Home » ফিচার » পঞ্চগড়ে ১৬শ’ বছরের প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গনগরী

পঞ্চগড়ে ১৬শ’ বছরের প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গনগরী

আসাদুজ্জামান আসাদ
আশপাশে নীরবতা। নেই মানুষের কোলাহল। ছায়াঢাকা, মায়াঘেরা শান্তিময় পরিবেশ। মাটি খনন করে তৈরী করা হয়েছে বিশাল দীঘি। দীঘিটির নাম ‘মহারাজার দীঘি’। দীঘির চার দিকে সুউচ্চ মাটির গড়। রয়েছে হরেক রকম গাছগাছালি। ছোট-বড় অসংখ্য প্রজাতির গাছ। গাছের ডালে জানা-অজানা অসংখ্য পাখির বাস। পাখির কণ্ঠে বাজে কিচিরমিচির সুর। মনোমুগ্ধ পরিবেশ দেখে সবাই থমকে দাঁড়ায়। ১৬ শ’ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভিতরগড় দুর্গনগরীর পরিবেশ এটি। নগরীটি বাংলাদেশে আবিষ্কৃত দুর্গনগরীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রায় ১৬ শ’ বছর আগে এখানে রাজা ছিল, রাজার বাড়ি ছিল, ছিল মানুষের কোলাহল। সেই রাজ্যে প্রজা, মন্ত্রী, উজির-নাজির, পাইক-পেয়াদা সৈন্য সবই ছিল। ছিল অসংখ্য মানুষের ভিড়। ছিল বড় বড় দালানকোঠা। এই দুর্গনগরী পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত।

Vitogar

ভিতরগড় দুর্গনগরীর ইতিহাস অনেক পুরনো। এটি ছিল পৃথু রাজার রাজধানী। রাজা তার রাজধানীকে শত্র“র আক্রমণ থেকে রার জন্য চার দিকে নির্মাণ করেন সুউচ্চ গড়। গড় মানে হচ্ছে, মাটির তৈরী সুউচ্চ প্রাচীর। এখনো সেই মাটির আলী বা প্রাচীর কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কথিত আছে, শত্রুর কবল থেকে আত্মরার জন্য পৃথু রাজা সপরিবারে ‘মহারাজার দীঘি’তে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।

দীঘির দৈর্ঘ্য ৮শ’ গজ ও প্রস্থ ৪শ’ গজ। খড়া মওসুমে যার পানির গভীরতা প্রায় ৬০-৭০ ফুট। দীঘির পানি খুবই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। দুই বছর পরপর দীঘিটি বিভিন্ন ব্যক্তি বা এনজিও লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে থাকে। মাঝে মধ্যে টিকিট কেটে বরশি দিয়ে মাছ শিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। টিকিটের মূল্য ১০০ থেকে ৩০০ টাকা।

ভিতরগড় দুর্গনগরীটির আয়তন প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার। এলাকা দেখলেই মনে হয় এটি একসময় রাজবাড়ি বা রাজসিংহাসন ছিল। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে স্থাপিত ভিতরগড় দুর্গনগরীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বর্তমানে চরম অবহেলা ও অযত্নে পড়ে রয়েছে। তদানীন্তন সময়ে স্বাধীন নগরী হিসেবে এখানে ব্যবসাবাণিজ্য চলত। ছিল রাজ্যের রাজসভা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা এই নগরীতে বসবাস করতেন। এখানে ছিল বহুমুখী সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র। তিব্বত, ভুটান, চীন, নেপাল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, বিহার ও পুণ্ড্রবর্ধনের সাথে এই নগরীর ছিল সুমধুর সম্পর্ক। এসব দেশের সাথে ভিতরগড় দুর্গনগরী সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ হতো।

বিভিন্ন সময় ভিতরগড় দুর্গনগরীর আশপাশে মাটি খনন করে অনেক মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় নেতাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ও মন্দির। মাটি খননকাজ চালিয়ে মন্দিরের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং ইটের গাঁথুনির ১৬টি স্তম্ভ পাওয়া গেছে। নির্মাণপদ্ধতি দেখে বোঝা যাচ্ছে এটি ‘গুপ্তযুগে’র। অর্থাৎ সপ্তম শতকের তৈরী। প্রাপ্ত স্থাপনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানে প্রতি বছর ছাত্র, শিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, বিভিন্ন কাবসহ অনেক পর্যটক আসেন। তারা দুর্গনগরীর সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য দেখে মনোমুগ্ধ ও বিমোহিত হন। দুর্গনগরীর বাইরের দু’টি গড় বা দেয়াল ছিল মাটির তৈরী এবং ভেতরের দু’টি গড় ছিল পাথর ও ইটের গুঁড়া দিয়ে নির্মিত। আমাদের দেশে যেসব দুর্গনগরী রয়েছে, তার মধ্যে ‘ভিতরগড় দুর্গনগরী’র বিস্তৃতি অনেক বেশি। এ কারণে এই নগরীকে দেশের সর্ববৃহৎ দুর্গনগরী বলা হয়ে থাকে। দুর্গনগরীর অমূল্য প্রত্নসম্পদ, অভ্যন্তরে অবস্থিত অসংখ্য প্রাচীন স্থাপত্যিক নিদর্শন মানুষের হস্তেক্ষেপে বিলীন হতে চলেছে।
দীঘির পানিতে সাঁতার কাটা কিংবা খাদ্য দিয়ে বড় বড় মাছ দেখার মজাই আলাদা। তবে অতীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভয় ছিল। ভয়ের কারণে এখানে কেউ গোসল করতে নামত না। অনেকে মনে করত, মহারাজার দীঘিতে ভূতের বাড়ি আছে। তবে এখন আর সেই দিন নেই।

Vitogar2

এখানে আসতে হলে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে নাইট কোচ, বিআরটিসি বা ট্রেনে আসতে পারেন। পঞ্চগড় শহরে সেন্ট্রাল প্লেজা, আমন্ত্রণ, হিলটন, রাজনগর, সার্কিট হাউজসহ অনেক থাকার জায়গা রয়েছে। এসব আবাসিক হোটেলে কম খরচেই রাতযাপন করা সম্ভব। এ ছাড়া মৌচাক, আমন্ত্রণ, করতোয়া, রহমানিয়া, কলাপাতা, নীরব প্রভৃতি হোটেলে রুচিসম্মত খাবারের সুব্যবস্থা রয়েছে।

পঞ্চগড় থেকে মাইক্রো, কার, মিশুক, রিকশা কিংবা ভ্যানে ভিতরগড় মহারাজার দীঘি যাওয়া যেতে পারে। মাইক্রো ও কারের ভাড়া তিন থেকে পাঁচ শ’ টাকা, মিশুক ভাড়া ২ শ’ টাকা এবং রিকশা কিংবা ভ্যানের ভাড়া এক থেকে দেড় শ’ টাকা। সূত্র : নয়া দিগন্ত