Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » ঢেউভাঙা মেয়েরা

ঢেউভাঙা মেয়েরা

কক্সবাজারের সার্ফার মেয়েরা প্রায় সবাই গরিব ঘরের। সমাজের চোখরাঙানি সয়ে ওরা ঢেউ ভাঙে সকাল-বিকেল। ওদের নিয়ে  লিখেছেন তোফায়েল আহমদ

সুমী আকতার থাকে ঘোনারপাড়ায়। সৈকত বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। টেলিভিশনে সার্ফিং দেখে তাঁরও ইচ্ছা জাগে। ঢেউ ভাঙার স্বপ্নে বিভোর হয়। কিন্তু উপায় খুঁজে পায় না। সমাজের চোখ রাঙানি আছে, সার্ফিং বোর্ডই বা পাবে কোথায়? একদিন অবশ্য উপায় বের হয়। বলছেন সুমী- ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থা আমাদের স্কুলে আসে নোটিশ নিয়ে। তাঁরা সার্ফিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে। আমি অমনি নাম লিখিয়ে দিই।’ গেল আগস্ট মাসে ১৫ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সুমীদের। সুমী বলল, ‘এটা শুধু খেলা নয়, আÍরক্ষার বড় কৌশলও।’ পুরুষের সঙ্গে দৌড় পারে সুমী-লোকজনের নানা বলাবলিতেও থামেনি। সে বলল, ‘পাড়া থেকে একদিন বিকেলে হেঁটে সাগরপারে যাচ্ছিলাম, এক মুরব্বি থামিয়ে বলেন, ওই মাইয়া, তুই নাকি সাগর দাবড়াস? জানস না, কাজটা ভালো না? এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। তবু পিছু হটিনি। প্রতিদিন সাগরে সাঁতার কাটি।’ সার্ফিংয়ের আনন্দ নিয়ে সুমী বলল, বোর্ডে চড়ে ঢেউয়ের তালে তালে সাঁতরানোর মজাই আলাদা। ঢেউয়ের পর ঢেউ ধরে দূরে চলে যায়। আবার আরেকটি বড় ঢেউয়ে ভেসে আসি তীরে।’

Surfing

সুমীর বাবা জাগির হোসেন পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন। মা শবে মেরাজ একজন গৃহিণী। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সুমী সবার ছোট। অভাব-অনটনের পরিবারে কিছু স্বাচ্ছন্দ্য আনতে সে সাগরপারে পর্যটকদের কাছে সেদ্ধ ডিম বিক্রি করে। সকালে স্কুলে যায় আর বিকেলে বিক্রি করে ডিম। প্রথম প্রথম মা কিছুতেই রাজি ছিলেন না সার্ফিংয়ের ব্যাপারে। মা বলতেন, সাঁতার কাটলে পুরুষে দেখবে। এ কাজ করা যাবে না। সে সময় কক্সবাজার লাইফ সেভিং অ্যান্ড সার্ফিং ক্লাবের সভাপতি রাশেদ আলম মাকে অনেক বুঝিয়েছেন। মা-বাবাকে বলে সম্মতি আদায় করেছেন। এখন সুমী ওই ক্লাবের জুনিয়র সদস্য। অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত সার্ফিং অনুশীলন করে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এক বিকেলে সৈকতে গিয়ে দেখলাম আরো আট কিশোরীর সঙ্গে সার্ফিং করছে সুমী। সুমীকে সাহসী মনে হলো। অন্যদের চেয়ে সে বেশি কসরত দেখাচ্ছে। তীরে ফিরে আসার পর বলল, ‘আমি একসঙ্গে কয়েকটা ঢেউ পাড়ি দিতে পারি। তবে তীর থেকে বেশি দূরে গেলে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সবচেয়ে বড় ঢেউটি যেদিন জয় করতে পারি, সেদিন খুশিতে মন ভরে যায়। বর্ষার ঢেউ সবচেয়ে উঁচু; তাই এ সময় সার্ফিংয়ের মজাও বেশি।’

সুমীর সঙ্গী-সাথি ঢেউভাঙা মেয়েরা

রিফা আকতার, আয়েশা, নারগিস, মায়েশা, শবে মেরাজ, জাহানারা ও সোমা সুমীর সাফিং দোস্ত। সবারই বয়স ১১-১৩ বছরের মধ্যে। সবাই সৈকতে ফেরি করে।

রিফা-আয়েশা দুই বোন

রিফার বয়স ১৩ ও আয়েশার ১১। দুই বোন। থাকে কলাতলির শুকনাছড়িতে। দুজনেই সার্ফার। মা জানতে পেরে একদিন বেদম মেরেছিলেন। ওদের বাবা জাহাঙ্গীর আলম একটি হোটেলের পাচক। দুই বোনের কেউ স্কুলে যেতে পারেনি। বাড়িতে ছোট এক ভাই আর বোনও আছে। তাই দুজনই ফেরি করে সৈকতে। ঝিনুকের মালা বিক্রি করে। ফেরি করতে গিয়েই দেখে সাগরে মেয়েরা ঢেউ ভাঙছে। তাদের খুব ইচ্ছা হয়। কক্সবাজার লাইফ সেভিং অ্যান্ড সার্ফিং ক্লাবের ছেলে-মেয়েরা ওদের আগ্রহ দেখে দলে নিয়ে নেয়। রিফা জানায়, মা-বাবা দুজনকেই ক্লাবের ভাইয়ারা বুঝিয়েছে। এখন আমি নিয়মিত অনুশীলন করি। আমার ইচ্ছা আমেরিকার সাগরে সার্ফিং করার।’ আয়েশা বলল, ‘প্রথম প্রথম ভয় লাগত। এখন ভয় পাই না। সাগরের ঢেউ আপন লাগে।’

Surfing2

শবে মেরাজ আর সোমা

কক্সবাজার সদরের দক্ষিণ ঘোনারপাড়া এলাকার জাফর আলম ও বেবী খাতুনের মেয়ে শবে মেরাজ। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। সৈকতে মালা, কানের দুল, হাতের চুড়ি ফেরি করতে এসে অন্যদের মতো তারও সার্ফিংয়ের নেশা লাগে। দুই বছর হয়ে গেল তার সার্ফিংয়ে। একই এলাকার আলতাজ হোসেন ও মরিয়ম বেগমের মেয়ে সোমাও সৈকতে ফেরি করে সংসার টানে। এখন বলতে গেলে পাকা সার্ফার। সোমা বলে, ‘এটা এক ভিন্ন জগৎ। এখানে সাগর জয়ের আনন্দ আছে।’

সার্ফিং সিটি কক্সবাজার

এখন সরকারও সার্ফিংকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ৯ আগস্ট থেকে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে আয়োজন করা হয় ১৫ দিনব্যাপী সার্ফিং প্রশিক্ষণের। কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যবস্থাপনায় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ৫০ জন ছেলেমেয়ে অংশ নেয়। এর মধ্যে মেয়ে আটজন। সংগঠনের হয়ে যারা সার্ফিং করে তারা সাধারণত বিদেশে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য সেটা শিখে। অনেকে চায় এটা শিখে যেন বিদেশে যেতে পারে। প্রশিক্ষণের সময় সংগঠনগুলো থেকে তারা শুধু যাতায়াতের খরচাপাতি পেয়ে থাকে। কক্সবাজারে সার্ফিং নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত। একে পর্যটকবান্ধব করতে সার্ফিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

Surfing3

দ্য মোস্ট ফিয়ারলেস ছবির পোস্টার

কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অরূপ বড়ুয়া অপু বলেন, ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থা এখন স্পোর্টস ট্যুরিজমের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে আমরা বিচ ফুটবল, বিচ ক্রিকেট, বিচ কাবাডি, বিচ ভলিবলের আয়োজন করেছি।’ তিনি বলেন, সার্ফিং বোর্ড ২৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। আমরা চাইছি সরকার ছেলে-মেয়েদের বোর্ড সরবরাহ করুক। কক্সবাজারে একটি সার্ফিং ইনস্টিটিউটও গড়ে তোলা দরকার।

দ্য মোস্ট ফিয়ারলেসঢেউভাঙা মেয়েরা

ইএসপিএনের সাংবাদিক জয়মাল যোগির লেখা পড়ে হিদার প্রথম নাসিমার কথা জানতে পারেন। হিদারের পুরো নাম হিদার কেসিংগার। বাড়ি আমেরিকায়। তিনি নাসিমাকে নিয়ে একটি চিত্রনাট্য লেখার অনুরোধ জানান জয়মালকে। সে চিত্রনাট্য নিয়ে হিদার আসে বাংলাদেশে। জর্ডান ডজি নামের এক আলোকচিত্রী তখন ঢাকায়। হিদার আর ডোজি মিলে কক্সবাজারে নাসিমার খোঁজ করে। মেয়েটার সার্ফিং তাদের মুগ্ধ করে। তবে নাসিমার জীবনকাহিনী জেনে তারা কষ্ট পায়। তাঁরা জানতে পারে নাসিমার বিয়ে হয়ে গেছে মাত্র ১৩ বছর বয়সে। পরিবারের লোকজন চায় না সে সার্ফিং করুক। কিন্তু নাসিমা অদম্য। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল ২০১৪ পর্যন্ত তারা দফায় দফায় নাসিমার সার্ফিং দৃশ্য তোলে কক্সবাজারে। ছবিটির পোস্ট প্রোডাকশন শেষ হওয়ার পথে। হাফিংটন পোস্ট নাসিমাকে নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। তাতে নাসিমা বলেছে, স্থলের দুঃখ ভুলতে আমি জলে থাকি। ম্যারি ক্লেয়ার সাময়িকীও ছবিটি নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এর আগে হিদারের ইন দ্য শ্যাডো অব বুদ্ধ ছবিটি প্রশংসা পেয়েছে।

Surfing4

ভেনেসা রুডের সঙ্গে সার্ফার মেয়েরা

কক্সবাজারে সার্ফিংয়ের এক যুগ

২০০০ সালে কক্সবাজারে সৈকতকেন্দ্রিক সার্ফিং চর্চা শুরু হয়। সাগরপারের বাহারছড়া মহল্লার কিছু তরুণ এর উদ্যোক্তা। ২০০৫ সালে এখানে সার্ফিং প্রতিযোগিতাও হয়। জাফর আলম সেবার খুব কৃতিত্ব দেখায়। তার বড় ভাই রুবেলও ছিল সঙ্গে। জাফর এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্ফিংয়ের দাওয়াত পায়। বছরের এগার মাসই বিদেশে থাকে। সেখানে সে সার্ফিংয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে। তার বড় ভাই রুবেলও আছে একই পথে।

ভেনেসা-রাশেদ জুটিঢেউভাঙা মেয়েরা

কক্সবাজার সৈকতের দুরন্ত কিশোরীরা সার্ফিংয়ের পাশাপাশি ইংরেজিও শিখছে। শিক্ষক হিসেবে আছেন এক মার্কিন তরুণী, নাম ভেনেসা রুড। সার্ফিং তাঁর প্রিয় বিষয়। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ি। তাঁর ইচ্ছা, ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কক্সবাজারও সার্ফিং সিটি হোক। কক্সবাজারের একজন সার্ফারকে বিয়েও করেছেন ভেনেসা। ভেনেসা বলেন, ‘কক্সবাজারের সার্ফিং ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। আমি আশা করি, একদিন কক্সবাজারের মাথায় সার্ফিংয়ের মুকুট উঠবে।’ মার্কেটিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ভেনেসা। ২০১২ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। তারপর সোজা কক্সবাজার। ছোট্ট শহরটি তাঁর ভালো লেগে যায়। প্রথম প্রথম দুয়েকজন ছেলেমেয়েকে সার্ফিং করতে দেখেছেন তিনি। পরিচয় হয় ‘কক্সবাজার লাইফ সেভিং অ্যান্ড সার্ফিং ক্লাবে’র সভাপতি বাহারছড়ার তরুণ সার্ফার রাশেদ আলমের। সেবারই তিন মাস থেকে যান। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে রাশেদের সঙ্গে।

Surfing5

এরপর ফি বছর আসতে থাকেন। নিজেই রাশেদকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। গেল ২০ জানুয়ারি তাঁদের বিয়ে হয়। অনুষ্ঠান হয় সাগরের বালুকাবেলায়। ভেনেসা বিয়ের দিন লাল শাড়ি পরেছিলেন। দেনমোহর ধার্য হয়েছে তিন লাখ টাকা। সেই কাবিননামার বদৌলতে ভেনেসা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। ক্লাবের আটজন কিশোরীর সবাই ভেনেসার ছাত্রী। পড়ন্ত বেলায় সৈকতের বালুচরে এই আট কিশোরীকে ইংরেজি শেখানোর কাজ করে যাচ্ছেন ভেনেসা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরা যখন সার্ফিং করতে বিদেশে যাবে, তখন ইংরেজি না জানা থাকায় সমস্যায় পড়ে যাবে। ওরা নিজেরাও খুব আগ্রহী। কয়েকজন অনেকটাই এগিয়েছে।’

সুমী বলল, ‘রাশেদ ভাইয়ের বউ হওয়ার পর ভেনেসাকে আমরা ভাবি ডাকতে শুরু করি। কিন্তু ভেনেসা তাতে খুশি হতেন না। নাম ধরে ডাকতে অনুরোধ জানাতেন। আমরা এখন তাঁকে ভেনেসা নামেই ডাকি। তিনি আমাদের বেশ ভালোবাসেন। তিনি চান আমরা ভালো সার্ফার হই।’

ভেনেসার স্বামী রাশেদ আলম জানান, ‘চার বছর আগেও কক্সবাজারে সার্ফার ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। আর এখন অনেক।’ ভেনেসা বললেন, ‘কক্সবাজার শার্ফ ফ্রি, জেলি ফিশও নেই, পাথর নেই, সৈকত বালুকাময় আর সবচেয়ে দীর্ঘ তাই এটি সার্ফিংয়ের জন্য আদর্শ জায়গা।’ সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ