Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » তাজিংডংয়ের চূড়ায়…

তাজিংডংয়ের চূড়ায়…

Tajingdong2

এখানে শুধু বেড়ানোই নয়, থাকতে হবে দুঃসাহসিক মন-মানসিকতা। গোটা বান্দরবানকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা চলে। এখানকার মূল আকর্ষণই হলো যান্ত্রিক শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল আর মেঘাচ্ছন্ন পাহাড়। এখানে ভ্রমণপিপাসুরা শুধু ভ্রমণেই আসেন না, আসেন দুঃসাহসিকতা দেখাতে। সবুজের সমারোহ আর মেঠো পথ ধরে বেয়ে ওঠা পাহাড় আর পাহাড়। প্রাকৃতিক ললনা বান্দরবানের নৌসর্গিক সৌন্দর্যের এসব পাহাড়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে থাকছে আমাদের আজকের আয়োজন।

অফুরন্ত সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের মূল আকর্ষণগুলোই রয়েছে শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এসব জায়গা না দেখলে বাংলার প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র্য অদেখাই রয়ে যাবে। কিন্তু এসব জায়গা ভ্রমণ করতে হলে থাকতে হবে দুঃসাহসিক মন-মানসিকতা। বেয়ে উঠতে হবে পাহাড়ের পর পাহাড়। শীতের এই সময়টা তো বান্দরবানের রূপ-বৈচিত্র্য অসাধারণ। বান্দরবানের তাজিংডং পাহাড়ে কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘের খেলা বছরজুড়েই। শীতের দিনে পাহাড়ের সবুজ রং হারানো কুয়াশায় মোড়ানো পথ বেশ উপভোগ্য। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, পথে পথে ছোট জুম ঘর। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে নামছে সকালের নির্মল সোনালি রোদ।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি এসি, নন-এসসি বাসে আসতে পারবেন বান্দরবান। তবে চট্টগ্রাম হয়ে বান্দরবান আসতে হলে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে আসতে হবে। বাসে সময় লাগবে আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা। তবে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের গাড়িতে করে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানিহাট রাস্তারমোড়ে নেমে গিয়ে পৃথক গাড়িতে বান্দরবান আসতে পারবেন। কেরানিহাট থেকে বান্দরবানের দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। সময় লাগে ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন
বান্দরবানে পর্যটকদের থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্টহাউস রয়েছে। এ ছাড়া তাঁবুতে রাত যাপনের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। এখানে থাকতে প্রতিদিন রুমপ্রতি গুনতে হবে দেড় থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া পর্যটকদের থাকার জন্য অনেক আকর্ষণীয় কটেজের ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। এখানে থাকতে হলে প্রতিদিন গুনতে হবে ২ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। পর্যটন মোটেলেও সপরিবারে রাত যাপন এবং খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে রাত যাপনে গুনতে হবে রুমপ্রতি দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।

অভ্যন্তরীণ যাতায়াত
পর্যটকদের তাজিংডং যেতে হলে বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রথম যেতে হবে রুমা উপজেলা সদরে। রুমা উপজেলায় যাত্রাপথে রুমা সেনা গ্যারিসনে পর্যটকদের নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হবে। রুমা উপজেলা সদর থেকে সাধারণত বিকাল ৪টার পরে বগালেক, কেওক্রাডং বা তাজিংডং-এর উদ্দেশে যেতে দেওয়া হয় না। যাত্রা যদি হয় বর্ষা মৌসুমে তাহলে বান্দরবান শহরের রুমা জিপ স্টেশন থেকে রুমাগামী চাঁদের গাড়িতে করে কৈক্ষ্যং ঝিরি যেতে হবে। তারপর নৌকায় ১ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে রুমা সদর। যদি শীতের মৌসুম হয় তাহলে জিপে করে রুমা উপজেলা সদরের কাছে বোটঘাটায় পৌঁছে দেবে গাড়ি, সেখান থেকে নৌকায় করে ১৫-২০ মিনিটের নৌকাভ্রমণ শেষে আপনি রুমা উপজেলা সদরে পৌঁছাতে পারবেন। রুমা উপজেলা সদর থেকে হেঁটে বগালেক হয়ে কেওক্রাডং-এর পাশ দিয়ে তাজিংডং যেতে হবে।

অ্যাডভেঞ্চার তাজিংডং
বেসরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশের চতুর্থ পর্বতশৃঙ্গ অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই তাজিংডং। উচ্চতায় খুব বেশি না হলেও ১২৮০ মিটার, আর এই পর্বতে পায়ে হেঁটে বেয়ে বেয়ে ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া পাশের কেওক্রাডংও উচ্চতায় ৩য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে তাজিংডং। এর উপজাতীয় শাব্দিক অর্থ হচ্ছে— ‘তাজিং’ অর্থ বড় আর ‘ডং’ অর্থ পাহাড়। অর্থাত্ বড় পাহাড়। বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রি পাংশা ইউনিয়নে অবস্থিত। রুমা উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড় দুটির অবস্থান। পাহাড়ি রাস্তা ধরে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা গাছের সারি।

শীতের দিনের শেষ ভাগে পুরো পথটি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। পাহাড়ের কোলজুড়ে থাকে কুয়াশার বিছানা। দেখতে দেখতে কখন যে পাশ কাটিয়ে একের পর এক উঁচু সব পাহাড়ের সারি খেয়ালই করতে পারবেন না। তবে মনে রাখতে হবে, বর্ষা মৌসুমে তাজিংডং যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টকর। শুষ্ক মৌসুমে অনেক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটক পায়ে হেঁটে তাজিংডং যান। রহস্যময় থানচির পাশ কাটিয়ে পাহাড়টি ভ্রমণ দারুণ রোমাঞ্চকর। বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শিখড়ে রয়েছে দুর্গম পথ। পাহাড়, আকাশ, নদী ও ঝরনা এখানে মিলেমিশে একাকার। সবুজ পাহাড়ের গায়ে পরগাছার মতো জড়িয়ে আছে সাদা মেঘ। থানচি বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু সড়কপথ। চলতে চলতে বাসের জানালা দিয়েই চোখে পড়বে পাহাড়ের পশ্চিম দিগন্তের সোনালি সূর্যের বিদায়! সন্ধ্যা নামলেও দিনের কিছু আলো পাহাড়ের বিস্তৃত আকাশে ঘোরাফেরা করে, যা দেখতে অপরূপ। আর রাতের অন্ধকারে তো পথ চলতে চলতে চোখে পড়বে পাহাড়ঘেঁষা জোছনা। যতদূর চোখ যাবে কেবল পাহাড়ের বিস্তীর্ণ মানচিত্র। ধবধবে জোছনার আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে গোটা পাহাড়ি জনপদ। আবার পূর্ণিমায় পাহাড়ের এমন চিত্র কল্পনার রংকেও হার মানায়। হাজারও তারার দল সবুজ পাহাড়ের আকাশজুড়ে, নিচের পৃথিবীতে শুধু জেগে আছে শত শত পাহাড়ের ভাজ, উপত্যকা, অরণ্যভূমি, খরস্রোতা নদী, ছোট-বড় ঝরনা, জুমের খেত, ফুল-পাখি। এককথায় রূপকথার সৌন্দর্য ছেয়ে যায় তাজিংডংজুড়ে। সময়টা তো শীতের। এ সময়টা অপরূপ সাজে সেজে ওঠে ভোরে থানচি। চারপাশে কুয়াশা। ভোরের আলোয় যাত্রাপথে শীতের দিনে পাহাড়ের সবুজ রং হারানো কুয়াশায় মোড়ানো পথ আপনার মনকে রাঙিয়ে তুলবে। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, পথে পথে ছোট জুম ঘর। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে নামা সকালের নির্মল সোনালি রোদ। পথ চলতে চলতে পাহাড়ের ওপর থেকে চোখে পড়বে উপজাতীয় বোডিং পাড়া। এখানে ম্রো আদিবাসীর বসবাস। পাশেই বম আদিবাসীর বসবাস। শেরকর পাড়া থেকে তাজিংডং ২ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে পুরোটা পথ উঠতে হবে। মানে ‘আপ হিল’।

প্রয়োজনীয় তথ্য
তাজিংডং ভ্রমণকারীদের অবশ্যই ভ্রমণের সময় শুকনো খাবার, খাবার পানি, জরুরি ওষুধপত্র সঙ্গে নিতে হবে। যাত্রাপথ দুর্গম ও কষ্টসাধ্য হওয়ায় মহিলা ও শিশুদের না নেওয়াটাই ভালো। রুমা উপজেলা সদরে রাত যাপনের জন্য কয়েকটি হোটেল থাকায় দলবেঁধে যাত্রা করার আগে হোটেল বুকিং করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন।

ভ্রমণ টিপস
যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজেকে রিফ্রেশ করতে কার না মন চায়! কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, ঘুরতে যাওয়ার আগে প্রয়োজন কিছু প্রস্তুতির। পাঠকের জন্য থাকছে কিছু ভ্রমণ টিপস।

ভ্রমণের আগের রাতে ভালো করে ঘুমানো দরকার।
ভ্রমণ শুরু করার আগে ভরপেট না খাওয়া ভালো।
যেখানে যাবেন, ওই এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব আছে কি না তা জেনে নিন।
বিশেষ কোনো অসুখ থাকলে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
যানবাহন চলাকালে কোনো বই বা খবরের কাগজ পড়বেন না এবং মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। কেননা এতে করে চোখের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে।
দীর্ঘ ভ্রমণে পা দুটি যতটা সম্ভব ছড়িয়ে বসবেন। মাঝে মাঝে পা নাড়াচাড়া করুন, যাতে রক্ত চলাচল ঠিক থাকে। একটানা বেশিক্ষণ না বসে মাঝে মাঝে হাঁটুন।

প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম

ট্রাভেল ব্যাগ, গামছা বা তোয়ালে, অতিরিক্ত কাপড় (প্রয়োজন অনুযায়ী), ক্যাপ, সানগ্লাস, টিস্যু পেপার, আগুন জ্বালানোর জন্য ম্যাচ বা লাইটার, বন্য এলাকা হলে কয়েল, পানির বোতল, সাবান, শ্যাম্পু, লোশন, বডি স্প্রে, টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট, আয়না, চিরুনি, ল্যাপটপ, নোটবুক, কলম, পাওয়ার ব্যাংক ও ক্যামেরা। সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন