Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » ভুটান : দি ল্যান্ড অব থান্ডার ড্রাগন

ভুটান : দি ল্যান্ড অব থান্ডার ড্রাগন

:: এইচ এম এ আলম ::

নেপাল ঘুরে আসার পর আবার আবার শুরু হল আমার গতানুগতিক ৯ টা ৬ টা অফিস। কোন বৈচিত্র্য নাই। প্রায়ই নেপালের ছবি গুলো বের করে দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। মন ভালো করতে বাইক নিয়ে চলে গেলাম সাজেক। সাজেক অসাধারণ সুন্দর একটা যায়গা, কিন্তু তাও মন ভরল না। সাজেকে বসেই প্ল্যান করে ফেলি যে নেক্সট ট্যুর হচ্ছে ভুটান। ঢাকায় এসে ক্যালেন্ডার ঘাটতে লাগলাম কবে ছুটি আছে দেখার জন্য। ২৩~২৫ সরকারি বন্ধ দেখে ভাবলাম সাথে ২ দিন ছুটি নিয়ে ৫ দিনে সুন্দর মত ঘুরা হয়ে যাবে। বসে গেলাম ট্যুর প্ল্যান করতে।

প্ল্যানিং:
এই সেকশনে কিভাবে কোথায় কোথায় যাবেন তা সম্পর্কে লিখব, কেও যদি সরাসরি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পরতে চান তাহলে এই অংশ স্কিপ করতে পারেন।

ভুটান এ বাসে বা প্লেনে দু’ভাবেই যাওয়া যায়। বাসে গেলে ইন্ডিয়ার ট্রানজিট ভিসা লাগবে। ট্রানজিট ভিসা নেয়ার জন্য কোন ই-টোকেনের প্রয়োজন হয় না। তাই ঝামেলা কম। দালাল ধরার ও প্রয়োজন নাই। http://indianvisa-bangladesh.nic.in/… এই লিঙ্ক এ সব ডিটেইলস পাবেন যে কি কি ডকুমেন্ট লাগবে। আপনার যদি আগে থেকেই ইন্ডিয়ার ভিসা থেকে থাকে তা বাতিল হয়ে যাবে ট্রানজিট ভিসা নিলে।

সাধারণত ট্রানজিট ভিসা দেয় ১৫ দিনের জন্য। যার মাঝে যাওয়ার সময় টানা ৩ দিন আর ফেরত আসার সময় টানা ৩ দিন থাকতে পারবেন। সময় আর সুযোগ থাকলে এই ৩ দিনে দার্জিলিং ও ঘুরে আসতে পারেন। বর্ডার পার হয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ফেলতে পারেন সরাসরি জয়গাঁও বর্ডার পর্যন্ত। ট্যাক্সি তে করে যাবার সময় পাবেন জলপাইগুড়ি জেলার চা বাগানের মনোরম দৃশ্য।

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার জয়গাঁও হচ্ছে ভারতের শেষ সীমানা। ওপাশে ভুটান এর ফুয়েন্টশলিং বর্ডার। বুড়িমাড়ি থেকে জয়গাঁও আসতে দেড় ঘণ্টার মতো লাগবে।

নেটে একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ১০ এয়ারপোর্ট আর তাদের বর্ণনা। পরতে পরতে এক নাম্বারে এসে দেখলাম ভুটান এর পারো এয়ারপোর্ট। হিমালয়ের পাহাড়ের মাঝে ছোট্ট একটা রানওয়ে। সেখানেও ২ টা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে অনেক কাইৎ চিত হইয়া যাইতে হয়। পারও এয়ারপোর্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২৩৫মিঃ উপরে অবস্থিত, আর এর দৈর্ঘ্য হল ১২০০মিঃ। এটাই পৃথিবীর একমাত্র এয়ারপোর্ট যার রানয়ের দৈর্ঘ্য তার উচ্চতার চাইতে কম।

বলা হয়ে থাকে মাত্র ৮ জন পাইলট এখানে প্ল্যান ল্যান্ড করানোর জন্য অভিজ্ঞ, সত্যতা জানা নাই। কিন্তু সত্য হোক আর মিথ্যা, ভুটানে প্লেনে আসতে চাইলে আপনার এয়ারলাইন্স বাছাই করার খুব বেশি সুযোগ নাই। কারণ ভুটানে ২ টা আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সই যায়, একটা হল ড্রুক এয়ারলাইন্স, আরেকটা ভুটান এয়ারলাইন্স। বাংলাদেশ থেকে গেলে আপনার ড্রুক এয়ারলাইন্স ছাড়া যাবার কোন উপায় নাই।


ভুটানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক ভালো। ভুটানে শুধুমাত্র ২ টা দেশের এমব্যাসি আছে, একটা হল ভারত, আরেকটা বাংলাদেশ। ভুটান হল পৃথিবীর সবচেয়ে কম এমব্যাসি ওয়ালা দেশ (ভ্যাটিকান সিটি তে কোন এমব্যাসি রাখে না) ।

আপনি যদি বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মালদ্বীপের নাগরিক না হন, তা হলে ভুটানে যাবার জন্য আপনাকে ভিসা নিতে হবে (তথ্যসূত্র – http://www.tourism.gov.bt/plan/visa)। আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট হলে ইমিগ্রেশনে কোন ঝামেলা হবে না।

বাহিরের দেশের নাগরিকরা আবার নিজেরা ভুটানের ভিসার জন্য এপ্লাই করতে পারে না। তাদের অনলাইনে কোন ট্রাভেল অপারেটরের কাছ থেকে ট্রাভেল প্যাকেজ কিনতে হয়, যার মূল্য হতে হবে কমপক্ষে ২৫০ ডলার প্রতি দিন। এর মাঝে মিনিমাম ৩ সটার হোটেলে থাকাখাওয়া, গাইড সহ সব খরচ থাকবে। এই ২৫০ ডলার থেকে নেপাল সরকার নেয় ৬৫ ডলার, বিনামূল্যে চিকিৎসা আর শিক্ষা সেবা দেওয়ার জন্য।

ভুটান সম্পর্কে কিছু কথা
এর মাঝে ইউটিউবে টেড টকের ভিডিও দেখতে দেখতে ভুটানের উপর একটা ভিডিও দেখলাম। সেখান থেকে জানলাম যে ভুটান হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেটা কার্বন নেগেটিভ। মানে তারা যত পরিমাণ কার্বন উৎপন্ন করে তার চেয়ে বেশি শোষণ করে। তাদের সংবিধানে বলা আছে যে ভুটানের ন্যুনতম ৬০ ভাগ জমিতে ফরেস্ট থাকতে হবে। অর্থাৎ তাদের সরকার থেকে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা আছে।

তারা আবার রিনিউএবল এনার্জির মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করে কার্বন এমিসন আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ভুটান যাবার আগে এই দেশ সম্মপর্কে অনেক ব্লগ পরেছিলাম। প্রত্যেকটা ব্লগে কমন ছিল যে জিনিস তা হল, ভুটানের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, আর সে দেশের মানুষের ব্যাবহার। খারাপ কিভাবে হতে হয় সেই জিনিসটাই মনে হয় এই দেশের মানুষের মাথায় ঢুকে নাই।

ভুটানের প্রধান ধর্ম হচ্ছে বৌদ্ধ। ভুটান দেশটাই বিখ্যাত তাদের অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ আর মনেস্ট্রির জন্য। তিব্বতের কাছাকাছি হওয়ায় তাদের সংস্কৃতির সাথে তিব্বতিয়ান সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায়। আমাদের অনেকেরই ধারণা যে ভুটানে এখনো রাজতন্ত্র চলে। এটা একসময় ছিল, কিন্তু ২০০৮ সালে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিবর্তিত হয়।

এদের আবার ড্রাগনের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা আছে। তাদের রাজাকে তারা স্থানীয় ভাষায় ডাকে – ”লর্ড অফ থান্ডার ড্রাগন’ নামে।

শুরুর কথা
২৩ ডিসেম্বর যাবার ইচ্ছা থাকলেও ঝামেলা বাধল প্লেনের টিকেট নিয়ে। ২৫ তারিখ বড়দিন। বাহিরের দেশে সবার ছুটি। আর ভুটানের এয়ারলাইন্সও একটা হওয়াতে সব টিকেট বুক। বাসে যাওয়া আমার জন্য সম্ভব ছিল না ২ টা কারণে। এক হল সময় কম। আরেক হল আমার ইতোমধ্যে ১ বৎসরের ইন্ডিয়ার ভিসা ছিল, সেইটা আর নষ্ট করতে চাই নাই।

অনেক গুঁতাগুঁতি করে শেষে ১০~১৩ তারিখের টিকেট ম্যানেজ করতে পারলাম। ৫ দিনের জায়গায় ৪ দিন ঘুরতে পারব, এই যাহ। আর এই ট্যুরে আমার সাথে সঙ্গী হিসাবে পেলাম সাব্বির ভাই কে।

প্রথম দিন
১০ তারিখ সকালে ৯.৩০ এ ফ্লাইট। তাই সকাল সকাল ২ জন এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেলাম। সাব্বির ভাই এর এটা প্রথম বিদেশ যাত্রা। উনি খুবই এক্সাইটেড। আমি এর আগে নেপাল ঘুরে আসছি। তাই এমন ভাব ধরে থাকলাম যে, এ আর এমন কি। আমি ত সকাল বিকাল দেশের বাইরে যাওয়া আসা করি। উনাকে ভাব ধরে বিভিন্ন জিনিস চিনাতে লাগলাম। কোনটারে বলে চেক ইন, আর কাকে বলে বোর্ডিং, ইমিগ্রেশন খায় না মাথায় দেয়, কিভাবে বোর্ডিং এর সময় আপনার প্যান্টের বেল্ট পর্যন্ত খুলে চেকিং করবে তার সব বর্ণনা দিতে থাকলাম।


উনি দেখলাম মনোযোগী ছাত্রের মতো সব মাথায় সেভ করে রাখতেসেন। আমার উৎসাহ আরও বেড়ে গেল, এরপর তারে চিনানো শুরু করলাম যে কোনটা জেট প্লেন, আর কোনটা প্রপেলার প্লেন। ভাব ধরে বললাম যে আজ আমরা জেট প্লেন এ যাব (আমি আগে কখনো জেট প্লেনে উঠি নাই, তাই ভিতরে ভিতরে নিজেও এক্সাইটেড) ।

কিন্তু সব আসায় গুড়ে বালি, আমাদের দেখলাম এক পাঙ্খা ওয়ালা প্লেন এর সামনে নিয়া দাড়া করায় দিল। সাব্বির ভাই জিজ্ঞাস করে, ভাই আপনার জেট ইঞ্জিনে পাঙ্খা কেন!! কবি এখানে নীরব।

আমার সিট পড়ল লাস্টের আগের রো তে, আমার পিছনে সাব্বির ভাই। তার পাশের সিট কেবিন ক্রু দের জন্য বরাদ্ধ থাকায় আমি বসতে পারি নাই। প্লেন টেক অফ হবার পর আমি উঠে পিছনে চলে আসলাম। কিছুক্ষণ খাবার দাবার দেয়ার পর কেবিন ক্রু, যার নাম সোনাম (সোনম কাপুর ভেবে ভুল করবেন না) আমার পিঠে টোকা দিয়ে বলল – ‘Hey, you want a beer?’. আমি বাপ মায়ের বাধ্য সন্তান, জীবনে একটান বিড়িও খাই নাই, কিন্তু এইরকম হটাত করে একজন অফার করার পর ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ভাবলাম না বললে ভাববে যে পোলা এখনো বাচ্চা রইয়া গ্যাসে। তাই নিজের পৌরষত্ত বাঁচানোর জন্য তার কাছ থেকে ১ টা হেইনকেনের ক্যান নিলাম।

পাশে সাব্বির ভাই অলরেডি সোনাম এর কাছ থেকে এক বোতল বিয়ার নিয়া অর্ধেক নামায় দিসে। এইখানে বলে রাখা ভালো, সোনাম রে যদি আইনা বাংলাদেশের রাস্তায় ছাইড়া দেই, সবগুলা মেয়ে সিরিয়াল ধরে ক্রাশ খাইতে থাকবে। আর বিয়ারটা প্ল্যানে শুধু কেবিন ক্রু দের জন্যই ছিল, সে সেখান থেকে আমাদের নিজের ইচ্ছায় দিয়েছিল। আমি এক চুমুক দিয়েই বুঝলাম এই জিনিস আমার জন্য না, সাব্বির ভাই কে দিইয়ে দিলাম। উনি দেখালাম মহানন্দে ২ বোতল নিয়া খাইতে থাকলেন।

তারপর নিজ থেকেই বলল, যদি আমরা পারো থাকি, তাহলে যাতে তাকে কল দেই, সে তাহলে আমাদের পারো ঘুরিয়ে দেখাবে। তারপর তার সাথে অনেক গল্প হল। এদিকে আমরা ফ্রি বিয়ার খাচ্ছি দেখে আমাদের সামনের জন পিছন ঘুরে বলল, ভাই এইটা কি সবাইরে দেয় নাকি শুধু আপনারে দিসে। আমি বললাম মনে হয় না সবাইকে দেয়। তো উনি মন খারাপ করে আবার আগের জায়গায় বসে পরলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখি উশখুশ করে আর থাকতে না পেরে কেবিন ক্রু রে বলেই ফেলল যে ভাই আমারেও একটা দেন। তার দেখা দেখি আরেকজন, তারপর আরেকজন। এইরকম চার পাঁচ জন কে দেয়ার পর শেষে সে বলতে বাধ্য হইল যে দেখেন ভাই, এইটা দেয়ার নিয়ম নাই। তারপর আমাদের দেখায় বলল- “Because of my friends, I gave it to you.”।

পারোর কাছাকাছি চলে আসার পর শুরু হল পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কাইত চিত হয়ে আস্তে আস্তে নিচে নামা। দুইটা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে যখন প্লেন নামছিল, বাড়ি ঘরের এতো কাছ দিয়ে যাচ্ছিল যে হয়তো চেষ্টা করলে দুই একজনের ঘরের টিভিও দেখতে পারতাম।

ঢাকায় অনেক গরম ছিল, তাই আমি আমার জ্যাকেট লাগেজের সাথে দিয়ে দিয়েছিলাম। পরনে ছিল শুধু একটা শার্ট। কত বড় ভুল ছিল ল্যান্ড করার পর পরই বুঝতে পারলাম। এমনিতে ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল যে বাহিরে অনেক রোদ। কিন্তু প্লেন থেকে বের হয়েই দেখলাম যে এই রইদের আসলে কোন বেইল নাই। কণকণে ঠাণ্ডা, প্রায় ৭~৮ ডিগ্রী ছিল তাপমাত্রা।

ভুটান এ পা দিয়েই যা চোখে পড়বে তা হল তাদের পরিষ্কার পরিছন্নতা। কোথাও এতটুকু ময়লা পড়ে নেই। আর চোখের পড়বে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। ভুটান এর প্রায় সবগুলো বাড়িই দেখতে প্রায় একই রকম। সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে পাবলিক টয়লেটের পর্যন্ত ডিজাইন সেইম। আর প্রায় প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব পোশাক ‘কিরা’ পড়ে থাকে।

এয়ারপোর্টের সামনে কিছুক্ষণ ফটোসেশন করে রওনা দিলাম থিম্পুর উদ্দেশ্যে। একটা ট্যাক্সি আমরা রিজার্ভ করে নিয়েছিলাম। আমার প্ল্যান ছিল আজ থিম্পু থেকে পুনাখা যাবার পারমিট নিয়ে রাখব (পুনাখা যেতে হলে আলাদা করে থিম্পু থেকে পারমিশন নিতে হয়) । আর পুনাখা যাবার ইচ্ছা ছিল রয়েল এনফিল্ড বাইকে করে। আমার বহুদিনের স্বপ্ন যে একটা রয়েল এনফিল্ড চালাব । আজই বাইক ভাড়া করে কাল সকালে চলে যাব পুনাখা।

কিন্তু সব সময় প্ল্যান মতো সব কিছু কি হয়। ট্যাক্সি করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একেবেকে যাচ্ছিলাম। রাস্তার পাশেই এক পাহাড়ি নদী। দেখে মনে হচ্ছিল যেন ইউরোপে চলে এসছি।

ড্রাইভার আমাদের জিজ্ঞাস করতে লাগল যে কোত্থেকে এসেছি, কয়দিন থাকব, কোথায় যাব এসব। সে আমাদের প্ল্যান শুনে বলল যে “আজ তো পারমিট নিতে পারবেন না, অফিস বন্ধ”। আমার তো মাথায় বাজ পড়ল। একেতো অনেক কম সময় নিয়ে এসেছিলাম, তাই প্রতিটা ঘণ্টা আমার কাছে গুরত্তপূর্ণ।

সাব্বির ভাই আমাকে জিজ্ঞাস করতে লাগল যে ভাই কি করবেন। আমি চুপ করে এক মিনিটের মধ্যে তাড়াতাড়ি পুরো প্ল্যান আবার রিশিডিউল করে ফেললাম। তারপর চিন্তা করে দেখলাম যে কোন প্লেস বাদ পড়ে যায় কিনা। তারপর ড্রাইভার কে বললাম যে গাড়ি ঘুরান, আজ আমরা চে লে লা পাস যাব।

চে লে লা পাস সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৯৮৮মিঃ উঁচু, প্রায় ১৩০০০ ফিট এবং এটি হচ্ছে ডান্তাক রোডের সবচাইতে উঁচু স্থান। এখানে যাবার জন্য প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে একে বেকে আপনাকে উঠে যেতে হবে। হঠাৎ করে ঢাকার মত সমতল যায়গা থেকে ২ ঘণ্টার ব্যবধানে এতো উপরে উঠে যাওয়ায় আমার মাথা ব্যথা আর বমি বমি লাগতে লাগল। কিন্তু আশে পাশের সৌন্দর্যের কাছে তা ছিল অতি তুচ্ছ। আরেকটা জিনিস যেটা চোখে পড়ার মতো তা হল এদের রাস্তের পাশে সিমেন্টের ফলকে লিখে রাখা ড্রাইভার দের জন্য সতর্কবাণী। যেমন –

Be Mr. Late, not Late Mr.
Peep peep, don’t sleep
If you are married, divorce speed
He who touches ninety, flies to die at nineteen
Drive fast and test out rescue
Fast isn’t always first
After drinking whiskey, driving is risky

পাসের একদম কাছে এসে চোখে পড়ল ‘জমলহারি’র বরাফাবৃত পিক। এর উচ্চতা ৭৩২৬ মিঃ অথবা ২৪০৩৫ ফিট, ভুটানের ২য় সর্বোচ্চ পিক। অনেকে জমলহারিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বৌ (The bride of Kanchenjunga) ও বলে থাকে। এই পাহাড় থেকেই তৈরি হয়েছে পারো নদী।

তিব্বতি বৌদ্ধ রা এই পাহাড়কে অনেক পবিত্র মনে করে।তারা মনে করে এই পাহাড় পাঁচ ‘শারিংমা বোন’ (Tsheringma Sisters) এর একজনের বাসস্থান ছিল। এই শারিংমা দের কাহিনী বলতে গেলে আরেক ইতিহাস শুরু হয়ে যাবে। শুধু এইটা বলে রাখি যে এই পাঁচ বোন ‘গুরু পদ্মসম্ভভা’ এর কাছে শপথ করে বৌদ্ধ দের সংস্কৃতি ও স্থানীয় জনগণদের রক্ষা করার। বৌদ্ধরা এইটাও ধারণা করত যে ,যেহেতু এই পাহাড় পবিত্র, তাই কেউ এর চুড়ায় যেতে পারবে না। যেতে চাইলে তাকে ফেলে দেয়া হবে। ১৯৩৭ সালে এক ব্রিটিশ এক্সপেডিশন টিম কে সামিট করার অনুমতি দেয়া হয় এবং তারা ২১ মে, ১৯৩৭ এ এর চুড়ায় উঠে। তাদের কেন ফালায় দেয় নাই মাথায় ঢুকল না।

যাই হোক, পাসের উপর যেয়ে দেখি ছোট একটা টং এর মত দোকান আর দোকানের পাশে ২টা কুকুর। সেখানে প্রথম সাব্বির ভাই এর কুকুর প্রেম সম্পর্কে যানতে পারলাম। উনি দেখি কুকুর ২ টাকে বুকে জড়ায় বসে আছেন। এরপর ভুটান এর রাস্তায় এর পর যতগুলা কুকুর সামনে পড়ছে সবগুলার সাথে উনি যেয়ে কুলাকুলি করে আসছেন। বাংলাদেশে তাকে এমনটা করতে দেখা যায় না।

পাসের পাশে একটা উঁচু জায়গা ছিল। আমরা ভালো ভিউ পাবার জন্য টং থেকে পানি, চিপস আর একটা ড্রাই ফ্রূটের প্যাকেট কিনে হাটা দিলাম। ৫ মিনিটেই আমার দম শেষ। এই আমিই ২ মাস আগে কিভাবে অন্নপূর্ণা ট্র্যাক দিয়ে আসছিলাম ভেবে পাই না। সাব্বির ভাই দেখি তর তর করে উঠে যাচ্ছে। আমি আস্তে আস্তে বিস্বাদ একটা ড্রাই ফ্রুট খেতে খেতে উঠতে লাগলাম।

হিমালয় রেঞ্জের প্রায় সব জায়গাতেই বৌদ্ধদের টাঙ্গানো প্রেয়ার ফ্ল্যাগ চোখে পড়ে। ভুটানও তার ব্যতিক্রম না। কিন্তু এখানে এসে কিছু অন্য রকম শেপের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ দেখলাম। সাদা একটা কাপড়, পতাকার মতো একটা বাঁশের সাথে লম্বাভাবে লাগানো। এরকম আগে কখনো দেখি নাই, জানাও ছিল না। প্রথমে ভেবেছিলাম পতাকা টাইপ কিছু বোধহয়।

কিছুদূর উঠে যাবার পর সারি সারি বিশার সব পাহাড় আর তাদের মাঝের উপত্যকায় ছোট ছোট বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে দেখতে লাগলাম। আমার ক্যামেরা সাব্বির ভাই এর কাছে দিয়ে দিয়েছিলাম। উনি একটার পর একটা শাটার মারতে থাকলেন।

সেখানে কিছুক্ষণ ফটোসেশন করে আমরা ফেরা পথ ধরলাম।আমার এমনিতেই মাথা ব্যথা, তার উপর এই পাহাড়ে উঠানামা করতে যেয়ে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলাম। ট্যাক্সিতে উঠে তাই হা করে ঘুমাতে লাগলাম। এর মাঝে নাকি আমার ঘুমানোর ছবি টবিও তোলা হয়েছে। সাব্বির ভাই ভুলটা করেছিল আমার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে। বিশ্ববাসী আর আমার এই হা করে ঘুমানোর ছবি দেখতে পাচ্ছে না।

ঘুম ভাঙ্গার পর দেখলাম ট্যাক্সি রাস্তার পাশে দাঁড়ানো। পাশে একটু নিচে একটা লম্বা সোজা রাস্তা আর সেখান দিয়ে একটা প্লেন ট্যাক্সিং করে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠার কারণে কিছুক্ষণ ধান্ধা খাইয়া ছিলাম যে হইতাসে কি। পরে বুঝলাম আমরা পারো বার্ডস আই ভিউ পয়েন্টে আছি। এইটা এয়ারপোর্টের পাশেই একটু উঁচুতে একটা রাস্তা যেখান থেকে পুরো এয়ারপোর্টের একটা প্যানারমিক ভিউ পাওয়া যায়। ততোক্ষণে বিকাল হয়ে এসেছে, ঠাণ্ডাও বাড়ছে, আমি তাও একটা শার্ট পরেই বসে আছি। আলসেমি করে ব্যাগ থেকে জ্যাকেট বের করা হচ্ছে না। এখানে কিছুক্ষণ সময় পার করে পারো সিটি তে চলে গেলাম।

পারো এবং টাইগার্স নেস্ট

পারো তে উঠেছিলাম হোটেল পেলজরলিং এ। হোটেলে ব্যাগ টেগ রেখে চলে গেলাম সিম কিনতে আর একটু শহর টা একটু ঘুরে দেখতে। শহর বললে ভুল হবে, ছোট্ট একটা জায়গা, এমাথা থেকে ওমাথা হেটে যেতে ১০ মিনিটও লাগেনা। এর মাঝে কিছু দোকানপাট, বাড়িঘর আর কিছু হোটেল।


এখানে আসার সময় কয়েক জায়গায় বাড়িঘরে দেখলাম অদ্ভুত রকমের কিছু চিত্রকর্ম, লম্বা একটা দন্ড, দন্ডের মাথায় চোখ, অনেকের আবার হাত, গলায় মালাও আছে। নিচে আবার দুইটা গোলাকার কিছু। জিনিসটার আকার অনেকটা পুরুষাঙ্গের সাথে মিলে যায় দেখে আমি আর সাব্বির এটা নিয়ে কিচ্ছুক্ষণ হাসাহাসি করলাম। হয়তো অন্য কিছু আঁকতে যেয়ে ভুলে এরকম হয়ে গেছে। অন্তত এই জিনিসের হাত পা, গলায় মালা এইসব তো থাকতে পারে না। কিন্তু পারো এসে দেখি স্যুভনিরের দোকানে এই জিনিস গুলার থ্রিডি মডেল পাওয়া যাচ্ছে। তখন আমাদের সন্দেহ হতে লাগল, যে কোন ঘাপলা আছে।

সাব্বির ভাই ঠিক করলেন যে দোকানে যেয়ে জিনিসটা দামাদামি করে আসবেন। কিন্তু ভিতরে যেয়ে পরমা সুন্দরী এক সেলস ম্যান দেখে আর পারলেন না। আর যাইহোক, একটা মেয়ের সামনে এই জিনিস হাতে নিয়ে দামাদামি করার কলিজা আমাদের ছিল না। ভুটানের মতো দেশে এসে এই ধরণের জিনিস ওপেন বিক্রি হবে আশা করি নাই। এই জিনিসের উৎপত্তি নিয়ে বিস্তারিত লিখতে চাই না। শুধু বলে রাখি, এইটা ভুটানের অল্প সংখ্যক মানুষের ধর্মীয় সিম্বল টাইপ কিছু। পুনাখার কাছে চিমি লাখাং নামক এক মন্দির থেকে এর উৎপত্তি। কারো যদি আরও জানার ইচ্ছা থাকে ‘Phallus paintings’ লিখে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। আমি আর ছবি দিলাম না।

সাব্বির ভাই আরও কিছুক্ষণ পর হোটেল চলে গেলেন, আমি থেকে গেলাম। পাহাড়ি নদীর পাড়ে বসে সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। এতো শান্ত চুপচাপ একটা শহর যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে বসে পার করে দেয়া যায়।

সিম কিনে আনার পর নেট একটিভ করার জন্য কল সেন্টারে কল দিলাম। সাধারণত কল সেন্টারে কল দিলে অমুক করতে এক চাপুন, তমুক করতে দুই চাপুন এইসব করতে হয়। তাই লাউডস্পিকার দিয়ে ডায়ালপ্যাড বের করে রাখলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা মেয়ে ফোন ধরল আর চাইনিজ এক্সেন্টে হেলো বলে উঠল। আমি বেক্কল হয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। নাম্বার টা আবার চেক করলাম যে ভুলে অন্য কোন নাম্বারে কল চলে গেল কিনা।এখানে কল সেন্টারে এতো কম কল আসে যে একজনকে বসায় রাখসে কথা বলার জন্য। আমাদের মতো ওয়েটিং সিস্টেম নাই।
যাই হোক, তাকে বললাম নেট এক্টিভ করতে চাই, সেটিংস পাঠান, সে বলে আমি তো একটু আগেই সেটিংস পাঠায় দিসি। বেক্কল হয়ে গেলাম, তার সাথে আমার কথাই হইতেছে এই প্রথম। আসলে কাহিনী হইসে, কিছুক্ষণ আগেই সাব্বির ভাই তাকে ফোন দিয়ে সেটিংস চাইছে, আমাদের নাম্বার অলমোস্ট সিমিলার হবার কারণে বুঝতে পারে নাই বেচারি।

কয়েকজন দেখলাম বাস্কেটবল খেলছে। পাশে দাঁড়ায় দাঁড়ায় তাদের খেলাম দেখতে লাগলাম। একসময় বল আমার কাছে আসল। স্কুল কলেজে থাকতে প্রচুর খেলতাম, এখন আর খেলা হয় না। তাও বল নিয়ে শুট করে দিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে স্কোর হয়ে গেল। তা দেখে আমাকে ওরা জিজ্ঞাস করল আমিও খেলতে চাই কিনা। মনে মনে ভাবলাম, ঝড়ে বক পইরা গ্যাসে, এখন খেলতে যাইয়া মান সম্মান ডুবানোর দরকার নাই।


রাতে সাব্বির ভাই কে নিয়ে আবার বের হলাম। শুন শান নীরব শহর। একটা পার্কে দেখেছিলাম বিকেলে ছেলে বুড়া সবাই ব্যায়াম করছিল। পার্কে অনেক ব্যায়াম করা টাইপের জিনিস। সাব্বির ভাই সবগুলো পরখ করে দেখলেন। ভুটানের লোকজনদের আমার অনেক স্বাস্থ্য সচেতন মনে হয়েছে। খুব লোকই আমাদের মতো (অথবা আমার মতো) ভুঁড়িওয়ালা। রাতে এতো ঠাণ্ডা পড়ে যে আমরা ১ জোড়া হাতমোজা কিনতে বাধ্য হই।
এখানে দেখলাম বেশির ভাগ দোকান চালায় মেয়েরা। এইটা একটা ব্যবসায়িক চালও হতে পারে। কারণ ভুটানে ল্যান্ড করার পর থেকে এমন একটা মেয়েও দেখি নাই, যার উপর আমি ক্রাশ খাই নাই। সৃষ্টিকর্তা যেন সব কিউটনেস দিয়ে এখানকার মেয়েদের তৈরি করেছেন। তার চেয়েও কিউট তাদের কথা বলার স্টাইল। হাতমোজা কিনতে যেয়েও দেখি যথারীতি কিউট পুতুলের মতো একটা মেয়ে। দোকানে ঢুকার আগে প্ল্যান ছিল যে দামাদামি করব। কিন্তু দাম কম বলতেই, মেয়েটা কিউট করে রিকোয়েস্ট করল যে এর কম সম্ভব না, যাতে কম না দেই। আমার মনে হল, আহারে, দিয়েই দেই, কয়টা টাকাই বা যাবে।

রাতে আশে পাশে একটু ঘুরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে গেলাম। সাথের ভাই হোটেলের নীচে পিচ ওয়াইনের দাম ১২০ টাকা দেখে সকাল থেকে কাউমাউ শুরু করেছিল যে খাবে, তাকে ঠাণ্ডা করতে ১ টা কিনে দেয়া হল।

টাইগার্স নেস্ট

পরের দিন আমাদের টার্গেট ভুটানের বিখ্যাত টাইগার’স নেস্ট। ভুটান লিখে গুগলে ইমেজ সার্চ দিলে এই যায়গার একটা না একটা ছবি অবশ্যই আসবে। আইফেল টাওয়ার যেমন ফ্রান্সের, স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেমন আমেরিকার, তাজমহল যেমন ইন্ডিয়ার প্রতীকের মতো কাজ করে, ভুটানের ক্ষেত্রে টাইগার’স নেস্টকে অনেকটা তেমনই বলা যায়। স্থানীয়রা বলে থাকে ‘তাক্তসাং’। নামের সাথে বাঘ থাকলেও এর আশে পাশে বাঘের চিহ্নও নাই। যায়গাটা আসলে একটা মনেস্ট্রি।

১৬৯২ সালে এই মন্দির প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাক্তসাং গুহার পাশে। ‘গুরু পদ্মসম্ভব’ এখানে ৩ বৎসর, ৩ মাস, ৩ সপ্তাহ, ৩ দিন এবং ৩ ঘণ্টা ধরে ধ্যান করেছিলেন। ‘পদ্মসম্ভব’ কে বলা হয় ভুটানের ধর্মীয় গুরু। উনিই প্রথম ভুটানে বুদ্ধিজম প্রচার শুরু করেন। তার স্মরণে মার্চ এপ্রিলের দিকে পারো তে ‘সেচু’ নামে ফেস্টিভাল হয়।

তিব্বতি ভাষায় তাক্তসাং মানে বাঘের গুহা। বলা হয়ে থাকে পদ্মসম্ভব তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে করে এখানে আসেন। অনেকে আবার বলে, ‘ইয়েশে সগিয়াল’ নামে এক রাজার বৌ, যে পদ্মসম্ভব এর অনুসারী ছিল, নিজে বাঘিনীতে ট্রান্সফর্ম হয়ে গুরু কে তিব্বত থেকে নিয়ে আসে। এটা নিয়ে আরও অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে, তবে সব কাহিনীতেই বাঘের বিষয়টা কমন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই যায়গাটার নাম হয়ে যায় টাইগার্স নেস্ট। এ বিষয়ে আরও অনেক লেখা নেট ঘাঁটলেই পাওয়া যায়, তাই আমি আর কথা বাড়ালাম না।

আগের দিন রাতে আমাদের ড্রাইভার কে ফোন দিয়ে বলা ছিল, সে টাইম মত সাত সকালে ট্যাক্সি নিয়ে হাজির। পারো থেকে আধা ঘণ্টার মতো রাস্তা ট্যাক্সি তে যেতে হয়, তারপর সেখান থেকে শুরু হয় টাইগার্স নেস্ট যাবার ট্রেকিং। পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে থেকে শুরু হয় পাইনের বন। এতদিন শুধু মুভি তে দেখেছিলাম। প্রথমবার সামনাসামনি দেখে তাই কিছু ফটোসেশন হয়ে গেল, সেই সাথে সকালের নাস্তাটাও সেরে নিলাম।

ট্রেকিং যেখান থেকে শুরু হবে, সেখানে দেখি অলরেডি শ খানেক লোক। সবাই হাতে লাঠি শোঠা নিয়ে ট্রেকিং এর জন্য তৈরি। আমি আমার লাস্ট অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্রেকিং এর সময় কিনা ট্রেকিং পোল টা বের করলাম। তলপেটে নিম্নচাপ অনুভব করায় পাশে থাকা এক পাবলিক টয়লেটে গেলাম হাল্কা হতে। আমাদের দেশে পাবলিক টয়লেট এর যা অবস্থা দেখি, তাই এখানে খুব ভালো কিছু আশা করি নাই। কিন্তু কিসের কি, যাইয়া দেখি এই পাহাড়ের চিপার মধ্যে আমাদের এয়ারপোর্টের চেয়ে সুন্দর ঝকঝকে বাথরুম।

তো অনেক আনন্দে প্রাকৃতিক কর্ম সারার পর যেই ডান দিকে তাকালাম পানির জন্য, দেখি কিছু নাই। কিছু নাই মানে পানির কোন ব্যবস্থাই নাই। আমার তো আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। জীবনে আগে কখনো এই সিচুয়েশন এ পরি নাই। এর পর এখান থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পেয়েছি তা আর না বলি।
ট্রেকিং শুরু হল এবং যথারীতি ৫ মিনিট পর আমার দম শেষ হয়ে গেল। সাব্বির ভাই দিনে ১০০ টা করে বুকডন মারেন, তার কাছে তো এইসব ছেলের হাতের মোয়া। তিনি নাচতে নাচতে উপরে উঠে যান। আমরা উঠতে থাকি, আর একটু পর পর পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে টাইগার্স নেস্ট দেখা যায়, আর আমাদের সেলফি তোলা চলে।

পুরো হিমালয় রিজিওনে দেখা যায় বুদ্ধিস্টরা একটা পাথরের উপর আরেকটা পাথর রেখে একটা স্ট্যাক এর মত বানায়। নেপালে এরকম দেখে নেট ঘেঁটে এর পিছনে অনেক কারণ পাই। অনেকে বলে, এর কোন কাম নাই, হুদাই করে, কনসেন্ট্রেশন বাড়ানোর জন্য, এই লজিকটা আমার পছন্দ হয় নাই। একজন লিখছিল যে, পাথর যেরকম বড়টার উপর ছোট টা রেখে সাজাতে হয়, আমাদের জীবনেও তেমনি বিভিন্ন সময় অনেক কিছুর প্রায়োরিটি বেশি থেকে কম আকারে সাজাতে হয়। সুন্দর ব্যাখ্যা। কিন্তু ট্রেকিং এর সময় এক সিঙ্গাপুরিয়ান গ্রুপের গাইডের কাছ থেকে জানতে পারি যে, বুদ্ধিস্ট রা বিশ্বাস করে এইগুলা তাদের কে পথ হারিয়ে গেলে পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। কোনটা ঠিক কে জানে।

ভুটানে আসার আগে তাক্তসাং নিয়ে যত ভিডিও আছে ইউটিউবে তার সবই বলতে গেলে দেখে ফেলেছিলাম। তখন থেকেই ইচ্ছা অন্য সবার মতো টাইগার্স নেস্ট পিছনে রেখে অন্য সবার মতো ছবি তুলব। ছবি তোলার জন্য ছোট একটা জায়গা আছে, যেখানে ভালো ভিউ পাওয়া যায়। সেখানে দেখি এক ইন্ডিয়ান জামাই বৌ ছবি তুলতে ব্যস্ত। এই যে মহিলা ছবি তোলা শুরু করসে তো করসে, থামাথামি নাই। ডাইনে ,বায়ে, উপর,নীচ কাইত চিত, যত ভাবে ছবিতোলা সম্ভব।

এক পর্যায়ে জামাই বেচারা আমাদের দিকে তাকায় বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, ও আসলে একটু বেশি ছবি তুলে, হে হে’। আমরা বললাম , না না ব্যাপার না, তুলতে থাকেন। এদিকে আরও কিছু লোক এসে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে চলে গেছে। শেষে মহিলার একটু দয়া হল, আমাদের জায়গা দিল ছবি তোলার জন্য। আমরা ছবি তোলা শেষ করে সামনে এগুতে এগুতে দেখি ঐ মহিলা আবার ছবি তোলা শুরু করসে। বেচারা জামাইয়ের জন্য আমার খুব মায়া হল।

টাইগার্স নেস্ট জায়গাটার কাছে আসলেই কেমন জানি শান্তি শান্তি অনুভব হতে থাকে। এখানে আসলেই স্পিরিচুয়াল কোন ব্যাপার আছে কিনা কে জানে। পরিবেশ টা অনেক নীরব। অনেকেই আছে, কিন্তু কেও উচুস্বরে কথা বলছে না যাতে মন্দিরের অসম্মান করা হয়। সাব্বির ভাই সেখানে আরেকটা কুকুর পেয়ে তাকে কোলে নিয়ে ঘুরতে থাকলেন।

পরে মন্দিরের ভিতর ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এই মন্দিরের আসল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর অবস্থান। খাড়া ৯০ ডিগ্রী উঠে যাওয়া একটা পাহাড়ের ক্লিফের ঠিক পাশেই তৈরি। এই খাড়া পাহাড়ের আরও অনেকখানি উপর ছোট ছোট কয়েকটা মন্দির দেখলাম। সেখানে কিভাবে যায় বুঝে পেলাম না। মন্দিরের ভিতরে কোন ক্যামেরা বা ইলেক্ট্রনিক্স জিনিস নিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ, তাই ভিতরের কোন ছবি তোলা হয় নাই।

ভুটানের বিভিন্ন জায়গায় ( আসলে শুধু ভুটান না, পুরো হিমালয় রিজিওনে ) কিছু গোল সিলিন্ডার টাইপের জিনিস দেখা যায়। এইটাকে তারা বলে প্রেয়ার হুইল । এই সিলিন্ডারের বাহিরে সংস্কৃত ভাষায় ‘ওমানি পাদমে হাম’ নামে এক মন্ত্র লেখা থাকে। তবে অনেক সময় অন্য মন্ত্রও লেখা থাকে। সিলিন্ডারের অক্ষ হিসেবে যেটা থাকে, তাকে তারা বলে ‘লাইফ ট্রি’, যার উপরে আবার আর হাজারটা মন্ত্র লিখে পেঁচানো থাকে। তিব্বতিয়ান বুদ্ধিস্টরা বিশ্বাস করে এই হুইল ঘুরালে, এই মন্ত্র মুখে পাঠ করলে যে সোয়াব পাওয়া যাবে, ঘুরাইলেও একই পরিমাণ সোয়াব পাওয়া যাবে। সত্যি কিনা জানি না, তবে জিনিস গুলা ঘুরাতে মজাই লাগে। তাই টাইগার্স নেস্ট এর ভিতরে যখন এইরকম কয়েকটা দেখলাম, সাথে সাথে এক পুলিশ দৌড়ায় আসলো। ভয় পেয়ে গেলাম, না জানি কি না কি করে ফেলসি। পরে বুঝাইল যে এই গুলা শুধু মাত্র ক্লকওয়াইজ ঘুরানোর নিয়ম। আমার জানা ছিল না, তাই দুই দিকেই ঘুরাচ্ছিলাম। অন্য ধর্মের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধা দেখানো উচিত, তাই সরি বলে চলে আসলাম।

সেখানে আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু খিদেয় পেট চো চো করছে, তাই না চাইলেও ফেরার পথ ধরতে হল। পথে একটা রেস্টুরেন্ট পরে, সেখানে ৫০০ গুলট্রাম দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে ভেজ বুফে খেলাম। খাবারের মেন্যু দেখে, সাব্বির ভাই আরেকটা বোতল নিয়ে বসে পড়লেন।
পারো ফিরে আমরা থিম্পুর ট্যাক্সি ধরলাম। সকালে যে ড্রাইভার আমাদের টাইগার্স নেস্ট পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল, তার ফোন নাম্বার রাখা ছিল আমাদের কাছে। ফোন দিলে সে আমাদের এসে নিয়ে যায়। ফেরার পথে সাব্বির ভাই এর সাথে প্রেম ঘেলে নামে এক লোকের পরিচয় হয়ে যায়। সাব্বির ভাই তার রুপে প্রেম ভাই কে এতই দিওয়ানা করেছিল যে, এই এতদিন পর এখনো এই লোক সাব্বির ভাই কে কল দিয়ে যায়। সে কল ধরেনা দেখে মন খারাপ করে, বলে যে লাগলে সে প্লেনের টিকেট করে দিবে, তাও যাতে ভাই যেয়ে তাকে দেখে আসে। আহারে বেচারা।

পারো থেকে থিম্পু যাবার পুরো রাস্তাতেই অসাধারণ, পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একে বেকে চলে গেছে। একটু পর পরই হেয়ারপিন টার্ন, এতো টার্ন নেবার কারনে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল। আর সারাদিনের হাটা হাটিতে আমি আর সাব্বির ভাই দুইজনই ক্লান্ত। তাই পাহাড়ের ভিউ অ আমাদের ঘুমানো থেকে আটকে রাখতে পারল না। প্রায় সন্ধে নাগাদ আমরা থিম্পু পৌঁছে যাই।

থিম্পু থেকে পুনাখা

থিম্পু তে ট্যাক্সি থেকে নেমে আমরা বাংলা স্টাইলে রাস্তা পার হওয়া শুরু করলাম। সাথে সাথে বাঁশি মারতে মারতে এক পুলিশ দৌড়ায় আসল। বলল আমরা যাতে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হই। শুনে পুরা টাস্কি খেয়ে গেলাম। কারণ রাস্তা মুটামুটি খালি। আর জেব্রা ক্রসিং নামে এক জিনিস ছোট বেলায় বইতে পড়েছিলাম, এইটা যে আদৌ দুনিয়াতে আছে এবং মানুষ ব্যাবহার করে, তা তো আগে বুঝি নাই। পরে দেখলাম, রাস্তা যতই খালি থাকুক, আর আশে পাশে পুলিশ থাকুক বা না থাকুক, কেউ জেব্রা ক্রসিং ছাড়া রাস্তা পার হয় না। দেখে জাতিটার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। আর লাগল আফসোস। আমি জানি না দুনিয়ার আর কোন দেশে কেউ আমাদের মতো কেয়ারলেসলি রাস্তা পার হয় কিনা।

কিছুক্ষণ হেটে একটা জুতসই হোটেল খুঁজে বের করে আমি ধাপ করে শুয়ে পড়লাম। আজ এমনিতেই সারাদিনের ট্রেকিং আর জার্নিতে শরীর অনেক ক্লান্ত। সাব্বির ভাই বের হয়ে গেল আশে পাশে ঘুরে দেখতে, আর ডলার ভাঙ্গানো যায় কিনা তার খোজ নিতে।

কিছুক্ষণ পর দেখি সাব্বির ভাই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে বললেন যে যাতে তাকে আট হাজার টাকা দেই। ট্যুরের আনঅফিসিয়াল ম্যানেজার হিসেবে আমি কাজ করছিলাম, তাই সব টাকা আমার কাছে ছিল। উনি নাকি কোথায় অরিজিনাল চামড়ার একটা জ্যাকেট দেখে আসছে, যেইটা দেশে জীবনেও পাওয়া যাবে না, সেটা কিনতে চায়। আর বললেন দরকার হলে দেশে ফিরে রিক্সা টেনে হলেও আমার টাকা এক মাসের মধ্যে শোধ করে দিবেন। এরপর তো আর না দিয়ে পারা যায় না, দিয়ে দিলাম। সাথে এক হাজার টাকা বেশি দিলাম ইমার্জেন্সির জন্য। তো উনি আট হাজার টাকায় এক জ্যাকেট আর সাথে এক হাজার টাকায় এক মানিব্যাগ কিনে এনে দাঁত কেলায় হাসতে থাকলেন। আর বলতে লাগলেন, ‘ভাই, চিন্তা কইরেন না, দেশে ফিরে রিক্সা ……’।

পরের দিনের প্ল্যান নিয়ে আমরা দুইজনই খুব এক্সাইটেড। থিম্পু থেকে রয়েল এনফিল্ড ভাড়া নিয়ে পুনাখা যাব। গুগল করে একটা সার্ভিস পেয়েছিলাম যারা বাইক ভাড়া দেয়, ‘Bhutan Tusk Motorcycle’। তাদের ফোন দিলাম, কিন্তু কেও ধরেনা। ভাবলাম সাপ্তাহিক ছুটি দেখে হয়ত অফিসে কেও নাই।

পরদিন সকালে গাট্টি বোসকা প্যাক করে চলে গেলাম থিম্পু ইমিগ্রেশন অফিসে। সেখান থেকে পুনাখা যাবার পারমিট নিতে হবে। যেয়ে পরলাম বিপদে, পাসপোর্টের ফটোকপি চায়। ফটোকপি ত নাই। এতো সকালে কোন দোকানও খুলে নাই যে করায় নিব। একদম সেম বিপদে পড়েছিলাম লাস্ট ইন্ডিয়া ট্যুরে, রন অফ কাচ এ যেয়ে। ভুটানে ধরা খেয়েও আমার শিক্ষা হয় নাই। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা, যে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম সেবার।

ঠিক হল সাব্বির ভাই অপেক্ষা করবেন অথবা খুঁজাখুঁজি করবেন আশেপাশে, ফটোকপি করার জন্য, আর আমি যাব বাইক ঠিক করতে। আজকে সকালে যেয়ে বিকালে চলে আসার প্ল্যান, তাই দেরি করা যাবে না। গুগল ম্যাপ এর দেখানো পথ ধরে হাটতে থাকলাম। এবার আর জেব্রা ক্রসিং ভুল করলাম না।

বাইক রেন্টালের অফিস দেখলাম একটা শপিং সেন্টারের ভেতরে। সকাল দেখে সেটাও বন্ধ। আশে পাশে কোন বাইকও দেখলাম না। সন্দেহ হতে লাগলো ঠিক জায়গায় এসেছি কিনা। এবার তাদের নাম্বারে কল দেয়ার পর একজন ধরল আর বলল যে বিল্ডিং এর পেছনে চলে আসতে।
সেখানে আমার খান্দু’র সাথে প্রথম দেখা। সেই এই বাইক রেন্টাল চালায়। জানলাম যে তারা একদিনের জন্য বাইক ভাড়া দেয় না, আর সাধারণত গ্রুপে ভাড়া দেয়। আমাদের মতো সিঙ্গেল বাইক কেও নেয় না। ভয় হতে লাগল, এতো আশা করে এসে শেষে না আবার ট্যাক্সিতেই যাওয়া লাগে। আমার চেহারা দেখে তার মনে হয় মায়া হল। বলল যে চলেন, কখনো কাওকে এইভাবে দেই না, তাও পাশের দেশ থেকে আসছেন, আর এখন বাইক ট্যুরের সিজনও না। বাইক গুলো পরেই আছে, তাই দিলাম। আমি নাকি গত তিন মাসে প্রথম কাস্টমার।

সে বাইক রাখে থিম্পু শহর থেকে একটু বাইরে, তার বাসার সামনে। তার গাড়িতে উঠতে বলল, সে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে সাব্বির ভাই পারমিট রেডি করে ফেলেছে, তাকে ফোন দিয়ে বললাম, আমাদের হোটেলের সামনে যেয়ে দাড়াতে, বাইক আসতেছে।

গাড়ি যেখানে যেয়ে থামল, সেখানে দেখলাম কতগুলো বাইক ঢেকে রাখা, ধুলার আস্তরণ পরে আছে কাভারের উপর। মন খারাপ হয়ে গেল, ভাবলাম পুরাতন একটা বাইক বের করে দিবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে কাভারের নীচ থেকে বের হল, ২০১৫ মডেলের থান্ডারবার্ড ৫০০। ৫০০ সিসির বাইক। কন্ডিশনও অনেক ভালো। ঢাকায় চালাই ১০০ সিসির চাইনিজ বাইক, প্রথমবারের মতো পাঁচশ সিসির বাইক চালাবো ভেবে উত্তেজনায় লাফাতে লাগলাম। বাইক ঝেরেমুছে পরিষ্কার করা হল। আমি বললাম যে ৫ মিনিট একটু টেস্ট রাইড করতে চাই। বাইক অনেক ভারী, প্রথম ২ মিনিট চালাতে অনেক সমস্যা হলো। কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। তারপর খান্দুর গাড়ির পিছন পিছন রওয়ানা দিলাম হোটেলের উদ্দেশ্য, কারণ ডলার সব সাব্বির ভাই এর কাছে।

বাইক নিয়ে যখন থিম্পু শহরে ঢুকছিলাম, নিজের মাঝে একটা গ্যাংস্টার ফিলিংস কাজ করছিল। আর ইঞ্জিনের সাউন্ডের কথা নাই বলি। সাউন্ড দিয়েই সবাইকে জানান দিয়ে দেয় যে আমি আসতেছি। রাস্তায় অনেকেই তাকায় থাকে বাইক দেখার জন্য, ফিলিংস ই আলাদা। বাইকের ভাড়ার টাকা পয়সা আর গাড়ির কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের বাইক রাইড।

বাইক দেবার সময় খান্দু সাহেব বলে দিয়েছিল যে জেব্রাক্রসিং দেখলেই যাতে বাইক স্লো করি, কেও থাকুক বা না থাকুক। আর আমাদের এখানে, মানুষ তো দূরে থাক, হাতি ঘোড়া দেখলেও তো মনে হয় না কেও গাড়ি স্লো করে। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন শীতকাল শুরু হবে হবে করছে। রাস্তায় রাতের বেলায় বরফ জমে থাকে। আর যাবার সময় আমাদের ‘দচু লা’ নামে একটা পাস পার হয়ে যেতে হবে। খান্দু বলে দিল যে পাসের আশে পাশে বরফ থাকতে পারে রাস্তায়, বরফ দেখলে যাতে স্লো করে দেই, তা নাহলে ঢালু রাস্তায় নামার সময় চাকা স্লিপ করতে পারে। আমি বললাম তথাস্তু।

সে আমাদের বাইক তো ঠিকই দিয়া দিল, কিন্তু কোন তালা দিল না। আমি জিজ্ঞাস করলাম, তালা কই? বাইক রেখে দূরে গেলে কিভাবে যাব। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলে, যেখানে মনে চায় বাইক রাইখা চলে যাইতে, কেও নাকি নিবেনা। আমি ভাবলাম আজিব দেশ, কেও মনে হয় জানেও না যে চাইলে সে আরেকজনের জিনিস না বলে নিয়ে চলে যাইতে পারে (যেমন গুজরাটে বাসে একজন আমার ডিএসএলার তার মনে করে নিয়েচলে গিয়েছিল) ।

সাব্বির ভাইকে বানানো হল নেভিগেটর কাম ক্যামেরাম্যান, উনি পিছনে বসে ম্যাপ দেখে দেখে আমাকে রাস্তা বলে দিবেন। সাথে সেলফি স্টিকে লাগানো গো প্রো দিয়ে ভিডিও করবেন। থিম্পু শহর থেকে বের হয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে উপরে উঠতে থাকলাম।

এরকম সুন্দর টেরাইনে বাইক নিয়ে ট্রিপ দেয়ার ফিলিংস আসলে লিখে প্রকাশ করার সম্ভব না। আকাশ ছিল পরিষ্কার, আর ঝক ঝকে রোদ। তাই অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এই রোদও শীতের তীব্রতা কমাতে পারছিল না। তাই হাতে মোটা গ্লাভস থাকার পরেও ঠাণ্ডায় হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিল।

এদিকে, টাইগার্স নেস্ট এ সাব্বির ভাই কুকুর নিয়ে নাচানাচি করার এক পর্যায় তার গ্লাভসে কুকুর ইয়ে করে দেয়। তাই অই গ্লাভস ফেলে দিয়ে এক হাতে গ্লাভস পরে বসে আছেন। আরক হাত খোলা। তার গায়ে গতকাল রাতে কিনা আট হাজার টাকার জ্যাকেট।

ঐ জ্যাকেট পরে পার্ট নিয়ে ছবি তোলা যায়, কিন্তু কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে বাইক রাইড দেয়া যায় না। ফলশ্রুতিতে উনি ঠাণ্ডায় কাপতে থাকলেন। ঘন্টাখানেক পরে পোঁছে যাই দচুলা। আমাদের রুটের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা। সেখান থেকে ইস্টার্ন হিমালয়া রিজিওনের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।

দচুলায় যেয়ে কথা হল এক বাঙালি পরিবারের সাথে। তারা পুরো একটা মাইক্রো ভাড়া করে চলে এসেছে। ইন্ডিয়ান দের ভুটানে ঢুকতে কোন পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন হয় না। জানলাম তারা বাচ্চা কাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্র চার পাঁচ দিনের জন্য ঘুরতে বের হয়ে যায়। অনেকে বাচ্চা কাচ্চা হলে ঘুরাঘুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাদের জন্য এই পরিবার একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে।

দচুলার পরে অনেকটা রাস্তা ভাঙ্গা, আসলে রাস্তার কাজ চলছে। মাঝে মাঝে এই ভাঙ্গা রাস্তা গুলো ছাড়া বাকি অংশ রাস্তা অনেক ভালো। তাদের এই রাস্তা রেগুলার মেইনটেইন করতে হয়। কারণ এই রাস্তায় ফ্রিকোয়েন্টলি পাহাড় ধস হয়। যাবার সময় দেখছিলাম পাশের পাহাড় থেকে বিশাল বড় বড় পাথর বা মাটির দলা এসে পড়ে আছে। এজন্য রাস্তার একদম কিনার দিয়ে চলানো ও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ যেকোনো সময় কিনার ধসে পরে যেতে পারে।
কিছু যায়গায় এইরকম রাস্তা ভেঙে পড়ে গেছে দেখলাম, সেখানে পাথর দিয়ে মার্ক করে দেয়া, অনেক যায়াগায় চক দিয়ে মার্ক করা থাকে যাতে কেও অদিকে না যায়।একটা বিশাল কন্সট্রাকশন ভেহিকেল দেখলাম, তার পিছনে লেখা – ‘Hell was full, so I came back’।

একটু পর পর রাস্তায় একশ আশি ডিগ্রী বাক। বাইকের গিয়ার ৩ থেকে ৪ এ তুলতে না তুলতেই নামায় দিতে হয়। আর এতো ভারী বাইক মোড় নেয়ার সময় অনেকটা হেলে যেতে হয়। এইরকমই এক মোড় নেয়ার সময় খেয়াল করলাম বাইক হেলানো যাচ্ছে না, তাই মোড় ও নেয়া যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি ব্রেক ধরলাম। দেখি পিছনে আমার ফটোগ্রাফার হাতে ক্যমেরা নিয়ে, আমি যেদিকে মোড় নিব তার উলটা দিকে কাত হয়ে, পারলে চাকার নীচে যেয়ে ভিডিও করতেছেন।

ভুটানিজ দের আরেকটা জিনিস আমার ভালো লাগল, তাদের ট্রাফিক রুল মেনে চলা। প্রায় নব্বই কিলো ড্রাইভ করলাম, দুই মিনিট পর পরই বাক নেয়া লাগছিল, কিন্তু একটা বারো হর্ন দেয়া লাগে নাই। কারণ অপর পাশ থেকে যে গাড়ি আসে সে কখনই তার লেনের বাইরে যায় না। আর আমি ঢাকা থেকে সাজেক যখন বাইক নিয়ে গিয়েছিলাম, হর্ন দিতে দিতে আমার বাইকের ব্যাটারি ডাউন হয়ে গিয়েছিল।

শুধু তাই না, আমি যদি অন্য কোন ট্রাক বা গাড়িকে অভারটেক করার চেষ্টা করিয়ার উলটা পাশ থেকে কোন গাড়ি আস্তে থাকে, তখন যাকে ওভারটেক করতে চাচ্ছি সে সিগনাল দিয়ে বলে দেয় ওভারটেক না করতে।

পুনাখা
পুনাখা তে আমার আমার দেখার ইচ্ছা তাদের সাসপেনশন ব্রিজ।পুনাখাতে নদীর উপর, এ পার থেকে ওপার পর্যন্ত কেবল দিয়ে ঝুলন্ত এক ব্রিজ। পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে দেখা গেল নদীটা। পানির কালার দেখে অবাক হয়ে গেলাম। ঠিক নীল ও না, আবার সবুজ ও না, মাঝামাঝি একটা কালার। আর কাচের মতো স্বচ্ছ পানি। এই নদীর ধার ঘেঁষে মিনিট দশেক পর আমরা পৌঁছলাম ব্রিজের পাশে।

জায়গাটা এতো নীরব আর সুন্দর, যে আমার মন উদাস হয়ে গেল। এখানে একা একা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেয়া যায়। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকার উপায় নেই, সূর্য ডুবার আগেই থিম্পু পৌছাতে হবে। অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভ করতে চাই না।

দুপুরে খেতে যেয়ে দেখি কোন রেস্টুরেন্ট নাই। অনেক খুঁজা খুঁজি করে একটা পেলাম। সাব্বির ভাই যথারীতি লাল পানীয় দামাদামি করতে লাগলেন। দোকানে একটা পিচ্চি, সে দেখি ভাই কে সাজেস্ট করতেসে, যে এইটা না, ওইটা খান। এইটার এই সুবিধা। আমাদের দেশে এই কাজ হলে তো সবাই হা রে রে করে তেড়ে আসত, যে ছেলে নষ্ট হয়ে গ্যাসে। ভুটানে জিনিসটা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের এখানে যেমন কোক বিক্রি হয় সব দোকানে, তাদের ওখানে বিয়ার। যে ঠাণ্ডা পড়ে শীতকালে, বিয়ার ছাড়া উপায় নাই।

বিল দেয়ার সময় দেখি এক প্লেট ভাত ৬০ রুপি আর মুরগি ২০ রুপি। আমি আর সাব্বির ভাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলাম। ভুল করে এই দাম লিখসে, নাকি অন্য কিছু লিখসে আমরা ভুল করে এই দাম পড়ছি বুঝতে পারলাম না। পরে জানলাম এই পাহাড়ি এলাকায় ধান চাষ করা অনেক কঠিন, তাই উৎপাদন খরচও বেশি, তাই দামের এই বৈষম্য।

বিকাল হয়ে আসছে, তাই তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিলাম থিম্পুর উদ্দেশ্যে। সূর্য ফুল তেজে থাকা অবস্থাতেই ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলাম, এখন তো বিকাল, ঠাণ্ডায় দাঁত কপাটি বাড়ি লাগতে থাকল। আর আমার পিছনে একতা হাতমোজা পড়া সাব্বির ভাই তার হাত গরম রাখার জন্য, হাত কোথায় ঢুকায় রাখল তা আর নাই বা বললাম।

তাড়াতাড়ি যাবার জন্য বাইক পাহাড়ি রাস্তায় আশি নব্বই তে টানতে লাগলাম। দচুলা পাস পর্যন্ত পোছাতে পৌছাতে মনে হল যে অনন্ত কাল লেগে গেল। ততক্ষণে আমার হাত শেষ। কেও কেটে ফেললেও বোধহয় টের পেতাম না। আমি যে ক্লাচ, ব্রেক ধরব, হাতে কিছু টের পাই না। বাম হাতে চাপ মারার মত চেষ্টা করি, বাইকের ইঞ্জিনের সাউন্ড শুনে বুঝি যে ক্লাচে চাপ পড়সে। আট হাজার টাকার জ্যাকেট সাব্বির ভাই কে এখানে ভালোমতোই ধোঁকা দিল। উনি কাপতে থাকলেন। কাপতে কাপতে মনে হল যেন অনন্তকাল পর আমরা দূরে থিম্পু শহরের আলো দেখতে পেলাম।

খান্দু সাহেবের বলা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সাব্বির ভাই এর হাত ততক্ষণে স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে। ওনার তখন শখ হল বাইকে বসে একটু ঠেলা ঠেলি করবে। তো বসার পর বাইকের ভারের কারণে আর বাইক সোজা করতে পারেন না। দিনে ১০০ টা বুকডন মেরে তার কি লাভ হল বুঝলাম না।

খান্দু সাহেবের পিছনে যেয়ে গাড়ি ফেরত দিয়ে আসলাম। অবাক হলাম যে সে একবার চেক ও করল না যে বাইকের সব ঠিক ঠাক আছে কিনা, জাস্ট নিয়ে গ্যেরেজে রেখে দিল। তারপর বল্যে গাড়িতে উঠতে, সে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিবে। ড্রাইভিং সিটের পাশে ছিল তার বৌ, নাম মনে নাই। সে সরকারি চাকরি করে, ভুটান এর নদী মন্ত্রণালয়ে। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি যে আপনাদের বিসিএস এ কি প্রশ্ন করে ? ।

থিম্পু তে বুদ্ধ পয়েন্ট নাম এ সুন্দর একটা মন্দির আছে, যেটা শহরের পাশেই একটা পাহাড়ের একদম উপরে। প্লেন ছিল যে সন্ধ্যার আগে চলে এসে বুদ্ধ পয়েন্ট যাব। কিন্তু আসতে আসতে রাত হয়ে গেল, আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, তাই আর যাওয়া হলো না। কালকেই চলে যেতে হবে, তাই থিম্পু শহরটা ঠিক মতো দেখা হবে না ভেবে মন খারাপ হচ্ছিল।

গাড়ি যেতে যেতে খান্দূ ভাই এর সাথে গল্প হচ্ছিল, উনি শুনালেন যৌবনকালে কিভাবে উনি দুনিয়ার সব যায়গায় বাইক নিয়ে রাইড দিয়ে বেড়িয়েছেন। এরপর শুরু করেছেন এর বাইক হায়ারের ব্যবসা, যেটা তার কাছে ব্যবসার চেয়ে শখ বেশি। তার বিভিন্ন বাইক রাইডের কাহিনী শুনলাম।

একটু পর একতা রাস্তা দেখিয়ে বললেন যে, এদিক দিয়ে গেলে বুদ্ধ পয়েন্ট যাওয়া যায়। আমরা গিয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করল। যাইনি শুনে বলল যে, যেতে চাই কিনা, তাহলে সে নিয়ে যাবে। যাওয়ার ইচ্ছা তো আছে ষোলআনা, কিন্তু তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করল না। তার উপর তার সাথে তার বৌ ও আছে। কিন্তু সে এসব শুনে বলল, আরে ধুর, চল নিয়ে যাই, এইগুলা কোন সমস্যাই নাই। তখন থেকে আমার আর সাব্বির ভাই এর অবাক হওয়ার পালা শুরু।

খাড়া পাহাড় বেয়ে অনেকটা উপরে উঠে যেতে হয়ে বুদ্ধ পয়েন্ট যাবার জন্য। রাতে গিয়েছিলাম, দেখি আশে পাশে কেও নাই, শুধ আমরা। খান্দু বলল যতক্ষণ মনে চায় থাকতে কোন সমস্যা নাই। থাকব কি, ঠাণ্ডায় হাত পা বরফ হয়ে যাবার যোগার। তার উপর পাহাড়ের টপে হবার কারণে প্রচণ্ড বাতাস। সেখান থেকে পুরো থিম্পু শহরের একটা প্যনারোমিক ভিউ পাওয়া যায়। ঠাণ্ডায় কোন এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়ানো দায়, শরীর গরম রাখার জন্য দুইজন তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছি।

এর মাঝে হটাত দুই জন আমাদের স্থানীয় ভাষায় কিছু বলতে লাগল।তারা কিছু একটা বলে, আমি ইংলিশ এ বলি হোয়াট, হিন্দি তে বলি ক্যায়া। কিন্তু সে ইংলিশ আর হিন্দি কিছু বুঝল বলে মনে হল না। তার ভাষায় কিছু একটা বলে যাচ্ছে। অনেক ইশারা ইঙ্গিত দেয়ার পর বুঝলাম যে রাতে এখানে গাড়ি রাখা যাবে না। আমরা এমনিতেও তখন চলে যেতাম। তাদের বললাম যে সমস্যা নাই, এখনি চলে যাচ্ছি।

খান্দু ভাই যখন শুনল যে থিম্পু কিছুই ঘুরি নাই, আর না ঘুরেই কাল চলে যাচ্ছি, বলল যে সেই আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে। আমি আর সাব্বির ভাই একজন আরেকজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলাম, যে পরে যদি টাকা চাইয়া বসে। আমাদের মনে হয় খান্দু আমাদের মনের কথা বুঝতে পারল, সে বলল চাপ নেয়ার কিছু নাই। এইটা ফ্রি রাইড, তার আমাদের ভালো লাগসে, তাই সে আমাদের নিয়া ঘুরতে বাইর হইসে। অনেক লজ্জা পেলাম শুনে। আসলে এমন এক পরিবেশে থাকি, মন মানসিকতা অটোমেটিক নিচু হয়ে গেছে।

খান্দু আমাদের পুরো ভুটান শহরের চারিদিক দিয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে ট্যুর দিয়ে বেড়াল। মাঝে একবার গাড়ি এমন এক যায়গায় দার করাল যেখান থেকে পুরো থিম্পু শহর দেখা যায়। আমাদের জিজ্ঞেস করল, বল তো রাজার বাড়ি কোনটা? একটা বড় বাড়ি দেখা যাচ্ছিল যাতে অনেক লাইটিং করা। স্বাভাবিক ভাবেই বললাম যে ঐটা। আসলে ঐ বাড়ির পাশে একটা অন্ধকার মতন যায়গা আছে, সেটা হল রাজার বাড়ি। তাদের রাজা জাঁকজমক পছন্দ করে না। সাদাসিধে জীবন যাপন করে। এখন আর এসব শুনে অবাক হই না। বুঝে গেছি যে এই দেশের সব লোকই এমন, একটু বেশি ভালো।

তারপর সে আমাদের নিয়ে গেল ‘Walking Buddha’ দেখাতে। একটা পার্কে ৪৫ ফিট উঁচু বুদ্ধের মূর্তি। ২০১২ সালে এইটা স্থাপন করা হয় থাইল্যান্ড এর রাজার জন্মদিন উপলক্ষে। থাইল্যান্ড এর রাজার জন্মদিনের জন্য ভুটানে কেন মূর্তি বসাবে, আর সেইটারে ‘হাটা বুদ্ধ’ কেন বলবে মাথায় ঢুকল না।আরও কয়েকটা যায়গা ঘুরে দেখানোর পর তাকে আমাদের সাথে খাবার জন্য অনুরোধ করলাম। বাসায় বাচ্চারা আছে বলে ভদ্র ভাবে না করে দিল। তবে বলল ঢাকায় যদি কখনো আসে, তখন অবশ্যই এই খাওয়া আদায় করে নিবে। সে নাকি আগেও একবার ঢাকা এসেছিল। তখন খুব পেইন খেয়ে গেসে। আমি ভাবলাম যে নিশ্চয়ই জ্যামের কারণে। আসল কারণ অন্য, সে ঢাকায় এসে কোথাও বিয়ার খুঁজে পায় না। যারা সকাল বিকাল ভাতের সাথে বিয়ার খায়, তাদের জন্য ব্যাপারটা তো কষ্টের বটেই।

খান্দুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলাম। তার একটা কথা খুব ভালো লেগেছিল, ‘আমার কাছে সবাই আসে কাস্টমার হিসাবে, ফিরে যায় ভাই হিসাবে’। আসলেই তাই, তার সাথে এখনো যোগাযোগ আছে। আমার নেক্সট ইন্ডিয়া ট্যুরের ব্যাপারে সে অনেক সাহায্যও করছে।

পরের দিন সকালে আমরা থিম্পু থেকে পারো চলে যাই, আমাদের প্লেন ছিল দুপুরে। এইদিন আর কিছু করা হয় নাই। সকাল বেলাতেও খান্দু ফোন দিয়ে খোজ নিল যে আমরা ঠিক ঠাক মতো এয়ারপোর্ট গিয়েছি কিনা। ভুটানে এসেছিলাম পাহাড় দেখতে, কিন্তু প্রকৃতির চেয়েও বেশি সুন্দর এই দেশের মানুষের মন। গুটিবাজি বলে কিছু যে আছে তা বোধহয় এই এলাকার লোকজন জানেই না। ট্যাক্সি তে বসে ফেরার পথে মাথায় শুধু এগুলোই ঘুরছিল । শুধু মাত্র ভুটানের মানুষ গুলোর সাথে পরিচিত হবার জন্যে হলেও একবার ভুটান আসা উচিত। সৌজন্যে : আলমআশরাফুল.কম