Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » স্থল পথে মায়ানমার

স্থল পথে মায়ানমার

Esmat Elahee
মায়ানমার কিভাবে যাব, মায়ানমার কি স্থল পথে যাওয়া সম্ভব? এই ধরনের প্রশ্ন সহকারে মায়ানমার সম্পরকিত কিছু পোস্ট আমি দেখেছি গ্রুপ এ, কিছু কিছু পোস্ট এ কমেন্টস ও করেছি। তাই ভাবলাম আমার সামান্য অভিজ্ঞতার আলোকে আজ লিখব, যদি কারও কাজে লেগে যায়।

প্রথমেই বলে রাখি, মায়ানমার যাও্য়ার ডিটেইলস প্রসিডিউর এখানে দেয়া নেই, এখানে শুধু আমি কিভাবে গিয়েছিলাম তা বর্ণনা করা আছে এবং তা শুধু স্থল পথে।

২০১৪ সালে মার্চ এর প্রথম সপ্তাহে আমরা সেইন্টমারটিন যাই বেডাতে, সেইন্টমারটিন পুলিশ কেম্প এর ইন-চারজ এর আমন্ত্রনে আমরা রাত এ বার-বি-কিউ ডিনার এ যাই, ওখানেই পরিচয় হয় টেকনাফ ইমিগ্রেশন পুলিশ এর ইন-চারজ এর সাথে এবং উনি আমাদেরকে প্রস্তাব দেন মায়ানমার ঘুরে আসার। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজন পুলিশ আফিসার হও্য়াতে তার যাওয়া সম্ভব ছিলনা। আগত্য আমরা ৩জন (বন্ধু ও ভাবি) সকাল ৮ঃ৩০ এ উপস্থিত হই ইমিগ্রেশন এ।

Miyanmarইমিগ্রেশন এ আমাদের মুলত কাজ ছিল Entry permit নেয়া এবং অন্যান্য ফরমালিটিজ।

Entry permit করতে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রের দরকার ছিল ০১, জাতীয় পরিচয় পত্র ০২, ছবি আগের রাতেই আমারা জাতীয় পরিচয় পত্র ও ছবি রেডি করে রেখেছিলাম, আমার জাতীয় পরিচয় পত্রের কোন কপি সাথে না থাকাতে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ফটোকপি সংযুক্ত করি, কোন ঝামেলা ছাডাই আমারা Multiple entry permit পেয়ে যাই ( সব মিলিয়ে আমাদের ১ ঘন্টার মত সময় লাগে এবং Multiple entry permit ফী ও আসা-যাওয়ার বোট ভাডা মিলিয়ে আমাদের ১৮০০/ ২০০০ টাকা খরচ হয় মাথাপিছু) ইমিগ্রেশন থেকে আমাদের কে বলা হয় মোবাইল ও ক্যমেরা না নিতে এবং ব্যাগ এ যথা সম্ভব কম জিনিস পত্র নিতে, এবং টাকা নেয়ার লিমিট ছিল মাথা পিছু সরবোচ্চ ৫০০০ টাকা । আমারা আমাদের সমস্ত জিনিস পত্রের সাথে ওয়ালেট, ক্যমেরা, মোবাইল সব রেখে যাই। শুধু সাথে ছিল ৫০০০ টাকা।

মায়ানমার আসা-যাও্য়ার বোট এবং জ়েটী ওখানেই হওয়াতে আমারা বোটের টিকেট কেটে ( আসা-যাও্য়া ) ছাউনি বিহীন কাঠের বোট এ চডে বসি।

যা হোক শেষ পরযন্ত আমরা রওনা হই, আমাদের বোট নাফ নদীর তীব্র স্রোত উপেক্ষা করে এগিয়ে চলে আর আমরা ছাউনি বিহিন বোটের ডক এ তীব্র রোদ এ আমাদের চামডা পুডিয়ে মায়ানমার কে কল্পনা করতে থাকি।

১ঃ ৩০ মিনিটের ও বেশি রোদে পুডে অবশেষে আমরা মায়ানমার এর মংডু শহর এর জেটি ঘাট এ উপস্থিত হই।

ছোট জেটী। আমাদের কে বসতে বলা হয় জেটির উপর পুকুর ঘাট এর সিডির মত পাকা বেঞ্চ এ, entry permit গুলু নিয়ে সবার মুখের সাথে মিলিয়ে নেয়া হয়, নাম বলার পর আমরা হাত তুলে নিজের উপ্সথিতি নিশ্চিত করি। এর পর নিখুতবাবে দেহ তল্লাসি করা হয়, শুধু পুরুষ দের এবং শেষে এক টা অফিস ঘর এ নিয়ে যাওয়া হয় এবং entry permit মিলিয়ে সবার ছবি তোলা হয়।
একটা বিষয় খেয়াল করলাম মংডু তে লোকজন লোকাল বাংলা বললেও ইমিগ্রেশন অফিসাররা বাংলা বলতে পারেনা একজন দোভাষী রেখেছে, এমন কি ইংরেজি ও সবাই পারে না।

ইমিগ্রেশন অফিসাররা জেটীতে নগ্ন টেবিল এ বসে কাজ করছিল। আমদের পারমিট এ সিল মারার আগে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয় আমরা কোন হোটেল এ থাকব। আমাদের থাকার ইচ্ছা ছিল না তাই বললাম আমরা আজকেই চলে যাব, তখন বলা হলো যদি আজকেই চলে যাই তাহলে ১৫ঃ০০ টার মধ্যে আসতে হবে জেটিতে। সময়ের কথা যখন বলল আমি দেওয়াল ঘড়িতে তাকালাম, দেখলাম দুইটা ঘড়ি, একটাতে বাংলাদেশ টাইম আরেকটা তে মায়ানমার স্ট্যান্ডার্ড টাইম। মায়ানমার স্ট্যান্ডার্ড টাইমের সাথে আমার হাত ঘড়ি ৩০ মিনিট পিছিয়ে আছে, মিলিয়ে নিলাম যাতে যথাসময়ে জেটিতে আসতে পারি। সিল পড়ল এবং আমাদের জানিয়ে দেয়া শহরে ঢুকার মুখে যে ইমিগ্রেসন অফিসটা পডবে ওখান থেকে আরেকটা সিল নিতে যাতে অনুমতি থাকবে মায়ানমার কয়দিন থাকতে পারব তার। গেলাম, তিন দিন থাকার অনুমতি দেয়া হলো।

আমারা হেটেই শহরে ঢুকলাম।

ছোট শহর, রাস্তাগুলো প্রশস্ত, দেখলাম প্রচুর স্কুটি, ভেসপা আর সাইকেল, গ্রাম্য শহরের তুলনায় স্কুটি আর ভেসপা একটু বেশিই মনে হল।

পুরুষদের সবাইকে দেখলাম শার্টের উপর লুঙ্গি পরতে। আমরা বড় বাজারে গেলাম ঘুরলাম, দেখলাম। কেনাকাটা করতে গিয়ে বুঝলাম টাকা ভাঙ্গাতে হবে, মানিএক্সচেঞ্জ তথা লোকাল ভাষায় ‘‘বাট্টার দোকান’’ থেকে বাংলাদেশি ২০০০ টাকা দিয়ে ২৪০০০ কিয়াত নিলাম।

একটা অদ্ভুত বাহন পেলাম ‘‘চইক্ষা’’ ( দুইটা হুইল চেয়ার যদি একটার সাথে আরেকটা পিঠ দিয়ে লাগানো থাকে আর একপাশে যদি একটা সাইকেল লাগানো হয় তাহলে যে রকম হবে ‘‘চইক্ষা’’ হচ্ছে ও রকম।

যা হোক, আমারা সাইকেল বাজারে যাওয়ার জন্য একটা ‘চইক্ষা’ ভাড়া করতে গিয়ে ভাড়া চাইল ৩০০ কিয়াত, আমি ভড়কে গেলাম এত টাকা ভাড়া চাওয়ার কথা শুনে, পরক্ষণে বুঝলাম ৩০০ কিয়াত মানে বাংলাদেশি ২৫ টাকা মাত্র। চইক্ষাতে দুইটা সিট থাকাতে আমি সাইকেলের পেছনের অংশে বসলাম। সাইকেল বাজারে গেলাম, ঘুরলাম, শেষে গ্রামের দিকেও একটু গেলাম চইক্ষাতে চড়েই।

আমার বন্ধু পন করেছিল ওখানে ভাত খাবে না। কিন্তু আমার খুবই খেতে ইচ্ছা করছিল। একটা হোটেরে ঢুকলাম। শুধু আমার জন্যই অর্ডার দিলাম ভাত আর গরুর মাংসের। ভাল খাবার, সুস্বাদু। গোগ্রাসে খেলাম। আমার খাওয়া দেখে বাকি দুজনও খাওয়ার অর্ডার করল। তিনজনের বিল আসল ৪৫০০, মানে ৩৭৫ টাকা।

খাওয়া শেষে আমরা গুটি গুটি পায়ে রওনা দিলাম জেটির উদ্দেশে, পথে এক দল ভিক্ষুক-বাচ্ছা ঘিরে খরল। সবাইকে ৫০০ কিয়াত দিলাম। ৫০ কিয়াত করে পড়বে প্রতেকের ভাগে।

তারপর যথারীতি দেহ তল্লাশি শেষে বোট এ উঠলাম। পাড়ি জমালাম বাড়ির উদ্দেশ্যে।

বোটে এক ভদ্র মহিলা উঠল, বসল আমার পাশে এসে, জিজ্ঞেস করলাম বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন নাকি আন্টি? ( টেকনাফে আনেকে বিয়ে করেছে মংডু থেকে)। ভদ্র মহিলা জানালেন বাপের বাড়ি নয় শশুর বাড়ি গিয়েছিলেন। একটা টাসকী খেয়ে গেলাম। উনি কেমন মহিলা সামরিক শাসনের দেশে যার সশুরবাড়ি !!!!!। আন্টি বললেন ‘‘তোমার আঙ্কেলদের বাড়ি এখানে এবং ওরা যখন করাচি থাকত আমদের ফ্যামিলিও করাচি থাকত, আমাদের বিয়েটা ওখানেই।’’

জানলাম ওনার বাসা চট্টগ্রামেরএর চান্দগাঁও আবাসিকে।

ওই আন্টির সাথে গল্প করতে করতে বাকী পথ টুকু পাড়ি দিলাম।

(বিঃ দ্রঃ মায়ানমারে সামরিক শাসন, নিয়ম যেনে নিন যাওয়ার আগে, নিয়ম মেনে চলুন। ও দেশে গিয়ে বেফাস কোন মন্তব্য না করাই মঙ্গল জনক হবে।) সূত্র : লেখকের ফেসবুক থেকে।