Home » ভ্রমণ » ঢাকা » ঢাকার ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থাপত্য

ঢাকার ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থাপত্য

মাহবুব মমতাজী
পুরান ঢাকার ধোলাইখালে একসময় হতো নৌকাবাইচ। এখন সেটি ইতিহাস। এ ছাড়াও পুরান ঢাকার কালের সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা থাকলেও কিছু কিছু রয়েছে অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে। একে একে ধ্বংস করা হচ্ছে পুরান ঢাকার নানা ঐতিহ্য। ব্রিটিশদের শাসন-শোষণের সাক্ষী হিসেবে পুরান ঢাকায় অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আছে। এই শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এই স্থাপনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চাশের দশকে বুড়িগঙ্গার পানিতে গোসল করা যেত। বিকালের স্নিগ্ধ গোধূলিতে বাকল্যান্ড বাঁধে বসা যেত। যেখানে ঢাকাবাসী বেড়াতে আসত। জানা যায়, ২০০৯ সালে সরকার ঢাকার ৯৩টি ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেখানে যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সংস্কার কাজেরও নেই তেমন কোনো উদ্যোগ।

Dhaka

লালবাগ কেল্লা

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো হলো- লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, রূপলাল হাউস, আর্মেনীয় গির্জা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারীবাজার, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, হোসেনী দালান, তারা মসজিদ, শায়েস্তা খাঁ জামে মসজিদ, বেগম বাজার মসজিদ, খান মুহাম্মদ মসজিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিনাত বিবির মসজিদ ও চকবাজার শাহী মসজিদ। এসব স্থাপনার দর্শন পাওয়া বর্তমানে অনেক দুরূহ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর অন্যতম হলো রূপলাল হাউস। রূপলাল দাস ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন এবং সেই সময় স্কলারশিপ পেয়েছিলেন ১০ টাকা। জানা যায়, রূপলাল একজন সংগীত অনুরাগীও ছিলেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার যতটুকু অংশগ্রহণ ছিল তার চেয়ে বেশি তিনি খরচ করতেন সংগীতের পেছনে। সেই সময় রূপলাল হাউসে নিয়মিত সংগীতের আসর হতো। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ওয়ালী উল্লাহ খান এবং লক্ষ্মী দেবীসহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি রূপলাল হাউসে সংগীত আসরে নিয়মিত আসতেন। ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সম্মানে নাচ-গানের আসর কোথায় হবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয় আহসান মঞ্জিল এবং রূপলাল হাউসের মধ্যে। এতে অনেক বেশি ভোটে বিজয়ী হয় রূপলাল হাউস। সেই সময় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে রূপলাল হাউসের আধুনিকীকরণ করা হয়। সেই সময় বিদেশিরা ঢাকায় এলে রূপলাল হাউসে কক্ষ ভাড়া করে থাকতেন। সেই যুগে কক্ষ প্রতি ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। ১৮৯৭ সালে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বাড়িটি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর প্রায় পঞ্চাশ বছর বাড়িটির অনেক অংশ প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

রূপলাল হাউসের এক পাশে সুন্দর বাগান ছিল যা ‘রঘুবাবুর বাগান’ এবং এক পাশে একটি পুল ছিল যার নাম ছিল শ্যামবাজার পুল। কালের বিবর্তনে অযত্ন- অবহেলায় এসব নষ্ট হয়ে যায়। এরপর নদীকে ঘিরে বাজার গড়ে উঠে যার নামকরণ করা হয় শ্যামবাজার। বাড়ির ভিতরের অংশে ইউরোপিয়ান অফিসার এবং ব্যবসায়ীরা থাকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের দিকে নদীর অংশটি ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে উঠে ফলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠলে তারাও জায়গাটি ত্যাগ করেন। রূপলাল হাউস তার রূপ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই আর এখন এর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্তির পথে। স্থানে স্থানে ভেঙে পড়েছে। মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ছাদে কার্নিশে এবং অন্যান্য স্থানে বটগাছ গজিয়েছে। কিন্তু বসবাসকারীরা এখনো নির্বিঘ্নে বসবাস করে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য দোকানপাটসহ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে মূল ভবনকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।

Dhaka2

আহসান মঞ্জিল

হোসেনী দালান ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। মহররম মাস এলে নিদর্শনটির গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আসা-যাওয়া শুরু হয় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের। মহররম মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিন সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইমামবাড়া ঢাকার হোসেনী দালান। জানা যায়, এটি নির্মিত হয় ১৬৪২ সালে সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলে। শাহ সুজার নৌবহরের এক অধিনায়ক (মীর মুরাদ) এ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তার পর পরই নির্মিত হয় হোসেনী দালান। এটি নির্মিত হয় মূলত কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে এবং হজরত ইমাম হোসেনের আত্দত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশেই। মীর মুরাদ শিয়া সম্প্রদায়ের ছিলেন। প্রথম দিকে এখানে ছিল ছোট আকারের স্থাপনা। পরবর্তীকালে প্রয়োজনের তাগিদে চলে এর সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ। এসবেরই ধারাবাহিকতায় এটি রূপ নেয় বড় স্থাপনায়। স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে। তখন এর সংস্কার করেন নবাব আহসান উল্লাহ। আর বর্তমান কাঠামোটি নির্মাণ করা হয় গত শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সরকারের সময়। এটি নির্মিত হয় প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর। এখানে দেখতে পাওয়া যায় মনোরম একটি দ্বিতল ভবন। এর উত্তরে রয়েছে প্রশস্ত চত্বর, আর দক্ষিণ দিকে পুকুর। পশ্চিমে রয়েছে তাজিয়া ঘর, সামনে দেউড়ি ও দ্বিতল নহবতখানা ইত্যাদি।

মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হলো লালবাগ কেল্লা। মোগল আমলে স্থাপিত এই দুর্গটির প্রথমে নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। সে সময় থেকে দুর্গটি লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। অনেকে মনে করেন এটি পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। আর তাই এর নামকরণ করা হয়েছে লালবাগ কেল্লা। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। জানা যায়, কেল্লার নকশা করেন শাহ আজম। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহ ১৬৭৮ সালে ঢাকার সুবেদারের বাসস্থান হিসেবে এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। দুর্গের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব দিল্লি চলে যান। এরপর নবাব শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তবে শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর এ দুর্গ অপয়া মনে করে ১৬৮৪ সালে এর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খাঁ আগ্রায় চলে যাওয়ার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান। তবে কেল্লার স্থাপনার মধ্যে পরী বিবির সমাধি বেশ উল্লেখযোগ্য। এটি মোগল আমলের একটি চমৎকার নিদর্শন।

বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ইমারতে মার্বেল পাথর, কষ্টিপাথর ও বিভিন্ন রঙের ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ ৯টি কক্ষ অলঙ্কৃত করা হয়েছে। কক্ষগুলোর ছাদ কষ্টিপাথরে তৈরি। মূল সমাধিসৌধের কেন্দ্রীয় কক্ষের ওপরের কৃত্রিম গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত। ২০.২ মিটার বর্গাকৃতির এই সমাধিটি ১৬৮৮ সালের আগে নির্মিত। এ ছাড়াও দর্শনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে লালবাগ কেল্লা মসজিদ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজম বাংলার সুবেদার থাকার সময় ১৬৭৮-৭৯ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। আয়তাকারে (১৯.১৯ মি:, ৯.৮৪ মি) নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি এ দেশের প্রচলিত মোগল মসজিদের একটি আদর্শ উদাহরণ। বর্তমানেও মসজিদটি মুসল্লিদের নামাজের জন্য ব্যবহার হয়ে আসছে।

ঐতিহ্যের সুরম্য আধার আহসান মঞ্জিল। আজকের বাংলাদেশ এককালে শাসন করেছে জমিদার, রাজা, নবাবরা। কালের বিবর্তনে তারা হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের পাতায় এখনো আছে তাদের সরব উপস্থিতি। আর তাদের স্মৃতি হিসেবে আজও টিকে আছে অসংখ্য স্থাপনা। সেসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম দর্শনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থাপনা হচ্ছে আহসান মঞ্জিল। এটি পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। একসময় এটি ব্যবহৃত হতো ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাচারি হিসেবে। আজ নবাব নেই। নেই নবাবী প্রথাও। কিন্তু নানা উত্থান-পতন ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে আজও টিকে আছে আহসান মঞ্জিল। বর্তমানে এটি একটি প্রত্নতাত্তি্বক জাদুঘর। জানা যায়, আঠার শতকের প্রথম দিকে জালালপুর পরগনার (বর্তমান ফরিদপুর-বরিশাল) জমিদার শেখ এনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রংমহল নামে চমৎকার একটি প্রমোদ ভবন তৈরি করেন। সে যুগের অসংখ্য সুন্দরী রমণীর স্থান হয়েছিল এই রংমহলে। দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি দেশের বাইরে থেকেও এসব সুন্দরীদের সংগ্রহ করা হয়েছিল। শেখ এনায়েতউল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র শেখ মতিউল্লাহ নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে রংমহলটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। ঢাকার তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত জমিদার খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩০ সালে ফরাসিদের কাছ থেকে কুঠিটি ক্রয় করেন এবং সংস্কারের মাধ্যমে নিজ বাসভবনের উপযোগ্য করে তোলেন। নবাব খাজা আলীমুল্লাহর মৃত্যুর পর তার ছেলে নবাব আবদুল গনি ১৮৬৯ সালে প্রাসাদটির পুনর্নির্মাণ শুরু করেন যা শেষ হয় ১৮৭২ সালে। নবাব আবদুল গনি তার প্রিয় পুত্র খাজা আহসান উল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে এখন পর্যন্ত সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি। এখানে ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টিতে গ্যালারি আকারে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয় নবাবদের ব্যবহৃত বিভিন্ন তৈজসপত্র, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, আসবাবপত্র, গার্হস্থসামগ্রী, মুদ্রা, চিত্রকর্ম প্রভৃতি। এ ছাড়া ১৯০৪ সালের আলোকচিত্রশিল্পী ফ্রিৎজকাপের তোলা ছবি দিয়ে ৯টি কক্ষ সাজানো হয়েছে। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন