Home » ডিটিসি ভ্রমণ বার্তা » বাংলাদেশে পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল : তালেব রিফাই

বাংলাদেশে পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল : তালেব রিফাই

জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) মহাসচিব তালেব রিফাইয়ের জন্ম ১৯৪৯ সালে, জর্ডানে। ২০১০ সাল থেকে তিনি সংস্থাটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে জর্ডানের পর্যটনসহ তথ্য ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি গত ২৭ ও ২৮ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্মেলনে অংশ নেন। সমাপনী দিনে তিনি এ সম্মেলন, বাংলাদেশের পর্যটন খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মামুনুর রশীদ

Taleb-Refai

বাংলাদেশে বৌদ্ধ স্থাপনাগুলো ঘিরে পর্যটন বিকাশের কী সম্ভাবনা আপনি দেখছেন?

এটা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। সম্প্রতি সেটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রদর্শিত হয়েছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বাংলাদেশে আয়োজিত এ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি আমাদের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দেয় যে এই দেশের ভেতরে-বাইরে অবস্থানরত সবারই এখানকার মানবিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে। এই দেশ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বহন করে। এ জন্য সবার গর্বিত হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বার্তাই দিয়েছেন। এ জন্যই আমি বিশ্বাস করি, এই দেশ বর্তমানে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। রাজনৈতিক সহযোগিতার কারণেই বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই প্রচার সর্বোচ্চ পর্যায়ে করা সম্ভব হয়েছে। এখানে এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে আরও অনেক প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতাও লক্ষ করার মতো। এই সম্মেলনে তাদের যোগদান অভিভূত করার মতো। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন খাতের সব মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব এখানে উপস্থিত আছেন। তাঁদের উপস্থিতি বাংলাদেশের প্রতি এবং এই সম্মেলনের বিষয়বস্তুর প্রতি তাঁদের সমর্থনই প্রমাণ করে।

আমাদের পর্যটনমন্ত্রী এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশে বৌদ্ধ পর্যটকের সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন (বর্তমানে মাত্র তিন হাজার বৌদ্ধ পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন)। এটা কতখানি সম্ভব?

এটা খুবই সম্ভব এবং বাস্তবসম্মতও বটে। এই সম্মেলন বাংলাদেশ এবং এর পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের বৌদ্ধ সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। সুতরাং ভারত, ভুটান, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে ভ্রমণের মতো এখন সবার বাংলাদেশ ভ্রমণের দিকে নজর থাকবে। তাঁরা বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখছেন। এই আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যের যথার্থতা প্রমাণ করবে। আমি এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা ও পর্যটনের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইউএনডব্লিউটিও কী ভূমিকা রাখবে?

এ ক্ষেত্রে ইউএনডব্লিউটিও বাংলাদেশকে দুই ধরনের সহায়তা দিতে পারে। একটি হচ্ছে কারিগরি, অন্যটি রাজনৈতিক সহযোগিতা। আসলে কারিগরি সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই এ সম্মেলনটি আয়োজিত হয়েছে। যেমন, ভবিষ্যতের জন্য রোডম্যাপ ঠিক করা কিংবা ঠিক কোন পথে আমরা কাজ করব, সেটা নির্ধারণ করা। এই পথের বাধা, চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা, সেই অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া এবং সবগুলো কাজ তিন থেকে চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে গুছিয়ে আনা। প্রথমত, ভ্রমণ সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ সফর অনেক বেশি সহজ করে তোলা। এ ক্ষেত্রে আমাদের বেশ অভিজ্ঞতা রয়েছে, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে সফরের সহজ, নিরাপদ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা কারিগরি সহায়তা দেব। দ্বিতীয়ত, আপনাদের প্রচুর সাংস্কৃতিক পুরাকীর্তি ও সম্পদ আছে। আপনাদের এটা সবার সামনে নিয়ে আসতে হবে, এগুলোকে পর্যটন পণ্যে পরিণত করতে হবে। এ কাজে আমাদের সহযোগিতা থাকবে। আর তৃতীয় ক্ষেত্রটি হচ্ছে প্রচারণা (প্রমোশন), যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পৃথিবীকে এসব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে না পারলে আদতে এর কোনো মূল্য নেই। এগুলো সবাইকে জানানোর জন্যই আমরা আজ এখানে। আমি এখান থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্যটন মেলা ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল মার্কেটে অংশ নিতে লন্ডন যাব। সেখানে আমি আমার বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে বলব। আমরা পৃথিবীর যে ফোরামেই যাই না কেন, সেখানে আমরা বাংলাদেশ নিয়ে প্রচারণা চালাব। সর্বশেষ আমরা পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যটন পণ্যগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আর রাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটি কারিগরি বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাকি বিশ্বে এই তথ্য পৌঁছে দেব যে এটা একটি পর্যটন অঞ্চল এবং এখানেই আমরা আমাদের পর্যটন সম্মেলনটি আয়োজন করেছি। এভাবেই আমরা ঢাকা থেকে এই বার্তা সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। পৃথিবীজুড়ে আমরাই আপনাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। এটাকেই আমি রাজনৈতিক সহায়তা বলছি। এর মাধ্যমে আপনারা বাংলাদেশে বৌদ্ধ পর্যটনসংক্রান্ত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে ইউএনডব্লিউটিওর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলাদেশ, এখানকার মানুষ, আতিথেয়তা সম্পর্কে কিছু বলুন।

আমি এখানে আছি ৩৬ ঘণ্টা হতে চলল। চারটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা দেখেছি। একটি হিন্দু, একটি বৌদ্ধ, একটি মুসলিম ও একটি খ্রিষ্টান। আমি এ দেশের মানুষের মুখে হাসি দেখেছি। আমি সেই যানজট দেখিনি, যা নিয়ে মানুষ কথা বলে। আমি স্বতঃস্ফূর্ততা দেখেছি। আমি দেখেছি এখানকার মানুষ সুখী এবং হাস্যোজ্জ্বল। দিন শেষে আমার কাছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানকার ছয়টি ঋতু সম্পর্কে ধারণা আমার আছে। আমি অবশ্যই এখানে ফিরে আসব। আমার পরিবারকেও সঙ্গে নিয়ে আসব। এটি বসবাসযোগ্য অসাধারণ একটি দেশ। আমি আশা করব, সবাই এভাবেই ভাববে এবং জানবে যে এই দেশে কতখানি ইতিবাচকতা রয়েছে।

বাংলাদেশে অনেক ধর্মের লোকের বাস। এই সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের বিষয়টি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মানবতার মধ্যে নিহিত যে সত্য, তার ওপর কোনো সত্য নেই। ধর্ম বৈচিত্র্যের ধারক। এটা স্বাস্থ্যকর, এটাই শক্তি। যে সমাজ ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে সম্মান ও উদ্যাপন করে, সেটাই শক্তিশালী সমাজ। সুতরাং এই শক্তি ও বৈচিত্র্যে বিশ্বাস রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করি, এই বার্তাটি যত বেশি প্রতিষ্ঠা পাবে, ততই বাংলাদেশ শান্তি ও সৌহার্দ্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। গত ৩৬ ঘণ্টায় আমি এ রকম অনেক মানুষের সদিচ্ছা ও বিশ্বাস দেখেছি। তাই আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরও শান্তি, সৌহার্দ্য, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে ভরপুর।

ইউএনডব্লিউটিও, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্ধুদের নিয়ে বাংলাদেশ এবারই প্রথম একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্মেলনের আয়োজন করেছে। এখান থেকে বাংলাদেশ কতখানি লাভবান হতে পারে?

আমার মনে হয় অনেকখানি। একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন কোনো জায়গায় অনুষ্ঠিত হলে সে জায়গাটা মানুষের কাছে খুব পরিচিত হয়ে ওঠে। ঢাকায় এ সম্মেলনের ভেতর দিয়ে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। মানুষজন এগুলো সম্পর্কে জানবে। বাংলাদেশ ঘোষণা নিয়ে তারা কথা বলবে। তাদের কাছে এটাই প্রতিষ্ঠা পাবে যে আপনারা আপনাদের পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি, এ আয়োজনটিকে ভবিষ্যতে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে মনে রাখা হবে। বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে করলাম আর হয়ে গেল। আপনারা খুব সফলতার সঙ্গে আয়োজনটি সম্পন্ন করেছেন। এর ওপর ভিত্তি করেই আমি আশা করব, প্রতিবছরই ভিন্ন আঙ্গিক ও বিষয় নিয়ে এ দেশে সম্মেলন আয়োজিত হবে। এ রকম বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়ে যেন সবাই এ দেশকে পর্যটনের একটি প্রাণকেন্দ্র হিসেবে চিনতে পারে। বিশ্ব পর্যটনের আসরে নিজের অবস্থান পাকা করে নিতে পারে।

তালেব রিফাই: জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) মহাসচিব। সৌজন্যে : প্রথম আলো

Web-Design-&-Developmen