Home » ফিচার » সাগরতলে বিস্ময়জগৎ

সাগরতলে বিস্ময়জগৎ

তানভীর আহমেদ
রহস্যঘেরা মহাসমুদ্র
পৃথিবীর স্থলভাগ জুড়ে আমাদের চলাচল বেশি। যোগাযোগের জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অংশই সমুদ্র। মহাসাগর পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৭০ শতাংশ দখল করে আছে। মহাসাগরের অর্ধেকেরও বেশি জায়গার গড় গভীরতা ৩ হাজার মিটারেরও বেশি। আমাদের ভূমণ্ডলে মহাসাগরের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশেষত মহাসাগরীয় বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া গুরুত্ব বহন করে। এটি পানিচক্রের একটি প্রয়োজনীয় ধাপ। পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের উৎসস্থল হিসেবে মহাসাগরগুলো চিহ্নিত। মহাসাগরীয় তাপমাত্রা, জলবায়ু ও বাতাসের গতিপথের ওপর বৃষ্টিপাত অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ ছাড়া মহাসাগর স্থলভাগে বসবাসকারীদের জীবন ও জীবনধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। মহাসাগর গঠনের ৩ বিলিয়ন বছরের মধ্যে স্থলভাগে মানুষের চলাচল শুরু হয়। সমুদ্র উপকূলের গভীরতা এবং দূরত্ব উপক‚লীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্যে অবদান রাখে। উপক‚লীয় এলাকায় বিভিন্ন ধরনের গাছপালা জম্নে এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে। মহাসাগরের পানির রং নীল। এ ছাড়াও পানিতে খুব কম পরিমাণে নীল রং থাকে। তাই যখন বিপুল জলরাশিকে একত্রে রাখা হয় তখন মহাসাগরের পানি নীল দেখায়। এখন পানির নিচ দিয়েও ভ্রমণ করা সম্ভব। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ হিসেবে নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপের খাত সমুদ্রের গভীরতম বিন্দু। ব্রিটিশ নৌযান চ্যালেঞ্জার-২ ১৮৫১ সালে স্থানটি জরিপ করে এবং সবচেয়ে গভীর স্থানকে নামকরণ করেছে ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ হিসেবে। ভূগোলবিদরা গবেষণার সুবিধার্থে মহাসাগরকে ৫টি অংশে বিভক্ত করেছেন।

Under-Sea

প্রশান্ত মহাসাগর : এটি আমেরিকাকে এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বিভক্ত করেছে।
আটলান্টিক মহাসাগর : এটি আমেরিকাকে ইউরেশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে বিভক্ত করেছে।
ভারত মহাসাগর : এটি দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে রেখেছে এবং আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে বিভক্ত করেছে।
দক্ষিণ মহাসাগর বা অ্যান্টার্কটিক মহাসাগর : এ মহাসাগর অ্যান্টার্কটিক মহাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং প্রশান্ত, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগরের বহিরাংশ হিসেবে নির্দেশিত হচ্ছে।
উত্তর মহাসাগর বা আর্কটিক মহাসাগর : এ মহাসাগরটি আটলান্টিক মহাসাগরের একটি সমুদ্র হিসেবে মর‌্যাদা পাচ্ছে, যা আর্কটিকের অধিকাংশ এলাকা এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ার একাংশকে ঘিরে রেখেছে।
প্রশান্ত মহাসাগর : প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর। প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন ১৬৯.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। এটি পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৩২ শতাংশ, সব জলভাগের ৪৬ শতাংশ এবং পৃথিবীর ভ‚মিপৃষ্ঠের চেয়ে আয়তনে বেশি। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ আগ্নেয়গিরি এই মহাসাগরে অবস্থিত। গ্রেট বেরিয়ার রিফ বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোরাল রিফ এখানে।
অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। এর আয়তন ১০৬.৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। এটি পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত।
ভারত মহাসাগর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। পৃথিবীর মোট জলভাগের ২০ শতাংশ এই মহাসাগরে রয়েছে।
দক্ষিণ মহাসাগর বা অ্যান্টার্কটিক মহাসাগর হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের জলরাশি। উত্তর মহাসাগর উত্তর গোলার্ধের সুমেরু অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে কম গভীর মহাসাগর।

চ্যালেঞ্জার ডিপ
প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের একটি খাদ মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। বিশ্বের গভীরতম বিন্দু রয়েছে এখানেই। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পূর্বে অবস্থিত। মারিয়ানা খাদ একটি বৃত্তচাপের আকারে উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কি.মি. ধরে বিস্তৃত। এর গড় বিস্তার ৭০ কি.মি.। এই সমুদ্র খাতটির দক্ষিণ প্রান্তসীমায় গুয়াম দ্বীপের ৩৪০ কি.মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃথিবীপৃষ্ঠের গভীরতম বিন্দু অবস্থিত। এই বিন্দুর নাম চ্যালেঞ্জার ডিপ এবং এর গভীরতা প্রায় ১১ হাজার ৩৩ মিটার।Under-Sea3

১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে সুইস মহাসাগর প্রকৌশলী জাক পিকার ও মার্কিন নৌবাহিনীর লিউট্যানান্ট ডনাল্ড ওয়ালস ফরাসি-নির্মিত বাথিস্কাফ ত্রিয়েস্ত করে চ্যালেঞ্জার ডিপে অবতরণ করেন। জাক পিকারের বাবা ওগুস্ত পিকার বাথিস্কাফ উদ্ভাবন করেন। জাক ও ডনাল্ড ত্রিয়েস্তকে ১০ হাজার ৯১৫ মিটার গভীরতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে গভীরতম ডিপ। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার। চওড়ায় এটি মাত্র ৬৯ কিলোমিটার। গভীর সাগরের তলদেশে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে এখনো রয়ে গেছে নানা সমস্যা। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা খাদের গভীরতা আরও বেশি হতে পারে। সে জন্যই তারা চালাচ্ছেন নিত্যনতুন অভিযান। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর অংশটি শেষ হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে চ্যালেঞ্জার ডিপ’ নামের ভ্যালিতে গিয়ে। খাদের শেষ অংশে পানির চাপ এতটাই যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের স্বাভাবিক বায়ুচাপের তুলনায় তা ১০০০ গুণেরও বেশি। এ কারণেই এখানে স্বাভাবিকের চেয়ে পানির ঘনত্বও প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। খাদের সবচেয়ে নিচু জায়গা চ্যালেঞ্জার ডিপ’ নামটি রাখা হয়েছে জলযান এইচএমএস চ্যালেঞ্জার-২-এর নাম থেকে নিয়ে। স্থানটির তাপমাত্রা এতই কম যে, বিজ্ঞানীরা বলেন, সাগরতলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার স্থান এটিই। কখনো হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন ধরনের খনিজ সমৃদ্ধ গরম পানিও বের হয় চ্যালেঞ্জার ডিপের ছিদ্রপথ দিয়ে। এগুলো প্রধান খাদ্য ব্যারোফিলিক জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার। এসব ব্যাকটেরিয়াকেই আবার খায় শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয় এমন কতগুলো ছোট ছোট জীব। এদের খেয়ে বেঁচে থাকে মাছেরা। এভাবেই সাগরতলের এত গভীরেও জীবনের চক্র কিন্তু ঠিকই চলতে থাকে, যেমনটি চলে সাগরের ওপর। অতি ক্ষুদ্র কিছু ব্যাকটেরিয়ারও দেখা মেলে মারিয়ানা খাদে।

সাধারণত সমুদ্রতলের গভীরে মৃত প্রাণীর কঙ্কাল, খোলস জমা পড়তে থাকে। মারিয়ানার তলও আলাদা নয়। এখানকার পানির রং সে জন্যই খানিকটা হলুদ। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ চাঁদের মতোই বিরান বলে মন্তব্য করেছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জেমস ক্যামেরন। পৃথিবীর গভীরতম তলদেশে দুঃসাহসিক অভিযান শেষে উঠে এসে তিনি এই মন্তব্য করেন। বিশ্বনন্দিত এই পরিচালক সাগরের তলদেশে ৩৫ হাজার ৭৫৬ ফুট গভীরে পাড়ি জমান। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়ামের অদূরে অবস্থিত মারিয়ানা ট্রেঞ্চ বলে অভিহিত এই খাদের সবচেয়ে গভীর বিন্দুতে পৌঁছায় ক্যামেরনের সাবমেরিন। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ অভিযানে বিশেষভাবে তৈরি একটি সাবমেরিন ব্যবহার করেন তিনি। ১২ টন ওজনের এই সাবমেরিনটি নিয়ে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাগরতলে প্রায় ১১ কিলোমিটার নিচে নেমে যান। সেখানে পানির চাপ হলো ১০৮.৬ মেগাপ্যাসকেল, অর্থাৎ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ১৫,৭৫০ পাউন্ড। এই সমুদ্র গভীরতায় দেখা মেলে অবাক করার মতো মাছের। এখানকার বাসিন্দারা সংখ্যায় যেমন অনেক, তেমনি বৈচিত্র্যেও কম নয়।

Under-Sea4

বৃদ্ধ প্রবাল
সাগরতলে সৌন্দর্যের আধার বলা হয় প্রবালকে। শুধু রঙের দিক থেকেই নয়, সাগরতলের ইতিহাস লেখকও সে। প্রবাল মূলত অ্যান্থজোয়া শ্রেণিভুক্ত সামুদ্রিক প্রাণি। এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। প্রাণি হলেও জীবনের পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় সাগরতলে কোনো দৃঢ়তলের ওপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে গেড়ে বসে সেখানে নিজের দেহের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে খোলস তৈরি করে। প্রবালে বৈচিত্র্যের শেষ নেই। প্রবালের তালিকায় চোখ ধাঁধিয়ে দেবে নীল প্রবাল। এ ছাড়া খোঁজ মিলেছে লোবের। এই প্রবাল দেখতে অনেকটা সূর্যের মতো। অনেকেই একে সমুদ্রতলের সূর্য বলে উপমা দিয়ে থাকেন। এর বয়স কমপক্ষে ৫০০ বছর। পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যবহন করছে এটি। লোব কোরালের দেখা পাওয়া যায় প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ দিকে, লাইন দ্বীপের কাছে।

Under-Sea5

সমুদ্রকাঁটা
সমুদ্রতলদেশে উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের শেষ নেই। বিশ্লেষকরা দাবি করেন, মাটির ওপর নয়, সমুদ্রতলেই উদ্ভিদবৈচিত্র্য বেশি। এর কারণ আর কিছুই নয়, গবেষণার স্বল্পতা। এখনো সমুদ্রতলে উদ্ভিদজগত নিয়ে খুব কম গবেষণার সুযোগ মিলেছে। একে তো গবেষণার বিশাল খরচ অন্যদিকে জলতলে দীর্ঘদিন থাকার প্রযুক্তিগত স্বল্পতা। সমুদ্রতলে দেখা মিলবে কাঁটা। গায়ে ফুটলে এগুলোর কোনোটি প্রাণঘাতী হতে পারে। এ ধরনের কাঁটাকে বলা হয়, ‘সি-আর্চিন’। এগুলো দৃষ্টিনন্দন ও রঙিন হওয়ায় যে কাউকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু ডুবুরি ও সৌখিন সাঁতারুদের কাছে এটি বাড়তি আতঙ্ক। কিছু কিছু সি-আর্চিন কিন্তু খাওয়া যায়। কিছু প্রজাতির মাছের প্রিয় খাবার এগুলো। রেড সি-আর্চিন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বনে কার্পেটের ন্যায় বিছানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রতলেও এটি যেন লাল গালিচা। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডে রয়েছে যাপার। ভ্যানকুভারেও সি-আর্চিনের দেখা পাওয়া যায়।

Under-Sea6

বৈদ্যুতিক মাছ
সমুদ্রজগতে মাছের রাজত্ব। অসংখ্য প্রজাতির মাছের বসবাস সেখানে। তালিকা দিয়ে সেটি শেষ করার নয়। ইলেকট্রিক ইল নামক মাছ নিজের শরীরে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। যে বিদ্যুতের শকে মানুষ আহত কিংবা মারাও যেতে পারে। কুমির পর্যন্ত মারাÍকভাবে আহত হয়। এগুলো পাওয়া যায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। এ মাছ দেখতে আমাদের দেশের মাগুর মাছের মতো; কিন্তু আকারে বড়। ইলেকট্রিক ইল তার শরীরের বিশেষস্নায়ুতন্ত্র ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এ মাছের শরীরে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য চাকতির মতো কতকগুলো কোষ রয়েছে। শরীরের বিশেষ একটি অংশ, যেটিকে বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গ বলা হয়।

স্নায়ুতন্ত্রের কাজ হলো এসব কোষ যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করে তা নিশ্চিত করা।স্নায়ুতন্ত্র থেকে সংকেত পাওয়ার পর,স্নায়ু থেকে অ্যাসেটিল কোলাইন নামের খুব সামান্য পরিমাণ এক ধরনের রাসায়নিক নির্গত হয়। এ রাসায়নিকটি নিউরো-ট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে।

Under-Sea7

নীল তিমি
আলাদা করে বলতে হয় নীল তিমির কথা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী। এটির ওজন প্রায় ১৫০ টন এবং এরা দৈর্ঘ্যে ৩০ মিটারের (৯৮ ফিট) হতে পারে। অনেকের ধারণা, সাগরে সাঁতরে বেড়ানো তিমিরা হলো একধরনের মাছ; কিন্তু তিমি কোনো মাছ নয়, স্তন্যপায়ী প্রাণী। তিমিও উষ্ণ রক্তের প্রাণী। জম্নের সময়ই নীল তিমির একেকটা বাচ্চা হয় হাতির মতো, বাচ্চার ওজন দাঁড়ায় প্রায় ২৭ টন আর দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৭ ফুট। তিমি স্কুইড, বড় মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করে খায়। ঘণ্টায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে সাঁতরাতে পারে। মাঝে মধ্যে তিমিরা সাগরের বুকে শুধু মাথাটা উঁচু করে একবার ঘুরে চার পাশটা দেখে নেয়, দেহকে পানির উপরে তোলে না। তিমিরা নানা রকম শব্দ করে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করে। এমনকি তিমিরা গানও গায়। বিশেষজ্ঞরা হ্যাম্পব্যাক বা কুব্জপৃষ্ঠ তিমির ৩০ মিনিট পর্যন্ত গান রেকর্ড করেছেন। তিমি কেন গান গায়, সে আর এক রহস্যের জাল। নীল তিমি যত জোরে শব্দ করতে পারে অত জোরে পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী শব্দ করতে পারে না। সাগরে নীল তিমির কণ্ঠস্বর ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়।

Under-Sea8

সমুদ্র হত্যা
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের লরা পার্কার গত বছরই বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন সমুদ্র হত্যায় মানুষের উৎসবের কথা। পৃথিবীর অনেকেই জানত না, সমুদ্রবাসীর কী সর্বনাশ হয়েছে গত কয়েক দশকে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ৩৭০ নিখোঁজের পর মহাসাগরজুড়ে তল্লাশি শুরু করে বিভিন্ন দেশ। তখনই সবার চোখে ধরা পড়ে আরেক দৃশ্য। সমুদ্রজুড়ে শুধুই আবর্জনা। অস্ট্রেলিয়ান উপক‚ লজুড়ে আবর্জনা ছেয়ে গেছে। মাছ ধরার টুকরো উপাদান, কার্গো জাহাজগুলোর বাতিল অংশ, প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগসহ আবর্জনার এই স্তপ পুরো সাগরকে যেন গিলে নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ছবি দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি। সমুদ্রগভীরে পৌঁছার কথা ভাবতেই তারা শিউরে উঠলেন। সমুদ্রতলে যাত্রা শুরু হয়, যা ভাবা হয়েছিল ঠিক তাই। কোথাও কোথাও আবর্জনার পাহাড় তৈরি হয়ে গেছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই আবর্জনার বেশির ভাগ অংশই সহজে পচে যায় না। প্যাসিফিক আর আটলান্টিকের অতলের এই দৃশ্যকে সমুদ্র হত্যা বলা হয়। উত্তর ও দক্ষিণে সরে এসেও একই দৃশ্য দেখা গেল। ভারত মহাসাগর, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যাংশ সমুদ্রতল আবর্জনায় ডুবে গেছে। এতে সমুদ্রতলের প্রাণীবৈচিত্র্য অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

Under-Sea9

ভয়ানক সি ক্রেইট
সমুদ্রে বাস করে বিষাক্ত সাপের দলও। সি ক্রেইট তাদেরই একটি। এই সাপের বিষে মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। একটু ভুলেই এটি হয়ে উঠতে পারে যে কোনো সাঁতারু বা ডুবুরির দুঃস্বপ্ন। পৃথিবীর স্থলে অন্যতম বিষধর হিসেবে র‌্যাটলস্রেকের কথা বলা হয়। র‌্যাটল স্রেক সি ক্রেইটের বিষের কাছে নেহায়তই ছেলেখেলা। কারণ সি ক্রেইট র‌্যাটল স্রেক থেকে কমপক্ষে দশগুণ বেশি বিষাক্ত। সমুদ্রের গভীরে চলাচল বেশি বলে এটি মানুষকে কম আক্রমণ করে। এটি সমুদ্রজলে ঘুরে বেড়ায়, প্রবালের আনাচে-কানাচে বাস করে। ম্যানগ্রোভ বনেও এদের দেখা যায়। সমুদ্রে বিষধরের অভাব নেই। অনেক ভয়ানক মাছ রয়েছে, উদ্ভিদ রয়েছে। কিন্তু সি ক্রেইট সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সমুদ্রের ছোট-বড় সব প্রাণী তাকে ভয় পায়। এরা সমুদ্রের আরেক আতঙ্ক বৈদ্যুতিক ইলকে অনায়াসে পেটে পুরে নেয়। ছোট মাছ, মাছের ডিম এদের প্রধান খাবার।

Under-Sea10

মৎস্যকন্যা
সমুদ্রে মিথের শেষ নেই। মৎস্যকন্যা যুগে যুগে সমুদ্রবাসীর কাছে সবচেয়ে আলোচিত মিথ। মিথ বলে, জাহাজডুবির ফলে কোনো কোনো নাবিককে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে এই মৎস্যকন্যারা। ১৪৯২ সালে সমুদ্রে ভ্রমণের সময় কলম্বাস তিনটি মৎস্যকন্যা দেখেছিলেন। ১৬০৭ সালে জেনরি হার্ডসন উত্তর সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তিনটি প্রাণীকে দেখেন, যাদের নাভির ওপর থেকে দেখতে হুবহু মেয়েদের মতো, কিন্তু নিচের অংশটা মাছের মতো। ১৯১৭ সালে লিওনদাসের ক্যাপ্টেন মানুষ আকৃতির একটি প্রাণীকে দেখতে পান, যার শরীরের উপরের অংশে কালো চুল, ত্বক সাদা, কিন্তু হাতের নিচ থেকে মাছের আকৃতি। ১৮০৩ সালে স্কটিশ সমুদ্র উপকূলে একটি মৎস্যকন্যা ধরা পড়ে। এক মিটারের মতো লম্বা, সেটার শরীরের উপরের অংশ অবিকল মেয়েদের মতো।

Under-Sea11

জলতলের আগ্নেয়গিরি
বিজ্ঞানীরা দাবি করেন পৃথিবীর ৮০ শতাংশ আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে এবং এগুলো নিয়মিত অগ্ন্যুৎপাত করে থাকে। এই আগ্নেয়গিরির বেশির ভাগই সমুদ্রের হাজার ফুট গভীরে রয়েছে। এগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০০৯ সালের মে মাসে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের সবচেয়ে গভীরে অগ্ন্যুৎপাতের চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হন। প্রশান্ত মহাসাগরের সামাও, ফিজি এবং টোঙ্গার মধ্যবর্তী অংশে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনাটি ঘটে। সেটি প্রশান্ত মহাসাগরের তলভাগ থেকে কমপক্ষে চার হাজার গভীরে ছিল। অগ্ন্যুৎপাতের পরপরই লাভা নির্গত হয়ে সমুদ্রতলে পুরো অঞ্চল কুয়াশায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। গলিত পাথরের স্রোত বয়ে যায়। পরীক্ষার পর জানা যায়, এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা। সমুদ্রে দ্বীপ গড়ে ওঠার সঙ্গে বিজ্ঞানীরা অগ্ন্যুৎপাতের একটি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। সমুদ্রতলদেশের প্রকৃতি নির্ণয়েও এ ধরনের আগ্নেয়গিরির ভূমিকা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন