Home » বাছাইকৃত » সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়

সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়

লুবনা রহমান
ভ্রমণ বলতেই আমরা কেবল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পার্বত্য জেলা আর সিলেটের চা বাগান বুঝি। কিন্তু যারা ভ্রমণপিপাসু তারা ঠিকই খুঁজে নেয় নয়নাভিরাম দৃশ্য। সেই অর্থে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে দেখার মতো কী কী আছে তা অনেকের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। তবে এই পঞ্চগড়ে কিছু দিন আগেও ছিল না চা বাগান। অথচ এখন সমতল চা বাগানের সারি জেলাটিকে এনে দিয়েছে নতুন সৌন্দর্য। কিন্তু শুধু কি চা বাগানে থেমে আছে পঞ্চগড়? না, বরং বহু ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ পঞ্চগড়।

তাই দর্শনীয় স্থানগুলো জেনে নেয়া যাক-

Panchagar2

ভিতরগড় দুর্গনগরী

উপজেলা সদর দফতর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ভিতরগড় দুর্গনগরী প্রাচীন যুগের একটি বিরাট কীর্তি। প্রায় ১২ বর্গমাইলজুড়ে এই বিশাল গড় ও নগরীর অবস্থান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বর্তমান এ দুর্গনগরীর কিছু অংশ ভারতের মধ্যে পড়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ভিতরগড় পূর্ণ নির্মাণ করেন প্রাচীন কামরুনের শুদ্রবংশীয় রাজা দেবেশের বংশজাত পৃথু রাজা। সম্রাট হর্ষবর্ধনের সময় পৃথু রাজার অভ্যুদ্বয় ঘটে। তিনি কামরুপে পরাজিত হয়ে ভিতরগড় এলাকায় গমন করেন এবং নির্মাণ করেন এই গড়। ভিতরগড় দুর্গে একটি বড় দীঘি (মহারাজার দীঘি) ও কয়েকটি ছোট ছোট দীঘি আছে। ’মহারাজার দীঘি’ একটি বিশালায়তনের জলাশয়। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০দ্ধ৪০০ গজ। পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। জলভাগের আয়তন প্রায় ৪০০দ্ধ২০০ গজ। পানির গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট বলে স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস। পানি অতি স্বচ্ছ। দীঘিতে রয়েছে ১০টি ঘাট। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে ওই দীঘির পাড়ে মেলা বসে। ওই মেলায় কোনো কোনো বার ভারতীয় লোকের উপস্থিতি ল করা যায়।

বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট
Panchagarহিমালয়ের কোলঘেঁষে বাংলাদেশের সর্বোত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া। এই উপজেলার ১ নম্বর বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এই স্থানে মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্তসংলগ্ন প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, নেপালের সাথে বাংলাদেশের পণ্য বিনিময়ও সম্পাদিত হয় বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্টে। সম্প্রতি এ বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সাথে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটানের সাথেও এ বন্দরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্থলবন্দর, যার মাধ্যমে তিনটি দেশের সাথে সুদৃঢ় যোগাযোগ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে শিগগিরই ভারতের সাথে ইমিগ্রেশন চালু হতে যাচ্ছে। এটি চালু হলে পঞ্চগড় জেলা পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।

তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো
পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরে একটি ঐতিহাসিক ডাকবাংলো আছে। এর নির্মাণ কৌশল অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের। জানা যায় কুচবিহারের রাজা এটি নির্মাণ করেছিলেন। ডাকবাংলোটি জেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত। এর পাশাপাশি তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি পিকনিক কর্তার রয়েছে। ওই স্থান দু’টি পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় সৌন্দর্য বর্ধনের বেশি ভূমিকা পালন করছে। সৌন্দর্য বর্ধনে এ স্থান দু’টির সম্পর্ক যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মহানন্দা নদীর তীরঘেঁষা ভারতের সীমান্তসংলগ্ন (অর্থাৎ নদী পার হলেই ভারত) সুউচ্চ গড়ের ওপর সাধারণ ভূমি হতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচুতে ডাকবাংলো এবং পিকনিক কর্তার অবস্থিত। ওই স্থান থেকে হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চন জংঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বর্ষাকালে মহানন্দা নদীতে পানি থাকলে এর দৃশ্য আরও বেশি মনোরম হয়। শীতকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটে।

Advertisement

বারো আউলিয়ার মাজার
উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মির্জাপুর ইউনিয়নের বারো আউলিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ ভূমিতে অবস্থিত বারো আউলিয়া মাজার শরিফ। বারো আউলিয়া ওলিদের আগমনের ইতিহাস বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেলেও ওলিদের ইতিহাস রহস্যাবৃত। এদের লিখিত কোনো ইতিহাস আজো পাওয়া যায়নি। ১২ জন ওলি-সুফি-সাধক চট্টগ্রামের শহর প্রান্তে প্রথমে এসে আস্তানা স্থাপন করেন। সেই জায়গাটি আজো বারো আউলিয়া নামে প্রসিদ্ধ। জানা গেছে, ১২ জন ওলি খাজাবাবার নির্দেশে চট্টগ্রামসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। পরে স্থল পথে রওনা হয়ে ইসলাম প্রচার করতে করতে উত্তরবঙ্গের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেন এবং পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বারো আউলিয়ায় আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। আটোয়ারীর মাটিকে পুণ্যভূমিতে পরিণত করে সময়ের বিবর্তনে ওলিদের এখানেই সমাহিত করা হয়।

Panchagar3

মির্জাপুর শাহী মসজিদ
মির্জাপুর শাহী মসজিদটি আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (সম্ভাব্য) নির্মিত ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের সাথে মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণশৈলীর সাদৃশ্য রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হয় ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের সমসাময়িককালে এ মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। দোস্ত মোহাম্মদ এটির নির্মাণকাজ শেষ করেন বলে জানা যায়। মসজিদের নির্মাণ সম্পর্কে পারস্য ভাষায় লিখিত মধ্যবর্তী দরজার উপরিভাগে একটি ফলক রয়েছে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী ধারণা করা হয় মোগল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটির দেয়ালের টেরাকোটা ফুল এবং লতাপাতার নকশা খোদাই করা রয়েছে।

মহারাজার দীঘি
পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে পঞ্চগড় সদর উপজেলাধীন অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত একটি বড় পুকুর, বর্তমানে যা মহারাজার দীঘি নামে পরিচিতি। ‘মহারাজার দীঘি’ একটি বিশালায়তনের জলাশয়। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০দ্ধ৪০০ গজ। পানির গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট বলে স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস। পানি অতি স্বচ্ছ। দীঘিতে রয়েছে ১০টি ঘাট। ধারণা করা হয়, পৃথু রাজা এ দীঘিটি খনন করেন। কথিত আছে, পৃথু রাজা পরিবার-পরিজন ও ধনরতœসহ ‘কীচক’ নামক এক নিম্নশ্রেণীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে তাদের সংস্পর্শে ধর্ম নাশের ভয়ে ওই দীঘিতে আত্মহনন করেন। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে ওই দীঘির পাড়ে মেলা বসে। ওই মেলায় কোনো কোনো বার ভারতীয় লোকের উপস্থিতি ল করা যায়। এই বিশাল দীঘির চার পাশে রয়েছে অনেক গাছগাছালির সবুজের কারুকার্য, স্নিগ্ধ সমীরণ, সৌম্য শান্ত পরিবেশ, যা এখনো সবার কাছে বিরল মনে হয়। সূত্র : নয়া দিগন্ত