Home » পপুলার ডেস্টিনেশন » ঐতিহ্যের নওগাঁ

ঐতিহ্যের নওগাঁ

মাসুম সায়ীদ
নির্জন কালো পথ। পড়ে আছে নিথর। বৃষ্টি ভেজা। তারই বুক বেয়ে আমরা চলছি তীরের বেগে। দেখতে দেখতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে সবকিছু পথের ধারে প্রাচীন-অর্বাচীন সব গাছের সারি। জড়াজড়ি করে থাকা লতাগুল্ম। ছোটখাটো বাজার। বন্ধ দোকানপাট। ঘুমন্ত কুকুর। হোটেলে সদ্য জ্বালানো চুলার ধুঁয়া, আশ্বিন-কার্তিকের আগাম কুয়াশার বার্তা আর আত্রাই ব্রিজ। দু একজন যাত্রী নামছে। সেই সুযোগে উঠে পড়ছে দু-একজন। এরা সাপাহার যাবে। সাপাহার আর বেশি দূরে নয়।

Nagoan

একটা ব্রিজ দেখে নদীটার নাম জিজ্ঞেস করলাম বনেটে বসে থাকা একটা লোককে। ‘এটাও আত্রাই ব্রিজ! এর আগেও একবার পাড় হয়ে এসেছেন’ হেসে বলল লোকটা। পথের দুধারে ধানের ক্ষেত। এই ধানই এখানকার প্রধান ফসল। শুকনো মৌসুমে পানি সংকটের কারণে ইরিটা জুৎসই হয় না। আরো একপশলা বৃষ্টি নামল। আর পুরো সকালটা রইল কাজল মেখে। ইলশেগুড়ি বৃষ্টি মাথায় আমরা বাস থেকে নামলাম। দশ জনের দল। ফেইস বাংলাদেশ আর ব্রাজকের যৌথ উদ্যোগ এটা। দলনেতা ফেইস বাংলাদেশের শাহিন ভাই। সাপাহারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সোহেল ভাই একসময়কার সাংবাদিক অধুনা স্থানীয় কলেজের আইটি শিক্ষক। ব্যাগ-বোচকাসহ দেখবার মতোই আমরা। কৌতূহলী অনেক চোখের সামনে দিয়ে ঢুকতে হলো হোটেলে। খিচুরি, রুটি-পরটা আর ভুনা মাংসের গন্ধে ক্ষুধা চাগিয়ে উঠল। হোটেলের পাশেই একটা পাবলিক টয়লেট। সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে। সে কাজকর্মও সারা গেল বেশ আরামেই।

নাস্তা পর্ব শেষ হলো। অটোরিকশা করে রওনা হলাম দীবর দীঘির পথে। এ দীঘির ইতিহাস একাদশ শতকের। সেই সময় কোনো এক কৈবর্ত রাজা পাল বংশের রাজা দ্বিতীয় মহিপালকে লড়াইয়ে হারিয়ে দেয়। সেই জয়ের স্মারক এটা। ত্রিশ ফুট লম্বা। আস্ত একটা পাথর কেটে বানানো হয়েছে। নিচের দিকে নয় কোণবিশিষ্ট। প্রতিটি কোণের দূরত্ব ১২ ইঞ্চি। উপরের দিকে মিনারের মতো গোল। এটা মাটির নিচে আট ফিট। পুকুরের পানিতে ৮ ফুট। আর বাকিটা পানির উপর। পুকুরে একটা মাত্র ঘাট। দীঘি তো নয় যেন স্টেডিয়াম। সাড়ে পাঁচ একর জায়গা জুড়ে দীঘি। তারপর চারপাশে ধানি জমি। তার পর ক্রমশ উঁচু হয়ে যাওয়া টিলা। সবুজে মোড়া। মাঝে মাঝে তাল গাছ দাঁড়িয়ে। যেন গ্যালারির দর্শক। পানি দেখলেই আমরা হাঁসের বাচ্চা হয়ে যাই। এখানেও তাই হলা। শুধু নুমান ভাই আর আমি নামলাম না। বাকিরা সবাই। মাছধরার একটা নৌকা ছিল। তাতে বৈঠা ছিল না। লগি যেটা ছিল ওটা আসলে একটা বাঁশ! সেটা নিয়েই ব্রাজকগণ ছুটলেন স্তম্ভের দিকে। নৌকা বয়ে নিতে হলো না। বাতাস ঠেলে নিয়ে গেল। ফিরতি পথে মাঝি উদ্ধার করলেন সবাইকে। পুকুর থেকে উঠে চেপে বসলাম ছাদ খোলা একটা অটোতে। গন্তব্য সোহেল ভাইদের গ্রাম রূপগ্রাম। পিচ ঢালা গ্রাম্যপথ। সারি সারি তালগাছ। থোকায় থোকায় কাঁচা পাকা তাল। ভাদ্র মাস। তাই গাছের নিচেও পড়ে আছে দু’ চারটা।

রূপগ্রামে এসে অটো থামল। আমগাছের তলায় একটা চায়ের দোকান। চা পর্ব শেষ করে পাকা সড়ক ছেড়ে নেমে পড়লাম গ্রামের হালটে। পাড়ার মুখেই বাড়িটি। মাটির দেয়ালের দোতলা ঘর। সামনে একটা নিচু পাড় পুকুর। পানিতে টুইটুম্বুর। পিচ্ছিল আঠালো কাদামাটি পেরিয়ে ঘাটের পৈঠায় পা ধুয়ে আমরা ঘরের দাওয়ায় উঠলাম। এটা আমাদের রাতের আস্তানা। হেলাল ভাইয়ের বাড়ি। খুব পরিপাটি। মেঝেতে চাটাই বিছানো। একটা দেয়ালে শীতল পাটি ঝুলছে। বৃষ্টি বাদলার দিন হলে কী হবে? লেপাপোছা শুকনো খটখটে ঘর।

Nagoan2

রূপগ্রাম সত্যি রূপময়ী। হালটের দু পাশ দিয়ে বাড়ি। বাড়ি তো নয় যেন দুর্গ! মাটির উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। দেয়ালের উপরেই ঘর। একপাশে থাকার ঘর। অন্য পাশে রান্নাঘর খড়ির ঘর, গোয়ালঘর পরপর। দেয়ালের বাহিরে চাল দেয়া উন্মুক্ত গরুর ঘর। আঙ্গিনায় খড়ের পালা, বিচালির স্ত‚প, হাঁস-মুরগি, গরু-বাছুর, গরুর-গাড়ির কাঠের চাকা। আম-কাঁঠালের গাছ। তালবন, বাঁশঝাড় সব মিলে নিখাঁদ গ্রাম যাকে বলে! ছেলে-বুড়ো-মাঝারি লোকের একটা মিছিল নিয়ে আমরা গিয়ে হাজির হলাম মাস্টার মশাইয়ের খামারে। সূর্য তখনও মেঘের আড়ে। আমবাগান, সবজি ক্ষেত আর মৎস্য চাষের জন্য পুকুরÑ সব মিলিয়ে সমন্বিত একটা খামার সোহেল ভাই শুরু করেছেন সবে। অসাধারণ এক উদ্যোগ! কম্পিউটার সায়েন্স জানা একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এসে শিক্ষকতার পাশাপাশি খামার শুরু করবেন ভাবা যায়! পুকুর পাড়ে একটা মাঠের মতো ছিল। সেখানে শাহিন ভাই মেলা বসিয়ে দিলেন মোরগযুদ্ধ, পাতিল ভাঙা আর হাসি তামসায়। আর দিগন্ত জোড়া ধানের ক্ষেতে দামাল ছেলের হাতছানি তো ছিলই। বেলা দুপুর হয়ে গেল।

দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা সাপাহারে সোহেল ভাইদের বাসায়। এলাহী কাণ্ড! যেন জামাইষষ্ঠী! আস্ত পটোল জবা ফুলের পাতার মতো করে খাঁজ করে কেটে ভাজা হয়েছে। ডুবো তেলে ইলিশ ভাজা। বিলের কই মাছ, ডিম ভুনা আর দলনেতার প্রতিশ্রুত রাজহাঁসের মাংস। রেঁধেছেন সোহেল ভাইয়ের দুলাভাই। বাকি কয়টা দিন কেউ ভুলতে পারেনি সে রান্নার স্বাদ।

সাপাহার বাজারে বটের ছায়ায় চা খেয়ে রওনা হলাম জবাই বিলের দিকে। দিনটা ভালোই ছিল। বিলের ধারে যেতে না যেতেই নামল বৃষ্টি, সাথে দমকা বাতাস। শান্ত বিল পরিণত হলো উত্তাল সমুদ্রে। বিলের মধ্য দিয়ে সাপাহার থেকে আসা পথটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে কলমুডাঙ্গার দিকে। রাস্তাটা দেখবার মতো। একেবারে পানির নিচ পর্যন্ত সানে বাঁধানো। পাশে সারি সারি খুঁটি। খুঁটির গায়ে লাল ফ্লোরোসেন্ট রঙ। পথের মাঝামাঝিতে একটা উঁচু ব্রিজ। নৌকায় বিল পাড়ি দিয়ে আমাদের যাওয়ার কথা কলমুডাঙ্গা বাজারে। আজ হাটবার। হাটে বোল্ডার সাইজ রসগোল্লা পাওয়া যায়।

সানে বাঁধানো বটতলায় নৌকা ঘাট। ঘাটে নৌকা বাঁধা। ঢেউয়ে-ঢেউয়ে দুলছে পাতার মতো। ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির মধ্যে কোনো মাঝি নাও ভাসাবে সাহস করে? ছাতা আর রেইনকোট মুড়ি দিয়ে পিচঢালা পথে দাঁড়িয়ে, পায়চারী করে, সেলফি আর শখের ফটোগ্রাফিতে কাটছিল সময়। মাঝে মাঝে কানফাটানো শব্দ করে চলে যাচ্ছিল যাত্রীবোঝাই নছিমন-করিমন। অবশেষে শেষ বিকেলে বৃষ্টি থামল। বাতাসের দাপানি কম কিন্তু শীতল ছোবলটা তীব্র। নৌকা ছাড়ল। টের পেলাম তখন, যখন ফেইস বুকে ঢাকায় বসে একজন আরাম করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লোভ দেখাল। আর তাতেই তেষ্টা পেল চায়ের। আর তখনই দেখি ফ্লাক্সে থেকে চা ঢালা হচ্ছে। এই হলো শাহিন ভাই! কখন যে চমকে দেবেন বলা মুশকিল।

Nagoan3

পুরোটা বিকেল গেল বিলের ওপর। সন্ধ্যায় ঘাটে নামলাম। বাজারে ঢোকামাত্র ভিড় জমে গেল আমাদের ঘিরে। কৌতূহলী চোখেরও যে স্পর্শ আছে টের পেলাম আরও একবার। মিষ্টির সাইজ সত্যি নামের মতোই। একটাতেই ভরে গেল পেট। রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলে আমরা ফেরার জন্য নছিমনে উঠলাম। সাপাহার বাজারের সেই বটতলায় আরেক দফা চা পর্বের পর ফিরে এলাম রূপগ্রামে। এক দিন এক রাতের ক্লান্তি পুকুরের জলে ধুয়ে ঘরে ঢুকলাম। শুকনো, উষ্ণ মাটির ঘর। আমরা কয়েকজন উঠে গেলাম দোতলায়। আহ! কত দিন পর মাটির ওপর শীতলপাটিতে পিঠ!

পরদিন সকাল আটটার দিকে একটা মাইক্রোবাসে গাদাগাদি করে রওনা হলাম আমরা। গন্তব্য আলতাদীঘি। এটা ধামুরহাট উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে বংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে। নীরব নিঝুম গ্রামের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ। সদ্য বেড়ে ওঠা ছানা পোনাসহ শালিক, ঘুঘু, বুলবুলির ঝাঁক। পাতার আড়াল থেকে ভেসে আসছে হলদে পাখির ডাক। এর ভেতর দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আলতাদীঘি ফরেস্ট এলাকায়। একচিলতে শালবনটায় লেগে আছে আষাঢ়-শ্রাবণের আদর। একটা শিয়াল দিনদুপুরে উঠে এল রাস্তায়। আমাদের দেখে দিল ছুট। দুপুর বারোটায় দীঘির পাড়ের প্রাইমারি স্কুলের মাঠে আমরা গাড়ি থামালাম। উত্তর দক্ষিণে লম্বা এ দীঘির দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার আর প্রস্থে ৪০০ মিটার। দীঘির নামে জড়িয়ে আছে বটু রাজার কাহিনী। রানী আবদার করে ছিলেন দীঘির। আর রাজা মজা করে বলে ছিলেন হাঁটতে থাক, যেখানে পা ফেটে রক্ত বেরুবে সেখান পর্যন্ত দীঘি হবে। রানী হাঁটছে তো হাঁটছেই। রাজ্যের সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে পা ফাটে না। শেষে পায়ে কেউ আলতা মেখে দিল। ব্যস! দীঘির নাম আলতাদীঘি। আমরা পশ্চিম উত্তর পাড় ঘুরে পূর্ব পাড়ে এসে আমরা স্বচ্ছ নীল জলে গা ভাসালাম। তারপর শালবনের লালমাটিতে উই পোকার প্রাসাদ, আকাশচুম্বী সাদা ইউক্যালিপটাস গাছের গায়ে খোদাইকৃত প্রেমকাব্য দেখতে দেখতে চলে এলাম স্কুল মাঠে। দিঘীর পাড়ে বিশাল সাইজের কয়েকটি উঁইঢিবি। এতোবড়ো উঁইঢিবি জীবনে দেখেছি বলে সন্দেহ। পাহাড়পুরের লাল স্ত‚পের পেছনে আজকে আমাদের সূর্যাস্ত দেখার কথা।

Nagoan4

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচটা ছাড়িয়ে। আমরা বিহারের গেটে হুড়মুড় করে নেমে পড়লাম। তারপর ক্যামেরা হাতে ছড়িয়ে পড়লাম। সবুজ ঘাসের গালিচা সর্বত্র। ধর্মপাল বা দেবপাল যেই বানিয়ে থাকুক না কেন আমার আজকের দৃষ্টি খুঁজে মরছিল সেই হাজার বছর আগের প্রদীপ জ্বালা সন্ধ্যেবেলাটা যখন দিন শেষে ভিক্ষুরা ফিরতেন ধূলিমলিন পায়ে। তারপর যার যার কুঠুরিতে মগ্ন হয়ে পড়তেন ধ্যান আর জ্ঞান চর্চায়। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল ইংরেজি ছাপমারা একালের ইট। সংস্কার করার মাথামোটা প্রচেষ্টা! দেখে পিত্তি জ্বলে গেল। সন্ধ্যা যতই ঘনিয়ে আসছিল দর্শনার্থীর সংখ্যা তত কমছিল। এক সময় আবিষ্কার করলাম আমরাই শুধু আছি। আমরাও উঠে পড়লাম। সবুজ চত্বর আর জাদুঘরের আঙিনা পার হয়ে চলে এলাম রাস্তায়। গেটের সামনে সূর্যের জাফরানি রং গায়ে মেখে একটা গ্রুপ ছবি এ ট্রিপে নওগাঁর শেষ স্মৃতি। ছবি : ফরিদী নুমান