Home » ফিচার » বগুড়ার মহাস্থানগড় খননে মিলেছে ১২শ’ বছর আগের নিদর্শন

বগুড়ার মহাস্থানগড় খননে মিলেছে ১২শ’ বছর আগের নিদর্শন

:: আবুল কালাম আজাদ ::
বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রায় ১২০০ বছর আগের নির্মাণ করা বাড়ি-ঘর, পানির কুয়া, খাদ্যশস্য মজুদ রাখার তৈজসপত্র, পোড়া মাটির ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি মহাস্থানগড়ের জাহাজঘাটা এলাকার একটি স্থানে ও বৈরাগীর ভিটা এলাকার দুটি স্থানে দেড়মাস খনন করার পর পাল সাম্রাজ্যের সময়কালের মন্দির সাদৃশ্য, পোড়া মাটির ফলক, পানি পানের কুপ, ঘর আকৃতির অবকাঠামো পাওয়া গেছে।

খননে বের হয়ে আসা এই অবকাঠামোগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য।

বগুড়ার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাস্থানগড় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে খনন করা হয়েছে। খননের বিভিন্ন পর্যায়ে এখানে বেরিয়ে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রত্ননিদর্শন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স সরকার যৌথভাবে খনন কাজ পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন কাজ পরিচালনা করছে। এবারও গড়ের জাহাজঘাটা ও বৈরাগীর ভিটার দুটিসহ মোট তিনটি স্থানে নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয়েছে খনন কাজ।

মিলেছে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বিশাল মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ

বৈরাগীর ভিটায় গত বছর খননের পর প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর আগে নির্মিত তিনটি বৌদ্ধ মন্দিরের নিদর্শন মেলে। এবারও সেখানে ওই মন্দিরগুলোর পূর্ণ অবয়ব নিশ্চিত করতে খননের পাশাপাশি চলছে সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ। এবারো একই মন্দিরের অংশ বিশেষ আরো ফুটে উঠেছে।

মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় খননে বেরিয়ে এসেছে প্রায় ১২০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। সেই সঙ্গে খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে শুরু করে মুসলিম শাসনামলের সমৃদ্ধ কিছু প্রত্নসামগ্রীও পাওয়া গেছে।

গত ১৫ মে থেকে মহাস্থান গড়ে এই খনন কাজ শুরু হয়। শেষ হয়েছে ৩০ জুন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ে খননে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী নিশ্চিত করেছে মহাস্থানগড় প্রাচীন যুগেও ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে ছিলো সমৃদ্ধ।

খনন দলের সদস্য এসএম হাসানাত বিন ইসলাম জানান, জাহাজঘাটার পূর্বাংশে যে খনন কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে সেখানে বেশ কয়েকটি কক্ষের সন্ধানের পাশাপাশি মিলেছে ধান-চালসহ শষ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত বৃহদাকার মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ। এছাড়া গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত মৃৎপাত্র ও অনেকগুলো পাত্রের পোড়া মাটির ভগ্নাংশও উদ্ধার হয়েছে সেখান থেকে। সেখানে যে কক্ষগুলোর সন্ধান মিলেছে তা অন্য কোনো স্থাপনায় ব্যবহৃত পুরাতন ইটের টুকরো দিয়ে নির্মিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।। সেই সঙ্গে মিলেছে পাতকুয়া। পানি পানের জন্য এই ক’য়া ব্যবহার হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময়েও একটি সমৃদ্ধ রাজ্য গঠন করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, নিদর্শনগুলো পাল সাম্রাজ্যের।

মহাস্থানগড়ের জাহাজঘাটা খনন কাজের দলনেতা সাদেকুজ্জামান জানান, জাহাজঘাটার মধ্যভাগে খননে বেরিয়ে এসেছে ঘনবসতির নিদর্শন। সেখানকার মাটির তলদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মৃৎপাত্রের টুকরো উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া সরু পথের নিদর্শনের পাশাপাশি বসতবাড়ির চিহ্ন মিলেছে সেখানে। ধারণা করা হচ্ছে সেখানে এককালে জনবসতি ছিল। সে সময় মাটির হাড়ি পাতিল ব্যবহার হতো। খননকালে সেখানে স্থাপত্য শৈলীর পাশাপাশি বেশকিছু প্রত্নবস্তুও সন্ধান মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় উজ্জ্বল চকচকে কালো মৃৎপাত্র (এনবিপিডাব্লিউ), বিভিন্ন যুগের মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, পোড়া মাটির বাটি ও পোড়া মাটির গুটিকা। উদ্ধার হওয়া এসব প্রত্নবস্তু মহাস্থান জাদুঘরের গবেষণাগারে নিয়ে পরিচ্ছন্ন করে সংরক্ষণ করছেন খনন সম্পৃক্তরা।

তিনি বলেন, মহাস্থানগড়ের প্রাচীনত্ব বিশ্ব স্বীকৃত। সেই স্বীকৃতির নিদর্শনই প্রতি বছরের খননকাজে উন্মোচিত হচ্ছে। সেখানে যেসব প্রত্নবস্তুর নমুনা মিলেছে তা প্রমাণ করে খ্রিস্টের জন্মের পূর্বেও এই জনপদ ছিলো সমৃদ্ধ। এবার খননের পর সংস্কার করে বৈরাগীর ভিটা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বগুড়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মুজিবুর রহমান জানান, এবারের খননে বৈরাগীর ভিটায় প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর আগে নির্মিত তিনটি বৌদ্ধ মন্দিরের নিদর্শন মিলেছে। এবারও সেখানে ওই মন্দিরগুলোর পূর্ণ অবয়ব নিশ্চিত করতে খননের পাশাপাশি চলছে সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ।

তিনি জানান, ৩০ জুন খননকাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে অঙ্কনের কাজ। মোট তিনটি স্থানে খনন করা হয়েছে। খনন কাজ করার পর ধারণা করা হচ্ছে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ৮ম বা ৯ম শতকে এই এলাকায় মন্দির বা উপাসনালয় নির্মাণ করা হয়েছিল। ছিল জনবসতিও। আরও কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। সেগুলো মুসলিম শাসন আমলের কি না তা গবেষণার বিষয়। কিছু পোড়া মাটির ভগ্নাংশ রয়েছে যা খৃস্টপূর্বের কিনা তা নিয়ে গবেষনার পর বলা যাবে।

এবারের খননকাজে সাত সদস্যের দলের ফিল্ড ডাইরেক্টর হিসেবে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা। খননকাজের দুই ভাগের নেতৃত্ব ছিলেন দুই দলনেতা। এরমধ্যে বৈরাগীর ভিটায় দলনেতা ছিলেন মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান এবং জাহাজঘাটার দলনেতার দায়িত্বে আছেন পাহাড়পুর জাদুঘরের কাস্টডিয়ানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক সাদেকুজ্জামান। সৌজন্যে: নয়া দিগন্ত