Home » ডিটিসি ভ্রমণ বার্তা » ভালোবাসার ফুল ফুটছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে
দুর্লভ আমাজন লিলি ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার সকালে তোলা l সাজিদ হোসেন

ভালোবাসার ফুল ফুটছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে

Amajan-Lili2

ইফতেখার মাহমুদ
ছিল তারা ব্রাজিলের আমাজান নদীতে। গত শতকের ষাটের দশকে আসে এই বঙ্গে। আজ অবধি আছে তারা। তবে সংখ্যায় অল্প। নাম তাদের আমাজান লিলি। ষাট থেকে নব্বই দশকে দেশের অনেক স্থানেই তাদের ভাসানো হয়েছিল। মানে তাদের চারা রোপণ হয়েছিল অনেক এলাকার জলকাদায়। কিন্তু কোনো এক অভিমানে বা যন্ত্রণায় তারা বাঁচেনি। এখন আছে শুধু পুরোনো ঢাকার ওয়ারীর বলধা গার্ডেন ও মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। গত সপ্তাহে মিরপুরের জাতীয় উদ্যানের বিশাল সবুজ থালার আকৃতির পাতার সন্নিবেশে আমাজান লিলি ফুটতে শুরু করেছে।

দুর্লভ আমাজন লিলি ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার সকালে তোলা l সাজিদ হোসেন

দুর্লভ আমাজন লিলি ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার সকালে তোলা l সাজিদ হোসেন

দুর্লভ আমাজন লিলি ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার সকালে তোলা l সাজিদ হোসেনমিরপুর জাতীয় উদ্যানের আমাজান লিলি ফুলের চৌবাচ্চাটির সামনে প্রতিদিনই প্রকৃতিপ্রেমীরা একনজর দেখতে আসেন। অল্প অল্প করে ফুটতে থাকা ওই ফুল দেখাটাই অনেকের কাছে আনন্দের। গত মাসের টানা বৃষ্টির পরশে আমাজান লিলির পাতাগুলোও এবার আরও গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। ফুলটির শুভ্রতাও যেন অন্য বছরের চেয়ে বেশি। গত বৃহস্পতিবার শাপলা-জাতীয় ওই ফুলটি দেখতে গেলে হাসিমুখে জানান জাতীয় উদ্যানের মালি আবদুল মালেক।

কবে, কী করে, সুদূর ব্রাজিল থেকে জাতীয় উদ্যানে এই ফুল এল—সেই ইতিহাস জানতে চাইলে নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা জানালেন, ষাটের দশকে বরিশালের এক প্রকৃতিপ্রেমী ডা. এম আহমেদ দক্ষিণ আমেরিকার কোনো এক দেশ থেকে এই ফুলের চারা নিয়ে আসেন। বরিশাল শহরে তাঁর বাড়ির পুকুরে ওই ফুল রোপণ করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষকে কিছু চারা দেন তিনি। বলধা গার্ডেন থেকে ১৯৯৪ সালে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ওই চারা নিয়ে আসা হয়।

ডা. এম আহমেদ চেয়েছিলেন শাপলা ও পদ্ম ফুলের মতো আমাজান লিলিতে ভরে যাক বাংলাদেশের পুকুর, বিল, ঝিল, হাওর-বাঁওড়। কিন্তু তাতে বাদ সাধে খোদ বাংলার প্রকৃতি। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়ায় প্রতিবেশ আমাজান লিলির জন্য উপযোগী। আমাজান লিলির জন্য স্বচ্ছ পানির নিরবচ্ছিন্ন ধারা থাকতে হয়। শীতকালে মাঝারি শীত ও প্রচণ্ড খরতাপের গ্রীষ্ম না হলে আমাজন লিলি বাঁচে না। বাংলাদেশে স্বচ্ছ পানির জলাভূমি এমনিতেই কম। যা আছে তা-ও যেভাবে দূষিত হয়ে যাচ্ছে, তাতে দেশি ফুল ও উদ্ভিদেরই প্রাণ যাওয়ার উপক্রম। সুদূরের অতিথি আমাজান লিলি আর কীভাবে বাঁচবে এখানে।

রাজধানীর শিশুপার্কের পুকুরে, রমনা উদ্যানের লেকে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক পুকুরে আমাজান লিলির চারা রোপণ করা হয়। শেরপুর, নওগাঁ, ময়মনসিংহেও এই ফুলের চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু কোনোটাই টেকেনি। রাজধানীর বলদা গার্ডেনের আমাজান লিলিগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই। চারপাশে আলো-বাতাস আটকে বহুতল ভবন নির্মাণ হওয়ায় সেখানে আমাজান লিলিগুলো কত দিন টিকবে, তা নিয়ে প্রকৃতিবিদদের রয়েছে সংশয়।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সাবেক প্রধান উদ্ভিদবিদ শামসুল হক জানালেন, আমাজান লিলি ভারী বর্ষণমুখর বর্ষায় ফুটে। তাই জুলাই-আগস্টে এর প্রস্ফুটন শুরু হয়। নভেম্বরে তাপমাত্রা ও বৃষ্টি কমে গেলে এর বিশাল পাতাগুলো মরতে থাকে। ফুলও ঝরতে থাকে। ফেব্রুয়ারিতে পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে এর বীজ পড়ে থাকে। কাদার মধ্যে থাকা অবস্থায় তাপমাত্রা টানা ৩৪ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাতে অঙ্কুরোদ্গম হয়। পরের বছর আবারও মে-জুনে বৃষ্টি বাড়লে এর পাতা বড় হতে থাকে এবং ফুল ফোটে।

দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশেই এই ফুলটি ভালোবাসার প্রতীক। প্রেমিকাকে ভালোবাসা জানাতে বা বিয়ের অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে উপহার হিসেবে আমাজান লিলি দেওয়া হয়। পেরুর অধিবাসীরা বিশ্বাস করে, আমাজান লিলি ফুলের বীজ প্রাণশক্তিবর্ধক। সেখানে আমাজান লিলির বীজ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সূত্র : প্রথম আলো