Home » বাছাইকৃত » ঠাকুরগাঁও চা বাগান : সমতলে সবুজের সমারোহ

ঠাকুরগাঁও চা বাগান : সমতলে সবুজের সমারোহ

Thakurgoan2

ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তে চা বাগান। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে বিস্তৃত চা বাগানে শীতের এই সময়ে তার প্রকৃত রূপ ছড়ায়। উত্তরে হিমালয়কন্যা-খ্যাত ভারতের পাশেই রূপ-বৈচিত্র্যের চা বাগান। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পাড়িয়া সীমান্তের এই চা বাগান এখন ভ্রমণ পিপাসুদের অন্যরকম পছন্দ। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে ঠাকুরগাঁওয়ের চা বাগান।

প্রাকৃতিক লীলাভ ঠাকুরগাঁও। এটি আয়তনে ছোট হলেও প্রাচীন ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এক জনপদ। পর্যটনের জন্য এখানে রয়েছে অনন্য সৌন্দর্যের পাড়িয়া সীমান্তবর্তী চা বাগান। শীতের এই মৌসুমে রূপ বদলে যায় প্রকৃতির। চা বাগানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। শীতের এই মৌসুমে সবুজে সবুজ অরণ্যের পুরো চা বাগান মেঘাচ্ছন্ন হয়ে রূপ ছড়ায়। হিম বাতাসে মনকে উৎফুল্ল করে তোলে নিমিষেই। আশপাশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাঁওতাল ও উরাও জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ছাড়াও বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান ধর্মালম্বীদের বসবাস। তাদের জীবনবৈচিত্র্য আর এখানকার সংস্কৃতি সহজেই মন জয় করে নেবে। বিভিন্ন শাসকের শাসনামলে বিভিন্নমুখী পরিবর্তনের ছোঁয়াও লেগেছে এ জেলায়। এ জেলার নেকমরদ ও রাণীশংকৈলে সুপ্রাচীন সভ্যতার বহু নিদর্শন বিদ্যমান। ঠাকুরগাঁও জেলার উত্তরে পঞ্চগড়, পূর্বে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর, পশ্চিম ও দক্ষিণে ভারতের পশ্চিম বাংলা। আয়তনে মাত্র ১৮০৯.৫২ বর্গ কিলোমিটার। ভ্রমণপিপাসুরা একটু সময় করে শীতের এই সময়ে বেড়িয়ে আসতে পারেন অপরূপ সৌন্দর্যের এই চা বাগান থেকে।

কিভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও সড়ক ও রেলপথ, উভয় পথেই যাতায়াত করতে পারবেন। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও জেলায় যে-কটি বাস চলাচল করে কর্ণফুলী পরিবহন তার মধ্যে অন্যতম। কল্যাণপুর, গাবতলী এবং আবদুল্লাহপুর থেকে কর্ণফুলী পরিবহনের যাত্রীরা সরাসরি আন্তঃজেলা বাসে উঠতে পারেন। ঢাকা-লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও রুটে চলাচল করে ৭৫২/৭৫১ নং লালমনি আন্তঃনগর ট্রেনটি।

থাকা-খাওয়া : হিমালয়ের পাদদেশে সমতলের চা বাগান দেখতে এলে কম খরচেই রাত কাটানো আর খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। পঞ্চগড় শহরেই আছে ভালোমানের কয়েকটি আবাসিক হোটেল। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি কটেজ ডাকবাংলো তো রয়েছেই। হিমকন্যা তেঁতুলিয়ায় সরকারি বিভিন্ন বিভাগের ডাকবাংলো রয়েছে। এসব ডাকবাংলোয় রাত কাটাতে চাইলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। এক রাতের জন্য খরচ পরবে পাঁচশ’ থেকে এক হাজার টাকা। একটু এদিক ওদিক খুঁজলেই পেয়ে যাবেন ভালো রাঁধুনি অথবা বাবুর্চি। নিজেদের উদ্যোগেই তারা আপনাকে খাওয়াবে। পরিচ্ছন্ন মনোরম পরিবেশে শীতঘন রাত আপনার স্বপ্নময় হয়ে উঠবে। এ ছ্ড়াও তেঁতুলিয়ায় বেসরকারিভাবে আবাসিক হোটেল রয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন চা বাগানে কটেজ নির্মিত হচ্ছে।

চা বাগান দর্শন : শীতকাল অন্য সব ঋতু থেকেই আলাদা। শীতের এই সময় প্রকৃতি সাজে নতুনরূপে। আর এ সময়ে চা বাগানের সবুজের সমারোহ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চা বাগান ঘুরে দেখা মিলবে বিভিন্ন প্রজাতির অচিন পাখি। শীতের এই সময়টায় হিম বাতাসে কুয়াশাচ্ছন্ন জনপদ আর পাড়িয়া সীমান্তের সবুজে ঘেরা চা বাগান দেখতে অসাধারণ। পর্যটন সম্ভাবনার ঠাকুরগাঁওয়ের এখন পর্যটকদের ভিড় বাড়তেই থাকবে। চোখ জুড়ানো সবুজের মাঝে শিশিরের পরশ আপনাকে হারিয়ে নিয়ে যাবে। সমতল ভূমিতে চা-চাষের দৃশ্যমান বাস্তব উদাহরণ মিলবে এখানে। মাত্র ১২০ একর জমিতে চায়ের চাষ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্তৃতি হয়েছে অনন্য রূপে। দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল-খ্যাত ঠাকুরগাঁও- পঞ্চগড়। তেঁতুলিয়া উপজেলায় বিচ্ছিন্ন গোচারণ ভ‚মিতে চায়ের সবুজ পাতা ভরে রয়েছে। পঞ্চগড় আলোকিত হয়ে উঠেছে চায়ের সবুজ আভায়। এরই সঙ্গে শীতের আমেজ, সত্যিই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো চা বাগানে। এ ছাড়াও ঠাকুগাঁওয়ে রয়েছে বেশকিছু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থান।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি : ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা প্রাচীন জনপদের একটি। পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি। শহরে রয়েছে ফান সিটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড টুরিজম পার্ক। পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর ভবনের বিপরীতে এই পার্কটি অবস্থিত। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে পীরগঞ্জ যাওয়ার পথেই পড়বে বিমানবন্দর। তারপরই শিবগঞ্জ হাট। হাটের একেবারে পশ্চিমে জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ। জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য এখানে এখনো বিদ্যমান। রয়েছে ২০০ বছরের পুরনো সূর্যপুরী আম গাছটি। গাছটি প্রায় ২.৫ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত। গাছটির শাখা-প্রশাখা মাটির দিকে ঝুঁকে গেছে। এটিকে এশিয়া মহাদেশের সর্ববহৎ আম গাছ বলা হয়। পীরগঞ্জ উপজেলার জাবরহাট ইউনিয়নের হাটপাড়া নামক স্থানে টাঙ্গন নদীর বাঁকে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে যে রাজবাড়িটির অস্তিত্ব অনুভব করা যায় তা রাজভিটা নামে পরিচিত। হরিপুর উপজেলার কেন্দ্রস্থলে হরিপুর রাজবাড়ি। এই রাজবাড়ি ঘনশ্যাম কুণ্ডুর বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে জগদল নামক স্থানে নাগর ও তীরনই নদীর মিলনস্থলে ছোট একটি রাজবাড়ি রয়েছে। রানীশংকৈল উপজেলার পূর্বপ্রান্তে কুলিক নদীর তীরে মালদুয়ার জমিদার রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি। এই উপজেলা থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার উত্তরে নেকমরদ স্থানটি। এলাকাটির মূল নাম হচ্ছে ভবানন্দপুর। আজও নেকমরদকে মৌজা হিসেবে ভবানন্দপুর লেখা হয়। শেখ নাসির-উদ-দীন নামক এক পুণ্যবান ব্যক্তি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভবানন্দপুর আসেন। তিনিই পীর শাহ নেকমরদ নামে পরিচিত ছিলেন। উত্তরে মীরডাঙ্গী থেকে তিন কিলোমিটার পূর্বে মহেশপুর গ্রামে মহালবাড়ি মসজিদটি অবস্থিত। এ ছাড়া পশ্চিমে ভাউলারহাটের কাছে শালবনে শালবাড়ি মসজিদটিও অবস্থিত। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কালমেঘ হাট থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে সনগাঁ নামক গ্রামে সনগাঁ মসজিদটি নির্মিত। হরিপুর উপজেলার উত্তরে মেদিনীসাগর গ্রামে মেদিনীসাগর জামে মসজিদটি অবস্থিত। একই উপজেলায় গেদুড়া ইউনিয়নে গেদুড়া মসজিদটির ইতিহাসও প্রায় আড়াইশ’ বছর পুরনো। বর্তমানে পুরাতন মসজিদটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। একইস্থানে নতুন মসজিদ তৈরি হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিঘিও রয়েছে। আর এসব দিঘি নিয়ে রয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনার ইতিহাসও। দিঘিগুলো নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প রয়েছে। দিঘিগুলো হলো- গড়েয়াহাট দিঘি, লস্করা দিঘি, টুপুলী দিঘি, শাসলা ও পেয়ালা দিঘি, ঠাকুর দিঘি (দানারহাট), আঠারো গাণ্ডি পোখর-ঠাকুরগাঁও উপজেলায়। আধার দিঘি, হরিণমারী দিঘি, রতন দিঘি, দুওসুও দিঘি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। রামরাই দিঘি, খুনিয়া দিঘি, রানীসাগর রানীশংকৈল উপজেলায়। মেদিনীসাগর দিঘি হরিপুর উপজেলায়। রানীশংকৈলের রামরাই দিঘি ঠাকুরগাঁও জেলার সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ। দিঘিটি ৫০০ থেকে হাজার বছরের পুরনো হতে পারে। তবে এর সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি।

সতর্কতা : এখন শীত পড়েছে। হিমালয় থেকে আসা হিমেল শীতে কাঁপছে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়। সকালের মিষ্টি রোদ আর বুক প্রশস্ত করে ছুটে যাওয়া হাইওয়ে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ঠুকে পড়বেন চা বাগানের ভেতরে। দেখবেন পথে পথে ফুটে আছে রডোডেন্ড্রন। বিকেল হলেই জাঁকিয়ে আসে শীত। এ দিকে এলে ট্রাভেল ব্যাগ ভর্তি শীতের কাপড়-চোপড় আনবেন। সৌজন্যে : পঞ্চগড় প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন