Home » ভ্রমণ » ঢাকা » ঢাকার পাশে বেড়ানোর জায়গা

ঢাকার পাশে বেড়ানোর জায়গা

:: ফেরদৌস জামান ::
আমরা যারা রাজধানী ঢকায় থাকি সময় ও সামর্থের অভাবে মনোরম কোনো জায়গায় ভ্রমণ অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদিও আমাদের অনেকেরই অজানা যে, সাধ্যের মধ্যে একদিনের ভ্রমণের জন্য ঢাকার আশপাশেই অনেক জায়গা রয়েছে। নানাবিধ কারণে প্রিয়জন বা বন্ধুবান্ধবসহ ভ্রমণের জন্য যখন দূরের কোনো গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন এই জায়গাগুলো আপনার জন্য আদর্শ হতে পারে।

ঐতিহাসিক পানাম নগর ও মেঘনার পাড়
আমরা জানি পৃথিবীর ধ্বংসপ্রায় একশ’টি ঐতিহাসিক নগরের মধ্যে সোনারগাঁও পানামনগর একটি। শতবর্ষ পূর্বে এই নগরী ইতিহাসখ্যাত সিল্ক রোডের সাথে সংযুক্ত ছিল। ঈশা খাঁর আমলে বাংলার রাজধানী ছিল পানামনগর। এখানে অনবদ্য নির্মাণশৈলীর সাক্ষী বহু পুরনো বেশ কিছু ভবনের সমন্বয়ে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত নগরী, যা বাংলার বার ভূঁইয়াদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। সেখান থেকে নিকটেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মেঘনা নদী। নদীতে নৌকায় বেড়াতে ভালোই লাগবে। সুতরাং আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনায় নদী দেখার বিষয়টি যুক্ত থাকলে মন্দ হয় না। এখানে যাতায়াত তুলনামূলক বেশ সহজ। পানাম নগর ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত। গুলিস্থান থেকে দূরত্ব মাত্র ২৭ কিলোমিটার। গুলিস্থান থেকে দিনে সব সময় বাস পাওয়া যায়। নামতে হবে মোগরাপাড়া। সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় ১৫ মিনিটেই পৌঁছা যায়। উল্লেখ্য, পানাম নগর ভ্রমণে গেলে অবশ্যই এর সঙ্গে আরেকটি বিশেষ জিনিস যোগ করা যেতে পারে। তা হলো, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত কারুশিল্প যাদুঘর। প্রবেশ মূল্য বিশ টাকা।

আড়াইহাজার মেঘনা নদীর চর
রাজধানীর অদূরেই আড়াই হাজারের চরাঞ্চল ইদানিং খুব পর্যটকপ্রিয় একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে। অল্প সময়েই সেখানে গিয়ে ঘুরে আসা যায়। আশপাশে এমন মনোরম পরিবেশ খুব কমই আছে বলা যায়। ঢাকার নিকটে মেঘনা নদীর মাঝখানে এই বিশাল চর। জায়গাটিতে উপভোগ করা যায় খোলা আকাশে অজস্র পাখির ওড়াউড়ি। পাশ দিয়ে বয়ে যায় পাল তোলা নৌকা আর ছোট ছোট জাহাজ। ধু ধু বালু চরের সৌন্দর্যের সাথে অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায় একটি দিন। ঢকা থেকে খুব সহজেই যাওয়া যায়। গুলিস্থান থেকে দোয়েল, স্বদেশ পরিবহনে মাত্র ৫০ টাকা ভাড়া। নামতে হবে মদনপুর। সেখান থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ৫০ টাকা ভাড়ায় আড়াই হাজার। যাতায়াত, খাওয়াদাওয়া ও নৌকা ভাড়া মিলে চার থেকে পাঁচ জনের ভ্রমণ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যেই হয়ে যাবে।

শালবন বৌদ্ধ বিহার
বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী শালবন বৌদ্ধ বিহার। এটি কুমিল্লা লালমাই-ময়নামতি এলাকার অসংখ্য মূল্যবান সব প্রাচীন স্থাপনা নিদর্শণগুলোর অন্যতম। লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শ্রেণীর প্রায় মাঝামাঝি এলাকায় বিহারটি অবস্থিত। এককালে বিহার ও তার আশপাশের উঁচু এলাকা শালগাছের বনে আবৃত ছিল। বিহারের আশপাশে এখনও অনেক শালগাছ দেখা যায়। যে কারণে অত্র এলাকার নাম হয়েছিল শালবন গ্রাম। বিহার আবিষ্কৃত হওয়ার পর যা ‘শালবন বিহার’ নামে পরিচিতি পায়। এর প্রকৃত নাম কি ছিল তা অবশ্য আজও জানা যায়নি। দশ টাকা টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই বিহারের টকটকে লাল দীর্ঘ প্রাচীর দেখে যে কারও মন ভরে যাবে। প্রাচীরের চরিধার দিয়ে প্রদক্ষিণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে ঝকঝকে তকতকে পায়ে হাঁটা পথ। তার পাশ দিয়ে লাগানো নানা প্রজাতীর ফুল ও পাতাবাহারের গাছ শোভা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বিহার প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দেখা যায় সম্পুর্ণ জায়গাটি চার কোণাকৃতির। এখানে যেতে সায়দাবাদ তেকে উঠতে হবে কুমিল্লাগামী যে কোনো বাসে। এসি এবং ননএসি ভেদে ভাড়া পরবে দুই থেকে সাড়ে তিনশ টাকা। দুই ঘণ্টায় কুমিল্লা। সেখান থেকে রিকশায় টমসম ব্রিজ। এখান থেকে অটোরিকশায় শালবন বিহার পনেরো-কুড়ি মিনিটের পথ। বিহারের সন্নিকটে রয়েছে প্রত্মতাত্ত্বিক যাদুঘর। ইতিহাসের বিস্ময়কর সব উপাদানে সাজানো যাদুঘরের গ্যালারী। মাত্র দশ টাকা প্রবেশ মূল্যে ঘুরে দেখা যায়।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
এক সময় ভারতবর্ষের ভূমি ব্যবস্থা ছিল সামন্তিয়। আর সেই সামন্ত ব্যবস্থায় প্রান্তিক পর্যায়ে জমির খাজনা আদায়ের দায়িত্বে থাকতো কিছু লোক যারা জমিদার বলে খ্যাত ছিল। সেই হিসেবে ভারতবর্ষজুড়ে রয়েছে বহু জমিদার বাড়ি। তেমনি এক বাড়ি বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। এটি দেশের সর্ববৃহৎ জমিদার বাড়িগুলোর একটি। মোট সাতটি ভবন বা স্থাপনা নিয়ে গঠিত। অল্প সময়ের জন্য মনোরম পরিবেশের আবেশ নিতে এর তুলনা নেই। এখানে যেতে হলে ঢাকার গাবতলী থেকে আরোহণ করতে হবে মানিকগঞ্জের বাসে। নামতে হবে সাটুরিয়া, জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৭০-৮০ টাকা। সেখান থেকে সহজেই রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চলে যাওয়া যাবে জমিদার বাড়ি। প্রবেশ মূল্য মাত্র দশ টাকা।

উয়ারী বটেশ্বর
নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর, প্রত্মতাত্ত্বিক স্থাপনা নিদর্শনের নতুন নাম। এখানে মিলেছে প্রাচীন বাংলার এক জনপদের অস্তিত্ব। খনন কাজ এখনও চলমান। খননের পর উদ্ধার হয়েছে বেশ কিছু নিদর্শণ যা এখানকার ইতিহাস রচনায় নতুন উপাত্তের যোগান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খনন এখনও চলমান, আশা করা যায় অল্প কয়েক বছরের মধ্যে মাটির নিচ থেকে বেড়িয়ে আসবে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের অনেক উপাত্ত। বিস্তির্ণ ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে সরু পিচঢালা অথবা মেঠো পথ তারপর উয়ারী বটেশ্বর। এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা ছোট্ট সংগ্রহশালাটি হতে পারে আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনবদ্য এক শিক্ষার বস্তু। পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঢাকার নিকটে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী উয়ারী বটেশ্বর ভ্রমণ হতে পারে আপনার প্রিয়জনদের জন্য স্মৃতিময় একটি ঘটনা।

বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন।

টাঙ্গাইলের মহেরা জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইলে ঘুরে দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থাপনা নিদর্শনকে কেন্দ্র করেই, সে নিয়ে হয়তো আলাদা একটি সমৃদ্ধ লেখা প্রস্তুত করা যেতে পারে। যাই হোক, এসবের মধ্যে মহেরা জমিদার বাড়ির অবস্থান মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নে। বর্তমানে মহেরা পুলিশ একাডেমির সন্নিকটে। একাধিক বিশেষ স্থাপনা, দিঘি ও বিশাল চত্তর নিয়ে এই জমিদার বাড়ির অবস্থান। কারুকার্জখচিত ভবনগুলি সাধারণত বিভিন্ন নাটক বা সিনেমায় দেখা যায়। পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি বর্তমানে এটি একটি শুটিং স্পটও। ঢাকা থেকে বেশ খানিকটা সময় লাগলেও চাইলে এক দিনেই ঘুরে আসা সম্ভব। মহাখালী থেকে প্রায় প্রতি আধা ঘণ্টা পরপরই বাসে ছেড়ে যায় টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার পথ, ভাড়া নেবে ৮০-১০০ টাকা। ঝটিকা পরিবহনের বাস হতে পারে সব থেকে সহজ মাধ্যম। সেক্ষেত্রে বাস থেকে নামতে হবে নাটিয়াপাড়া। সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় আধা ঘণ্টায় মাত্র ৫০ টাকায় যাওয়া যায় মহেরা জমিদার বাড়ি। প্রবেশ মূল্য বিশ টাকা। টাঙ্গাইল এখন ট্রেনেও যাওয়া যায়। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আপনাকে ট্রেনে উঠতে হবে। সৌজন্যে: রাইজিংবিডি