Home » কালচারাল ট্যুরিজম » ইংরেজি নববর্ষের একাল সেকাল

ইংরেজি নববর্ষের একাল সেকাল

শামীম চৌধুরী
ইংরেজি নববর্ষ আজ আর পাশ্চাত্যদের একার সম্পদ নয়, গোটা বিশ্ব নববর্ষের আগমনকে উল্লাসে আর উন্মাদনায় প্রকম্পিত করে। ইংরেজি ভাষা যেমন আজ শুধু নির্দিষ্ট দেশের বা জাতির নয়। সব দেশেরই এখন এই ভাষার চর্চা হয়। এটিকে বাদ দিয়ে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারবে না। লিখেছেন শামীম চৌধুরী

বছরের বাকি দিনগুলো যাতে ভালোভাবে যায়, এ কারণে প্রার্থনা করা হয়। দিন কাটে সাজগোজে, গানে গানে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে। উদ্দেশ্য থাকে, বছরটা যেন সুন্দরভাবে পার হয়ে যায়। এমনটি যে শুধু ইংরেজদের বেলায় হয়, অন্যদের হয় না, তা নয়। সব জাতিরই একটা বিশেষ দিন থাকে যে দিনটি ধর্ম-বর্ণ একাকার হয়ে একটা বিশেষ সংস্কৃতির জন্ম দেয়।

New-Year

ইংরেজি নববর্ষ শুরু হয় জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে। ইংরেজরা দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখে নানা আনন্দ উৎসবে। অতীতে কে কী ছিল, সে কথা না ভেবে এই আধুনিক যুগে নববর্ষের উৎসবে সবাই একাকার হয়ে যায়।

ইংরেজি নববর্ষ আজ আর পাশ্চাত্যদের একার সম্পদ নয়, গোটা বিশ্ব নববর্ষের আগমনকে উল্লাসে-উন্মাদনায় প্রকম্পিত করে। ইংরেজি ভাষা যেমন আজ শুধু নির্দিষ্ট দেশের বা জাতির নয়। সব দেশেই এখন এই ভাষার চর্চা হয়। একে বাদ দিয়ে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।

মধ্যযুগ থেকে অদ্যাবধি নববর্ষের এ দিনটি যিশুখ্রিষ্টের খতনা দেয়ার দিনের সাথে মিলিয়ে রাখা হয়। পৃথিবীর সব দেশে জানুয়ারির প্রথম দিন উৎসবে উৎসবে মুখরিত থাকে। এই দিনকে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা সৌভাগ্যের দিন বলে মনে করেন। এ জন্য ভালো খাওয়া, ভালো পোশাক পরা ইত্যাদি এ সমাজে প্রচলিত আছে।

ইংরেজি নববর্ষের আনন্দ শুধু ১ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে নয়। ৩১ ডিসেম্বর সূর্যাস্তের পর থেকেই উদ্দাম-উচ্ছলতায় নিজেকে সমর্পণ করে উৎসবে, আনন্দে। বাংলাদেশেও এখন এমনটি হচ্ছে। আমাদের তরুণ-তরুণীরা এই সংস্কৃতিকে ধরে ফেলেছে। তবে আমাদের সংস্কৃতির সাথে যেহেতু এই সংস্কৃতি মেলে না তাই এটি পালনে ভিন্নতা আছে। অনেকেই তা এমনভাবে পালন করে যা দৃষ্টিকটু হয়ে যায়। এখানে শ্লীল ও অশ্লীলের বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।

রোমানরাও নতুন বছর হিসেবে মার্চের প্রথম দিনে উৎসবের আয়োজন করত। এমন চলছিল অনেক দিন। কিন্তু রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার নতুন বছর হিসেবে মার্চ মাসের পরিবর্তে জানুয়ারি মাসকেই সাব্যস্ত করেছিলেন।

জানুয়ারির প্রথম দিনকে তিনি নতুন বছরের উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করলেন দেবতা ‘জানুস’-এর নামানুসারে খ্রিষ্টজন্মের ৪৬ বছর আগে। দেবতা ‘জানুস’-এর দুটো মুখ ছিল। এক মুখ ছিল সম্মুখভাগে, অপরটি পেছনে।

তাকে আকাশ ও পাতালের দ্বার রাকারী দেবতা বলে মনে করা হতো। সম্রাট সিজার দেবতা ‘জানুষ’-এর সম্মুখভাগের মুখকে নতুন বছরের ‘দরজা’ এবং পশ্চাৎভাগের মুখকে বিদায়ী বছরের প্রতীক বলে গণ্য করা হয়।

ইংরেজি নববর্ষ, অতীতে তা এমনটি ছিল না। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, আজকের ইংরেজদের রক্তে নির্ভেজাল ইংরেজ রক্ত নেই, অর্থাৎ ইংল্যান্ডের আদিবাসী যারা ‘ব্রিটন’ বলে পরিচিত ছিল, তাদের দেশের নাম ব্রিটেন বলে, তাদের সে রক্তে মিশ্রণ ঘটেছে ‘এরিয়ান’ বা আর্য বলে কথিত জার্মান রক্ত। ‘অ্যাঙ্গেলস’, ‘স্যাক্সন’ এবং ‘জাটস’ নামে বহিরাগতদের মাধ্যমে ইংরেজদের পরিচিতি ঘটেছে। এর সাথে মিশ্রিত হয়েছে রোমানদের রক্ত। ইংরেজদের প্রথম যে মহাকাব্য, সেটিও বহিরাগত জার্মানদের মুখে মুখে, কণ্ঠে কণ্ঠে এক দেশ থেকে আর এক দেশের সম্পদ হয়ে গেল। ভারতবর্ষ যেমন নানা জাতি এবং বর্ণের মিলনকেন্দ্র, গ্রেট ব্রিটেন নামের দেশেও নানা জাতির সংমিশ্রণ ঘটেছে।

জানুয়ারি মাস ইংরেজি নবর্ষের সূচনা করলেও অতীতে পাশ্চাত্যে নববর্ষ হিসেবে মার্চ মাস প্রাধান্য পেয়েছিল। মার্চ মাস ছিল বসন্তের আগমনে রসধারায় সিক্ত। নতুন ফসল রোপণের সময়ও ছিল মার্চ মাস। খ্রিষ্টের জন্মের চার হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনে বসন্তের অবির্ভাব ও শস্য রোপণের সময়কেই নববর্ষ বলে সূচিত হতো। ১১ দিন ধরে এই উৎসব পালিত হতো। সে সময় রাজা যেতেন নিভৃত স্থানে বিবস্ত্রে জন্মদিনের পোশাকে। এটাই ছিল রীতি তখনকার দিনে। তারপর আর কোনো বাঁধনই ছিল না কারো সে সময়। যার যা খুশি তা করতে পারত কোনো দ্বিধা না রেখেই। এ ছিল এক মহোৎসবের কাল। ১১ দিন পর রাজা ফিরে আসতেন মহাধুমধামে সদলবলে মিছিল করে জন্মদিনের পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদে আলোর ঝিলিকে।

সম্রাট সিজার জানুয়ারির প্রথম দিনকে উৎসবের দিন বলে ঘোষণা দিয়ে বিদ্রোহী ইহুদি সেনাদের এক রক্তয়ী সংগ্রামের মুখোমুখি হন। সে দিন রোমের রাজপথ রক্তের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে রোমান পৌত্তলিকেরা পানোৎসবে মত্ত হয়ে নববর্ষের এই প্রথম দিনকে উদযাপন করত।

খ্রিষ্টান ধর্ম বিস্তার লাভ করলে পৌত্তলিকদের বিভিন্ন ছুটির দিনগুলোকে কখনো গ্রহণ এবং কখনো বর্জন করা হয়। এ সময়ের খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা যিশুখ্রিষ্টের মা মেরি কর্তৃক দৈবগুণে গর্ভবতী হওয়া এবং ২৫ ডিসেম্বর যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিনকে বছরের প্রারম্ভের দিন বলে গণ্য করত। কিন্তু বিজয়ী যোদ্ধা উইলিয়াম যখন ১০৬৬ সালে ২৫ ডিসেম্বর রাজা হলেন, তখন তিনি যিশুখ্রিষ্টের খতনা দেয়ার দিনকে বছর শুরুর দিন হিসেবে জানুয়ারির ১ তারিখকে মনোনীত করেন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে খ্রিষ্টানরা উইলিয়ামের এই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করলে ২৫ ডিসেম্বরকেই নতুন বছরের শুরুর দিন হিসেবে চিহ্নিত করে। পোপ গ্রেগরি অষ্টমের আমলে (১৫০২-১৫৮৫) নতুন বছর হিসেবে জুলিয়াস সিজারের নির্ধারিত ১ জানুয়ারিকে নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য করেন। তখন থেকেই জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনকে বছরের শুরুর দিন মনে করে উৎসবে-আনন্দে মত্ত হয়ে ওঠে।

অতঃপর বিজয়ী যোদ্ধা উইলিয়মের মৃত্যুর ৫০০ বছর পরে পোপ গ্রেগরি অষ্টমের সময় প্রাচীন সৌর ক্যালেন্ডার (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার) সংশোধন করে নতুন ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়। এই ক্যালেন্ডারের নাম রাখা হয় গ্রেগরি ক্যালেন্ডার। গ্রেগরি ১৫৭৭ সালে জুলিয়াস সিজার কর্তৃক প্রবর্তিত জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনকেই বর্ষবরণের দিন হিসেবে নির্ধারিত করেন। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে এই ক্যালেন্ডার চালু রয়েছে।

জাপানে নববর্ষের এই দিনে বাড়ির সম্মুখভাগে খড়ের তৈরি দড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। কারণ, কোনো অশুভ প্রেতাত্মা যেন বাড়িতে প্রবেশ করতে না পারে।

জাপানিরা নববর্ষ শুরু হওয়ার দিনটিতে হাসিতে ভরিয়ে দেন এ কারণে যে, সারা বছর যেন তাদের এমন হাসার ভাগ্য থাকে। নববর্ষের এই দিন লন্ডনে ট্রাফালগার স্কয়ারে বিশাল জনসমাবেশ ঘটে। মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটায় নববর্ষের আগমনী বার্তা সূচিত হলেই সবাই একত্রে পানপাত্র হাতে নিয়ে একে অপরের শুভকামনা করে।

যারা বাড়িতে এ দিনটি উদ্যাপন করে তারা বাড়ির ভেতর মেঝেতে একটি অগ্নিকুণ্ডের পাশে গোল হয়ে বসে এবং ঘড়ির কাঁটায় নববর্ষের মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে বাড়ির প্রধান বসা অবস্থা থেকে উঠে বাড়ির প্রধান ফটকে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকেন যতণ না মধ্যরাত ঘড়ির কাঁটায় পার হয়ে যায়। অতঃপর তিনি পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে খোলা দরজা বন্ধ করেন এবং নতুন বছরকে আবাহন করে পরিবারের কাছে ফিরে আসেন।

অতঃপর ভালো ভালো খাবার খেয়ে আনন্দের মাধ্যমে এই দিন পার হয়ে যায়। কানাডা এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় একশ্রেণীর মানুষ ঠাণ্ডা বরফপানিতে সাঁতারের পোশাকে নেমে সাঁতার কেটে তাদের ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রে এ দিনটি উদযাপিত হয় ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে। নানা ধরনের রঙিন পোশাক ও মুখোশ পরে নৃত্যের তালে তালে উৎসবের আমেজে দিনটিকে বরণ করে নেয়া হয়। ঘড়ির কাঁটায় ১২টা বাজার ১ মিনিট আগে একটি আলোকিত বলকে একটি দণ্ডের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনা হয়। যে মুহূর্তে আলোর বলটি মাটি ছুঁয়ে ফেলে তখন নববর্ষের আলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সবাই একসাথে গান গেয়ে মুহূর্তটিকে স্মরণ করে রাখে। এ গানটি মূলত একটি লোকসঙ্গীত, তবে পরবর্তীকালে কবি বানর্স গানটি সংশোধিত করে লিখেছিলেন এবং সব ইংরেজই এই গান নববর্ষে গেয়ে থাকে। সৌজন্যে : নয়া দিগন্ত