই একমাত্র বাড়ির কর্তা ফজলুর রহমান। পেশায় কৃষক। স্ত্রী, সাত ছেলেমেয়ে ও দুই নাতি-নাতনী নিয়ে তার পরিবার। এই বাড়ির তথা এই গ্রামের বড় ছেলে মিজানুর রহমানের বয়স ৩০। তিনি জানালেন, পুরো বর্ষায় তাদের এই একটি পরিবারই এই গ্রামে বাস করে। তাদের কোনো পড়শি নেই।

কিন্তু তা কী করে সম্ভব? একটা গ্রামে একটা বাড়ি হয় কী করে? সে তথ্য জানতে হলে এই গ্রামের পেছনের ইতিহাস জানতে হবে।

জানা গেছে, এক সময়ে কাশীপুর হাওরের মধ্যে বেশ সমৃদ্ধশীল গ্রাম ছিল। শতাধিক পরিবার বাস করত এখানে। হাওরের অন্যান্য গ্রামের মতোই কাশীপুর গ্রাম গড়ে উঠেছিল নিরাপদ উচ্চতার ভূমিতে। শুকনো মওসুমে ধান, সরিষাসহ নানা ফসল চাষাবাদ করত এই গ্রামের মানুষ। আর বর্ষা মওসুমে হাওর ছিল মাছের আধার। ফলে হাওরের সহজাত পরিবেশ নিয়ে কাশীপুরবাসীর মনে কোনো দুঃখ ছিল না।

কিন্তু সর্বনাশ হয় ১৯৮৮ সালে। ওই বছর উজানের ঢলে দেশব্যাপী প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়। সে বন্যায় ফুঁসে ওঠে কাশীপুর গ্রামের পাশের নেওরা হাওর। যুগ যুগের সহাবস্থান ভুলে। পুরো কাশীপুর গ্রাম ভেঙে বুকে ভরে নেয় সর্বনাশা নেওরা। সেই থেকে কাশীপুর জনশূন্য।

১৯৮৮ সালে ভিটাবাড়ি হারিয়ে কাশীপুর গ্রামের মানুষ হাওরের উপকূলবর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়। তাদের বেশির ভাগের বাস এখন করিমগঞ্জ জেলার ইন্দাচুল্লি গ্রামে।

ফজলুর রহমানের আত্মীয়-স্বজনরা সবাই ইন্দাচুল্লিতে গিয়ে স্থায়ী বাস গেড়েছেন। ফজলুর রহমান নিজেও সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু জমিজমা সব পড়ে আছে কাশীপুরেই। তাই পাঁচ বছর আগে তিনি বাপ-দাদার ভিটায় ফিরে গেছেন। আর তাই কাশীপুর গ্রামে একটাই বাড়ি।

মিজানুর রহমান জানান, প্রায় ছয় মাস তাদের স্থলভাগ থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। ভরা বর্ষায় এখন হাওরের ঢেউ সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের মতোই। এমন দুর্যোগকালে ফজলুর রহমানের পরিবারের আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া অন্য কারো সাহায্য চাওয়ার সুযোগ থাকে না। তার বাড়ি থেকে নিকটতম দূরত্বের গ্রামে যেতেও নৌকায় প্রায় ৩০ মিনিট লাগে। শুকনো মওসুমে অবশ্য এই গ্রামে কিছু অস্থায়ী ঘরবাড়ি গড়ে ওঠে। জীবিকার তাগিদে কার্তিক মাসের দিকে উপকূল থেকে বেশ কিছু পরিবার এখানে চলে আসে। নৌকায় তুলে আনে তাদের অস্থায়ী ঘরবাড়ি। এখানে ফেলে যাওয়া বাপ-দাদার জমিজমা চাষ করে। আবার আষাঢ়ের শুরুতে সেসব ঘরদোর নৌকায় তুলে ফিরে যায়।

কিশোরগঞ্জ হাওরের বিস্তৃতি অনেক। জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা অধিক বন্যাপ্রবণ হাওর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও করিমগঞ্জের অংশ বিশেষও হাওর এলাকায় পড়ে। কিশোরগঞ্জ জেলা হাওর এলাকা গেইটওয়ে নামে খ্যাত। হাওরের সীমানা দেিণ অষ্টগ্রাম থানা, উত্তরে মিঠামইন, উত্তর-পূর্ব কোণে ইটনা, উত্তর-পশ্চিমে কটিয়াদী, পশ্চিমে নিকলী এবং পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানা।

হাওর এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিকলী উপজেলার ছাতিরচর, সুলতানপুর ও কীর্তিপুর; মিঠামইন উপজেলার শরীফপুর, কালীপুর, খিলাপাড়া, নয়াহাটি, শান্তিপুর, আলেকপুর, সাহেবনগর, মফিজগঞ্জ, রানীগঞ্জ, ঢাকী, মহিষারকান্দি ও কাঞ্চনপুর; ইটনা উপজেলার তেলনী, কুলিভিটা, শিমুলবাঁক, করণশী, হাতকবিলা ও নয়ানগর; অষ্টগ্রাম উপজেলার আনোয়ারপুরসহ হাওরের অন্তত শতাধিক গ্রাম ভাঙনের মুখে রয়েছে। বসতবাড়ি হারিয়ে এসব এলাকার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছেন। নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের গোরাদীঘা গ্রামটিও ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হওয়ার পথে ছিল। সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার প্রতিরা দেয়াল নির্মাণ করায় গ্রামটি রা পেয়েছে। এ ছাড়া অষ্টগ্রামের আবদুল্লাহপুরে ২.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রামপ্রতিরা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেবল প্রতিরা বাঁধ না থাকায় ভাঙন প্রতিরোধের অস্থায়ী প্রতিরা খাতে এ এলাকায় প্রতি বছর অন্তত ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। সূত্র : নয়া দিগন্ত