Home » ফিচার » সিটি গেটে বাংলার হৃদয়

সিটি গেটে বাংলার হৃদয়

City-Gate

বরিশাল সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে বরিশাল সিটি গেট ‘টেরাকোটা ৭১ : জনতার মুক্তিযুদ্ধ’। টেরাকোটার কাজটি করছেন সামসুল আরেফিন মিঠু। কিভাবে করছেন এই কাজ জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর ছবি তুলেছেন নাজমুল রনি

বরিশালের কীর্তনখোলায় দপদপিয়া ব্রিজের পাশে তৈরি হয়েছে বরিশাল সিটি গেট। ৪০ ফুট উঁচু গেটে টেরাকোটা হবে ২৬ ফুট বাই ২০ ফুট। উল্টো ইউ আকৃতির ‘টেরাকোটা ৭১ : জনতার মুক্তিযুদ্ধ’ টেরাকোটার চারটি অংশ। প্রথম অংশ বিজয়। এখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশটি আত্মসমর্পণ। এখানে থাকছে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের চিত্র। তৃতীয় অংশ অত্যাচার। এখানে রয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও অত্যাচারের চিত্র। চতুর্থ অংশের নাম নদীতে যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নদীতে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার কম চিত্রই আমরা পাই। সেই ভাবনা থেকে এই নাম।

টেরাকোটাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিত্রকে তুলে এনেছেন সামসুল আরেফিন মিঠু। মুক্তিযুদ্ধের সময় মিঠু মায়ের পেটে। তাঁর ভাষ্য, ‘আমার মা পুরো যুদ্ধকালীন আমাকে পৃথিবীর সব ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচিয়ে শান্ত-সুন্দর, সার্বভৌম একটি স্বাধীন দেশে প্রথম সূর্যোদয় উপহার দিয়েছিলেন।’

প্রথম অংশ বিজয়ের চিত্র তুলে ধরতে মিঠু মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বই পড়ার পাশাপাশি বরিশালের পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পের টর্চার সেল ঘুরে দেখেছেন। একটি টর্চার সেলে একটি রোলার কোস্টার দেখতে পান। এটা ’৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত-পা বেঁধে গায়ের ওপর দিয়ে তুলে দেওয়া হতো। সেই দৃশ্যটিও তুলে ধরেছেন টেরাকোটায়।

মিঠুর টেরাকোটায় বড় অংশজুড়ে রয়েছে নদীতে যুদ্ধ। বড় হয়ে মিঠু মায়ের কাছে শুনেছেন নদীতে যুদ্ধের কথা। সেই যুদ্ধে অলৌকিকভাবে তাঁর মায়ের বেঁচে যাওয়ার কথা শুনেছেন। ইচ্ছা ছিল সুযোগ পেলে নদীতে মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরবেন। সুযোগ পেয়ে যান বরিশালের সিটি গেট নির্মাণের প্রস্তাব পেয়ে। মিঠু বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যে আমার মা নানাবাড়ি স্বরূপকাঠি থেকে বরিশাল ফিরবেন। বাবা লঞ্চঘাটে মার জন্য অপেক্ষা করছেন। হঠাৎ করেই লঞ্চঘাটে পাকিস্তানি হানাদারদের বিমান হামলা। উপর্যুপরি হামলায় একে একে ডুবে যেতে থাকে ঘাটের লঞ্চ। বাবা আরো অনেকের সঙ্গে একটি নৌকা উল্টিয়ে তার নিচে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যান। কোনো কারণে সেদিন মায়ের ফেরার লঞ্চটির যাত্রা বাতিল হয়েছিল বলে তিনিও বেঁচে যান। সঙ্গে আমিও।’

সেই গল্পের কথাই তুলে ধরেছেন নদীতে মুক্তিযুদ্ধের অংশে। মিঠু বলেন, ‘নদীতে মুক্তিযুদ্ধের অংশে বহু ঘটনার প্রতিফলন দেখাতে চেষ্টা করেছি। এই অংশে বরিশালের নদীতে নিমজ্জিত লঞ্চ, স্টিমার থেকে কচুরিপানার সঙ্গে ভেসে যাওয়া আমার দেশের সোনার মানুষদের পচে-গলে যাওয়া দেহ, পুড়ন্ত বাড়ি, সওদাগরের নৌকা, বাড়ির আঙিনায় ধর্ষিত সারেং বউয়ের আর্তনাদ এসব চিত্র রয়েছে।’

এই সিটি গেট নির্মাণের পরিকল্পনা বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামালের মাথায় ঢোকান তাঁর ছেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাবার ব্যবসায় সহায়তা করছেন। এরপর সব সক্ষমতা যাচাই-বাছাই শেষে মিঠুকেই কাজটি দেয় বরিশাল সিটি করপোরেশন।

সাভারের একটি স্টুডিওতে তৈরি হচ্ছে টেরাকোটায় জনতার যুদ্ধ ফুটিয়ে তোলার কাজ। টেরাকোটাতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বধ্যভূমির মাটি। মিঠুর সঙ্গে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা চারুকলার পাঁচজন। মিঠু জানান, ‘কাজ শেষ হলে এটাই হবে বাংলাদেশে টেরাকোটা নিয়ে সবচেয়ে বড় কাজ।’

বরিশাল শহরে ঢুকতে বা বের হওয়ার সময় দেখা যাবে এই শিল্পকর্ম। কত দূর থেকে গোচরে আসবে এই স্থাপনা? মিঠু জানান, দুই কিলোমিটার দূর থেকে দেখা যাবে। বরিশালের কলসকাঠির মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই টেরাকোটা। চল্লিশ শতাংশ কাজ শেষ। সব কাজ শেষ হলে আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে উদ্বোধন করা হবে বরিশাল নগরের এই সিটি গেট।

City-Gate2

মিঠু বৃত্তান্ত

মিঠুর জন্ম বাংলাদেশ বিজয় লাভের ১২ দিন পর, ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাবা সিদ্দিকুর রহমান, মা বেগম সামসুন্নাহার। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে মিঠু সবার বড়। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে খুলনা আর্ট কলেজ (বর্তমানে খুলনা চারুকলা ইনস্টিটিউট) থেকে বিএফএ ডিগ্রি নিয়েছেন। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতিস্তম্ভ, কবি জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার, হোটেল সিক্স সিজনস, হোটেল রেডিসন ব্লুতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো রয়েছে। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ