Home » ভ্রমণ » ঢাকা » জৈনসারের ঐতিহ্য প্রাচীন লোহার পুল

জৈনসারের ঐতিহ্য প্রাচীন লোহার পুল

রমজান মাহমুদ
পশ্চিম বিক্রমপুরের একটি গ্রামের নাম জৈনসার। গ্রামের নাম জৈনসার কেন হলো তা নিয়ে নানা মতবাদ চালু রয়েছে। অনেকের মতে, একসময় এ গাঁয়ে জৈন সম্প্রদায় বাস করত। এ সম্প্রদায় দ্বারা এ গাঁয়ের গোড়াপত্তন ঘটে বলে গ্রামের নাম হয় জৈনসার। জৈনসার গ্রাম নানা কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বেশ পরিচিত। এ গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পোড়াগঙ্গা নদী। একসময় এ নদী দিয়ে বারো মাস লঞ্চ চলাচল করত।

Joinsar

এ গ্রামে ছিল লঞ্চঘাট; লোকজন শ্রীনগর, লৌহজং, নাগেরহাট, নওপাড়া থেকে জৈনসার কাঁঠালতলী হয়ে ইছাপুরা, তালতলা, সিরাজদিখান যাতায়াত করত। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা জজকোর্টের জজ শ্রীযুত বাবু অভয়কুমার দত্তের বাড়ি এ গ্রামে। তিনি লোকজনের সহজ যাতায়াতের জন্য ইছাপুরা জৈনসার সড়কপথ নির্মাণ করেন এবং সড়কপথের পাশে নৌপথেও সহজ যাতায়াতের জন্য পোড়াগঙ্গা থেকে জৈনসার খাল খনন করেন, জৈনসারের এ খাল কাঁঠালতলী হয়ে তালতলা-শ্রীনগর খালের সাথে সংযুক্ত হয়।

জৈনসার তখন বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। কোম্পানির আমলে বিক্রমপুরের বিভিন্ন স্থানে লোহার প্লেটে কনক্রিট ঢালাই একধরনের অদ্ভুত দৃষ্টিনন্দন পুল নির্মিত হয়, ইছাপুরা-জৈনসার গ্রামে এমন তিনটি পুল চোখে পড়ত, পুলগুলো বেশ সরু এবং নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমেই খাড়া; যা দিয়ে লোকজন হেঁটে পারাপার ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারত না। ইছাপুরা বাজার রাস্তায় প্রাচীন সে পুলগুলো এখন আর নেই, নব্বই দশকে তা ভেঙে পরে সেখানে বিকল্প ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে জৈনসার ইউনিয়ন পরিষদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এখনো সে সময়কার নির্মিত একটি পুল চোখে পড়ে। ধারণা করা হয় কোম্পানি আমলে নির্মিত পুলটি বিক্রমপুরে অবস্থিত শেষ নিদর্শন হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। পুলটি জৈনসার গ্রামের জমিদার অভয় দত্ত কিংবা তার পূর্বপুরুষেরা নির্মাণ করেন। প্রমত্তা পদ্মার করালগ্রাসে কাউলিপাড়া যখন ভেঙে যায়, তখন সে এলাকার জমিদারেরা জৈনসার, পশ্চিম পাড়া ও ইছাপুরায় এসে বসত করেন। পশ্চিম পাড়া, ভবানীপুর, জৈনসার- তিন গ্রামের ১০ হাজার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে দত্ত পরিবার জৈনসার খালের ওপর পুলটি নির্মাণ করেন।

এ গ্রামে মানুষের সুবিধার জন্য দত্ত পরিবার ডাকঘর ও দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন ইংরেজ আমল থেকেই। ১৮৬৮ সালে এ গ্রাম থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক ‘পল্লীবিজ্ঞান’ নামে এক পত্রিকা, ১৮৬৮-১৮৭০ সাল পর্যন্ত অভয়বাবু স্বয়ং পত্রিকার ব্যয়ভার বহন করে ‘পল্লীবিজ্ঞান’ প্রকাশ করতেন। এটি বিনামূল্যে পাঠকদের মাঝে বিলি করা হতো, ব্যাপক পাঠককুল থাকা সত্ত্বেও এক সময় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

আঠারো শ’ শতকে জৈনসার গ্রাম থেকে পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কতটা আধুনিক আর শিক্ষায় পূর্ণতা থাকলে সে আমলে জৈনসারের মতো একটি গ্রাম থেকে পত্রিকা প্রকাশিত হতে পারে! পরবর্তীকালে জৈনসারের পাশের গ্রাম পশ্চিম পাড়া থেকে উনিশ শতকের শুরুর দিকে কাশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় হিন্দুরক্ষণী সভার মুখপত্র হিসেবে ‘হিন্দুহিতৈশিনী’ নামে পত্রিকা বের করতেন।

অভয় দত্তের সে জৈনসার গ্রামের জৌলুশ আর নেই। গ্রামের পাশ দিয়ে বহমান পোড়াগঙ্গা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। সেখানে এখন আর বড় মোকাম বসে না। বিপুলসংখ্যক মানুষের আনাগোনা নেই। নেই আগের সেই লঞ্চঘাট আর ডাকঘর। এখন এখানে দেখার মতো বলতে কোম্পানি আমলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন পুল আর জজ অভয় দত্তের বিশাল বাড়ি আর বাড়ির সামনে ছায়াঘেরা বড় বড় দীঘি। হয়তো আগামীতে হারিয়ে যেতে পারে যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে প্রাচীন নির্দশন এ পুল আর বাড়ি। সৌজন্যে : নয়া দিগন্ত