Home » রকমারি » মৃত্যু নিষেধ!

মৃত্যু নিষেধ!

মৃত্যু মানুষের অমোঘ নিয়তি। তার পরও অবুঝের মতো কোনো কোনো এলাকায় মরার ওপর জারি আছে নিষেধাজ্ঞা। যদিও এসব নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওপারের ঠিকানায় পাড়ি জমায় মানুষ। মরতে মানা এমন কিছু অদ্ভুত জায়গা নিয়ে ফিচারটি তৈরি করেছেন জুবায়ের হোসেন

জাপানের পশ্চিমের একটি খুদে দ্বীপ ইতসুকুসিমা। দ্বীপটির হাজার দুয়েক অধিবাসীর বেশির ভাগই প্রাচীন শিনতো ধর্মের অনুসারী। শিনতো ধর্মের মূল ভিত্তি হলো শুদ্ধতা। ইতসুকুসিমা দ্বীপটি তাদের মতে পবিত্রতম স্থান। আর তাই এখানকার ধর্মগুরুরা ভাবেন, দ্বীপে কারো মরণ হওয়া মানে পবিত্রতা নষ্ট হওয়া। আর এ জন্য ইতসুকুসিমা দ্বীপে অধিবাসীদের মরতে মানা! তাই বলে অমৃত পান করিয়ে তাঁদের তো আর চিরদিন বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আর সে রকম কোনো পন্থাও এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই কারো মরণাপন্ন অবস্থা হলে দ্বীপের ত্রিসীমানায় তাঁকে আর থাকতে দেওয়া হয় না। ধর্মগুরুরা সব সময় তক্কে তক্কে থাকেন। কেউ বেশি বুড়িয়ে গেলে বা অতিরিক্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে সময় থাকতে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি গর্ভবতী মহিলাদের সন্তান জন্ম দিতে হয় মূল ভূখণ্ডের বাইরে। ১৮৭৮ সাল থেকে এই নিয়ম চলে আসছে। দ্বীপের মাটিতে কোনো কবর দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তার পরও কালেভদ্রে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ঠিকই দ্বীপে।

Death-Band

লংইয়ারবেন, সবার্দ দ্বীপ

ইতসুকুসিমার ইতিহাসে যুদ্ধ হয়েছিল মাত্র একবার। অনেক অনেক দিন আগে সে লড়াইয়ে মারা যায় অনেক মানুষ। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই মৃতদেহ বাইরে সরিয়ে ফেলা হয়। যেসব দেয়ালে রক্ত লেগেছিল, সেগুলো ঘষে তুলে ফেলা হয়। রক্তমাখা মাটি কোদাল দিয়ে চেঁছে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই মরণের ওপর চলে আসছে এই নজরদারি!

এদিকে ইতালির ফালসিয়ানো দেল মসসুকো শহরে ২০১২ সাল থেকে মরা নিষিদ্ধ। তবে তাদের গল্প খানিকটা আলাদা। এখানকার মেয়র বেচারা পড়েছেন চরম জায়গা সংকটে। ছোট্ট গ্রামের পুরনো কবরস্থানটা আগেই ভর্তি হয়ে গেছে। নতুন কবর বানানোর জায়গাও নেই। উপায়ান্তর না দেখে তিনি আইন জারি করলেন, শহরের অধিবাসী এবং ঘুরতে আসা অতিথিদের মরা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ! নতুন কবরস্থান তৈরির আগ পর্যন্ত না মরার মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধও করেন তিনি জনসাধারণকে। অভিনব আইনটি নিয়ে শহরবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তখন সংবাদপত্রে এক সাক্ষাৎকারে মেয়র বলেছিলেন, ‘নতুন এই আইনে সবাই খুশি। যদিও দুজন প্রৌঢ় এরই মধ্যে আইন ভঙ্গ করে পরলোকগমন করেছেন!’

নরওয়ের সবার্দ দ্বীপের লংইয়ারবেনে সমস্যা একটু ভিন্ন। স্থানীয় কবরস্থানটি ৭০ বছর আগে মৃতদেহ গ্রহণ করা বন্ধ করে দিয়েছে। মাত্র এক হাজার ৫০০ লোকসংখ্যার শহরটি মারাত্মক কবর সংকটে ভুগছে। কারণ একটাই। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দেশে মৃতদেহ না পচে অবিকল রয়ে যায় যুগের পর যুগ। তাই এখানেও মরতে মানা। বাধ্য হয়ে সারা জীবন লংইয়ারবেনে কাটানোর পরও বুড়ো-বুড়িরা জীবনের শেষটা পার করেন অন্য কোনো শহরে গিয়ে। এখানে মারা গেলে যে কবরের মাটিটাও জুটবে না। তার পরও কেউ যদি মরেই যায়, তাহলে আর কী করা! মৃতদেহ জাহাজে করে দূরের কোনো শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই আজব সমস্যা বিজ্ঞানীদেরও আগ্রহী করে তুলেছে। জানা গেছে, শূন্যেরও অনেক নিচের তাপমাত্রায় এখানকার মাটি এমন এক অবস্থায় চলে যায় যে কবর দেওয়ার পর দেহে প্রাকৃতিকভাবে কোনো পচন ধরে না। তারা ১৯১৭ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে মরে যাওয়া এক ব্যক্তির মৃতদেহ পরীক্ষা করে দেখেছেন, দেহ তো বটেই, তাতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসও অবিকৃত রয়ে গেছে।

Death-Band2

ইতসুকুসিমা দ্বীপ

ব্রাজিলের সাও পাওলোর একটি শহরের মেয়র ২০০৫ সালে একটি আইন পাস করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, শহরের বাসিন্দাদের যখন-তখন মরতে মানা। আপাতদৃষ্টিতে প্রকৃতিবিরুদ্ধ হলেও নগরপিতার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। তাঁর অভিযোগ, নগরবাসী ঠিকমতো তাদের শরীরের খেয়াল রাখে না। ফলে অসময়ে মারা যায় অনেকে। চাপ পড়ে কবরস্থানের ওপর। এমনিতেও নদীবহুল এই শহরে স্থলভাগের পরিমাণ কম। ১৯১০ সালে তৈরি হওয়া স্থানীয় কবরস্থানটি প্রায় পূর্ণ। তাই শরীরের যত্ন না নিয়ে মরে গিয়ে অযথা উটকো ঝামেলা বাড়ালে মেয়রের রাগ হওয়ারই কথা। জানা গেছে, মেয়রের উদ্দেশ্য ছিল মৃতের আত্মীয়স্বজনকে চড়া অঙ্কের জরিমানা করা, প্রয়োজনে জেলে পুরে দেওয়া। ভাগ্যিস! এই আইন সরকারিভাবে পাস হয়নি।

ফ্রান্সের সাহপুসুক্স শহরেও সেই জায়গাসংক্রান্ত সমস্যা। কবরস্থানের জায়গা বাড়ানোর পরিকল্পনা কোর্টে পাস হয়নি। মেয়র চটে গিয়ে আইন করে দিয়েছেন, মরা নিষেধ। আর যারা মরার চেষ্টাও করবে, তাদের কপালে জুটবে কঠোর সাজা। তবে মরার পরে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে মেয়র পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। গুজব রটেছে, মৃতদেহ শোয়ানো হবে পেরেক বিছানো কফিনে। শহরের অধিবাসীরা এসব ভেবে আছেন শঙ্কায়! সূত্র : কালের কণ্ঠ