পাহাড়কন্যা

আকাশছোঁয়া পর্বত। নাম তার কেয়াজোরি। উচ্চতা ২০ হাজার ২৯৫ ফুট। এভারেস্টের দক্ষিণ-পশ্চিমে কেয়াজোরি পর্বতে পড়েছে দুই বাংলাদেশি কন্যার পায়ের ছাপ। তাদের একজন ফৌজিয়া আহমেদ রিনি অন্যজন শায়লা পারভীন বীথি। দুজনেই শিক্ষার্থী। প্রকৃতিপ্রেম থেকে বাধা টপকানোর অদম্য নেশা। ইচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সাফল্যের আদলে হাতের মুঠোয় নেওয়া যায়, সেটাই করে দেখালেন তারা। প্রথমবারের মতো কেয়াজোরির বেস ক্যাম্প ১৪ হাজার ৭০০ ফুট পর্যন্ত আরোহণের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পর্বতারোহণে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাই যেখানে শেষ কথা সেখানে প্রতিকূলতা তো থাকবেই। নারী বলে পিছিয়ে থাকার গল্পটা বদলে দিতে সফলভাবে বেস ক্যাম্প পেড়িয়ে আরোহণ করেন ১৫ হাজার ৫০০ ফুট উপরে। পাহাড়কন্যাদ্বয়ের সেই অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন — তানভীর আহমেদ

Paharkanna

ছবি : মেহেদী আল হাসান

দুই পাহাড়কন্যা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্রী ফৌজিয়া পারভীন রিনি। ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসেন প্রকৃতিকে। সবুজ অরণ্য, পাহাড়-পর্বত আর সমুদ্রের টানে প্রায় ছুটে বেড়িয়েছেন। এখনো ছুটি পেলেই ছুটে যান সবুজের কাছে। পাহাড়ে চড়ার নেশার বাইরের জীবনাটাকেও উপভোগ্য করে তোলায় চেষ্টার কোনো কমতি নেই। খেতে পছন্দ করেন। বাংলাদেশি খাবারটাই প্রিয়। আলুভর্তা, ডিমভাজি আর কাচ্চি বিরিয়ানি পছন্দের তালিকায় রয়েছে শুরুতে। ছুটির দিনে জাবির ক্যাম্পাসেই ঘুরে বেড়ান। এ ছাড়া প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়। অবসর পেলে বই পড়েন। হুমায়ূন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই পেলে ছাড়েন না। এখন পড়া হচ্ছে সমরেশ আর সুনীলের বই। সায়েন্স ফিকশনও পড়তে পছন্দ করেন। নিজেকে পরিপাটি করে রাখতে ভালোবাসেন। খুব ভারি সাজ মোটেই পছন্দ নয়। বিয়ে বা জন্মদিনের মতো ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোতে প্রথম পছন্দ শাড়ি। এ ছাড়া সালোয়ার-কামিজ, জিন্স-ফতুয়া পরা হয়। নিজেকে যে পোশাকে যখন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সেটাই পরা হয়।

আরেক পাহাড় কন্যা শায়লা পারভিন বীথি। সিটি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করছেন। কখনো কি ভেবেছিলেন সমুদ্র সমতলের বাসিন্দা হয়ে হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে চড়বেন? বাংলাদেশি পর্বতারোহণের দুই নারী আইকন নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের এভারেস্ট জয় তাকে প্রেরণা জুগিয়েছে। প্রথমে পাহাড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয় বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় অভিযান করে। পর্বতারোহণ ছাড়া বই পড়তে ও গান শুনতে পছন্দ করেন। সঞ্জীব চৌধুরী ও অঞ্জন দত্তের গান খুব পছন্দ। ভাত-সবজি-মাছ খেতে ভালোবাসেন। আলাদা করে বলতে হয় টাকি মাছের কথা। নিজেকে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা সব সময়ই রয়েছে। তাই বলে ভারি সাজ ও গয়না খুব একটা পছন্দ করেন না। জিন্স-ফতুয়া বেশি পরা হয়। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে শাড়ি পরেন। তবে অবশ্যই সেটা সুতি শাড়ি। পছন্দের রং নীল।

১৫ হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে

পাহাড় নাকি নিজ ভাষায় ডাকে। সেই আহ্বান শুনে ঘরে থাকা কঠিন। পাহাড় কন্যাদ্বয়ের মনে প্রত্যয় ছিল ভিন্ন কিছু করার। তাই ঠিক করলেন পাহাড়ে চড়বেন। দেশের চন্দ্রনাথ ও কেওক্রাডং দিয়ে যাত্রা শুরু। এর সঙ্গে ছিল পাখি দেখার নেশা। বার্ড ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এভারেস্টজয়ী এম এ মুহিতের সঙ্গে পরিচয়। পাহাড়ে চড়ার ইচ্ছে থেকে যোগ দেন বিএমটিসিতে। বিএমটিসির প্রথম ক্যাম্পেইন। ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা। বিএমটিসি থেকে শুধু মেয়েদের জন্য একটি ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়। এখান থেকেই পর্বত আরোহণের বিস্তারিত জানতে পারেন। এই ক্যাম্পেইন থেকেই পর্বত আরোহণের সব সরঞ্জাম সম্পর্কে পরিচিতি। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে, ‘আমিও পারব’। তবে, ভয় একটু ছিল। কারণ, কোনো প্রকার ট্রেনিং ছাড়াই তো আর পর্বত আরোহণ করতে পারব না!

Paharkanna2

একজন মেয়ে হিসেবে মাউন্টেইন জয়ে শারীরিক বা মানসিক কোনো বাধা আছে বলে মনে হয়নি তাদের। নিজের ইচ্ছে শক্তিটাই বড়। পরিবার ও সমাজের সাপোর্ট থাকলে একজন মেয়ের জন্য হিমালয় জয় করা অসম্ভব কিছু নয়। নিজেকে জানালেন, একজন মেয়ে হয়ে কতটুকু পারব জানা ছিল না। তবে আত্মবিশ্বাসটা ছিল প্রখর। শুরু হয় পথচলা। মাউন্টেইন, ট্রাভেল ব্যাগ, তিন-চার ধরনের জ্যাকেট, জুতা, হাত মোজা ও পা-মোজাসহ কিছু প্রযোজনীয় সরঞ্জাম গুছিয়ে রওনা। গত বছর অক্টোবরের ৩০ তারিখ লুকলার উদ্দেশে রওনা করি। লুকলা এয়ারপোর্ট একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ অন্যদিকে ৯ হাজার ৩০০ ফুট উপরে। তাই হঠাৎ করেই ঠাণ্ডা পরিবেশে চলে আসেন। মেনদি থেকে বেজড ক্যাম্পে যাওয়ার রাস্তাটা সবচেয়ে কঠিন। খাড়া পাহাড়ি পথ বলে কষ্টটাও বেশি ছিল। প্যাকেট খাবারের পাশাপাশি চকলেট আর বেশি করে গরম পানি খেতে হয়েছে। বেজড ক্যাম্পের কাছাকাছি সমতল পথ হওয়াতে একটু স্বস্তি ফিরে আসে। সমতল হলেও পথটি খুব বড় ছিল। বিকাল ৪টার মধ্যে বেজড ক্যাম্পে পৌঁছে যায় তারা। খুব সুস্থভাবেই বেজড ক্যাম্পের ১৪ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতা শেষ করেন। টার্গেট পূরণ করে থেমে থাকেননি। ওই দিনই ১৫ হাজার ৫০০ ফুট পর্যন্ত উঠে আবার সবাই নিচে নেমে আসেন। কেয়াজো-রি অভিযানে তারা ছিলেন এভারেস্টজয়ী এম এ মুহিতের নেতৃত্বে থাকা সাত সদস্যের দলে। মুহিতসহ টিমের বাকিরা সামিটের উদ্দেশ্যে চলে গেলে তারা বেস ক্যাম্পে দুদিন থাকেন। বেস ক্যাম্পের পরিবেশও অসাধারণ। দিনের বেলা স্বাভাবিক থাকলেও রাতে মাইনাসে চলে আসে। ফলে তাঁবুর ভিতরেও তুষারপাত দেখা যায়। সামনে একটা জলধারা থাকাতে দিনের রোদে বরফগুলো আওয়াজ করে ভাঙতে থাকে। আর রাতের আকাশ অনেক পরিষ্কার দেখা যায়। আর তারাগুলো যেন হাত বাড়ালেই মিলবে। দুটো দিন খারাপ ভালোর মধ্যেই কেটেছে। দেশে ফেরার পর তাদের এই মাউন্টেইন বেস ক্যাম্প ওভার ১৫ হাজার ৫০০ ফুট জয়ে পরিচিতদের উচ্ছ্বাসটা ছিল চোখে পড়ার মতো।

চ্যালেঞ্জ জয়ের রহস্য

বাংলাদেশি পাহাড়গুলো থেকে হিমালয়ে যাত্রা আরও অনেক কঠিন। সেখানকার রাস্তাগুলো আরও সরু ও খাড়া। দুপাশে খাদগুলোও ভয়ঙ্কর। বাংলাদেশের মতো সমুদ্রতলের দেশগুলোর মানুষের জন্য কেয়াজোরির মতো পাহাড়গুলোতে আরোহণ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। উঁচুতে এসে হঠাত্ অক্সিজেন স্বল্পতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সম্মিলনেই জয় হয় পর্বত। চ্যালেঞ্জের শুরু কিন্তু প্রতিকূলতা থেকে। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা ধরনের প্রতিকূলতা শুধু পাহাড়ে চড়া কেন, যে কোনো কাজেই আসবে। সেটা কাটিয়ে পথচলার রহস্যটা কী? রিনি জানান, নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। সবাইকে গতানুগতিক ধারায় চলতে হবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। সে নারী বলে পিছিয়ে না থেকে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পর্বতজয়ে আগ্রহী মেয়েদের পড়াশোনার পাশাপাশি ফিটনেস ট্রেনিং করাটাও জরুরি। পর্বতারোহণের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন, জীবনে পাহাড়সব বাধা এলেও সেটা টপকানো সম্ভব। বিথীর অভিজ্ঞতায়, পর্বত দুর্গম, প্রতিকূলতা পেরিয়েই ১৫ হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছেছেন। এখানে চড়ার পর জেনেছেন শতভাগ ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যে কোনো বাধা টপকানো যায়। যে মেয়ে গান গাইতে চায়, নাচতে চায়, ছবি আঁকতে চায়… তার যে কাজে আগ্রহ সেটাতে শতভাগ একাগ্রতা দেখালে, পরিশ্রম করে গেলেই সাফল্যের দেখা মিলবে। মনের শক্তিটাই বাধা পেরুনোর মূলমন্ত্র। সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন