Home » এন্টারটেইনমেন্ট » হুমায়ূন ক্যালেন্ডার…
২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর কলম জাদুকরের জন্মদিনের একটি দৃশ্য। ছবিটি তার পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া।

হুমায়ূন ক্যালেন্ডার…

মেহের আফরোজ শাওন
হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তার জন্মদিন ছিল অনেকটা সার্বজনীন। এদিনটা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। নিজ হাতে সবাইকে তিনি এদিন বরণ করে নিতেন। তার অনেক জন্মদিনই আমার স্মৃতির পাতায় রয়েছে। তবে বিশেষ কিছু দিবস বা কাজ হয়ে থাকে তা সব সময় মনে রাখার মতো। আসলে তার সব কিছুই মনে রাখার মতো। তারপরও কিছু থাকে একটু ব্যতিক্রম। এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালের জন্মদিনের সময়।

২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর কলম জাদুকরের জন্মদিনের একটি দৃশ্য। ছবিটি তার পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া।

২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর কলম জাদুকরের জন্মদিনের একটি দৃশ্য। ছবিটি তার পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে চিন্তা করতাম তাকে কিভাবে চমকে দেওয়া যায়। প্রথমেই চিন্তা করলাম কবিতা, অর্থাৎ জন্মদিনে চার লাইনের কবিতা লিখে তাকে কিভাবে চমকানো যায়। কিন্তু আমার তো কবিতা লেখার ক্ষমতা নেই। তিনি আশ্চর্য সব উপহার দিয়ে মানুষকে চমকে দিতেন। একবার আমার পরীক্ষার সময় উপহার হিসেবে একটা অ্যারোসলের কৌটা পাঠালেন। পরীক্ষার সময় মশা কামড়াবে তাই। এরকম মজার মজার কাজ করে সবাইকে চমকে দিতেন। বিয়ের পর থেকেই চিন্তা করলাম যেভাবেই হোক হুমায়ূন আহমেদকে চমকে দিতে হবে। কেউ পাঞ্জাবি দেয়, কেউ কলম, কেউ বই। তিনি সারা জীবন লিখেছেন তিন টাকার কলম দিয়ে। তাই দামি কলম দিয়ে লাভ নেই। বই দিয়েও তাকে চমকানো যাবে না। চমকে দেওয়ার বিষয়টা প্রতিবারই চিন্তা করতাম।

২০০৭ সালের জন্মদিনের ঘটনাটা একটু আলাদা করে বলি। সন্তানদের প্রতি প্রচণ্ড আবেগ-ভালোবাসা ছিল হুমায়ূন আহমেদের। ভাবলাম সন্তানদের যোগ করে কিছু দেওয়া যায় কিনা। পরে ভাবলাম হুমায়ূন ক্যালেন্ডার বানানো যায় কিনা। হুমায়ূন ক্যালেন্ডারের ডেটটা শুরু হবে ১৩ নভেম্বর, ২০০৭। শেষ হবে ১২ নভেম্বর, ২০০৮। তখন থেকে হুমায়ূন বছর শুরু হবে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের ছবিগুলো কি হবে এটা নিয়ে ভাবতে থাকলাম। ছবিগুলো হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় ও পছন্দের হতে হবে। বাচ্চাদের ছবি, নিষাদের ছবি… এরকম অনেক কিছু ভাবতে লাগলাম। পরে ভাবলাম শুধু নিষাদ কেন হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলো আনলে কেমন হয়। যেমন হিমু, শুভ্র ও মিসির আলী। নিষাদের বয়স তখন সাত মাস। দাঁড়াতেও পারে না। সবে হামাগুড়ি দেওয়া শিখেছে। চিন্তা করলাম সেই ক্যালেন্ডারে নিষাদের ছবি থাকবে। কিন্তু তাকে নিয়ে ফটোসেশন করতে গিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। কারণ ও তো ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না। এদিকে হিমুর মতো একটা পাঞ্জাবি বানালাম। দুজনের জন্য দুটা। একটা আমার অন্যটা নিষাদের। এছাড়া তৈরি করলাম মিসির আলীর শার্ট-প্যান্ট। ছবি তুলতে যাব। ফটোসেশন করার জন্য বাসা থেকে যাব কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ জিজ্ঞেস করলে উত্তরে কি বলব তা বুঝতে পারছিলাম না। বিয়ের পর মায়ের বাড়িতে খুব একটা যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

অনেকবার যেতে চেয়েছি। তিনি আমাকে বলেছেন পরে যাও। অনেক সময় মাঝপথ থেকে ম্যাসেজ দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। মায়ের বাড়ি যাওয়ার অজুহাতে নিষাদকে নিয়ে ফটোসেশনের কাপড়-চোপড় গুছিয়ে বের হতে চাইলাম। কিন্তু সরাসরি বলতে পারছি না ছবি তুলতে যাব। তাহলে তো আর সারপ্রাইস থাকল না। সেই সময় যাওয়ার জন্য তর্ক-বিতর্কও করেছি। অতঃপর সাত মাসের বাচ্চা নিয়ে ছবি তুলতে গেলাম। এটুকু বাচ্চা নিয়ে ছবি তুলতে সে কি যুদ্ধ। দাঁড়াতেই পারে না। হাতে কিছু দিলে খুলে ফেলে। আমিও তাকে নিয়ে ছবি তুললাম। কারণ আমিও হুমায়ূনের একজন প্রিয় মানুষ। চশমা পরিয়ে শুভ্রর মতো নিষাদের ছবি তুললাম। সমস্যা হলো মিসির আলী চরিত্রে ছবি তোলার সময়।

কারণ নিষাদকে দাড়ি লাগানো গেল না। তাই ধুতি দিয়ে দেবদাস সাজালাম। অন্যদিকে গোঁফ লাগালাম কালি-কলম দিয়ে। হাতে পিস্তল-টিস্তল দিয়ে ছবি তুললাম। অনেকটা ওয়েস্টার্ন হিরোর মতো। ছবি তোলার পর ১০০ ক্যালেন্ডারও প্রকাশ করে ফেললাম। এর মধ্যে একটি করলাম এক্সক্লুসিভ যা শুধু হুমায়ূনের জন্য। প্রতি জন্মদিনের মতো সেবারও আমার শাশুড়ি ছিলেন, হুমায়ূনের বোনরা এসেছিল। উপস্থিত ছিল হুমায়ূনের অনেক কাছের বন্ধু-বান্ধবরা। ছবিগুলো যখন দেখানো হলো তিনি এত পছন্দ করলেন আইডিয়াটা। তাকে খুশি করা যেমন সহজ, তেমনি কঠিন।

টাকা পয়সা খরচ করে হবে না। লাগবে আইডিয়া। অনেক ছোট জিনিস দিয়েও তাকে খুশি করা যায়, তবে তার পছন্দের হতে হবে। সে সময় সবাই ক্যালেন্ডারের খুব প্রশংসা করলেন। একজন বলেই বসলেন আমি ক্যালেন্ডারটা নেব না। আমার বউকে এমন একটা সারপ্রাইজ দেব। তাই এই মুহূর্তে ক্যালেন্ডারটা বাসায় নেব না। এভাবেই উদযাপন করা হতো তার জন্মদিনগুলো। তিনিও সবাইকে আপন করে নিতেন খুব সহজেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও কথাটা সত্যি, হুমায়ূনকে মানুষ অবহেলা করেছে। কিন্তু, তিনি কখনো কাউকে এক মুহূর্তের জন্য অবহেলা করেননি। অসুস্থ অবস্থায় জেগে বলতেন, তিনি ফোন করে, সে ফোন করে, কখন করে? তারা কেমন আছে? আমি বলতাম, তুমি তখন ঘুমিয়েছিলে। আর এখনো সে ঘুমিয়ে আছে। সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন