Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » এই তো ভূস্বর্গ আমার

এই তো ভূস্বর্গ আমার

বিপ্রদাশ বড়ুয়া
চট্টগ্রাম থেকে ভূস্বর্গ পার্বত্য ভূমির কাপ্তাই হ্রদের ঘাটে যখন পৌঁছলাম সেখানে হাটের অরণ্য। পার্বত্য বা জুমের ফসলের শেষ মৌসুম। মনসা পুজো সমাগত বলে তাগড়া পুরুষ ছাগল দর্প ঘোষণা করছে। ঢুঁসো দিলে হাঁটু ভেঙে যাবে নির্ঘাত। কাঁধে-পিঠে-মাথায় আট-পাঁচটা কলার সুপুষ্ট ছড়া নিয়ে ছুটলে কি কুলির মুখ-চোখ দেখা যায়! ওদিকে কুড়ো, নাপ্পি, রেঙ্গুইন্যা বাকর পাতা, দু-দশটা মারফা ও চিন্দাল। কচু ও ওল দেখা যাচ্ছে ওদিকে। বুনো মাংস আছে ওই এক প্রান্তে। বাঁশের চোঙায় মোষের দইও থাকবে কোথাও না-কোথাও। পাহাড়ি ব্যাঙের ছাতা, বাঁশের হুঁকো চাই? মানুষের কাঁধ সমান লম্বা শুকুনো গিলার আস্ত শিম কিনতে চান ঘর সাজাবার জন্য? খাঁটি গুঁড়ো হলুদ বা লঙ্কা চাই? ভেজালহীন মাখা তামাক! গাছ-পাকা পেঁপে বা আনারস! কোনটা রেখে কোনটা নেব? আমার পাগল হয়ে যাওয়ার বাকি। যাচ্ছি বেগানা ছড়া দেখে বিলাইছড়ি যাব। ফের ফিরে আসব সন্ধে আটটা-নটা নাগাদ। এত লটবহর রাখব কোথায়। না, রসনা ও বাসনা সংযত করে দলের ছত্রচ্ছায়ায় ভিড়ে গেলাম। কাপ্তাই বাজারের খাঁটি সওদা এ যাত্রায় আমার জন্য নয়।

CHT

৮ আগস্টের ঝলমলে সকাল দুপুর গড়াল কাপ্তাই থেকে ইঞ্জিনের নৌকো বা বোট সংগ্রহ করতে। দলের উদ্যোক্তা শ্রামণী গৌতমী। আমরা মিলিত ১৬ জন। গর্জন তুলে কাপ্তাই হ্রদের নীল জল পাড়ি দিয়ে উত্তর দিকে। ঝকঝকে সোনা রোদে ভিজে, তার ঐশ্বর্যে কৃপণতা নেই, সৌন্দর্যেও অপরাজেয়। নীল জলরাশি ঘেরা পাহাড়ের সবুজ মিশেছে নীল নীলিমায়। প্রথম ছোট পাহাড়টা বাঁয়ে রেখে পার হতেই তার উত্তর কোল ঘেঁষে আধুনিক মৎস্য খামার। জাল দিয়ে ঘেরা, ড্রাম বেঁধে ভাসা ভেলা তার সঙ্গে।

আগে শুনেছি, চোখের দেখায় পেলাম আজ। তারপর শুধু জলরাশি আর আধ ডোবা সবুজ পাহাড় শুধু। মাঝে মাঝে গত বর্ষায় বেড়ে ওঠা বাঁশ, তার পাতা বের হয়নি, সোনালি রঙে সবার থেকে দর্শনীয় হয়ে আছে। ছবির পর ছবি তুলছি। পাখিরা উড়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চাকমা রমণীর বেয়ে যাওয়া নৌকো। তাতে কচুরিপানায় ভরা। ক্লিক, ছবি। এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে চলে গেছে বৈদ্যুতিক তার। তাতে কাক বা মুনিয়া বসে আছে চিত্রার্পিত হয়ে। আকাশ নিঃসঙ্গ ঝকঝকে নির্মম নীল। বেগানা ছড়া? বেগানা চাকমা শব্দ, অর্থ ব্যাঙের ছানা।

ঘণ্টাখানেক পরে পড়ল একটা ঘাট। সিঁড়ি উঠে গেছে। দুপুর একটা। চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে ঝাপ খোলা, যেন প্রকৃতি দেখার মানমন্দির। সিঁড়ি বেয়ে উঠেই চলেছি, যেখানে সিঁড়ির শেষ হবে বুঝিবা সেখানে স্বর্গোদ্যান থাকবেই। চায়ের দোকানের চা খেলাম। সেখান থেকে নেমে আবার গর্জনশীল বাহন। মাঝে সামরিক প্রহরা ঘাট। মাঝি উঠে হাজিরা দিয়ে এলো। দুপুর তিনটা নাগাদ পৌঁছতে পারলাম বেগানা ছড়ার মুখে চাকমা পাড়ায়। একেবারে নতুন এখানে আমি। সৌন্দর্যও স্বভাবসৌন্দর্য নিয়ে আকুল হয়ে আছে।

একটি-দুটি-তিনটি দোকান। ওখানে হাট বসে। চায়ের দোকান হাঁটু-বেড়ার উপরে খোলা, উপরে আবার হাত-দুয়েক বেড়া। ঝাপ খোলা। বয়স্ক পুরুষেরা বসে বসে ধুন্দা খাচ্ছে বাঁশের হুঁকোয়। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে গুরুক গুরুক শব্দ তুলে দম দিয়ে আসি। স্থানীয় একজনকে নিয়ে আমরা পাঁচজন অগ্রবর্তী দল। পেছনে শ্রামণী গৌতমী এবং ঢাকা থেকে কবি-মেঘ অদিতি, সাইদা মিমি, সরদার ফারুক, অনিন্দ্য বড়ুয়া, জয়দেব কর। ওরা আসতে থাকুক। আমি অগ্রবর্তী দলে থাকতে ভালোবাসি।

Hanging-Bridge

ড. দীপঙ্কর বড়ুয়া, বিজয় তালুকদার, তাঁর মেয়ে ও ছোট শ্রামণী আর আমাদের পথপ্রদর্শক স্থানীয় চাকমা যুবক। পাড়া ফেলে নেমে পড়লাম বেগানা ছড়ায়। পাথুরে ছড়া, স্বচ্ছ সলিলা দু পাশে বিশ-পঞ্চাশেক হাত দূরে সুউন্নত পাহাড়, সবুজ গাছপালার তাঁবুতে নিস্তব্ধতায় মগ্ন। শব্দ শুধু ছড়ার পাথরে পাথরে স্রোতের গলাগলি, আলিঙ্গন ও আদর কাড়ার সংগীত। পাথরে-জলে সঙ্গম ও কোলাকুলির সানুরাগ শীৎকার। জগতের আর কোনো শব্দ তখন ওখানে ছিল না। এক রমণী তাঁর উদোম শিশুকে স্নান করাচ্ছে গা ডলে ডলে। আর দেখছেন আমাদের। আমার সনি ক্যামেরা সচল হয়ে উঠল। ওদের সতর্ক হতে সময় একটুও না দিয়ে ক্লিক ক্লিক। আবেশ ছড়ানো ঝিরি ঝিরি ঝরনা-ছড়ার সংগীত। পেট ভরে ছড়ার জল দিয়ে বুভুক্ষু উদর ভরে নিলাম। সুশীতল। ও জলের নিজস্ব সুগন্ধ। সুনির্মল সুকোমল এমন জল কবে পান করেছি? এর আগে ধইন্যার মা ঝরনা ও রিন ছং ঝরনায়। তাও আমার ‘ভূস্বর্গ ভ্রমণ : বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখে সাক্ষী করে রেখেছি। দৈনিক কালের কণ্ঠ তার দলিল ও পৃষ্ঠপোষক হয়ে আছে। কালের কণ্ঠ আমার আত্মার বোন।

জুতো আগেই খুলে ফেলতে হয়েছে। পাতলুনও গুটিয়ে নিয়েছি। একটা মরা ডাল ভেঙে জুতমতো লাঠি বানিয়ে সঙ্গী করে নিয়েছি। একটা ছাড়া-বাড়ির মাচার নিচে জুতো রেখে দিলাম। ফেরার পথে কুড়িয়ে নেব। পায়ের তলার চামড়া বুঝে নিক জুতোর মর্মযাতনা।

ওরে-ব্বাবা! দুই পাহাড়ের মাঝখানে তিন হাত উঁচু-নিচু পথে ঢুকে পড়লাম। এমন সুসঙ্গমনীয় পিচ্ছিল পথে আমি কখনো প্রবেশ করিনি, এত স্নিগ্ধ শীতল কমনীয়তার পরশ উপভোগ করার সুযেগ কখনো হয়নি। এত শিহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো ছড়া বা ঝরনায় উপভোগ করিনি। শুভলং-এর দশ-বারোটি ঝরনায়ও নয়। এই তো ভূস্বর্গ আমার।

বেরিয়ে পড়লাম সেই পিচ্ছিল পথ থেকে। বেরিয়েই দেখি সামনে ছড়া, ডান দিক থেকে ঘুরে এসে গিরিপথ বাঁয়ে রেখে আমাদের সামনে ঝিরি ঝিরি গান গাইছে উপল-ব্যথিত ছন্দে। ইচ্ছে করে সবার আগে গিরিসংকটে ঢুকে পড়েছি একাকীত্বের জন্য। এক-দু মিনিটের পথ কিন্তু আমার পুনর্জন্ম হয়ে গেল। একবার চোখ বুজে ছড়ার গানের শব্দ শুনতে চেয়েছি। পেয়েছি, পুরে রেখেছি হৃৎপিণ্ডে এবং মণিকোঠায়। এত শিহরণ ও প্রশান্তি আগে কখনো পেয়েছি বলে মনে করতে পারিনি তখন। ছবি তুলতেও ভুলে গেছি। বেরিয়ে মনে পড়াতে ফেরার সময় তুলব ভেবেছি। সব ভাবনা কি সব সময় কাজে লাগাতে পারি আমরা, আমি! তারপর শহুরে পা নিয়ে মসৃণ পাথরেও ধারালো আঘাত নিয়ে হাঁটছি, যে আমি নবম শ্রেণি পর্যন্ত খালি পায়ে গ্রামের স্কুলে যেতাম। দশম শ্রেণিতে রাঙামাটি শহরের সরকারি স্কুলে যাওয়ার ফলে এক জোড়া কাপড়ের জুতোর অধিকারী হয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতা তখন মাত্র পড়েছি।

প্রথম ঝরনাটি পেলাম একটু পরেই। পথপ্রদর্শক বলেছিলেন ওই-তো। সেই ওদের ওই-তো এরই মধ্যে ‘আমার অনুমানে মাইল তিনেক বলে দিয়েছে ঘড়িতে। আমার তো ঘড়ি নেই। মোবাইলই জানায় আমাকে। দু পাশে সুউচ্চ পাহাড়, একেবারেই আরণ্যক পরিবেশে আমি। খাগড়াছড়ি বা বড় হরিণাও নয়। এখানে আমার মতো কালো কেউই নেই। সবাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র। আমাকে ওরা চেনে না ১৫০টি বই লেখার পরও-ওটা ওদের গাফিলতি, দোষ বা অবহেলা নয়। ওরা তো পার্বত্য ভূমিপুত্র। ওরা তো আমার বা কারুর করুণার পাত্র হতে চায় না, ওরা শুধু ওদের মতো থাকতে চায়, বনভূমির অংশ বা গাছ-বাঁশ হয়ে বা অচ্ছুৎ হয়ে, এক প্রান্তে অন্ত্যজ হয়ে নিজের মতো নিজের হয়ে থাকতে চায়। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ