Home » পপুলার ডেস্টিনেশন » পাথুরে নদীর জলে

পাথুরে নদীর জলে

Volaganj

মো. জাভেদ বিন এ হাকিম   
অভিভাবকদের ভয়ে কানে কানে ফিসফাস, ফেসবুকে চ্যাট, সেলফোনে এসএমএস চালাচালি। অতঃপর এক অস্থির রাত শেষে ফজরের নামাজ পড়েই কাঁধে-পিঠে বোঁচকা ঝুলিয়ে দে ছুট। এক দমে হাজির হই একত্র হওয়ার নির্ধারিত জায়গা—বাহাদুর শাহ পার্কের গেটে। মাইক্রোবাস নিয়ে দলের সবাই আগে থেকেই হাজির। পছন্দের আসনে বসতে না-বসতেই গাড়ি ছুটল সোজা সিলেটের পানে, প্রকৃতির টানে।

পথ-ঘাট নিরিবিলি। দু-চারটি গাড়ি ভোঁ করে এসে শাঁ করে চলে যাচ্ছে। দেরি করার জন্য করিম ভাই আমার ওপর খানিকটা খেপেছিলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ আর সেটা ধরে রাখতে পারলেন না। গাড়ি চলেছে দারুণ গতিতে। হঠাৎ ব্রেক।

পথে গাজীপুরের কালিগঞ্জে এক হোটেলে যাত্রার হলো বিরতি। ‘দলা পাকানো ময়দা’র রুটি আর ‘লঙ্গরখানা’র ডাল দিয়ে নাশতা পেটে পুরে আবারও শুরু হলো ছুটে চলা। ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের মূলমন্ত্র ‘যখন যেমন তখন তেমন’ অনুযায়ী ভ্রমণের সময় থাকা-খাওয়া নিয়ে রাগ-গোসসা কিংবা ন্যাকামো করার কোনো সুযোগ নেই। শুধু পেট মহাশয় বেঁকে না বসলেই হলো।

ভৈরবের পথে দুই পাশে দেশি ফল আর সবজির হাট বসে গেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁক-ডাক তেমন একটা নেই। আবারও আশুগঞ্জের উজান-ভাটি রেস্টুরেন্টের সামনে ব্রেক কষল মাইক্রোবাস। এবার চলল নাশতার পর বাকি থাকা চা-কফি পর্বটি। বাড়তি হিসেবে খানিকটা ফটোসেশন।

সোনামাখা রোদ, নির্মল বাতাস আর গ্রাম বাংলার আবহমান রূপ দেখতে দেখতে সকাল ১১টার মধ্যেই পৌঁছে যাই পুণ্যভূমি সিলেটে। চা-শিঙ্গাড়া খাওয়ার পাশাপাশি পরিচিত দুই-একজনের সঙ্গে সেরে নিই প্রয়োজনীয় কথাবার্তা। ‘দে ছুট’-এর নতুন বন্ধু আমির ভ্রমণপাগল মানুষ, ধ্যানে-মনে শুধু ঘুরে বেড়ানোর বাসনা। প্রথমবারের মতো আমাদের সঙ্গে আসতে পেরে দারুণ উত্তেজিত সে।

অন্যদিকে ইফতেখারের বেশ মন খারাপ। দুষ্ট ভাইরাসরা নাকি তাঁর শখের ডিএসএলআর ক্যামেরাটার দফা রফা করে ছেড়েছে। ভোলাগঞ্জে যাওয়ার পথে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে আবারও অল্প সময়ের জন্য বিরতি। সে সময়ের মধ্যেই যা দেখেছি, তাতে খাদিমনগর চা বাগানটা লেগেছে বেশ। সময়ের অভাবে বনের ভেতরটায় যাওয়া হলো না। ঘুরতে ঘুরতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম হুট করে একদিন চলে আসব এদিকটায়। এবার কোনো থামাথামি নেই। গাড়ি এবার সোজা ভোলাগঞ্জের পথে। শুধু চৌমুহনী মোড় থেকে পূর্ব পরিচিত সিলেটি তরুণ বোখায়েরকে তুলে নিলাম। বোখায়েরের হাস্যরসাত্মক আলাপচারিতায় ঝিমিয়ে যাওয়া ‘দে ছুট’ বন্ধুরা নড়েচড়ে ওঠে।

সিলেট শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার পথের ২০ কিলোমিটার যেতেই কাঁঠালবাড়ী থেকে ‘ভোলাগঞ্জবাসীর দুঃখ’ এবড়োখেবড়ো কর্দমাক্ত পথের শুরু। একটু পরে আমরাও সঙ্গী হলাম ভোলাগঞ্জবাসীর দুঃখের সঙ্গে। কিন্তু পথের দুই পাশটা অসাধারণ সৌন্দর্যের প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। মায়াবি প্রকৃতি পথের ক্লান্তি আর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি ভুলিয়ে রাখবে নিঃসন্দেহে। গাড়ি এসে থামে ভোলাগঞ্জ নতুন বাজারে। অপেক্ষায় ছিল স্থানীয় তরুণ জাহাঙ্গীর। তারই সৌজন্যে দ্রুত খানাপিনা সেরে চেপে বসি ধলাই নদীর ঘাটে অপেক্ষমাণ ইঞ্জিনের নৌকায়। কিছুক্ষণ পরেই দূরের ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের অনিন্দ্য সৌন্দর্য মায়াবি হাতছানি দেয়।

Volaganj2

পাথর শ্রমিকরা ব্যস্ত নদীর তলদেশ থেকে পাথর উঠানোর কাজে। কারো দিকে তাকানোর কোনো ফুরসত নেই। মাল বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় নৌকার ট্রেন। একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার পেছনে বেশ কয়েকটি নৌকা সারি করে বাঁধা রাখা। চলন্ত অবস্থায় দূর থেকে ট্রেনের মতোই লাগে। আমাদের নৌকাখানি নোঙর করে পাথর কোয়ারি বিজিবি ক্যাম্পের ঘাটে। অসাধারণ! স্রষ্টার অপূর্ব নিদর্শনের দেখা মেলে এ পাশটায়। নিঃস্বার্থভাবে সব সৌন্দর্য যেন এখানটায় দিয়েছে প্রকৃতি। অন্যরকম এক ভালোলাগা দোলা দেয় মনে।

পাথুরে ধলাই নদীর শীতল জলে ডুব দিতেই নিমেষে দূর হয়ে যায় দীর্ঘ ভ্রমণের সব ক্লান্তি। শৈশবের দুরন্ত সময়ের কথা মনে করে ধলাই নদীর স্বচ্ছ জলে ডুব দেন ডায়াবেটিস রোগী নুরুন্নবী চাচাও। ডুব দিতেই চোখে পড়ে নদীর তলদেশে থাকা পাথরগুলোতে। অদ্ভুত সেই সৌন্দর্য। স্রোতস্বিনী ধলাই নদীতে আমরা মেতে উঠি জলকেলিতে। ফুসফুসটায় বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভরে ঢাকার ফিরতি পথ ধরি।

কিভাবে যাবেন
দিনে-রাতে ঢাকা থেকে সিলেটের পথে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজি যায় ভোলাগঞ্জ বাজারে। ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা। রিজার্ভ আসা-যাওয়া করলে লাগতে পারে ১০০০ টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। নদী ভ্রমণে নৌকায় ভাড়া নেবে প্রতি ঘণ্টা ৩০০ টাকা। দল ভারি হলে ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থের সাশ্রয় হবে বেশ। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ