Home » বাছাইকৃত » প্রথমে লুভাছড়া তারপর বিছনাকান্দি
বিছনাকান্দিতে মেঘালয়ের পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে

প্রথমে লুভাছড়া তারপর বিছনাকান্দি

আবদুল মোমেন রহিত
ঘড়ির কাঁটাকে ঠিক এক বছর পিছিয়ে দেওয়া যাক প্রথমেই। নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে সিলেটের লুভাছড়া আর বিছানাকান্দির কিছু ছবি দেখে মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু বিছনাকান্দির ছবিসহ বেশ তথ্য পেলেও ঝামেলা বাধাল লুভাছড়া। মাত্র একটা ছবি ছাড়া কোনো তথ্যই জোগাড় করতে পারছিলাম না। শেষমেশ মাত্র একটা লিঙ্কে অল্প কিছু তথ্য পেলাম। জানলাম সিলেটের কানাইঘাটে এর অবস্থান। ব্যস, হয়ে গেল। ঈদের ছুটিকে কাজে লাগালাম লুভাছড়া আর বিছনাকান্দি দেখে আসার জন্য।

৩১ আগস্ট ২০১৪, রাত ৯টা। ইমরান ভাই আর আমি দুটি মোটরসাইকেলে চেপে যাত্রা শুরু করলাম কুমিল্লা থেকে। সিলেটের দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। রাতের হিমেল হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছিল। তাই কিছুক্ষণ পরপর দাঁড়িয়ে চা-বিরতি। আনুমানিক রাত ২টায় সিলেট শহরে ঢুকলাম। দরগাহ গেটে সারলাম রাতের খাবার। এর পরই শুরু হলো বিপত্তি। অত রাতে কোনো হোটেলই খোলা ছিল না। সঙ্গে বাইক থাকায় পুরো শহর চষে ফেললাম। শেষমেশ কেবল পাঁচ-ছয় ঘণ্টার জন্য উঠে পড়লাম খরুচে হোটেল তালতলার নিরভানা ইন-এ। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় যেতে যেতে ভোর ৫টা।

বিছনাকান্দিতে মেঘালয়ের পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে

বিছনাকান্দিতে মেঘালয়ের পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে

ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়াই ছিল। সাড়ে ৮টায় উঠে ঝটপট রেডি হয়ে নিচে নেমে দেখি আমাদের জন্য সুন্দর বুফে নাশতার ব্যবস্থা। খাবার সুস্বাদু হলে আর কিছু মনে থাকে না আমার। ফলে খিচুড়ি দিয়ে শুরু করে ডিম, পরোটা, কর্ন ফ্লেক্স, জুস কোনোটাই বাদ গেল না। শেষ হলো ব্ল্যাক কফি দিয়ে।

ঠিক করলাম প্রথমে লুভাছড়া যাব। সিলেট শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। ঠিক ১০টায় জাফলংয়ের রাস্তা ধরলাম। মোটামুটি ৪৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর পৌঁছলাম দরবস্ত বাজার বাস স্টেশন। এবার পূর্বদিকে, অর্থাৎ ডানে মোড় নিলাম। এই রাস্তায় কিছু দূর যাওয়ার পর এক জায়গায় এসে একটা দৃশ্য দেখে আরেকটু হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছিলাম।

চোখ জুড়িয়ে গেল। মেঘ যেন পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে পড়েছে।

প্রায় ১৫ কিলোমিটার রাইড করে কানাইঘাটে চলে এলাম বেশ সহজেই। রাস্তা মোটামুটি, মাঝেমধ্যে কিছু ভাঙা আছে। চিন্তায় ছিলাম মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে সঠিক দিকনির্দেশনা পাব কি না। কিন্তু প্রথম যাকে জিজ্ঞেস করলাম সেই ঠিকঠাক রাস্তা বাতলে দিল। তবে এখান থেকে রাস্তা পুরোটাই কাঁচা। একেবারে কাদা-পানিতে মাখামাখি। কিছুদূর গ্রামের রাস্তায় গিয়ে হাতের বাঁয়ে একটা গেট দিয়ে ঢুকতে হলো আমাদের। আর ঢুকেই অদ্ভুত সুন্দর এক দুনিয়ায় চলে এলাম। চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ।

এভাবে কিছুদূর গিয়েই লুভাছড়া চা বাগানে। টিলার ওপর চা বাগান, সুনসান প্রকৃতি সব মিলিয়ে ভালোলাগা এবার দিগুণ হলো। কিছু দূর গিয়েই সুন্দর এক ব্রিজ। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশরা এটা তৈরি করেছে। বাগানের চা পাতা ভারতে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য। একসময় চলে এলাম বাগানের গেটে।

এটি আসলে চার রাস্তার মোড়। এখন ডানে যেতে হবে। এই রাস্তা ধরে ১ কিলোমিটার গিয়ে পৌঁছলাম লুভাছড়া নদীর পারে। সাজু নামের অল্প বয়স্ক এক মাঝিকে পেলাম সেখানে। এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। বাইক দুটি সাজুর বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। এবার নৌকা ভ্রমণ। গন্তব্য জিরো পয়েন্ট। পানিতে মেঘের খেলা। মেঘালয়ের অপরূপ পাহাড়গুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কিন্তু কিছু দূর যেতেই আর সামনে যাওয়ার অনুমতি মিলল না। বাংলাদেশের সীমান্ত শেষ। নদীটি এখানে ভারতে প্রবেশ করেছে। আমরা ফিরতি রাস্তা ধরলাম। ১ ঘণ্টা লাগল আমাদের ঘুরে আসতে। অথচ মনে হচ্ছিল বুঝি বা ১০ মিনিটেই ফুরিয়ে গেল পুরো সময়টা।

একটা চা বিরতি দিয়ে আবার যাত্রা। ঘড়িতে তখন প্রায় ২টা বাজে। এক টানে দরবস্ত স্টেশন থেকে ডানে মোড় নিয়ে তিন কিমি পরের স্টেশন সারিঘাট। সেখান থেকে বাঁয়ে ঘুরে বাইক ছোটালাম গোয়াইনঘাটের রাস্তায়। গোয়াইনঘাট পৌঁছে জিজ্ঞেস করে বিছনাকান্দির দিকনির্দেশনা নিয়ে আরো ১০ কিলোমিটার সোজা এগিয়ে ডানে মোড় নিয়ে ধরলাম হাদারপাড়ের রাস্তা। তবে আপনারা যদি সরাসরি সিলেট থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে আসেন, তাহলে এখানে বাঁয়ে মোড় নেবেন। শহর থেকে বিছনাকান্দি পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

হাদারপাড় যখন পৌঁছলাম, তখন ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছে পেট। হোটেল পানসীতে খেয়েই আবার যাত্রা। দেড়-দুই কিলোমিটার পর একটা নদী পার হলাম। বাইক দুটি পার করলাম নৌকায় উঠিয়ে।

তারপর কাঁচা রাস্তা দিয়ে কিছুটা সময় চলে পাহাড়ের কোলে বিশাল এক মাঠে এসে পড়লাম আমরা। সামনে বিশাল মাঠ আর দূরে পাহাড়ের হাতছানি। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। মাঠ থেকে নেমেই ছোট্ট একটা বালুর তট। তারপর পিয়াইন নদী পেরিয়েই বিছনাকান্দি। বালুর তটে বাইক রেখে আমরা নৌকায় উঠে পড়লাম।

গভীরতা খুব বেশি না। কয়েক মিনিটেই নৌকা আমাদের বিছানাকান্দির পাথরের ওপর নামিয়ে দিল। এটা আসলে একটা পাথরের কোয়ারি। বিশেষ করে বর্ষায় ঝিরিটাতে যখন পানি থাকে বেশি, তখন অদ্ভুত লাগে দেখতে। তখন শেষ বিকেল।

জায়গাটি আসলেই খুব সুন্দর। আমাদের রাতের ভ্রমণ, তিন ঘণ্টার অপর্যাপ্ত ঘুম, সারা দিনের একটানা জার্নি সব ক্লান্তি মিলিয়ে গেল বিছনাকান্দি এসে। সব কষ্ট সার্থক। অন্যমনস্ক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সোজা হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়েছি! বিজিবির চেঁচামেচিতে হুঁশ ফিরল। খরস্রোতা পাহাড়ি ঝিরিটির পানি একুরিয়ামের মতো স্বচ্ছ। ব্যস, শুরু করলাম দাপাদাপি। গোসলটোসল করে ফ্রেশ হয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ততক্ষণে সূর্য মামাও বিদায় নিয়েছে। পাহাড়ের কোলে গোধূলি যে এত রহস্যময় হয়, তা আগে জানতাম না। বান্দরবানে অনেক গোধূলিই দেখেছি, কিন্তু সব কয়টা পাহাড়ের ওপর থেকে। পাহাড়ের কোলে এই প্রথম। কেমন থমথমে হয়ে গেল চারদিক। নাকি প্রকৃতি আমাদের ছাড়তে চাচ্ছে না! ছবি : ইমরান। সূত্র : কালের কণ্ঠ