Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » ঝরনা দেখার উল্লাসে

ঝরনা দেখার উল্লাসে

Bandarban2

পাহাড়ি ঝরনা তু কুন তু মু

ফেরদৌস জামান
একবার ‘তু কুন তু মু’ঝরনার কাছাকাছি গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছিল। অথচ বাকি ছিল আর মাত্র এক দিনের পথ। পরিকল্পনায় ছোট্ট একটা ভুলের কারণে প্রতীক্ষা করতে হয়েছে পরের দুটি বছর। অভিজ্ঞ অভিযাত্রীগণ বলেন- যে কোনো ধরনের ভ্রমণ বা অভিযানের পূর্বে পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি থাকা চাই। এবং এই প্রস্তুতি হতে হবে একেবারে নিখুঁত। নিখুঁত প্রস্তুতির পূর্বশর্ত হলো, প্রথমেই গন্তব্য সম্বন্ধে সম্ভাব্য সকল মাধ্যম থেকে তথ্য জেনে নিতে হবে। বিশেষ করে সেখানকার প্রকৃতি, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। সেখানকার সম্ভাব্য বাধা দূর করতে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে তবেই যাত্রা করতে হবে।

অভিযাত্রী দলের সকল সদস্যের সম্মতি নিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে। প্রস্তুতি পর্বে মাথার টুপি থেকে শুরু করে পাদুকা এবং ব্যাকপ্যাক সমস্ত কিছু ঠিকঠাক থাকা চাই। আমরাও সেভাবেই পরিকল্পনা করে এবারের অভিযান শুরু করলাম জানুয়ারির এক সকালে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এবার আর তু কুন তু মু না দেখে ফিরছি না। বান্দরবানের উপজেলা সদর রুমার পেছনের পাহাড়টা বেশ উঁচু, সেখান থেকে দীর্ঘ ঝিরিপথ নিচে নেমে গেছে। এই ঝিরিটাই একটা পথ! বহুদূর থেকে ঝরনার একটানা শো শো শব্দ পাচ্ছিলাম। সেই ঝরনার পানি পাহাড় থেকে গড়িয়ে এসে নিচে খালের সৃষ্টি করেছে। সেই পানি আবার বেগে ধেয়ে যাচ্ছে নদীর পানে। আমাদের সেই খাল ধরেই এগুতে হবে।

পাহাড়ের ঝিরিপথে ট্রেকিং

পাহাড়ের ঝিরিপথে ট্রেকিং

সু-উচ্চ পাহাড়ের ফাঁক গলে বয়ে আসা পানি খালে গিয়ে মিশেছে। সেই খালের পাড় ধরে এগিয়ে চললাম। খালের দু’পাশ মিলিয়েই ট্রেইল, আবার কখনও খালের মাঝ দিয়েই (যেখানে পানি কম)। উভয় পাশে চাষ করা হয়েছে নানা প্রকার মৌসুমী শাকসবজি। পাহাড়ি নারীরা পিঠে ঐতিহ্যবাহী ঝুরি ঝুলিয়ে সবজি আহরণে ব্যস্ত। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ট্রেকিং করে এলাম ত্রিপুরা পাড়ায়। ঠিক খালের ধারে অবস্থিত পাড়ার একমাত্র দোকানে চা-বিস্কুট ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পিঠা পাওয়া গেল। দুই ধরনের পিঠা সহযোগে সকলেই চায়ের তেষ্টা মিটিয়ে নিলাম। ভাপে বসিয়ে কলাপাতায় মোড়ানো তিন কোণাকৃতির পিঠা- বিন্নি চালের গুঁড়ার সঙ্গে শুধু লবণ মিশিয়ে বানানো। অন্য পিঠাটাও তৈরি হয়েছে অতি সাধারণ পন্থায়- উত্তপ্ত তাওয়ায় মিহি করে একই চালের গুঁড়া ছিটিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর তাওয়াতেই তা লম্বা রোল (পাটিসাপটা পিঠার মতো) করে বানানো।

আহামরি কিছু নয়, অথচ বিন্নি চালের আকর্ষণীয় সুগন্ধে তৃপ্তিময় একেকটা পদ। পরম মমতায় বানানো পিঠাগুলো তাদের ঐতিহ্যের নমুণাও বটে। দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ফলে আগে পা না বাড়িয়ে ত্রিপুরা পাড়াতেই থেকে গেলাম। থাকবার জায়গা হলো পাড়ার কারবারীর ঘরে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে খালে কুল কুল করে বয়ে যাওয়া হৃদয় শান্ত করা পানির শব্দ যেন কানের কাছে আরও স্পষ্ট হতে থাকল। পাহাড়িরা ঘুমায় অগে আবার জাগেও খুব ভোরে। মোরগ ডাকা ভোর থেকে পাড়ার চওড়া উঠানে বাচ্চা-বুড়ো সকলের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়।

এই ঝরনার শুরু কোথায় কে জানে?

এই ঝরনার শুরু কোথায় কে জানে?

সকাল আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি কুয়াশার ঘন চাদরে ঢেকে রয়েছে সমস্ত এলাকা। এ ঘর থেকে ও ঘরটাও দেখা যায় না। ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হতে হলো দিনব্যাপী ট্রেকিংয়ের জন্য। আগের দিনের ট্রেইল ছিল তুলনামূলক সহজ, কারণ ওঠানামা তেমন ছিল না। কিন্তু আজকের পথটা সহজ নয়। ত্রিপুরাদের পাড়ার পর থেকে সমস্ত পথে রয়েছে ওঠানামা। চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আনুমানিক বেলা দেড়টার মধ্যে পেয়ে যাই আরো একটা খালের দেখা। ট্রেইলে খালের নাগাল পেলেই মনের মধ্যে শান্তি অনুভূত হয়। কারণ খাল মানেই কিছুটা সমতল পথের সম্ভাবনা। খালের সৌন্দর্যে দলের সকলেই মুগ্ধ! চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বৃহৎ সাইজের একেকটি পাথর, কোনো কোনো পাথরে অনায়াসে জনাদশেক একসঙ্গে বসে আড্ডা দেয়া সম্ভব।

সন্ধ্যার আগে তাবু খাটানোর কাজে লেগে গেলাম দুজন। বাকিরা খালে নেমে মাছ ধরতে লাগল। ঠান্ডা পানির যন্ত্রণা সহ্য করে প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ত্রিশটি মাছ ধরা গেল। বেশিরভাগ চিংড়ি, আকারে একেকটা দেড় থেকে দুই আঙুল। আশপাশে শত শত গাছে ধরে রয়েছে ডাসা ডাসা চালতা। ভাট্টি রায়হান মরিচ, লবণ আর সরিষা তেল দিয়ে চাটনির মতো বানালো। ব্যস, সেই চাটনি দিয়ে চালতায় কামড় বসাতে লাগলাম। খাবার হিসেবে পদটা ছিল সত্যিই অসাধারণ। ওদিকে জুম চালে মুগডাল মিশিয়ে রান্না হতে থাকল খিচুড়ি। চুলার পাশে কলার পাতায় মুড়ে রেখে দেয়া মশলা মাখানো মাছও রান্না করা হলো। এমন বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা মাছ খিচুড়ির সঙ্গে খেতে অনবদ্য লাগল।

চলতি পথে বিশ্রাম

চলতি পথে বিশ্রাম

খাওয়া পর্ব শেষে তারা ভরা আকাশের নিচে পাথরে বসে গভীর রাত পর্যন্ত চললো সঙ্গীতের আসর। পাথরের গায়ে পানির ধারার মৃদু ধাক্কা অতঃপর পাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে যাওয়া এবং ঝিঁঝি পোকার ডাক গভীর রাতের নীরবতায় বিশেষ সুরলহরী সৃষ্টি করল। কিন্তু সেই সুরের ব্যঞ্জনায় অভিযাত্রীদের মজে গেলেই সর্বনাশ। কারণ তাদের যাত্রাপথে বিশ্রাম নিতেই হবে। কেননা পরদিন থেতে শুরু হবে আবার হন্টন। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়লাম আকাশের তারার দিকে মুখ রেখে।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই রওনা দিলাম। সারাদিন চলল থেমে থেমে হাঁটা। সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গেলাম ‘তু কুন তু মু’র আগে সর্বশেষ বসতি ত্রিপুরাদের আরেক পাড়ায়। স্বয়ং কারবারীর মেহমান হতে পেরে যতটা না খুশি হলাম তারচেয়ে বেশি খুশি হলাম দিনের ক্লান্তি শেষে রাতের খাবারের বিশেষ আয়োজন দেখে। মাত্র ক’দিন আগেই হয়ে গেছে তাদের বড়দিনের উৎসব, পাড়ায় সে আমেজ যেন তখনও বর্তমান। পাহাড়িদের আতিথেয়তার ব্যাপারে ধারণা ছিল আগে থেকেই, কিন্তু খাতির যত্নে তাদের আন্তরিকতা দেখে সেই ধারণা আরো পোক্ত হলো। আগে জানা থাকলে উৎসবের আগেই গিয়ে হাজির হতাম।

Bandarban6

তু কুন তু মু’র কয়েকটি ধাপ

কারবারীর ঠিক করে দেয়া একজন পথ প্রদর্শক সকালে এসে হাজির হলো। সবাইকে তিনি নিজেই ডেকে তুললেন। প্রথমে বর্ণনা করলেন তু কুন তু মু’র সৌন্দর্যগাথা ও চলতি পথের দৃশ্য। বললেন, বেশ কয়েকটা ঝরনার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাবে কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে সে সব দেখার সুযোগ মিলবে না। পালন করতে হবে কঠোর নীরবতা কারণ হরিণ, বানর ও অন্যান্য প্রাণীর দেখা পাওয়া যেতে পারে। সবশেষে সারি বেধে ট্রেইল ধরে এগুতে থাকলাম। পথ প্রদর্শক হাতে একটা লম্বা দা নিয়ে সেনাপতির মেজাজে এগিয়ে চললো আগে আগে। নীরবতা পালনের কথা থাকলেও তার বিরতিহীন তথ্য বিবরণীর ফলে পশুপাখি সব একযোগে পালাতে লাগল। তার কাণ্ড দেখে আমরা মুখ টিপে হাসতে লাগলাম। কারণ আমাদের নীরব থাকতে বলে সে নিজেই সরব হয়ে উঠেছে।

দুঃখের কথা হরিণ, বানর তো দূরের কথা পথে একটি চামচিকাও চোখে পড়ল না। জঙ্গলের ঘনত্ব ভেদ করে কেবল কানে এলো ঝরনার শব্দ। প্রত্যেকের চোখে মুখে উত্তেজনা- বহু প্রতীক্ষিত তু কুন তু মু আর মাত্র অল্প সময়ের ব্যাপার! হাঁটার গতি বেড়ে গেল সবার। অনিক সবার আগে দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। ওর চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। দেখলাম ৪/৫ ধাপে ঝরনার প্রথম ধাপটা বেশ প্রশস্ত। এরপর খানিকটা জায়গা সমতল। মাঝে একাধিক ধাপের পর সবশেষে পানি পতিত হয়েছে প্রায় পঁচিশ মিটার গভীর খাদে। বর্ষাকালে এই ঝরনার প্রকৃত রূপ যে কত দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে তা অনুমান করা গেলেও বাস্তবতা হলো, বর্ষায় এখানে পৌঁছা প্রায় অসম্ভব। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও। ঝরনা দেখার উল্লাসের এক পর্যায়ে সেই বন্ধুদের কথা মনে পড়ল। মনটা খারাপ হলো এই ভেবে যে, তারা শেষ পর্যন্ত তু কুন তু মু দেখতে পেল না। অথচ দুই বছর আগের অভিযানে তারাই ছিল মূল উদ্যোক্তা। সূত্র : রাইজিংবিডি