Home » ফিচার » বিরল ‘লাল মাছরাঙা’
সুন্দরবনের জামতলা খালপাড়ের নাম না-জানা গাছের ডালে লাল মাছরাঙা l ছবি: লেখক

বিরল ‘লাল মাছরাঙা’

আ ন ম আমিনুর রহমান
ভ্রমণপিপাসুদের সংগঠন ‘ভ্রমণ বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি সুন্দরবনে গেলাম। চার দিনের ভ্রমণে সুন্দরবনের যেসব স্পটেই গিয়েছি, মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি চুপিচুপি সব সময় একজনকে খুঁজেছি। কিন্তু জাতভাইদের দেখা পেলেও ওর কোনো হদিস পেলাম না। এর কারণ হয়তো ওর দুষ্প্রাপ্যতা। বর্তমানে একমাত্র সুন্দরবন ছাড়া এ দেশের অন্য কোথাও ওদের দেখা মেলে না। আবাস এলাকায় এসেও ওর দেখা না পাওয়ায় বেশ আফসোস নিয়েই ঢাকায় ফিরলাম।

পরের বছর ১৩ মার্চ মাত্র সাতজনের দল নিয়ে আবার সুন্দরবনে। বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধানে ‘রাজকন্যা’ নামের ছোট লঞ্চে চেপে মংলা থেকে এই অভিযান শুরু করলাম। ঢাংমারী ফরেস্ট বিট, করমজল, জয়মনিরঘোল হয়ে কটকা ফরেস্ট বিটে পৌঁছাতেই রাত সাড়ে আটটা। খাওয়াদাওয়া ও গল্পগুজব সেরে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত প্রায় ১২টা। ১৪ মার্চ ভোর সোয়া ছয়টায় কটকা খালে নোঙর করা রাজকন্যা থেকে ছোট নৌকা নিয়ে জামতলা খালে ঢুকলাম। আধা ঘণ্টা পর জামতলা খালের ডান পাশের শাখা খালের দিকে নৌকা ঘোরালাম। খালের দুই পাশের গাছপালার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে সামনে এগোচ্ছি। নাহ্! কোনো কিছুরই দেখা পাচ্ছি না। মনে মনে ভাবছিলাম, গত বছর বিভিন্ন পয়েন্টে এতটা খুঁজেও ওর দেখা পাইনি। আর আজকে কি ওকে সহজে পেয়ে যাব? ভাবতে ভাবতে সামনে এগোচ্ছি, আর গাছের দিকে নজর রাখছি। ঠিক পাঁচ মিনিট। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমার ডান পাশের নাম না-জানা গাছের একটি মরা ডালে ও এসে বসল। আর যায় কোথায়। ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। ভোরবেলায় প্রথম শিকার হাতে পেয়ে সবার মন খুশিতে ভরে উঠল।

এই শিকার আর কেউ নয়। সুন্দরবনের বিরল ও সংকটাপন্ন এক আবাসিক পাখি। নাম ‘লাল মাছরাঙা’ (Ruddy Kingfisher)। ডালসেলোনিডি পরিবারভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Halcyon coromanda।

লাল মাছরাঙার আকার মাঝারি। দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৬ সেন্টিমিটার। গড় ওজন ৭৭ গ্রাম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও পিঠের রং গাঢ় লাল। গলা, বুক ও পেটের রং হালকা লাল। কোমর হালকা নীল। ঠোঁটের গোড়া কালচে লাল ও অগ্রভাগ ফিকে লাল। চোখ কালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা প্রবাল-লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও পুরুষগুলো বেশি উজ্জ্বল হয়। অল্প বয়স্ক পাখির দেহের ওপরটা কালচে-বাদামি। দেহের নিচের অংশ লাল ও তাতে কালচে ডোরা দেখা যায়। কোমর ও লেজের ওপরের ঢাকনি গাঢ় নীল। ঠোঁট কালচে ও অগ্রভাগ কমলা-লাল।

লাল মাছরাঙা একমাত্র সুন্দরবনের জলাশয় বা খালের আশপাশে বাস করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। পানির ওপরে ও কাদার মধ্যে শিকার খোঁজে। মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, বড় বড় পোকামাকড় ইত্যাদি বেশ পছন্দ। এরা দ্রুত ও জোরে ডানা চালিয়ে সোজাসুজি ওড়ে। তীব্র ও কাঁপা স্বরে ‘টি-টি-টি-টি-টি-টি’ শব্দে ডাকে এবং ‘কুয়িররর-র-র-র-র-র’ কণ্ঠে গান গায়।

মার্চ-এপ্রিল এদের প্রজননকাল। এ সময় খালের খাড়া পাড় বা গাছের ডালে ৪৫ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার লম্বা গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। এরপর স্ত্রী তাতে চার-পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৭ থেকে ২২ দিনে। বিরল ও সংকটাপন্ন এই পাখির বাচ্চাগুলো একসময় বড় হয়ে নীল আকাশে স্বপ্নের ডানা মেলে। সূত্র : প্রথম আলো