Home » বাছাইকৃত » আরব বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহরে যত ভয়

আরব বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহরে যত ভয়

:: আবু এন এম ওয়াহিদ ::
আমি ২০০৬ সালে গিয়েছিলাম তিউনিসিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অব টিউনিস-এলমানার’-এ। সেবার তিউনিস থেকে ফেরার পথে আমার বৈরুত হয়ে আসার কথা ছিল, কিন্তু কেন সেটা হয়ে ওঠেনি, তা এখন আর মনে নেই। দশ বছর পর আবার যখন বৈরুত যাওয়ার সুযোগ এলো তখন ভাবলাম এবার আর কোনোক্রমেই এ মওকা হাতছাড়া করব না। লেবানিজ আমেরিকান উইনিভার্সিটি (এলএইউ) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে; দাওয়াত করেছে দুটো সেমিনার ও একটা খোলা আলোচনার জন্য। তারিখ ঠিক হয়েছে এপ্রিলের ২০, ২০১৬। বৈরুতমুখী যাত্রা হলেও আমার মূল গন্তব্য কিন্তু দুবাই। দু’দিনের কনফারেন্স এপ্রিল ১৭-১৮। রওনা দেবো ১৫ তারিখ। টিকিটও করেছি সেভাবেই, ন্যাশভিল-দুবাই-ন্যাশভিল। দুবাই থেকে বৈরুত যাওয়া-আসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা হয়েছে ‘ফ্লাই দুবাই’ এয়ারলাইন্সের সাথে। যাবো ১৯ তারিখ, দু’রাত থেকে ফিরব ২১ এপ্রিল, দুবাই হয়ে সোজা বাড়ি।

বৈরুত নিয়ে সব সময়ই আমার মনে কৌতূহল ও উত্তেজনার সাথে সাথে একটা শঙ্কা এবং ভীতি কাজ করত। এবার সফরের সময় যত ঘনিয়ে আসতে লাগল, উত্তেজনা যেমন তেমনই রইল, কিন্তু ভীতি যেন আস্তে আস্তে ঘনীভূত হতে থাকল। সফরসূচি চূড়ান্ত করার সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ‘ফ্লাই দুবাই’-এর একটা ফ্লাইট রাশিয়াতে গিয়ে ক্র্যাশ করল। বাষট্টিজন যাত্রীর মধ্যে কেউই বাঁচল না। শুনেই মনটা কেন জানি ছ্যাঁত করে উঠল, ক’দিন পর তো আমাকেও উড়তে হবে ‘ফ্লাই দুবাই’-এ! দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে একদিন রেডিওতে শুনলাম, বৈরুতে এক অস্ট্রেলীয় শিশুকে অপহরণ করা হয়েছে। বুঝতেই পারছেন, আমার মনের অবস্থাটা কেমন। যাবো কি যাবো না, ভাবতে শুরু করেছি, কিন্তু আমার ছেলে ও তার মাকে কিছু বলিনি। আমি জানি, ঘরে এসব আলোচনা হলে এবারো আমার বৈরুত যাওয়া মাঠে মারা যাবে। বড় মেয়ে তো আমার সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েই রেখেছে।

যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, এমন সময় হঠাৎ একদিন ট্রাভেল এজেন্টের ই-মেইল পেলাম। লিখেছে, ‘ফ্লাই দুবাই’-এর বৈরুত ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। আমি সাথে সাথে এলএইউ-কে জানালাম। তারা বলল, ‘‘চিন্তার কোনো কারণ নেই, অপেক্ষা করো, আমরা ‘মিড্ল ইস্ট এয়ারলাইন্স’-এর টিকিট কিনে তোমাকে শিগগির জানাচ্ছি”। কয়েক দিনের মধ্যেই ফ্লাইট কনফার্মেশনসহ আইটিনারি চলে এলো। আমিও মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, যাবো। বাক্সপেটরা গোছানো হয়ে গেছে। যাওয়ার সপ্তাহখানেক আগে ঘটল আরেক ঘটনা। এলএইউ আমার জন্য ১ মিলিয়ন ডলারের ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স কিনে তার কাগজপত্র ই-মেইল মারফত পাঠিয়েছে। ‘ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স’ দেখেই তো আমার হৃৎকম্পন আবার বেড়ে গেল। তার মানে বৈরুত সত্যি সত্যি একটি ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা, যাওয়ার আগে সবাইকে ইন্স্যুরেন্স কিনতে হয়, অর্থাৎ জীবনের নিরাপত্তা নেই!

এমন দোলাচলের মধ্যেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে মন শক্ত করলাম এবং এপ্রিলের ১৫ তারিখ যথারীতি দুবাই-বৈরুতের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। দুবাইয়ের কাজ সেরে ১৯ তারিখ এয়ারপোর্ট গিয়ে যখন বৈরুতগামী মিড্ল ইস্ট এয়ারলাইন্সের (এটা লেবাননের ন্যাশন্যাল ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার) বিমানে উঠলাম, তখন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের রূপমাধুর্য ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম এবং ভাবলাম, এমন সুন্দর সুন্দর মানুষ যে শহরে থাকে, সে শহর মানুষের জন্য কী করে অনিরাপদ হয়? আপাতত স্বস্তির সাথে বসলাম। বিমান আকাশে ডানা মেলার সাথে সাথে জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম দুবাই-উপকূলের কৃত্রিম দ্বীপে বানানো হোটেল আটলান্টিস ও পামজুমায়রা; ওপর থেকে অপরূপ লাগছিল! তারপর শুরু হলো বালুর সাগর পার হওয়ার পালা। ঘণ্টা দুয়েক পর গরম ভাপ ওঠা সুস্বাদু খাবারের গন্ধ ক্যাবিনের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। এমন খুশ্বুতে ক্ষিদে না লাগলেও খেতে ইচ্ছে করে। খাবার আয়োজন চলছে। এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চিকেন অর ফিশ’? প্রশ্ন করলাম, হোয়াট কাইন্ড অব ফিশ? ‘হামুর’ হাসিমুখে বললেন তিনি। সাধারণত সফরে আমি মাছ খাই না, কিন্তু কী মনে করে তখন বলে ফেললাম, লেট মি ট্রাই ফিশ। খেয়ে ভালোই লাগল। ‘হামুর’ অত্যন্ত মজাদার একটি সামুদ্রিক মাছ। আপনারাও কোনো দিন সুযোগ পেলে খেয়ে দেখবেন।

বিস্তীর্ণ মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে এসে যখন বৈরুতে নামলাম তখন দুপুর গড়িয়ে গেলেও বিকেল হয়নি। এরাইভ্যাল এরিয়াতে এসে দেখি এক ভদ্রলোক আমার নাম লেখা এক টুকরো কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে যেতেই তিনি বুঝে গেলেন আমিই তার অতিথি। আমাকে নিয়ে এসে উঠলেন তার গাড়িতে। ভদ্রলোকের বেশভূষা দেখে কেন জানি আমার মনে একটু সন্দেহ জাগল। সঠিক লোক না হলে তিনি আমার নাম জানবেন কী করে? আজ এই ফ্লাইটে আমি আসছি, সেটাই বা বুঝবেন কিভাবে? এসব তো যুক্তির কথা। তাতে কী? ভয়ভীতি কি আর যুক্তি মানে? একটু থিতু হয়ে গাড়িতে বসার পর তার সাথে দু’কথা বলে মনে হলো, তিনি এলএইউর কোনো শিক্ষক নন, ট্যাক্সিওয়ালা তো ননই। তাহলে তিনি কে? ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। আমি কি কোনো কিডন্যাপারের ফাঁদে পা দিলাম? তবে নার্ভাস না হয়ে একটু বুদ্ধি খাটালাম। তাকে বললাম, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি? আমার এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য, যদি তিনি আমার হোটেলের নাম সঠিক বলতে পারেন, তাহলে আমি নিশ্চিত হবো যে, আমার ড্রাইভার এলএইউর পাঠানো ব্যক্তি এবং নিরাপদ। যখন বললেন, ‘কমোডর হোটেল’, তখন স্বস্তি পেলাম, ভয় কেটে গেল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে এককালের প্রাচ্যের ভেনিস, বৈরুতের সৌন্দর্য দেখতে লাগলাম।

এর মধ্যে গাড়ি ভূমধ্যসাগরের পাড় ধরে চলতে শুরু করেছে। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি পামগাছ। কিন্তু বড় করুণ তাদের চাহনি! সব ক’টা গাছের ডাল ও পাতা আধমরা, শুকিয়ে বাদামি রঙ ধরেছে, নিচের দিকে সামান্য একটু সবুজের ছোঁয়া আছে মাত্র। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, গাছগুলোর অবস্থা এমন কেন? তিনি বললেন, ‘বৃষ্টি হচ্ছে না, তাই’। সাগরভরা পানি, অথচ পানিরই অভাবে পানিসংলগ্ন সাগরতীরের গাছগুলো সব মৃত্যুর সাথে লড়ছে। হলে কী হবে, মনে হলো, তবু তারা মানুষের মতো অকৃতজ্ঞ নয়! আধমরা গাছগুলো একাগ্রচিত্তে তাদের প্রভুর নাম জপছে আর বৃষ্টির অপেক্ষায় দিন গুনছে।

একটু পরেই গাড়ি ডান দিকে বাঁক নিয়ে পুরনো বৈরুতের ভেতর ঢুকে পড়ল। চার দিকে জীর্ণশীর্ণ অতি প্রাচীন দালানকোঠা, ঘরবাড়িতে দারিদ্র্যের ছাপ প্রকট, চাপা চাপা রাস্তা, কোনোরকমে একটা গাড়ি চলতে পারে। ময়লা-নোংরা সরু গলি দিয়ে গাড়ি এলোমেলোভাবে ধীরগতিতে চলতে লাগল। দিনের বেলাও অন্ধকার অন্ধকার লাগছে, আর বনের বাঘের আগে মনের বাঘে আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে! ভয়-ভীতি যেন আমাকে ছেড়েও ছাড়ছে না। সাধারণত বাইরে গেলে আমি ড্রাইভারদের সাথে ফটর ফটর অনবরত কথা বলতে থাকি, কিন্তু সেদিন আমার মুখ দিয়ে আর কথা বেরোচ্ছিল না। ভয়ে কাঁপছি এবং আল্লাহ আল্লাহ করছি।

এভাবে ঘুরেফিরে এক সময় গাড়ি এসে থামল হোটেল কমোডরের সামনে। আপতত ভয়ের অবসান হলো। জিনিসপত্র টেনে নিয়ে হোটেলে উঠলাম। বিকেলে খেতে যখন নিচে নামলাম, তখন ফের ভীতি এসে আমাকে তাড়া করতে লাগল। লবিতে দেখলাম লোকজন আছে, কথাবার্তাও বলছে, কিন্তু কেন যেন একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে। তার ওপর আরেকটা বিষয় নজর কাড়ল। যখন চেকইন করি তখন ক্লান্তি এবং তাড়াহুড়োর কারণে খেয়াল করিনি, এবার দেখলাম; দেখে একটু ঘাবড়ালামও বটে! পাঁচ তারকা হোটেল, তার সামনের প্রধান রিভলভিং ডোর বন্ধ। ডান দিকের ছোট দরজা দিয়ে লোকজন ঢুকছে এবং বাঁ দিকেরটা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ডান দিকের দরজার পরেই এয়ারপোর্টের মতো একটি মেটাল ডিটেক্টর গেট, যার ভেতর দিয়ে আমি ঘণ্টাখানেক আগেই পাস করেছি, কিন্তু টের পাইনি। আরো দেখলাম ওই সিকিউরিটি দরজার পাশে একটি টেবিলের ওপরে রাখা কালো মেটাল ডিটেক্টর বাটন। কাছেই স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে একজন সিকিউরিটি গার্ড। ভয়ে ভয়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের হোটেলে ইদানীং কি কোনো অঘটন ঘটেছে? বলল, ‘না, হোটেলে কিছু হয়নি, তবে শহরে এদিক-ওদিক যখন-তখন বোমাবাজি হয়, তাই আমরা সবসময় সাবধান থাকি’। হোটেলে এসেও শান্তি নেই! বুঝলাম বৈরুতের বাকি দিনগুলোও আমাকে এভাবেই কাটাতে হবে।

এবার ভয়কে ঠেলে দিয়ে পেটের ধান্ধায় লাগলাম। খবর নিয়ে দেখলাম হোটেলে দুটো রেস্তোরাঁ আছে, একটা জাপানি আরেকটা লেবানিজ। হিরোশিমা-নাগাসাকির পর জাপানিরা আমেরিকাকে খুব সমীহ করে, কিন্তু বৈরুতের ভয় তাদের কাবু করতে পারেনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুদূর ভূমধ্যসাগরের পাড়ে এসেছে ব্যবসা করতে। জাপানি খেতে ইচ্ছে হলো না, তাই লেবানিজ রেস্তোরাঁয় গেলাম এবং মেন্যু না পড়ে কিচেন কাউন্টারে তৈরি খাবার দেখে দেখে রুম সার্ভিস অর্ডার করে ফিরে এলাম। আধা ঘণ্টার মধ্যে একটি বিশাল ট্রে হাতে করে ওয়েটার এসে রুমে হাজির। তৃপ্তির সাথে খুব মজা করে খেলাম। কতক্ষণ টিভি দেখে ঘুমোতে গেলাম। বালিশে মাথা রাখার সাথে সাথে অন্য ধরনের এক আজব শঙ্কা আমাকে ঘিরে ধরল।

আপনাদের হয়তো মনে আছে, উনিশ শ’ পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতেরই এক হোটেলে ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন। আমার বারবার ভয় হচ্ছিল, আমিও যদি এভাবে ঘুমের মধ্যে মরে পড়ে থাকি, তা হলে কী হবে? নিজের অবুঝ মনকে নিজেই বোঝাতে লাগলাম, সোহরাওয়ার্দী সাহেব একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আমি তো তার ব্যাগ বওয়ারও যোগ্য নই। তিনি বৈরুতে এসে মারা গেছেন বলে আমিও মারা যাবো এটা কি কোনো যুক্তির কথা হতে পারে? অবশেষে মনের ভয় যুক্তির কাছে না হলেও ক্লান্তির কাছে হার মানল। কখন যে কিভাবে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিলাম সেটা টেরই পাইনি। সকালে উঠে দেখলাম ওই সব ভয়টয় উবে গেছে। প্রথম রাত যখন পার করে দিয়েছি, তখন এ যাত্রা আর মরব না।

আগের কথামতো সকাল সাড়ে দশটায় এলএইউর দু’জন শিক্ষক এলেন আমাকে নিয়ে যেতে। আমরা ১৫-২০ মিনিট পথ হেঁটে ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেলাম। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবো, দেখি এক সৈনিক একে-৪৭ কাঁধে নিয়ে বসে আছে। বাইরে যেমনই হোক না কেন, ক্যাম্পাসের ভেতরটা নিরাপদ, ছেলেমেয়েদের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। প্রথমে ডিন ও পরে অর্থনীতি বিভাগের প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। লেবানিজদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের চেহারা দেখে কিংবা নাম শুনে বোঝা যায় না, কে মুসলমান এবং কে খ্রিষ্টান। তাই কাকে সালাম করব আর কাকে গুডমর্নিং বলব সেটা ঠাহর করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। বিভাগীয় প্রধান কথায় কথায় লেবানিজ সিভিল ওয়ারের কথা বললেন। আমি বুঝলাম, তিনি মন খুলে আমার সাথে সব কথা বলতে পারেননি; হয়তো বা আমি মুসলমান বলে। শুধু বললেন, ‘গরম যুদ্ধ শেষ হয়েছে ২৫ বছরেরও ওপরে, এখন ঠাণ্ডা লড়াইয়ের টানাপড়েনে লেবানন একটা ডিসফাংশনাল স্টেট হিসেবে চলছে’। ১৯৭৫ থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে চলছে এ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। মারামারি শেষ হয়েছে, অথচ এখনো বৈরুতের রাস্তাঘাটে এবং দালানকোঠায় দেখা যায় যুদ্ধের জ্বলজ্যান্ত চিহ্ন। মানুষের সাথে কথা বলে বুঝলাম, তাদের হৃদয়ে রয়ে যাওয়া ক্ষত তার চেয়েও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে।

কেমন করে বুঝলাম, এবার শুনুন তার বয়ান। লাঞ্চে যাওয়ার সময় বিভাগীয় প্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মুসলমান-খ্রিষ্টান অনুপাত কত? তার পাশ থেকে আরেকজন জবাব দিলেন, ‘আমরা এ পরিসংখ্যান রাখি না’। এটা শুনে শিক্ষকদের মধ্যে অনুপাত কেমন, তা আমি আর জানতেও চাইনি। লাঞ্চ সেরে এসে বসলাম অন্য এক অধ্যাপকের অফিসে। তার নাম হোসেইন জিটার। ড. জিটারের সাথে কথা হচ্ছিল কাহ্লিল জিবরানকে নিয়ে। দেখলাম তিনি জিবরানের একজন বড় ভক্ত। কথা বলতে বলতে হোসেইন উঠে তার পেছনের দেয়াল থেকে একটা কাঠের ডেকোরেশন পিস নিয়ে এসে আমাকে গিফ্ট করলেন। ওর মধ্যে জিবরানের একটা স্কেচ পোট্রেটসহ আছে জিবরানেরই লেখা একটি আরবি কবিতা। আমাকে কিছু পড়ে শোনালেন। তিনি আমাকে পরদিন জিবরানের গ্রামের বাড়ি, মিউজিয়াম ও তার সমাধিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ডেকোরেশন পিসের সাথে তিনি একজোড়া তসবিহ নামালেন। আমি জানতে চাইলাম, আপনি এগুলো দিয়ে কী করেন? তিনি বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ্, সুবহানাল্লাহ্ পড়ি’। এবার আমি নিশ্চিত হলাম, তিনি মুসলমান।

আমি নামাজ পড়তে চাইলাম, তিনি একটা টাওয়েল বিছিয়ে দিলেন। তারপর মন খুলে আমার সাথে বেশ কিছু কথা বললেন, মনের দুঃখ নামাতে পেরে মনটাকে হালকা করলেন। বললেন, এলএইউতে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ৭০ শতাংশের মতো। প্রতিষ্ঠানটির সমানুপাতিক আয় আসে মুসলমান অভিভাবকদের কাছ থেকে, অথচ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ২০ শতাংশ মুসলমানও নেই। যাওবা আছে, তারা পদে পদে দারুণভাবে বৈষম্যের শিকার। সব রিকোয়ারমেন্ট মিট করার পরও আমার প্রমোশন হয়নি। একমাত্র কারণ, আমি মুসলমান। বুঝলাম, প্রশাসন খ্রিষ্টানদের দখলে। সাধ্যমতো তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম, আপনাদের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা আমারও আছে। ‘Life is not fair, but still it is good!’তা না হলে তো মানবের জন্য দড়ি-কলসি জোগান দেয়াই কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াত।

আলোচনার একপর্যায়ে জিবরান সম্পর্কে তার কাছে আমি একটি প্রশ্ন রাখলাম। মুস্তাফা, ইসলামের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা: এরই আরেক নাম, এ কথা জিবরানের অজানা ছিল না। তারপরও একজন খাঁটি খ্রিষ্টান হয়ে তিনি কেন তার মাস্টার পিস, ‘দি প্রফেট’-এর মূল চরিত্রের নাম আল-মুস্তাফা দিলেন? হোসেইন বললেন, খ্রিষ্টান হলেও জিবরান আমাদের রাসূল সা: প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল এবং ঐতিহাসিকভাবে বিবদমান এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্দেশ্যে তিনি সচেতনভাবে তার মাস্টার পিসের প্রধান ও মূল চরিত্রের নাম দিয়েছেন আল-মুস্তাফা।

তারপর শুরু হলো আমার প্রেজেন্টেশনের পালা। প্রথমটা ছিল শিক্ষকদের জন্য, পরেরটা ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে। আমার সেমিনারে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি বড় অডিটোরিয়াম, প্রায় ভরা ছিল। ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা দেখলাম অনেক বেশি। লেবানিজ মেয়েরা যে এত রূপবতী হয়, তা আমার জানা ছিল না। একজনের চেয়ে আরেকজন সুন্দর একেকটি মেয়ে যেন বাগানের একেকটি প্রস্ফুটিত তাজা গোলাপ। শুধু রূপ নয়, গুণও আছে তাদের। বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করেছে আমাকে। আমেরিকার অর্থনীতি ও নির্বাচন বিষয়ে যা যা জানতে চেয়েছে, তাতে মনে হলো তারা দিন-দুনিয়ার খোঁজখবরও রাখে এবং ভালোই রাখে।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানাদি শেষে সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবার ফিরে আসার পালা। বিকেল পাঁচটার সময় দু’জন শিক্ষক আমাকে গাড়িতে করে হোটেলে নামিয়ে দিলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, আটটায় এসে ডিনারে নিয়ে যাবেন। ডিনারে কোথায় গেলাম, কী খেলাম, কী আড্ডা মারলাম? তারপর রাতের বৈরুতে হেঁটে ও গাড়িতে করে কী কী দেখলাম, কী বুঝলাম, কী ভাবলাম, সেসব নিয়ে আরেকটা পিস লেখার ইচ্ছে আছে। লিখতে পারলে অবশ্যই আপনাদের সাথে শেয়ার করব। আজকের মতো এখানেই ইতি।
অধ্যাপক : টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর: জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ। সৌজন্যে: অন্যদিগন্ত