Home » বাছাইকৃত » পেয়ারার জলবাজারে

পেয়ারার জলবাজারে

মাহমুদ হাসান খান
একজন-দুজন করে শেষ পর্যন্ত দলটা ৫৬ জনের হয়ে গেল। যাচ্ছি পেয়ারার ভাসমান বাজার দেখতে। গন্তব্য বাংলাদেশের পেয়ারার রাজধানীখ্যাত ঝালকাঠি-স্বরূপকাঠির ভিমরুলী, আটঘর ও কুড়িয়ানা। উদ্যোগটা ফেসবুক গ্রুপ ‘ভিজিট বাংলাদেশ’-এর। সময়টা বর্ষায় হওয়ায় বাড়তি সাবধানতা হিসেবে প্রায় সবার হাতেই উঁিক দিচ্ছে লাইফ জ্যাকেট। উঠেই লঞ্চের শেষদিকে চাদর বিছিয়ে জায়গাটা নিজেদের দখলে নিলাম।

Vimrul-Market

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চালু হলো লঞ্চের ইঞ্জিন। বিআইডাব্লিউটিসির বিশাল লঞ্চ ‘বাঙালি’ ধীরে ধীরে জল কেটে এগোতে লাগল। কম-বেশি সবাই দোতলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে শীতলক্ষ্যার কাছে আসতেই ডাক পড়ল ডিনারের। লঞ্চের ডাইনিংয়ের ভুনা খিচুড়ি, মুরগির মাংস আর ডিম ভুনা দিয়ে সারলাম ভূরিভোজ। এরপর চলল খোলা আকাশের নিচে আড্ডা। আড্ডা জমে উঠতে না উঠতেই আকাশে উঁকি দিল বিশাল চাঁদখানা। চাঁদ দেখতে দেখতে কখন যে চোখ বুজে এলো, বুঝতে পারলাম না! ঘুম ভাঙল ভোর ৬টায়। লঞ্চ তখন বরিশাল লঞ্চঘাটে।

তল্পিতপ্পা গুটিয়ে তড়িঘড়ি করে সবাই লঞ্চ থেকে নেমে পড়লাম। লঞ্চঘাট-লাগোয়া এক রেস্টুরেন্টে সারলাম সকালের নাশতা। ততক্ষণে হাজির রিজার্ভ বাস। ওতে চেপেই রওনা হলাম বানারীপাড়ার উদ্দেশে। ৪০ মিনিটের যাত্রা শেষে বাস এসে হাঁফ ছাড়ল বানারীপাড়া ফেরিঘাটে। ঘাটে নেমে ঠিক করে ফেললাম তিনটি ট্রলার। ‘সন্ধ্যা নদী’তে মিনিট দশেক চলার পরই ট্রলার ঢুকে গেল ছোট এক খালে। ভরা বর্ষায় টইটম্বুর সে খাল। পানি ভেদ করে ছুটে চলল ট্রলারগুলো। ছোট খালগুলোর দুই পাশে সবুজ গাছপালা, এর মাঝ দিয়ে মাঝির ডিঙি নৌকার বেয়ে চলা-সে এক অসাধারণ দৃশ্য!

সরব হয়ে ওঠে আমাদের ক্যামেরাগুলো।

আটঘরের কাছে আসতেই শুরু হলো পেয়ারার বাগান। এগুলো করা হয়েছে খালের দুই পাড়েই। প্রতিটি বাগানের গাছগুলো সারি সারি করে লাগানো। সুবিধামতো এক বাগানে নেমে তুলতে লাগলাম পেয়ারা বাগানের ছবি। আর একটু সামনে এগোতেই খালগুলো আরো সরু হয়ে এলো, দুই পাশের গাছগুলো হয়ে গেল আরো ঘন। আলোকচিত্রীদের আনন্দ আর দেখে কে? ক্যামেরার শাটার পড়তে লাগল দ্রুত। আনন্দের আতিশয্যে তো অনেকে জায়গাটাকে ‘আমাজন’-এর সঙ্গে তুলনা দিয়ে ফেললেন!

পেয়ারার চাষ মূলত শুরু হয় স্বরূপকাঠির আটঘর আর কুড়িয়ানা ইউনিয়নেই। তবে এখন তা ছড়িয়ে গেছে সমুদয়কাঠি, ভিমরুলী, বানারীপাড়া, জলাবাড়িসহ নানা স্থানে। হাজার হাজার চাষি এখানে পেয়ারা চাষ করেন। মৌসুমের সময়টায় এ অঞ্চলে চাষ হয় ১০-১২ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারার। তখন এলাকাটা পেয়ারাচাষি, পাইকার, খুচরা ক্রেতা ও ভ্রমণকারীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌঁছলাম ভিমরুলী। পেয়ারার সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার এখানেই। প্রতিদিন চাষিরা সকাল থেকেই নৌকা ভর্তি করে পেয়ারা আনতে থাকে ভিমরুলীতে। সারা দিন ধরে চলে বিকিকিনি। এখানে পেয়ারা সাধারণত বিক্রি হয় নৌকা হিসেবে। বেশ বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে দেখা গেল পেয়ারা কিনতে। এরা বড় বড় ট্রলার নিয়ে এসেছে। ট্রলারভর্তি পেয়ারা দিয়ে তৈরি করা হবে জেলি। এ অঞ্চলের পেয়ারাগুলো সব দেশি জাতের আর এগুলোই নাকি জেলি বানানোর জন্য আদর্শ।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এখন পেয়ারার ভরা মৌসুম। এর ওপর আবার পেয়ারা পচনশীল ফল। এক-দুই দিনের বেশি রাখা যায় না। তাই তারা যা দাম পায়, বিক্রি করে দেয়। এমনকি মাঝেমধ্যে বিক্রি করতে না পারলে পেয়ারা পানিতে ফেলেও চলে যায়। ফলে এ সময় পেয়ারা বিকোয় একেবারে পানির দরে। মণপ্রতি ২০০ টাকা করে। আমরাও এক নৌকা পেয়ারা কিনলাম মাত্র ৩০০ টাকায়।

চাষিরা আক্ষেপ করে জানাল, ঢাকার সঙ্গে এ অঞ্চলের যদি সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সুবিধা কিংবা এখানে যদি একটি জেলি তৈরির কারখানা থাকত, তাহলে তারা ন্যায্য দর পেত। এই পেয়ারাগুলোতে চাষের কোনো পর্যায়েই কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। আর ফরমালিনের তো প্রশ্নই আসে না।

Vimrul-Market2

পাইকারি বিক্রির জন্য পেয়ারার জায়গা হয় আড়ৎগুলোতে

পেয়ারার ভাসমান এ বাজারটা মনে করিয়ে দিল ব্যাংককের সেই ভাসমান বাজারের কথা। এমনকি এখানকার বাজারটা ওটার চেয়েও অনেক বড় আর কর্মচাঞ্চল্যপূর্ণ। আশার কথা এই যে এ ভাসমান বাজার দেখতে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণকারীরা আসছে প্রায় প্রতিদিনই। এ ছাড়া বেশ কিছু ট্যুর কম্পানি এখানে বিদেশি পর্যটকও নিয়ে আসছে। এর ফলে এখানকার পেয়ারা বিক্রিও হচ্ছে ভালো এবং দেশের মানুষজনও জানতে পারছে এমন সুন্দর এক জায়গার কথা।

দুপুর দেড়টার দিকে ট্রলারে করে চলে এলাম আটঘর স্কুলের কাছে। এখানে বসে নৌকার হাট। নৌকার কারিগররা নৌকা বানিয়ে এখানে নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। এ অঞ্চলের একমাত্র বাহন নৌকা। প্রতি পরিবারেই অন্তত একটা করে নৌকা থাকে। তাই নৌকার চাহিদাও ব্যাপক। আকারভেদে একেকটি নৌকার দাম পড়ে এক হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। চারদিকে এত পানি, আমাদের শখ জাগল নাইবার। ঝাঁপিয়ে পড়লাম খালের জলে। অতিসাবধানীরা নামল লাইফ জ্যাকেটসমেত।

ঘণ্টাখানেক চলল সেই গোসলপর্ব। এরই মধ্যে পেটে শুরু হয়ে গেছে ছুঁচোদের নাচন। ওদের ঠাণ্ডা করতেই চললাম এ অঞ্চলের বিখ্যাত কুড়িয়ানার ‘সকাল সন্ধ্যা রেস্টুরেন্ট’-এ। যদিও স্থানীয়ভাবে এটি ‘বৌদির রেস্টুরেন্ট’ নামেই বেশি পরিচিত। এখানে পেঁপে ভর্তা, রুই মাছ আর ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। এরপর ট্রলারে করে আবার ফিরতি পথে বানারীপাড়ায়। তারপর বাসে করে চললাম বিখ্যাত গুঠিয়া মসজিদ দেখতে। সন্ধ্যার মধ্যে হাজির হলাম বরিশাল লঞ্চঘাটে। ফেরার সময় মনে মনে নিজেই চুপিসারে বললাম, ‘এবারই শেষ না। সামনের বছর ফিরছি আবার।’

কিভাবে যাবেন

সড়কপথ, জলপথ দুভাবেই যাওয়া যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় জলপথে গেলে। ঢাকা থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পিরোজপুরের ‘হুলারহাট’-এর উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে যায়। পরদিন সকালে পৌঁছে যাবেন বানারীপাড়া। কেবিন ভাড়া ডাবল ২০০০ টাকা, সিঙ্গেল ১০০০ টাকা। ডেক ১৮০ টাকা। এরপর ট্রলারে করে ভিমরুলী। ভাড়া নেবে ১২০০-১৫০০ টাকা (৫-৬ ঘণ্টার জন্য)।

আর সড়কপথে যেতে চাইলে ঢাকার গাবতলী থেকে প্রতিদিন বরিশালের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৪০০ টাকা। বরিশাল থেকে বাসে বানারীপাড়া যেতে পারবেন। এরপর ট্রলারে করে যথারীতি ভিমরুলী। সূত্র : কালের কণ্ঠ