Home » বাছাইকৃত » দারুচিনি দ্বীপ থেকে ছেড়াদ্বীপে

দারুচিনি দ্বীপ থেকে ছেড়াদ্বীপে

সুমনা দে
কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনস আইল্যান্ড, স্থানীয় নাম দারুচিনি দ্বীপ বা নারিকেল জিঞ্জিরা। এরপর অথই নীল বঙ্গোপসাগরে ভেসে ছেঁড়াদ্বীপ-যাত্রা। জনমানবহীন ছেঁড়াদ্বীপ ভরা জোয়ারে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়।

দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট দারুচিনি দ্বীপটি আজো অনেক অত্যুৎসাহী পর্যটকের চোখের আড়ালে রয়েছে। গত বছর ডিসেম্বরে আমরা ১২ জন সেই স্বপ্নময় ভূখণ্ডটিতে বেড়িয়ে এলাম।

Keari

১৪ দিনের এই ট্যুর শুরু হয়েছি ১৫ ডিসেম্বর। কলকাতা থেকে বাসে বেনাপোল পৌঁছে সেখান থেকে দু’টি গাড়ি নিয়ে একে একে কুষ্টিয়ার লালন মাজার, কুষ্টিয়া ও শিলাইদহে অবস্থিত ঠাকুর পরিবারের দু’টি কুটিবাড়ি- যেখানে রবীন্দ্রনাথ মাঝে মধ্যে গিয়ে থাকতেন, সাগরদাঁড়িতে কবি মধুসূদন দত্তের পৈতৃক ভিটে দেখে খুলনা বন্দরে পৌঁছলাম। সেখান থেকে অসাধারণ এক ক্রুজে তিন দিন তিন রাত থেকে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল ও ছোট-বড় অসংখ্য বাড়িতে ঢুকে জঙ্গল সাফারির রোমাঞ্চকর স্বাদ নেয়া গেল। ফিরতি পথে খুলনা হয়ে সারা রাত বাসযাত্রা করে পৌঁছলাম ঢাকা। ঢাকা শহর দেখে, আবার রাতের বাসে সকালবেলা পৌঁছলাম কক্সবাজার আর সেখান থেকেই আমাদের বহুপ্রতীক্ষিত দারুচিনি দ্বীপে যাওয়া।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার জেলাটি সমুদ্রতটের জন্য বিখ্যাত। ১২৫ কিলোমিটার বিস্তৃত পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রতটটি সব সময়েই লোকে-লোকারণ্য। এখানে আছে নানা মানের অসংখ্য হোটেল ও অসংখ্য বার্মিজ দোকান। বলা হয়, অবিভক্ত ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে এ অঞ্চলের প্রশাসক ছিলেন কক্সসাহেব। এ অঞ্চলের উন্নতির জন্য তার যথেষ্ট পরিকল্পনা ও পরিশ্রম ছিল। ১৭৯৯ সালে তার মৃত্যুর পর এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় কক্সবাজার।

যাই হোক কক্সবাজারে পৌঁছেই সময় নষ্ট না করে আমরা রওনা হলাম মহেশখালী দ্বীপের উদ্দেশে। বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলতরঙ্গের ওপর দিয়ে ৪৫ মিনিটে দুরন্তগতির স্পিডবোটে পৌঁছে গেলাম মহেশখালী। সুন্দরী, কেওড়া, গড়ানসহ বিভিন্ন জাতের গাছে গাছে সবুজ এ দ্বীপে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সংস্কৃতির অনন্য সহাবস্থান দেখে মুগ্ধ হতে হয়। এখানে রয়েছে আদিনাথ শিবের প্রাচীন মন্দির, বৌদ্ধবিহার প্রভৃতি। ফেরার পথে আবার স্পিডবোট ভরসা। বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসমান স্থানীয় ছোট-বড় সাম্পানগুলো, প্রাচীনকালে এসব অঞ্চল দিয়ে চীন, ব্রহ্মদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাংলার অতিসমৃদ্ধ বাণিজ্যের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।

পরদিন ভোরে আমাদের দারুচিনি দ্বীপ যাওয়ার পরিকল্পনা, কক্সবাজার থেকে গাড়িতে আড়াই ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে টেকনাফ পৌঁছানো গেল। কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত উপজেলা টেকনাফ কক্সবাজার থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত অবস্থিত। এর পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে চলেছে নাফ নদী। ম্যানগ্রোভ অরণ্য অধ্যুষিত টেকনাফে বহু বৌদ্ধবিহার নজরে পড়ল। ভোরের ঘন কুয়াশা, জঙ্গলঘেরা কখনো মসৃণ কখনো অমসৃণ পরে ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি ছুটিয়ে শেষ পর্যন্ত উঠলাম অপেক্ষারত কেয়ারি সিন্দাবাদ নামের ছোট জাহাজে।

Keary

দোতলার ডেকে উঠে যে দিকে তাকাই গাঢ় নীল জল। নাফ নদী তার নীল ঢেউ তুলে হেলেদুলে চলেছে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হতো। এক বর্মী রাজকুমারীর নামে এ নদীর নাম নাফ। কোথাও ১২৮ ফুট আবার কোথাও বা ৪০০ ফুট গভীর এই নদীর এক দিকে আরাকান পাহাড়ঘেরা মিয়ানমার আর অন্য দিকে অরণ্য-অধ্যুষিত বাংলাদেশ। নদীর বুকে সূর্যের আলোর ঝিকিমিকি আর অসংখ্য সি-গালের আনন্দ কোলাহল দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। কেয়ারি সিন্দাবাদের ক্যাপটেন এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, আঞ্চলিক ইতিহাস ইত্যাদি বিবৃত করে যাত্রীদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছেন।

ঘণ্টাদুয়েক পর নাফ নদী বঙ্গোপসাগরে মিলিত হলো। তখন কোথায় মিয়ানমার, কোথায় বাংলাদেশ। শুধু দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। একটু পরই দেখা গেল আমাদের স্বপ্নের দারুচিনি দ্বীপ, টেকনাফ থেকে যার দূরত্ব মাত্র ৯ কিলোমিটার। ক্যাপটেন জানালেন এ দ্বীপে প্রথমে একদল আরব বসতি স্থাপন করে। তারা নোনাজলে ঘেরা এ দ্বীপের মাঝখানে মিষ্টিজলের সন্ধান পায়। এটির নাম দেয়া হয় জাজিরা দ্বীপ। ব্রিটিশ আমল থেকে অবশ্য এ দ্বীপটি সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড নামে পরিচিত হতে আসছে। স্থানীয়রা তাদের প্রিয় ভূখণ্ডে নারকেল জিঞ্জিরা নামে অভিহিত করে। কথিত আছে, একবার মশলাবোঝাই এক বিদেশী জাহাজ এ দ্বীপের কাছে ডুবে যায়। দ্বীপবাসী সকালে উঠে দেখেন সমুদ্রে অসংখ্য দারুচিনি ভেসে আছে। সেই থেকে সেন্ট মার্টিনের আরেক নাম হয় দারুচিনি দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ।

দারুচিনি দ্বীপে নামার আগে ক্যাপটেন আমাদের সোজা জানিয়ে দিলেন এখানকার মানুষ অতিথিপরায়ণ ও আন্তরিক, কিন্তু মদ খেয়ে মাতলামি করলে এরা লাঠি প্রয়োগ করতেও ছাড়েন না। অবশেষে অবতরণ। সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড দুই হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল দেশী-বিদেশী পর্যটকদের।
এখানে সূর্য, সাগর আর নারকেল গাছের আবরণে প্রকৃতি অসামান্য সুন্দরী। আমাদের ব্ল মেরিন হোটেলটি সমুদ্রতটেই অবস্থিত। পৌঁছামাত্র হইহই করে নেমে পড়া হলো পানিতে। দুপুরের খাবারে ছিল বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছসহ ভাত। খাওয়ার পর সময় নষ্ট না করে জেটিতে এসে ওঠা হলো মাঝারি মাপের এক নৌকায়। না, সিড বোট নয়, মাদাসাঠা এক মোটরচালিত বোট। উদ্দেশ্য ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া। এখন ভাবলে অবাক লাগে তরঙ্গায়িত অতল সাগরের ওপর দিয়ে অতি সাধারণ এক নৌকায় আমরা ১২ জন দুঃসাহসী চলেছি দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে। আরো অ্যাডভেঞ্চার যে অপেক্ষা করে আছে তখনো জানি না। পরে প্রায় মাঝ-সমুদ্রে আমাদের নৌকার পাশে এসে দাঁড়াল এক জেলেডিঙি। অনেক কসরত করে নামলাম সেই ডিঙিতে এবং ডিঙিটি অবশেষে পৌঁছে দিলো ছেঁড়াদ্বীপে। পথে মাঝিটি প্রবাল কেনার প্রস্তাব দিলেও আমরা কান দেইনি, কারণ ওর কাছ থেকে প্রবাল কেনা মানে প্রকারান্তরে প্রবাল নিধনে উৎসাহ দেয়া। তবে সমুদ্রপথে যেতে যেতে অগভীর অংশে বেশ কিছু প্রবাল দেখতে পেলাম।

দারুচিনি দ্বীপের একটি অংশ হলো এই ছেড়াদ্বীপ। ভরা জোয়ারের সময় মূল দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলে এর এই নাম। ভাটার সময় অবশ্য আবার দু’টি দ্বীপজুড়ে যায়।

জনমানবশূন্য ছেঁড়াদ্বীপে পা রেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এত নির্জন দ্বীপে আগে কখনো আসিনি। কেয়াগাছের জঙ্গল ছাড়া বিশেষ গাছপালা বা জন্তু জানোয়ার এখানে নেই। একমাত্র অস্থায়ী চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়ার গন্ধওয়ালা চা খেয়ে আমরা তো আপ্লুত। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে মৃত প্রবাল ও ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে হঠাৎ পশ্চিম আকাশে চোখ পড়তেই দেখি সূর্যদেব জলের ক্যানভাসে লাল রঙ ছড়িয়ে পাটে বসতে চলেছেন। স্বর্গ যেন মর্ত্যে নেমে এসেছে। দুই চোখ ভরে সেই দৃশ্য দেখছি, এমন সময় শুনি আমাদের মাঝিভাই চাটগাইয়া ভাষায় কী যেন হাউমাউ করে বলে চলেছেন। অবশেষে বোঝা গেল আগে থেকে দ্বীপে আসা কয়েকজন লোককে মাঝ-সমুদ্রে নৌকায় সে তুলে দিয়ে আসতে চলেছেন। পরে আমাদের নিয়ে যাবে। এই বলে তো তিনি চলে গেলেন।

এ দিকে ক্রমেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। সপ্তার্ষিমণ্ডল, সন্ধ্যাতারা- আকাশে যা যা আছে সব জলজল করে উঠছে। আর আমরা সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সমুদ্রের মাঝখানে একটা ছোট্ট ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছি মাঝির প্রতীক্ষায়। ঠিক হয়ে গেল, কুছ পরোয়া নেই, মাঝি যদি নাও আসে হইচই করে দিব্য কাটিয়ে দেয়া হবে একটা রাত। না, মাঝি ফিরে এসেছিলেন এবং আমরাও তার ডিঙি চেপে মাঝ-সমুদ্রে গিয়ে অপেক্ষাকৃত বড় একটা বোটে চেপে সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ডে ফিরেছিলাম।

এখানে কিন্তু ইলেট্রিসিটি নেই, যা কিছু আলো জেনারেটরের সাহায্যে জ্বলে, হোটেলে রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত জেনারেটর বন্ধ থাকে। তখন হারিকেন ভরসা। তাই রাতের আলো নেভার আগেই খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়া হলো।

পরদিন সকালে আবার সমুদ্রসৈকত। লাল কাঁকড়া, ছোট-বড় জেলিফিশ, ছোট ছোট বিভিন্ন জাতের কাঁকড়া, পাফ মাছ দেখতে দেখতে অনেক দূর হাঁটা হলো। জেলেরা জাল ফেলে কত রকম মাছ ধরছিলেন- কোরাল ফিশ, টুনা ফিশ, জাম্বো সাইজের লবস্টার ছোট-বড় চিংড়ি, বিভিন্ন জাতের পমফ্রেট, ছোট ছোট চাইলা মাছ প্রভৃতি। এসব মাছের একটা বড় অংশ শুঁটকি মাছ হিসেবে দেশ-বিদেশে চালান করা হয়। মাছ ধরা ও বিক্রি করা ছাড়াও মাত্র ৮ কিলোমিটার বিস্তৃত ছোট্ট এই দ্বীপের মানুষ ধান ও নারকেল চাষ করে জীবিকানির্বাহ করেন। শীতকালে পর্যটকদের দাক্ষিণ্যে সামান্য কিছু রোজগারও হয়। এখানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ‘সমুদ্রবিলাস’ নামে একটি সুন্দর বাড়িও রয়েছে। এরই মধ্যে কেয়ারি সিন্দবাদ টেকনাফ থেকে আমাদের নিতে এসেছে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দারুচিনি দ্বীপকে বিদায় জানিয়ে জাহাজে উঠলাম। বেলা ৩টায় রওনা হয়ে বিকেল ৫টায় টেকনাফে পৌঁছলাম। গাড়ির ব্যবস্থা আগে ছিল। তবে কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে একাধিক স্থানীয় বাসও রয়েছে।

ফেরা হলো কক্সবাজারে। সে তো পর্যটকদের স্বাগত জানিয়েই রেখেছে। সমুদ্রের ধারে গরম গরম চিংড়ি ও টুনার খাবার খেয়ে প্রাণ খুলে কেনাকাটা সারা হলো। পরদিন সকালে রওনা হলাম রাঙ্গামাটির উদ্দেশে। সে আরেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

কিভাবে যাবেন
বিমান বা বাসে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া যায়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে রাতের বাসে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে বাসে কক্সবাজার যাওয়া যায়। কক্সবাজার থেকে স্থানীয় বাস ভাড়া করে টেকনাফ পৌঁছানো যায়। পাঁচটি শিপিং লাইনার প্রতিদিন টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাতায়াত করে। তাই দ্বীপে না থেকেও কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে আসা সম্ভব। পাঁচটি শিপিং লাইনার হলো- কেয়ারি সিন্দাবাদ, কেয়ার ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, ঈগল, এলসিটি কুতুবিয়া ও শাহিদ শেরনিয়াবত। টেকনাফ জেটি থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যায়।

কোথায় থাকবেন
কক্সবাজারে রয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তিনটি হোটেল। হোটেল শৈবাল- এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া দুই হাজার, এসি রয়্যাল রুম তিন হাজার টাকা। হোটেল প্রবাল ও হোটেল উপলে নন-এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া এক হাজার ১০০ ও এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া এক হাজার ৫০০ টাকা।

সেন্ট মার্টিন সমুদ্রতটে রয়েছে হোটেল ব্লু মেরিন, ভাড়া দুই হাজার টাকা। প্রসাদ প্যারাডাইস হোটেল লাবিলাবিলাস, ভাড়া দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। (লেখাটি একজন ভারতীয় পর্যটকের।)