Home » ফিচার » পার্বত্য চট্টগ্রামের খাদ্যভুবন
দীঘিনালার রাস্তার মোড়ে ফলের সম্ভার নিয়ে বসেছেন স্থানীয় এক নারী। ছবি : লেখক

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাদ্যভুবন

বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের গৌরবময় সাজেক থেকে ফিরতে বিকেল নামতে শুরু করল। রাস্তার পাশের ছোট ছোট কুঁড়েঘরের শিশুরা নেমে বিদায় জানাচ্ছে। সবাই পাহাড়ি। ওরা প্রকৃতির সন্তান। দুই পাশে উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢেউ ছবি হয়ে আছে। উত্তর দিকে বৃষ্টি তো পুব-পশ্চিম বৃষ্টিহীন। কখনো বা রোদ ঝলমল একদিক, অন্যদিকে বৃষ্টির সৌন্দর্যের লীলা। মাইল পাঁচেক আসতেই ডান পাশে পড়ল বেড়ার দোকানঘর। দুজন বসে বাঁশের হুঁকোতে তামাকের ধোঁয়া সেবন করছেন। সামনে মাচার ওপর জলডুবি আনারস রেখেছেন বেচার জন্য। গাছপাকা, সোনার বরণ উজ্জ্বল। বেশ বড়। জোড়া দশ টাকা। সুধাময়ের স্ত্রী সহেলী বললেন, গাড়ি থামাও, আনারস নেব। ড. আবসার বললেন নেব। আমিও ভাবলাম নিই।

দীঘিনালার রাস্তার মোড়ে ফলের সম্ভার নিয়ে বসেছেন স্থানীয় এক নারী।ছবি : লেখক

দীঘিনালার রাস্তার মোড়ে ফলের সম্ভার নিয়ে বসেছেন স্থানীয় এক নারী। ছবি : লেখক

অমনি সুধাময় দু-তিনটা নিয়ে দোকানিকে বললেন, কেটে দাও, আমরা খাব। আহা কী মিষ্টি! হাতের তালু ও পিঠ বেয়ে রস গড়িয়ে পড়ছে। দোকানি বললেন, এগুলো ওষুধ দিয়ে পাকানো নয়, তরল সার দিয়ে উৎপন্ন নয়, নিশ্চিন্তে খেয়ে নিন। সুধাময়ও বললেন। কবি ঈশ্বর গুপ্তের আনারস কবিতার ‘আনা দরে আনা যায় কত আনারস…/ফেলিয়া পনের আনা এক আনা রাখে…’ মনে পড়ে যায়। তিনি আরো লিখেছেন, ‘কৃপণের কর্ম নয় আনারস খাওয়া’। হ্যাঁ, গায়ের চোখ ফেলে আনারস খেতে হয়।

আর অন্তিমকালে মুখে আনারস নিয়ে মরতে চেয়েছেন কবি ওই কবিতায়। এত বড় কথা?

পেটে এবং গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে আমরা ফিরলাম দীঘিনালায়। রাস্তায় রোজকার মতো শেষ বিকেলের বাজার বসেছে। বিক্রেতা পুরুষের চেয়ে নারী বেশি। বর্ষার বাঁশের কোঁড়, লটকন, চৈ খাট্টা, আম, কাঁঠাল, আনারস, মুখিকচু, আম, পাকা পেঁপে কত কী! লেজি শামুক, গুগলি, কাঁকড়াও আছে। প্রত্যেকটি ভোজনরসিকদের ব্যাপক প্রিয়। কুচে বা বন্য মাংস চোখে পড়েনি। একটি পাকা পেঁপে কিনে নিলাম একদর তিরিশ টাকায়। গাছপাকা, মিষ্টতা গা ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়ছে। কাল সকালে কিচ্ছু ছাড়া এতেই প্রাতরাশ হয়ে যাবে। খাগড়াছড়ির ত্রিপুরী আবাসিক সরাইখানা গাইরিংয়ে উঠেছি। চামকা-ত্রিপুরা লোকসাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমির পরিচালক সুসময় চাকমার আমন্ত্রণে। রাঙামাটি থেকে কবি-লেখক এসেছেন।

আমি ঔদরিক না হলেও চাকমা-ত্রিপুরীদের নিজস্ব খাবারের প্রতি লোভী বলতে লজ্জায় মুখ লুকাব না। খাদ্যের কথা একটু থাক। দীঘিনালা থেকে আবার যাত্রা শুরু বাজারের পাশের নাতি-তরুণ বটগাছে উড়তে শেখা দোয়েল গাইছে মিষ্টি সুরে। গানের জন্যই দোয়েল-বুলবুলির জন্ম দুঃখের এই দেশে। প্রায় অরণ্য ও বনহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে। বৃষ্টি শুরু হলো আমার হতাশা ও দুঃখ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে। পাকা সড়ক, মজবুত টয়োটা মাইক্রো। খাগড়াছড়ির কাছে আসতেই আরেকটি ছোট্ট বাজার। ছাতা মাথায় তরকারি বিক্রেতা নারী-পুরুষ জবুথবু। ওদের কাঁকরোল, কচুরলতি, কচি চালতা, ঢেঁড়স, বাঁশকরুল, পাট-পালংশাক ভিজছে। একটু যেতেই বটগাছের তলায় আরেকটি বাজার। প্রতিদিন বাজারগুলো বসে। শহরের মাঝে আছে সাপ্তাহিক বড় হাট, দূর থেকে সওদা আসে। পাহাড়ের বিখ্যাত সুখাদ্য ফসল, মাংস, মাছ। লঙ্কা, হলুদ, আদা। আদা-হলুদের ফুলের ভর্তা খেয়ে থাকলে আমি আপনাদের দলে রইলাম। কিন্তু পাহাড়িদের হাতে করা মমতার ঝালমাখা এসব ভর্তা যাঁরা খেতে পাননি আমি তাঁদের দলের নই। জুমের ফসল এখনো উঠতে শুরু করেনি বলে বর্ণনাও দিলাম না। দুই মাস পরে আবার এসে দেখে ও খেয়ে যাব।

জুমিয়া গান শুনেছেন? চাকমা ভাষা বোঝেন? ‘কি এদক্ দোল্ হইয়ছ্ তুই, মনে হয় বানা চেই থেব।’ বাংলায় ‘কি এত সুন্দর যে হয়েছিস তুই, মনে হয় শুধু চেয়ে থাকি।’ গানের সুর কি শুধু বাণীতে পাওয়া যায়! গানটি আমার ভীষণ প্রিয়।

আবার আরেকটি বাজার পড়ল। শহরের আশপাশে বলে পাকা সড়কের পাশের পাড়াগুলো এখন জনাকীর্ণ হয়ে উঠেছে। এ জন্যই এই প্রাত্যহিক বাজার প্রয়োজন। বৃষ্টি না হলে নেমে পড়তাম শুধু দেখার জন্য। টগবগে তাজা ফল ও তরকারি বেচতে আসা মানুষের সঙ্গে দু-দণ্ড কথা যদি বলা যায়! কিছু ছবিতে যদি বিশেষ কোনো মুহূর্তকে ধরা যায়, আমার কোনো গল্প বা উপন্যাসে যদি তারা আপন শক্তিতে উঠে এসে জায়গা করে নেয়! পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমার কিছু গল্প আছে, উপন্যাসও-এদের কাছেই আমি এভাবে পাঠ নিয়েছি।

সাজেকে কেউ কেউ ছবি তুলতে দেয়নি। ওদের যুক্তি হলো, ছবি তুলে তুমি বেচবে, অনেক টাকা পাবে; তাতে আমার তো কিছু পাওয়া হলো না। কিন্তু বুলবুলি ছানার ছবি ও কাপড় বোনার ছবি তুলতে মানা করেননি ওই মহিলা। পথের পাশের বাজারের মহিলার হাতে দাবা, ওতে দা দিয়ে কাটা তামাকে রাবগুড় মেশায়। চুপি চুপি বলছি, দুই দিন পরে আবার দীঘিনালায় এসেছিলাম আশপাশ দেখতে। তখন এই দা-কাটা তামাক কিনে নিয়েছি হুঁকোয় ব্যবহারের জন্য। ঠাঠারি বাজারের তামাক এর কাছে নস্যি। আমি জানি তামাক ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু সারা দেশে ভেজাল খাদ্য, ফল থেকে দুধ, মাছ থেকে মাংসে যে ফরমালিন বা মসলায় যে কাপড়ের রং ব্যবহার করছে! ওষুধে যে ভেজালের মেলা-সভা বসেছে! এখানকার রাস্তার পাশে এনার্জি ড্রিংকসের খালি বোতল পড়ে আছে দেখেছি। এর পরও আমি বিশ্বাস করি এখানে দোষহীন শাকসবজি ও ফল পথের পাশের বাজারে প্রচুর আছে। আমি চিনিচাঁপা, কবরী, আম, আনারস, নাপ্পি, জগরা প্রবল নিশ্চিন্তে খেতে দ্বিধা করিনি। ছবির মহিলাকে দেখুন তো! আমি তাঁদের বিশ্বাস করি, আমাকে পারি না বলে কষ্ট পাই। সূত্র : কালের কণ্ঠ