Home » পপুলার ডেস্টিনেশন » জোছনা ভেজা চেমা খাল

জোছনা ভেজা চেমা খাল

মাসুম সায়ীদ
আমাদের এবারের গন্তব্য চেমাখাল। বগালেকের দক্ষিণ ঢাল থেকে আধা ঘণ্টার পথ। এগার মাইলেই জিপ ছাড়তে হলো। পায়েল ওরফে মাইকেল নামে চটপটে চৌকস একটি ছেলে আমাদের পথ দেখাচ্ছে। সাথে একজন পোর্টার। জিপ থেকে নামার পরই শুরু হলো উৎরাই। এই পথও একসময় ইট বিছানো ছিল। এখন দানা খশা ভুট্টার ছড়ার মতো। পানির ঢল পথের গা থেকে খুলে নিয়েছে ইট।

Chema-Khal

পাহাড়ে ওঠার চাইতে নামা সহজ। কিন্তু এই উৎরাইটা এত দীর্ঘ যে নামার পর একটু না বসলে চলে না কারো। উপত্যকায় দুটো দোকান। আমাদের আগের থেকেই একটা দল অপেক্ষা করছিল যাত্রার। আমাদের পর আরো তিনটি দল এল। সবার গন্তব্য বগালেক। একে একে সবাই রওনা করার পর শুরু করলাম আমরা। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ট্রেকার মাউনটেইনিয়ার সিরাজুল ইসলাম সাগর ভাই। যিনি টিমের ব্যবস্থাপক। আমাদের পরিভাষায় কোয়ার্টার মাস্টার। দলনেতা সালাউদ্দিন ভাই। সহকারী তার সহধর্মিণী উম্মে হাবিবা শশী। এ দম্পতির সাথে এবারই আমার প্রথম পরিচয়। শশীকে ভাবি বলতেই উড়িয়ে দিলেন হেসে। তবে আপা? ‘না, আপা টাপাও না। স্রেফ নাম ধরে ডাকবেন।’ অন্যরাও সায় দিলেন। তারাও তাই করে। ব্যাপারটায় আমারও বেশ মজা লাগল। কিন্তু মুখে আসছিল না সহজেই। তাই আপাতত কথা চলল ভাববাচ্যে, সম্বোধন এড়িয়ে।

হাঁটছি তো হাঁটছিই। পথ আর সরে না। সবার ব্যাগ ছোট। আমিই শুধু গাধা। অকারণে বোঝা ভারি করেছি। এখন কিছু ফেলে দিতেও মায়া। টাকাও নষ্ট। তার উপর যদি কাজে লাগে- এরকম ভাব। বগা লেকের বেশ আগেই সন্ধ্যা নেমে গলে। পথের বাঁকে পাহাড়ি দুটো ছেলেমেয়ে কিছু পেয়ারা আর একটা পেঁপে নিয়ে বসে ছিল। অগ্রবর্তীরা তার সদ্ব্যবহার ভালোই করেছে।

আমরা যখন পৌঁছলাম তাদের কাছে তখন অল্পকিছু আছে ভাগে। একেবারে না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া মন্দ না। আবার শুরু হলো হণ্টন। ‘হণ্টন শুধু হণ্টন/ পথে যেতে যেতে দুঃখ যত/করে যেও বণ্টন।’ হুমায়ূন আহমেদের ‘চলে যায় বসন্তের দিন’ বইটার ফ্ল্যাপের লেখাটা মনে পড়ল অকারণেই। অবশেষে ঘোর লাগা সন্ধ্যার প্রান্তে দেখা মিলল বগা লেকের পাদদেশের পাড়া। মিটিমিটি আলো। যে যেমন পারে গা ঢেলে বসে আছে। এরা সবাই বয়সে তরুণ। বয়স বিশ-বাইশ এর মধ্যেই হবে। তারপরও ক্লান্তিতে অবসন্ন। দোকানি ট্রেকারদের চাহিদা বোঝে। মর্তমান পাকা কলার কাঁদি ঝুলিয়ে রেখেছে দোকানের সামনে। ট্রেকাররা ব্যাগ রেখে যখন ধপাস করে বসে পড়ে তখন দোকানি হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলে শরবত আছে দেব?

দ্বিতীয়বার কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয় না শরবত দেবে কিনা। দলের অন্যরা শরবত খাচ্ছিল আমরা এসে যোগ দিলাম। মাত্র এক ঢোক পান করতেই শরীরটা জুড়িয়ে গেল! জিলানী ভাই উচ্ছ¡সিত হয়ে উঠলেন। চিয়ার্স করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,‘ আহ! অমৃত। বেহেশতি! বেহেশতি!! জনান্তিকে বলে রাখি জিলানী ভাইয়ের মনমতো কিছু হলেই তিনি বলে উঠবেনÑ বেহেশতি! বেহেশতি!’

শরবত আর বিশ্রাম পর্ব শেষ হলো। এবার আমদের উঠবার পালা। চেমা খাল বিশ মিনিটের পথ। ধরে নিলাম এর দ্বিগুণ চল্লিশ মিনিট। ব্যাপার না। পাড়ার আঙিনা থেকেই শুরু হয়েছে ইট বিছানো পথ। খাড়া ঢাল। ইটের গায়ে শ্যাওলা বলে পথ খানিকটা পিচ্ছিল। পায়ে আর্মি কমান্ডো বুট। পড়ে যাওয়ার ভয় কম। আমি পথের দিকে নজর না দিয়ে তাকালাম আকাশের দিকে। আকাশে আজ শুক্লাদ্বাদশীর চাঁদ। সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় পূর্ণিমার চাঁদ যে কী অপূর্ব! এ রূপ বর্ণনার ভাষা বিধাতা আমাকে দেননি।

আমার বারবার মনে হচ্ছিল মানুষ না হয়ে পাহাড় চূড়ার যে কোনো একটা লতা হয়েও যদি জন্মাতাম! জানি না গাছ লতা-পাতারা চাদের আলোর মর্ম বোঝে কিনা? আর বুঝবে না কেন? যদি নাই বুঝবে, তাহলে এমন করে নিজের সুন্দরতাটুকু মেলে ধরবে কেন? নিশী পাওয়া মানুষের মতো একটা ঘোর লাগা নিয়ে হাঁটছি। সবার হতেই টর্চলাইট। তবে নেহাত দরকার না হলে জ্বালাচ্ছে না কেউ। চাঁদটাকে উপভোগ করছে সবাই। টুকটাক কথা বলা স্বাভাবিক ব্যাপার। এটাও এই মুহূর্তে আমার কাম্য নয় তাই ইচ্ছে করে সরে এলাম পেছনে। সবার পেছনে এখন সাগর ভাই। এমনিতে থাকেন সবার আগে। রাতের বেলা বলে ইচ্ছে করেই রয়েছেন পেছনে। কিছুক্ষণ আগেও গান শুনছিলেন মুঠো ফোনে। এখন নীরব। সম্ভবত নীরবতা উপভোগ করছেন। আর্কিটেক্ট মানুষ তিনি। শিল্পচৈতন্য তারও প্রখর।

একদম নৈঃশব্দ কোথাও নাই প্রকৃতিতে। আশা করাও ঠিক না। ঝিঁঝিঁ পোকারা মাতিয়ে তুলেছে রাতটাকে। সাথে মিশে যাচ্ছে আমাদের পায়ের আওয়াজ। কিছুক্ষণ বাদে বাদে দূর থেকে ভেসে আসছে ঈগল পাখির ডাক। ব্যথাতুর সে কণ্ঠ। হয়তো প্রিয়া হারার ব্যাকুলতা, নিঃসঙ্গ বুকের কান্না। তাই বাতাসে ঢেলে হালকা করছে বুক। ডাকটা বগা লেকের দিক থেকে আসছে। গত বছর বগা লেকের পূর্বপাশের পাহাড় চূড়ায় একটা বড় গাছের মগডালে দেখেছিলাম ঈগলের বাসা। সম্ভত সেই পাখিটা। ঈগল পাখিরা একটা বাসা দীর্ঘদিন ব্যবহার করে। জীবনানন্দ দাশ চিলের ডাক নিয়ে তো অনেক লিখেছেন। ঈগল নিয়ে কিছু লিখেননি? এবার খুঁজে দেখতে হবে ফিরে।

সামনে একটা ঝিরি। দলের সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। গাছের ছায়া এত ঘন যে চাঁদের আলো ঝিরির জলে পৌঁছেনি। আহ বেচারা! এমন চাঁদের চুমো তুমি পেলে না। একে একে পার হয়ে গেলাম সবাই। ছোট্ট এক চিলতে ঝিরি। পা না ভিজিয়ে পাথরে পা রেখে রেখে পার হলো কেউ-কেউ।

পথের পড়ল একটা ওয়াই সংযোগ। দুটো পথ দু পাড়ায় গেছে। সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য থামতে হলো দলপতি আর তার পত্নীকে। এর মধ্যে দুজন পথচারী পাওয়া গেল। তারা বাতলে দিল পথ। আমরা নাক বরাবর এগিয়ে গিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের মাথায় পাড়ার একটা বাতি দেখলাম। পাহাড়ে দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন একটা ঘর চোখে পড়ে সে ঘরটা যারই হোক কী যে শান্তির! বলে বুঝানো যাবে না।

খানিক বাদেই আশ্রয় মিলল। কারবারির ঘরেই। কারবারির নাম লেংপুং। তার নামেই পাড়ার নাম লেংপুং পাড়া। এরা মুরং। পায়েল মুরং ভাষা ভালোই জানে। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামলেই ক্লান্তি কমে যায় অর্ধেক। ঘর থেকে পথে নামার চব্বিশ ঘণ্টা পর ঘর মিলল। উনুনের নেভানো আগুন আবার জ্বলল। হাঁড়ি চড়ল। মধ্যরাতের কাছাকাছি আমাদের পাতে পড়ল। তারপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে গা মেলে দিলাম বাঁশের মাচায়। পিঠের নিচে পাতার জন্য একপ্রস্ত বিছানা সবারই সাথে থাকে কিন্তু বালিশ থাকে না সব সময়। যাদের ছিল না তাদের জুটল কাষ্ট খণ্ড। ফিরে যখন কষ্টের এ গল্প বলি বন্ধুদের তখন সবাই এমনকি ঘরের মানুষটাও বলেÑ তবে যাই কেন পাহাড়ে এমন কষ্ট করতে? কেন যে যাই, তা কি নিজেরাই জানি?

রাত ভোর হতে না হতেই ঘুম ভাঙল। প্রাতকৃত্য করতে যেতে হবে বাইরে। এর জন্য ঝিরর ধারটাই উত্তম। আড়াল আর প্রক্ষালনের পানি দুটোই মিলবে। এখন আপাতত অজু করা দরকার ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। বর্ষায় পাহাড়ে সুবিধা পানির। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা সব ঘরে থাকে। পানির জন্য কার্পণ্য করতে হয় না। শুকনো মওসুমে পানি পিঠে করে বয়ে আনতে হয়ে দূরের ঝর্ণা বা ঝিরি থেকে। ঝিরির পানিতে সাধারণ কাজ সারলেও পাহাড়িরা ঝর্ণার পানি ছাড়া খায় না। টোয়াতে থাকে খাবার পানি। কলাপাতায় বানানো পানের খিলির মতো ছিপি। আর বোতলে থাকে ঝিরির পানি। বোতলের পানিতে অজু সেরে নামাজ পড়ে আর এক দফা গা গড়ালাম। কিন্তু ঘুম এলো না। মাথায় এল অন্য চিন্তা। ঝিরির ধারে গিয়ে সকালের সূর্য ওঠা দেখা মন্দ হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ। বেরিয়ে এলাম। হালকা কুয়াশা। প্রকৃতির সব কিছু শান্ত সমাহিত। শুধু ঝিরিটা ছাড়া। কিশোরীর মতো চঞ্চল স্বভাব তার। হাঁটতে গিয়ে যেন ছুটছে। আস্তে আস্তেÍ গিয়ে দাঁড়ালাম পানির ধারে বড় একটা পাথরের ওপর। সূর্য এখনো পাহাড়ের আড়ে মুখ লুকিয়ে। পাথর ছেড়ে ঝিরির পানিতে পা রাখলাম। আচমকা একটা শিহরণ খেলে গেল সারা গায়। যেন প্রথম পরশ কুমারীর থরথর। কত বারই তো পাহাড়ি ঝিরিতে নেমেছি, তারপরও কেন এমন হয় বারবার?

হাঁটতে থাকলাম কলরব করা স্রোতের ধারার সাথে। ছোট বড় আর নুড়ি পাথরে ভরা ঝিরির বুকটা। কিছুদূর গিয়ে ঝিরিটা বাঁক নিয়েছে পশ্চিমে। এখানকার সবচেয়ে উঁচু চূড়াটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই পাহাড়ের মাঝের সূর্য উঁকি দিতে দেখে আমি একটি পাথরের ওপর বসে পড়লাম। সূর্যের দিকে মুখ করে। দেখতে দেখতে শিশির বিন্দু হীরের কুচিতে পরিণত হলো। স্বচ্ছ জলের নিচে বালি পাথর কুচিরা হেসে উঠল। আমি বসে থাকলাম নিজেকে হারিয়ে। সূর্য তেতে উঠল। আমি পাশ ফিরলাম। মিঠেল রোদ গায়ে মাখতে ভালো লাগছে। পানির কলকল শব্দে থমকে গিয়েছিল সময়। কারো পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরল। পেছনে তাকিয়ে দেখি গুলতি হাতে দুটো পাহাড়ি ছেলে। সাতসকালেই নেমেছে শিকারে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি কাটা পৌনে আটের কাছাকাছি। জানি এখনো দলের কারো ঘুম ভাঙেনি। তবু কেন জানি মনে হলো ফেরা দরকার। ফিরছি ঝিরি ধরেই। আজ আমাদের কোনো তাড়া নেই, দিনটা ঝিরিতেই কাটাব দল বেঁধে। তার আগে এককাপ লাল চা। সৌজন্যে : দেশের খবর